Home / উপ-সম্পাদকীয় / বিশ্ব মা দিবসে সকল মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা!
এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ, সম্পাদক- ক্রাইম প্রতিদিন, সভাপতি-অপরাধ মুক্ত বাংলাদেশ চাই

বিশ্ব মা দিবসে সকল মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা!

  • হেরিলে মায়ের মুখ
    দূরে যায় সব দুখ,
    মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান,
    মায়ের শীতল কোলে
    সকল যাতনা ভোলে
    কত না সোহাগে মাতা বুকটি ভরান।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম মায়ের চিরায়ত রূপ এভাবেই তুলে ধরেছেন তার ‘মা’ কবিতায়। আজ মা দিবস। পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

আজ ১০ মে, ‘আন্তর্জাতিক মা দিবস’। ১৯১৪ সাল থেকে প্রতি ইংরেজি মে মাসের দ্বিতীয় রোববার দিবসটি মর্যাদার সাথে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রতিটি মূহুর্ত মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তিপূর্ণ ভালবাসা প্রদর্শন।

তবে সবসময় মায়ের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা প্রতিটি সন্তানের মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য। কারণ, ‘মা’ পৃথিবীর সবচেয়ে আপন। সবকিছুর ঋণ পরিশোধ করা গেলেও মায়ের ঋণ কখনও পরিশোধ করা সম্ভব নয়।

ছোট্ট একটা শব্দ, কিন্তু কি বিশাল তার পরিধি! সৃষ্টির সেই আদিলগ্ন থেকে মধুর এ শব্দটা শুধু মমতার নয়, ক্ষমতারও যেন সর্বোচ্চ আধার। মায়ের অনুগ্রহ ছাড়া কোনো প্রাণীরই প্রাণ ধারণ করা সম্ভব নয়। তিনি আমাদের গর্ভধারিণী, জননী। ‘মা’ শব্দটির বাংলা অর্থ জননী, গর্ভধারিণী, ধাত্রী, গুরুপত্নী, ব্রাহ্মণী, রাজপত্নী, গাভী, শুশ্রুষাকারিণী, প্রতিপালিকা ইত্যাদি। কবির ভাষায়,

  • ‘মা কথাটি ছোট্ট অতি,
    কিন্তু যেন ভাই,
    ইহার চেয়ে নাম যে মধুর,
    ত্রিভুবনে নাই।

মায়ের কাছে একটি সন্তান যেমন তার জগৎ, তেমনি সন্তানের কাছে তার মা-ই সব। আর এ জন্য মা ও সন্তানের মধ্যকার সম্পর্কটি সবচেয়ে মধুর। একটি সন্তান যখন ঠিকমতো খেতে পারে না, কথা বলতে পারে না, এমনকি নিজের কাজও নিজে করতে পারে না, তখন তাকে আগলে রাখেন মা। তার মমতার চাদরের উষ্ণতায় তাকে বড় করে তোলেন। সন্তানের সব আবদার মা হাসিমুখে মেনে নেন।

‘মা’ তাঁর সন্তানকে খুবই ভালোবাসেন। কারণ সন্তান প্রসবের সময় মায়েরা যে কষ্ট অনুভব করে তা ‘মা’ ছাড়া কেউ উপলব্ধি করতে পারে না। হাদীস শরীফে বলা হয়েছে- “মা’য়ের পদতলে সন্তানের বেহেস্ত।” গণশিল্পী আলমগীরের ভাষায়, “মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম, পাপুস বানাইলেও ঋণ শোধ হবে না।”

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে- অনেক নারী, স্বামী ও ননদ কর্তৃক অকথ্য নির্যাতিত হওয়ার পরও সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বিয়ে বিচ্ছেদ করে না। অকথ্য নির্যাতন সহ্য করে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মায়েদের অবস্থা আরও করুণ। প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য অনেক ‘মা’ কে স্বামী তালাক দিয়েছে। ঘর থেকে সন্তানসহ বের করে দিয়েছে। তবুও ‘মা’ সন্তানটিকে নিজের বুকের কাছে রেখেছে। শুধু তাই নয়, প্রতিবন্ধী সন্তান মায়েদেরকে সমাজ নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। মনে করে হয়ত মায়ের পাপের ফসল হিসেবে সন্তান প্রতিবন্ধী। যা ‘মা’কে খুব কষ্ট ও যন্ত্রণা দেয়।

কবি মায়ের কোলকে বিদ্যালয়ের সাথে তুলনা করেছেন। ‘মা’ পারে একমাত্র সকল সন্তানের মনে সাহস যোগাতে। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘আর তোমার পালনকর্তা (কতিপয়) সিদ্ধান্ত দিয়েছেন (তা এই) যে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচারণ করবে। যদি তাঁরা বৃদ্ধকালে পৌঁছে যায়, তাহলে (তাদের ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে) তাদের তুমি উহ্ শব্দও বলবে না এবং তাদের ধমকও দেবে না। আর তাদের সঙ্গে তুমি সম্মানজনক কথা বলবে এবং তাদের জন্য দোয়ার মধ্য থেকে নম্রতার বাহু ঝুঁকিয়ে দাও। আর তাদের জন্য দোয়াস্বরূপ বলবে, হে আমার পালনকর্তা, তাদের দু’জনের ওপর ঐরূপ দয়া কর, যেরূপ তারা আমাকে ছোটবেলায় লালন-পালন করেছিলেন (সুরা বনি ইসরাইল, ২৩-২৪ আয়াত)।

হাদীস শরীফে রয়েছে, “একবার এক সাহাবী হযরত রাসুলে কারীম (সা.) কে জিজ্ঞাসা করলেন। হে আলাহর রাসুল! সবচেয়ে কার মর্যাদা বেশী। রাসুলুলাহ (সা.) বললেন, তোমার মা। আবার জিজ্ঞাসা করলেন তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। আবার জিজ্ঞাসা করলেন, তারপরে কে? তোমার মা। তারপরে কার মর্যাদা বেশী। এবার রাসুলুলাহ (সা.) বললেন, তারপরে তোমার বাবা।”

হযরত ইবনে মাসউদ বলেন, “একবার আমি হজরত নবী করীমকে (সা.) জিজ্ঞেস করলাম, কোন কাজটি আল্লাহ পাকের দরবারে সবচেয়ে প্রিয়? তিনি বললেন, সঠিক সময়ে নামাজ আদায় করা। আমি বললাম, তারপর? তিনি বললেন, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার। আমি বললাম, তারপর? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে সংগ্রাম করা (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত)। হযরত আবু উমামাহ (রা.) নামক এক সাহাবী বলেন, একজন লোক বলল, হে আল্লাহর রাসুল (সা.) সন্তানের ওপর পিতা-মাতার অধিকার কী? তিনি (সা.) বললেন, তাঁরা দু’জন তোমার জান্নাত অথবা তোমার জাহান্নাম (ইবনে মাজাহ, মিশকাত)।”

হজরত মুয়াবিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি রাসুলে আকরাম (সা.) এর কাছে এসে ইসলামের জন্যে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তার মা জীবিত আছেন কিনা? যখন লোকটি উত্তরে বলল, হ্যাঁ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ফিরে যাও এবং তোমার মায়ের কাছে থাক। কেননা, বেহেশত তাঁর পায়ের নিচে (আহমদ, বায়হাকি, নাসায়ি)।

দুঃখের বিষয়, আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মায়েদের অবস্থা খুবই করুণ। ছেলে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে বিলাস বহুল বাসায় বসবাস করে। মা পড়ে থাকে একা গ্রামে। থাকে না মায়ের সেবা করার মত লোক। এমনকি অনেক মানুষ বৃদ্ধা মায়ের প্রতি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। চিকিৎসার অভাবে মায়েদের কষ্টে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। এর চেয়ে মায়ের কষ্ট কী আর হতে পারে?

আসুন আমরা সকল সন্তান মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার হাত প্রশস্ত করি। মায়ের সুখের জন্য ত্যাগ করি জীবন। প্রতিটি দিনের প্রতিটি মূহুর্ত মা দিবস হিসেবে গণ্য করি। এই প্রত্যাশা রইল সকলের প্রতি।

আরও পড়ুন.......

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 26
    Shares