Home / লিড নিউজ / নববর্ষ, পহেলা বৈশাখ ও ইসলাম : মাইনুল ইসলাম পলাশ
 এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ, সম্পাদক, ক্রাইম প্রতিদিন , সভাপতি, অপরাধ মুক্ত বাংলাদেশ চাই

নববর্ষ, পহেলা বৈশাখ ও ইসলাম : মাইনুল ইসলাম পলাশ

ক্রাইম প্রতিদিন, ডেস্ক : ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মানুষ কিছু আনন্দ এবং স্মৃতিকে আপন করে নেয়। আর এ আপন করে নেওয়ার বিভিন্ন স্তর এবং সময়ের পথ ধরে সংস্কৃতির বিকাশ। প্রতিটি জাতি ও সভ্যতা সংস্কৃতির মাধ্যমে খুঁজে পায় তার নিজস্ব অনুভূতি এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশী ও বাঙালী জাতি হিসেবে, ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আমাদের এমন একটি উৎসব হল পহেলা বৈশাখ।পহেলা বৈশাখ হলো বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন ।

বিশ্বের সকল প্রান্তের সকল বাঙালি এ দিনে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়, ভুলে যাবার চেষ্টা করে অতীত বছরের সকল দুঃখ-গ্লানি। সবার কামনা থাকে যেন নতুন বছরটি সমৃদ্ধ ও সুখময় হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ই এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমী কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এদিন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে।

বাংলা দিনপঞ্জীর সঙ্গে হিজরী ও খ্রিস্টীয় সনের মৌলিক পার্থক্য হলো হিজরী সন চাঁদের হিসাবে এবং খ্রিস্টীয় সন ঘড়ির হিসাবে চলে। এ কারণে হিজরী সনে নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনে। ইংরেজি দিন শুর হয় মধ্যরাতে। পহেলা বৈশাখ রাত ১২ টা থেকে শুরু না সূর্যদোয় থেকে থেকে শুরু এটা নিয়ে অনেকের দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে, ঐতিহ্যগত ভাবে সূর্যদোয় থেকে বাংলা দিন গণনার রীতি থাকলেও ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমী এই নিয়ম বাতিল করে আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রাখতে রাত ১২.০০টায় দিন গণনা শুরুর নিয়ম চালু হয়।

ইতিহাস : পাকিস্তান সরকারের অন্যায় অত্যাচারের জবাব দিতেই “ছায়ানট” ১৯৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল (১লা বৈশাখ, বাংলা ১৩৭২ সন) রমনার বটমূলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “এসো হে বৈশাখ এসো এসো” গানটি দিয়ে সর্বপ্রথম যাত্রা শুরু করে “পহেলা বৈশাখ”।

ইতিহাস বলে, যার হাত দিয়ে বৈশাখ কিংবা বাংলা নববর্ষের গোড়াপত্তন হয়েছে তিনি কেবল মুসলমানই ছিলেন না বরং সারা মুসলিম বিশ্বে একজন নামকরা, উদারপন্থি শাসক হিসেবে আজও পরিচিত তিনি হচ্ছেন সেই জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবর।

আমাদের দেশে প্রচলিত বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন মূলত ইসলামী হিজরী সনেরই একটি রূপ। ভারতে ইসলামী শাসনামলে হিজরী পঞ্জিকা অনুসারেই সকল কাজকর্ম পরিচালিত হতো। মূল হিজরী পঞ্জিকা চান্দ্র মাসের উপর নির্ভরশীল। চান্দ্র বছর সৌর বছরের চেয়ে ১১/১২ দিন কম হয়। সৌর বছর ৩৬৫ দিন, আর চান্দ্র বছর ৩৫৪ দিন। একারণে চান্দ্র বছরের ঋতুগুলি ঠিক থাকে না। তাই চাষাবাদসহ যেসব কাজ ঋতুনির্ভর তার সুবিধার্তে ভারতের মোগল সম্রাট আকবারের সময়ে প্রচলিত হিজরী চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সম্রাট আকবার তার দরবারের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরী চান্দ্র বর্ষপঞ্জীকে সৌর বর্ষপঞ্জীতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ৯৯২ হিজরী মোতাবেক ১৫৮৪ খৃস্টাব্দে সম্রাট আকবার এ হিজরী সৌর বর্ষপঞ্জীর প্রচলন করেন। তবে তিনি ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তার সিংহাসন আরোহনের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ইতোপূর্বে বঙ্গে প্রচলিত শকাব্দ বা শক বর্ষপঞ্চির প্রথম মাস ছিল চৈত্র মাস। কিন্তু ৯৬৩ হিজরী সালের মুহাররাম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস, এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়।

ইতিহাস থেকে জানা আরও জানা যায় যে, আগে বৈশাখের অনুষ্ঠানের চেয়ে চৈত্র সংক্রান্তির অনুষ্ঠান ছিল আকর্ষণীয়। এই রেশ ধরেই বৈশাখের পদার্পণ। এখনও চৈত্রের শেষ দিনে গাঁয়ের বধূরা বাড়ি ঘর পরিষ্কার করে। বিশেষ করে পানিতে মাটি ছেনে ঘরের ভিতরে ও আঙ্গিনায় লেপে দেয়। উঠান ঝকঝকে পরিষ্কার করে রাখে।

নববর্ষ, পহেলা বৈশাখ ও ইসলাম : বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও সর্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ। অথচ বর্তমানে অস্বীকৃতি, অস্পষ্টতা ও অসংলগ্নতার ঘূর্ণাবর্তে পহেলা বৈশাখ হয়ে যাচ্ছে একপক্ষীয়। তাই আনুষ্ঠানিক বর্ষবরণে কারো অংশগ্রহণ বা কারো বিরত থাকার মধ্যে বিভক্তি রেখা আবিষ্কার কাম্য নয়।

জাতিগতভাবে বিষয়টি বাধ্যতামূলক বা নিষিদ্ধকরণের পরিবর্তে এটিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বীকৃতি দেওয়াই যৌক্তিক। কেননা সংস্কৃতি কখনোই আরোপিত বিষয় নয়, বরং মানুষের সুকোমল প্রবৃত্তির বহুল চর্চা ও অনুশীলনের স্বাভাবিক প্রকাশ হলো সংস্কৃতি। সংস্কৃতির বিকাশ একটি নিরপেক্ষ কালোত্তীর্ণ-মানোত্তীর্ণ ধারণা ও সময়সাপেক্ষ অর্জন।

সংস্কৃত প্রবাদে আছে ‘আনন্দে নিয়ম নাস্তি’। তবে বৈশাখী উৎসবে যা যা করা হয়, তা নিয়ে ধর্মীয় ব্যাখ্যার অবকাশ প্রসঙ্গে কেউ বলেন, উৎসবের সঙ্গে ধর্মের সংশ্লেষ নেই। কেউ বলেন, এটা স্রেফ বাঙালির সর্বজনীন চেতনা। অথচ নিরেট সত্য কথা হচ্ছে, আমরা একই সঙ্গে বাঙালি ও মুসলমান। বাঙালিত্ব ও ঈমানি বিষয়ে দ্বন্দ্ব নেই বলেই তো ধমকের যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি আপসেরও দরকার হয় না। কেননা, ধর্মীয় চেতনা কখনোই এক দিনের বিশেষ বিষয় নয়। ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গে শৈথিল্যের অবকাশ রাখা হয়নি, এক দিনের জন্যও নয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে যেসব উৎসব-আয়োজন ও খেলাধুলার মাধ্যমে মানুষের জীবন-সম্ভ্রমের নিরাপত্তাঝুঁকি, নামাজ-ইবাদতের জন্য প্রতিবন্ধক, বিধর্মীদের অনুসরণ, সময় ও অর্থের অপচয়, জুয়া-লটারি, রং খেলা, উদ্দামনৃত্য-গীত, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, উল্কি আঁকা, অবৈধপণ্যের বিপণন ইত্যাদির বাহুল্য থাকে, তা একজন ঈমানদারের জন্য অশোভন। কেননা শরীর ও মনের বিকাশে যেসব কাজকর্মের ফলে ফরজ লঙ্ঘন অথবা হারামের অনুষঙ্গ তৈরি হয়, সে সব কিছুই ইসলামের দৃষ্টিতে কবিরা গুনাহ। একটি কবিরা গুনাহ জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার যৌক্তিকতা হিসেবে যথেষ্ট। কবিরা গুনাহ তাওবা ছাড়া মাফ হয় না। সুরা মায়েদার ৯০ নম্বর আয়াতে মদ, মূর্তি, জুয়া, লটারি নিষিদ্ধের পাশাপাশি একে ‘ঘৃণিত শয়তানের কাজ’ বলা হয়েছে।

“উৎসব-অনুষ্ঠান ধর্মীয় বিধান, সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে আল্লাহ বলেন : ‘তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটি নির্দিষ্ট বিধান এবং সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি।’ [আল-মায়িদাহ :৪৮] ‘প্রতিটি জাতির জন্য আমি ধর্মীয় উপলক্ষ নির্দিষ্ট করে দিয়েছি যা তাদেরকে পালন করতে হয়।’ [আল-হাজ্জ্ব :৬৭]

নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি – এ ধরনের কোন তত্ত্ব ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়, বরং নতুন বছরের সাথে কল্যাণের শুভাগমনের ধারণা আদিযুগের প্রকৃতি-পুজারী মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণার অবশিষ্টাংশ। ইসলামে এ ধরনের কুসংস্কারের কোন স্থান নেই।

কেউ যদি এই ধারণা পোষণ করে যে, নববর্ষের প্রারম্ভের সাথে কল্যাণের কোন সম্পর্ক রয়েছে, তবে সে শিরকে লিপ্ত হল, অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করল। আর কেউ যদি মনে করে যে নববর্ষের আগমনের এই ক্ষণটি নিজে থেকেই কোন কল্যাণের অধিকারী, তবে সে বড় শিরকে লিপ্ত হল, যা তাকে ইসলামের গন্ডীর বাইরে নিয়ে গেল। আর এই শিরক এমন অপরাধ যে, শিরকের ওপর কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে চিরতরে হারাম করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন সূরা মায়িদাহ ৭২ নম্বর আয়াতে “নিশ্চয়ই যে কেউই আল্লাহর অংশীদার স্থির করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন, আর তার বাসস্থান হবে অগ্নি। এবং যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।

প্রাণ ও প্রকৃতির সর্বজনীন উৎসব বাংলা নববর্ষ। আমরা ভাগ্যবান, আমাদের বর্ষপঞ্জি আছে, ইংরেজদের নেই। তারা ব্যবহার করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। ‘সন’ ও ‘তারিখ’ আরবি শব্দ। ‘সাল’ ফারসি শব্দ। এগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় বাংলা সনের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পৃক্ততার কথা। কিন্তু খাদ্যের সঙ্গে মিশে থাকা চুল, কাঁকড়জাতীয় বস্তু যেমন অখাদ্য, তেমনি সংস্কৃতির মধ্যে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশই বা কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখা জরুরি।

আমরা মুসলমান। মুসলমানদের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। ইসলামী সংস্কৃতি মহান আল্লাহর আদেশ ও প্রিয়নবী (সা.)-এর আদর্শিক চেতনায় উজ্জীবিত এবং ইহকাল ও পরকালের শান্তি-মুক্তির লক্ষ্যে নিবেদিত। অন্যদিকে বৈশাখী উৎসব নিছক এক দিনের সস্তা বিনোদনের বিষয় নয়, বৈশাখী উৎসব আমাদের জাতীয় পরিচিতি সংরক্ষণের ডাক দেয়। বাংলা নববর্ষের ক্রমবিবর্তনে রয়েছে মুসলিম ঐতিহ্য ও পুরনোকে মুছে ফেলে নতুন শপথে পথ চলার অঙ্গীকার। মুসলিম লোকভাবনাসমৃদ্ধ ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’য় নববর্ষের আবাহন ধ্বনিত হয়েছে—‘আইল নতুন বছর লইয়া নব সাজ,/কুঞ্জে ডাকে কোকিল-কেকা বনে গন্ধরাজ।’

লেখক : এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ, সম্পাদক, ক্রাইম প্রতিদিন , সভাপতি, অপরাধ মুক্ত বাংলাদেশ চাই

আরও পড়ুন.......

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 46
    Shares