Home / সারাদেশ / ঠাকুরগাঁওয়ের সূর্যাপুরী আমগাছটি এখন পর্যটন কেন্দ্র

ঠাকুরগাঁওয়ের সূর্যাপুরী আমগাছটি এখন পর্যটন কেন্দ্র

ক্রাইম প্রতিদিন, মজিবর রহমান শেখ ঠাকুরগাঁও : ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার হরিণমারি সীমান্তের মন্ডুমালা গ্রামে রয়েছে আড়াই বিঘা জুড়ে একটি সূর্যাপরী আমগাছ। ব্যাপক লোকের সমাগমে এ আম গাছটি এখন পর্যটন কেন্দ্রে পরিনত হয়েছে। আড়াই বিঘা জমি জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই গাছটি কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে এশিয়ার সর্ব বৃহত্তম আমগাছ। এ আমগাছে প্রতিদিন শত শত মানুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসে দেখার জন্য। কেউ আসে বনভোজনে, কেউ আসে শিক্ষা সফরে আবার কেউ আসে অলস সময় অতিবাহিত করার জন্য।

ঠাকুরগাঁও জেলায় উচ্চ পর্যায়ের কোন মন্ত্রী, সচিব, হাই কমিশনার সহ জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন জেলার অসংখ্য মানুষ বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার সীমান্তবর্তী হরিণমারি মন্ডুমালা গ্রামে ছুটে আসে আম গাছটিকে এক নজর দেখার জন্য। যে আমটির জন্য ঠাকুরগাঁও বিখ্যাত তার নাম “সূর্যাপরী” আম। চমৎকার স্বাদ, সুমিষ্ট এবং ছোট আঁটি বিশিষ্ট আমটির স্বাদ যিনি একবার পেয়েছেন, তিনিই বারবার ছুটে এসেছেন উত্তরের এই শান্ত জনপদে। তবেএ আমের চেয়েও আজ বেশি বিখ্যাত হয়ে আছে, ছবির এই আমগাছটি। কেবল একটি সূর্যাপরী আমের গাছ রয়েছে আড়াই বিঘা জমি জুড়ে। প্রায় দু’শ বছরের অসংখ্য ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে হরিণমারী সীমান্ত এলাকার মন্ডুমালা গ্রামে এই আমগাছটি দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় ৫০ হাত প্রস্থের প্রবীণ এই গাছটি চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে বিস্তৃত ডালপালা। প্রতিটি ডালের দৈর্ঘ্য ৫০/৬০ হাত। বিরাট জায়গা জুড়ে মাটিতে আসন গেড়ে জবুথবু হয়ে বসে থাকা গাছটিকে দেখলে মনে হয় সারিসারি আমগাছ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। কখনও মনেহয় গাঢ় সবুজ টিলায় সেজেছে হরিণমারীর প্রকৃতি।

স্থানীয় দুই ব্যাক্তি ওয়াহিদুজ্জামান (৪৫) ও সৈয়দ আলম (৩৭) জানান, গাছটির ডালপালা আরও অনেক বেশি ছিলো। ঝড়ে ভেঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কিছুটা কমেছে গাছটির আয়তন। কেউ বলেছেন দু’শ, আবার কেউ বলেছেন আড়াইশ বছর। তবে এলাকার বেশির ভাগ মানুষই একমত যে, গাছটির বয়স কিছুতেই দু’শ বছরের কম নয়।

পৈত্রিক সূত্রে গাছের মালিক নুর ইসলাম জানান, আম ব্যাবসায়ীর নিকট দেড় লক্ষ টাকা ৩ বছরের জন্য আম গুলো বিক্রি করা হয়েছে । এ বছর আম গাছে বেশ মুকুল এসেছে । আমের ফলন বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । তার এ আমগাছের খ্যাতি এ জেলা ছাড়িয়ে-ছড়িয়ে পড়েছেদেশ জুড়ে। আগামীতে বিদেশী অভ্যাগতদের ভীড়ও দেখা যাবে,এমন আশা ব্যক্ত করলেন বালিয়াডাঙ্গী সমিরউদ্দীন কলেজের অধ্যক্ষ নৃ-তত্ত্ববিদ বেলাল রব্বানী। নতুন যারাই দূর-দুরান্তথেকে এ জেলায় একবারের জন্যও আসেন তারা এক নজর দেখার জন্য গাছটির কাছে ছুটে যান।

গত ২৭ মে ২০১৬ সকালে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসনের আয়োজনে বাংলাদেশে উদ্ভিদ বিজ্ঞান সমিতির সহযোগিতায় জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পৃস্ট পোষকতায় ও তত্বাবধানে সূর্যাপুরী আমগাছের শর্তবর্ষির ফলদ ও বৃক্ষ পরিচর্চা বিষয়ক উন্মুক্ত সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, এ আমগাছটি একটি বিরল গাছ। বাংলাদেশের টুরিস্ট স্পট হিসেবে স্বকৃতি পাবে। বহু মানুষ দেশ বিদেশে থেকে দেখতে আসবে।

গাছটির অসাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে সাধারণ মানুষের নিকটএই গাছের সাধারণ মানুষের কাছে পৌছানো দরকার। গণমাধ্যম সারা দেশের শুধু নয় সারা পৃথিবীতে এই খবরটি ছড়িয়ে দিতে পারে। গাছটি রক্ষনা বেক্ষণের জন্য সচেতন থাকতে হবে। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যাদুঘর এর মহাপরিচালক স্বপন কুমার রায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো ভিসি (শিক্ষা) প্রফেসর ড. নাসরিন আহমেদ, প্রো ভিসি (প্রশাসন) ড. শহীদ আকতার হুসাইন, জীববিজ্ঞান অনুষদের ডীন ড. ইমদাদুল হক, বোটানিক্যাল সোসাইটির মহাসচিব শেখ শামীমুল হক, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নারগিস জাহান, শাহাদাত মোরশেদ, মমতাজ বেগম, মিহির লাল সাহা, জসিম উদ্দিন, নুরুল ইসলাম আশফাক মাহমুদ, আজমল হোসেন ভুইয়া, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান । এশিয়ার বৃহত্তম আমগাছটির পাশেই এই গাছের ডাল থেকে জন্ম নেয়া আরো কয়েকটি বিরাট আকারের গাছ বেড়ে উঠছে। ইসলাম উদ্দীনের মতে, ফলনের শর্ত ঠিকভাবে পূরণ করাহলে এই গাছ থেকে অজস্র চারা বানিয়ে জেলার অনেক জায়গায় এমন আমগাছ ছড়িয়ে দেয়া যাবে। আর তা হলে আড়াই বিঘা কেন আগামীতে চার বিঘা আয়তনের আমগাছ দেখতে পাওয়াও বিস্ময়ের কিছু হবে না। গাছটি দেখতে হলে ১০ টাকার বিনিময়ে টিকিট ক্রয় করতে হবে। প্রতিদিন ২/৩শ দর্শনাথীর আগমন ঘটে। ঈদের বা বিশেষ দিন গুলোতে দর্শনাথীদের ভীড় বেশী থাকে।

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের শস্য উৎপাদন বিশেষজ্ঞ সফিকুল ইসলাম জানান, এ আমগাছটি হচ্ছে লতানো আমগাছ। এ গাছের ডালকেটে কলম চারা করা হলে এর আবাদ সারা জেলায় ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব। ইতোপূর্বে কৃষি অধিদফতরের প্রাক্তন মহা-পরিচালক মোঃ এনামূল হক নিজে উদ্যোগী হয়ে জেলার বিভিন্ন নার্সারীতে এ গাছটি কলম চারা সরবরাহ করেন। এদিকে এই গাছটিকে ঘিরে হরিণমারীকে একটি পর্যটন কেন্দ্রহিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা ও ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসন। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ও এ টু আই প্রকল্পের মহাপরিচালক প্রফেসর ড.গওহর রিজভী এ গাছটি পরিদর্শন করেন এবং মুগ্ধ বলে জানান। বর্তমানে এখানে পর্যটকদের জন্য বসার ব্যবস্থা করেছেন উপজেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে আম গাছটিতে যাত্রী ছাউনি নির্মাণ করেছেন । সমগ্র ঠাকুরগাঁওবাসীর গর্ব এ আড়াই’ বিঘার আমগাছটি যেন আগামীতে হাজার বছর এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারে এজন্য সরকারের আরো মনোযোগের দাবি ঠাকুরগাঁওবাসীর।

Print Friendly, PDF & Email

আরও পড়ুন.......

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 71
    Shares