শিরোনাম

না’গঞ্জে আরেক নূর হোসেন : গডফাদার পলাশ ও তার চার খলিফা

ক্রাইম প্রতিদিন, ডেস্ক : নারায়ণগঞ্জে আরেক ‘নূর হোসেনে’র সন্ধান পাওয়া গেছে। ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা ও মন্ত্রীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ফতুল্লা দাপিয়ে বেড়ানো এই ‘নেতা’র নাম কাউসার আহমেদ পলাশ। দখল ও চাঁদাবাজিই তার পেশা ও নেশা।

নিচ থেকে উঠে আসা এই পলাশ এখন বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক। চড়েন প্রাডো গাড়িতে (ঢাকা মেট্রো-গ-১১-৬৮১৯)। তার চার ‘খলিফা’ও (সেন্টু, আবুল, মোকাররম ও আজিজুল হক) বিলাসী জীবনযাপন করছেন। গাড়ি-বাড়ি সবই তাদের রয়েছে।

থাকেন বসুন্ধরা ও গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায়। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টেও পলাশদের চাঁদাবাজির ভয়ঙ্কর তথ্য বের হয়ে এসেছে। ফতুল্লার আলীগঞ্জ থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত এলাকায় চাঁদাবাজি থেকেই পলাশের মাসিক আয় প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।

এই সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণে মূল ভূমিকায় রয়েছে এই চার খলিফা। আলোচিত ৭ খুনের মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন ফাঁসির দণ্ড নিয়ে বন্দি জীবনযাপন করলেও পলাশ দলবল নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ফতুল্লা।

ভুক্তভোগীরা ‘ফতুল্লার গডফাদার’খ্যাত পলাশের নাম শুনলেই আঁতকে ওঠেন। ১৯৯৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ৪টি হত্যাসহ তার বিরুদ্ধে ২১টি মামলা দেয়া হলেও সব ক’টি থেকে তিনি পার পেয়ে গেছেন। পুলিশের একটি সূত্র বলছে, ছাত্রলীগ করা পলাশ প্রতিটি মামলায় খালাস পেয়েছেন!

পলাশের ব্যাপারে প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে রাজি নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা জানান, ক্রমশই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছেন পলাশ। তার নাম শুনলেই ভয়ে আঁতকে ওঠেন ফতুল্লা ও পাগলার ব্যবসায়ীরা।

তার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষও। ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে তার নিয়ন্ত্রণে চলে ব্যাটারিচালিত অবৈধ ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা, স্টিল মিল, ইট-বালু, ট্রাক স্ট্যান্ড, গার্মেন্টস কারখানা থেকে শুরু করে নদীতীরে জাহাজ লোড আন লোড।

অজানা কারণে স্থানীয় প্রশাসনও পলাশের ব্যাপারে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। দেখেও না দেখার ভান করছেন। সূত্র বলছে, স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই পলাশ তার থাবা বিস্তার করেছে।

কাউসার আহম্মেদ পলাশ ফতুল্লার কুতুবপুর ইউনিয়নের আলীগঞ্জ এলাকার হাজেরা ইদ্রিস ও মৃত ইদ্রিস আলীর ছেলে। ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার শ্যাম বরনের সুঠাম দেহের অধিকারী পলাশ ১৯৮৯ সালে এইচএসসি পাস করেন।

সম্প্রতি একটি সংস্থা পলাশের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে শুরু করে। তাদের কাছেই রয়েছে পলাশের চাঁদাবাজির ভয়ঙ্কর চিত্র। ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফতুল্লায় চাঁদাবাজি হচ্ছে মূলত শ্রমিক লীগ নেতা পলাশের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ইন্ধনে।

আর ওই শ্রমিক লীগ নেতার ৪ জনের দল আছে যারা চাঁদাবাজির এই খাত নিয়ন্ত্রণ করছেন। গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানান, গত সংসদ নির্বাচনের আগেই কেন্দ্রীয় শ্রমিক লীগের শ্রম উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক পলাশের সাম্রাজ্য বিস্তারের থাবা শুরু হয়।

তখনই আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাবশালী নেতার সমর্থন পেয়ে যান তিনি। অঘোষিতভাবে তাকে রাজধানীর শ্যামপুরের শেষ অংশ আলীগঞ্জ থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত বরাদ্দ দেয়া হয়। এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে একাধিক এমপি ও মন্ত্রীর সঙ্গে তার ছবিকে কাজে লাগাচ্ছেন সুচতুর পলাশ।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে পলাশের সহযোগী সেন্টুকে উল্লেখ করা হয়েছে তার ‘মিত্র’ হিসেবে। বক্তব্য জানতে পলাশকে ফোন দিলেও তিনি ধরেননি। তবে তার চার খলিফার এক খলিফা মোকাররমের কাছে পলাশ সম্পর্কে জানতে চাইলে পলাশের ব্যাপারে তিনি বলেন, পলাশ শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করছেন। অবৈধ কোনো কিছুর সঙ্গে তিনি জড়িত না।

চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ফতুল্লা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শাহজালাল বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কথায় কথায় রাষ্ট্রপতির নাম : খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কের দুই পাশে লোড আনলোড সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করে পলাশের চার খলিফা। এদের মধ্যে মোকাররম কথায় কথায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, স্থানীয় এমপির ঘনিষ্ঠ বলে পরিচয় দেয়।

মোকারমের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলীতে। কিশোরগঞ্জের সন্তান মোকাররম ‘গডফাদার’খ্যাত পলাশের সঙ্গে থেকে অঢেল সম্পদ গড়ে তোলেন। এলাকাতে যান স্পিডবোটে চড়ে। গ্রামের বাড়িতে গড়ে তুলেছেন আলিশান ভবন।

ওয়ান ইলেভের সময় ফতুল্লায় একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের বিপুল সংখ্যক পচা গম উদ্ধার করা হয় একটি জাহাজ থেকে। ঐ সময় ঐ গ্রুপের আরও কয়েকটি জাহাজে লুটপাট চালানো হয়। তখন ১০ কোটি টাকার মালামাল লুট করা হয় বলে জানা যায়।

জনশ্রুতি রয়েছে তখনই কপাল খোলে মোকারমের। এর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এক সময়কার লেবার সর্দার মোকাররমের। এরই মধ্যে গড়ে তুলেছেন একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি। কয়েক কোটি টাকা লগ্নি করেছেন চলচ্চিত্রে।

জানতে চাইলে মোকাররম বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমি আগেও লেবার সর্দার ছিলাম, এখনও লেবার সর্দারই আছি। যা পাই তা দিয়ে আমার সংসার চলে। বাড়ি-গাড়ি করার কথা তুললে তিনি বলেন, এসবের কোনো ভিত্তি নেই।

বুড়িগঙ্গা নদী থেকে মালামাল লোড-আনলোডের সময় বস্তা হিসেবে সমিতির নামে চাঁদা আদায় প্রসঙ্গে মোকাররম বলেন, এখানে অবৈধ কোনো কিছু হয় না। ‘দীপু’ ডাক এনেছে, ঘাটে কোনো চাঁদাবাজি বা অবৈধ কোনো কিছু হয় না। যা কিছু করা হয় সবই শ্রমিকের কল্যাণে।

ঐ অঞ্চলে ব্যাটারিচালিত অটো রিকশা ও ইজিবাইক থেকেও বিপুল অংকের টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এসব টাকা কতিপয় লোকের পকেটে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ঐ অঞ্চলে আট হাজারের বেশি ইজিবাইক ও অটো রিকশা চলাচল করে।

প্রতিটি রিকশা থেকে ১০০ টাকা ও ইজিবাইক থেকে ৬০০ টাকা নেয়া হচ্ছে। এসব যান নিয়ে ক্ষুব্ধ ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কাছে মৌখিক অভিযোগ করেছেন।

এগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার দাবি জানান। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বলেন, ইজিবাইক ও রিকশা চলাচলে বাধা দিলে শ্রমিক লীগ নেতা পলাশ ও তার লোকজন আমাদের বিরুদ্ধে উল্টো বিক্ষোভ করে রাস্তাঘাট বন্ধ করে আন্দোলনের হুমকি দেয়। বিষয়টি জেলা প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্তাদের অবহিত করেছি এবং বলেছি, হয় এগুলোর বৈধতা দেন নয়তো আইনগত ব্যবস্থা নিন।

চাঁদার যন্ত্রণায় কারখানা বন্ধ : সূত্র জানায়, তাদের চাঁদাবাজির উৎপাত সহ্য করতে না পেরে পঞ্চবটিতে রফতানিমুখী গার্মেন্ট কারখানা পাইওনিয়ার ও পোস্ট অফিস রোডের বিপরীতে হামিদ ফ্যাশনসহ শিবুমার্কেট এলাকায় আরও একটি গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে।

এসব কারখানা ঘিরে কিছুদিন পর পর যে ঝামেলার সৃষ্টি হতো তার নেপথ্যে ছিল কাউসার আহম্মেদ পলাশ। একাধিক শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘আমরা দিনমজুর হিসেবে কাজ করি। এখানে একজন নেতার কল্যাণে কাজ করি। তবে বিভিন্ন সময়ে তাদের ডাকে আমাদের মিছিল-মিটিংয়ে যেতে হয়। সিন্ডিকেট ছাড়া কাজ পাওয়া যায় না।’

বর্তমানে পলাশের কব্জায় ৭৪টি শ্রমিক সংগঠন রয়েছে। সব সংগঠন থেকে চাঁদার টাকা চলে যায় পলাশের ফান্ডে। পলাশের অপকর্মের প্রতিবাদ করায় সাবেক এমপি সারাহ বেগম কবরী ও বর্তমান সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেমা মনির একাধিকবার লাঞ্ছিত হয়েছেন।

তাদের বিরুদ্ধে ঝাড়– মিছিলসহ নানা তৎপরতা চালানো হয়। এসবের নেপথ্যে ছিল পলাশদের হাত। ব্যাটারিচালিত রিকশা মালিক শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আজিজুল হক জানান, ফতুল্লায় প্যাডেলচালিত রিকশা (ব্যাটারি চালিত) মালিক শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের নামে ১৯টি কমিটি রয়েছে।

এ কমিটির অধীনে রয়েছে ৪ হাজার রিকশা। আর ইজিবাইকের মালিক শ্রমিক ঐক্যজোট নামে ৪টি কমিটি রয়েছে। এ কমিটির অধীনে ইজিবাইক রয়েছে ৮০০টি। এ দুই কমিটির আহ্বায়ক হচ্ছেন শ্রমিক লীগ নেতা কাউছার আহমেদ পলাশ। সরকারের অনুমোদন আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি না সূচক জবাব দেন।- যুগান্তর

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 27
    Shares
x

Check Also

হাইব্রিডরা মনোনয়ন পাবে না

ক্রাইম প্রতিদিন, ডেস্ক : কাল থেকে শুরু হচ্ছে ...