Home / সারাদেশ / ভোলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষের এক অনিঃশেষ সংগ্রামী জীবন

ভোলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষের এক অনিঃশেষ সংগ্রামী জীবন

ক্রাইম প্রতিদিন, ভোলা : চরের জীবন রৌদ্র-কঠোর, প্লাবন চিহ্নিত এক অনিঃশেষ সংগ্রামী জীবন। চর দখলের লড়াই এই জীবনেরঅন্যতম প্রধান একটি বিষয়। হিংস্রতার নেশা নয়, এর পেছনে আছে বেঁচে থাকার অনিবার্য তাগিদ। বস্তুত, ‘চর’-এর প্রথাসিদ্ধ কোনো গল্প নেই আবার আছে। এক বহতা নদীর গল্প, সেই নদীর খেয়ালখুশির সঙ্গে জুড়ে থাকা কিছু মানুষের বেঁচে থাকার গল্প, নদীর চরের হঠাৎ জেগে ওঠা এবং একদিন নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার মতোই ওই মানুষগুলোর স্বপ্নের ভাঙা-গড়ার গল্প। নদী যতই ওদের পায়ের তলার মাটি কেড়ে নেয়, ততই মরীয়া হয়ে ওরা খুঁজে নেয় বেঁচে থাকার নতুন ঠিকানা, নতুন চর! কিন্তু তাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। এমনই এক চিত্র দেখা গেছে ভোলার বিচ্ছিন্ন চরগুলোতে। এখানকার প্রতিটি মানুষ প্রতিনিয়ত নদীর সাথে লড়াই করছে। লড়াই করছে নদীর নিষ্ঠুর ভাঙনের সাথে। লড়াই করছে অভাবের সাথে। অব্যাহত নদী ভাঙনের কারণে ভোলার বিচ্ছিন্ন চরগুলোতে দিন দিন জনবসতির সংখ্যা বাড়ছে। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী অর্ধশতাধিক চরে প্রায় ২ লাখেরও বেশি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে কলাতলীর চর, মাঝের চর, চর জহির উদ্দিন, চর নিজাম, মদনপুর, নেয়ামতপুর, হাজিপুর, চর নাসরিন, ঢালচর, চর পাতিলা, চর মোজাম্মেলসহ জনবসতি আছে এমন ২০টি চরে বসবাস করা এসব মানুষ নদীর গতি প্রকৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। চরবাসীদের মনে বদ্ধমূল ধারণা, ভাঁঙা গড়াই নদীর খেলা। তাদের একটিই কথা, নদীর টানেই তারা পড়ে থাকে চর থেকে চরে। নদী যেমন দুঃখ দেয়, কেড়ে নেয় ঘর-বাড়ি। তেমনি নদীই তাদের সৌভাগ্য বয়ে আনে। ঋতু পরিবর্তনের সাথে তারা পেশা বদল করে। এক সময় জলে। কোন সময় নৌকার মাঝি। আবার এক সময় কৃষক। তাতেও চরের মানুষ কখনও পিছপা হয় না। চর ছেড়ে সমতলভূমিতে আসতে চায় না। পরিস্থিতি মানিয়ে তারা চরেই জীবনে তাগিদে জীবিকা নির্বাহ করে। চরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, ছড়ানো ছিটানো খড়ের ছাউনিযুক্ত প্রায় ৩০ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ বসতঘর। চরের সমতল জমিতে মাটি দিয়ে ৫-৬ ফুট উঁচু ভিটে তৈরি করে বানানো হয়েছে ঘরগুলো। কোন ঘরে টিনের চালা, আবার কোন ঘরে খড়ের ছাউনি। অধিকাংশ ঘরে পাতার বেড়া। ছোট ছোট নড়বড়ে ঘরগুলোর একই মেজেতে পরিবারের সকলে কোনমতে করে বসবাস করে। এতে দুর্যোগের মৌসুম ঘিরে বসতঘর নিয়ে চিন্তিত চরবাসী। চর পাতিলার অস্থায়ী বাসিন্দা মিনারা বেগম বলেন, এখানকার চরটি অনেক বড় ছিল। সেখানে ৫০-৫৫টি পরিবার ছিল। নদী ভাঙনে হারিয়ে যাওয়ায় ওই পরিবারগুলোর অনেকেই অন্যত্র চলে গেছে। কিছু পরিবার এখনও রয়ে গেছে। কিন্তু দুর্যোগের সময় এদের এখানে বসবাসে খুবই অসুবিধা হয়। বর্ষায় ঘরের মাচার ওপরে মালামাল নিয়ে বসবাস করে তারা। শুকনো মৌসুমে যে পথে পায়ে হেঁটে চলাচল করা যায়, বর্ষায় সে পথ তলিয়ে থাকে ৭-৮ ফুট পানির নিচে। তখন সাপের উপদ্রবও বেড়ে যায়। চর জহির উদ্দিনের আবু বেপারী জানান, উপকূলের উপর দিয়ে সিডর, আইলা, রেশমি, মহাসেন, রোয়ানুসহ অসংখ্য ঝড় বয়ে গেলেও চরবাসীর জন্য আজও নির্মিত হয়নি পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার। এতে দুর্যোগকালীন সময় চরম অনিরাপদ হয়ে উঠে চরাঞ্চলবাসীর জীবন। চর কুকরি-মুকরি ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাসেম মহাজন জানান, এটা একটা সামাজিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। বার বার নদী ভাঙ্গনে মাটির সাথে যেমন এই মানুষগুলোর মমতা দৃঢ় হয় না, তেমনি দারিদ্র্যের কারণে বাড়ি ঘর ছাড়তে ছাড়তে পরিবারের সাথেও বিছিন্নতা তৈরি হয়। প্রতিবছর নদী ভাঙ্গনে এই চরগুলোর মানচিত্রের বদল হয়। বদল হয় না মানুষগুলোর ভাগ্য। একপাশে ভাঙ্গে তো অন্য পাশে তখন জেগে ওঠে চর। নিজেদের আশ্রয়ের ঘরটি নিয়ে বার বার তাদের ছুটতে হয় এদিক-সেদিক। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) উপ-পরিচালক মো. সাহাবুদ্দিন জানালেন, চরাঞ্চলে যে পরিমাণ সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়। সাইক্লোন শেল্টারের অভাবে মোট জনসংখ্যার অর্ধেককেই শেল্টারের বাইরে থাকতে হয়। তাই আরো প্রায় ২০০ সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা দরকার। ভোলা জেলা প্রশাসক মো. মোহাম্মদ মাসুদ আলম সিদ্দিক জানান, চরাঞ্চলের বিপদগ্রস্ত মানুষদের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আনার জন্য আমাদের প্রায় ৬০০ সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন চরে মুজিব কেল্লা তৈরি করা হবে। সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এসব বসতঘরের নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ সুবিধাসহ গৃহপালিত পশুপাখি রাখার সুব্যবস্থাও থাকে এখন থেকে সেরকম অবকাঠামো নির্মাণে জোর দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

Print Friendly, PDF & Email

এই মুহূর্তে অন্যরা যা পড়ছে

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 29
    Shares