লক্ষ্মীপুরে ৩’শ ৫০ কোটি টাকার সুপারি উৎপাদন

ক্রাইম প্রতিদিন, লক্ষ্মীপুর : উপকূলীয় অঞ্চল লক্ষ্মীপুরে অর্থকরী ফসল সুপারি ‘লক্ষ্মী’ হিসেবে পরিচিত। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ জেলায় এবার প্রায় ৩’শ ৫০ কোটি টাকার সুপারি উৎপাদন হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত সুপারি জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে বাজার দর ভালো থাকায় স্থানীয়দের আগ্রহ বাড়ছে অর্থকরী এ ফসল চাষাবাদে। তবে পরিকল্পিত আবাদ, সঠিক পরিচর্যা ও চাষীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে জেলার ৫ টি উপজেলায় ৬ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে সুপারি উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১ হাজার ৯০০ হেক্টর, রায়পুরে ৩ হাজার ৭০০ হেক্টর, রামগঞ্জে ৮৯০ হেক্টর, কমলনগরে ২৬৫ হেক্টর ও রামগতির ৪০ হেক্টর জমিতে সুপারি চাষ হচ্ছে। জেলায় এবার ১১ হাজার ৪৫২ মেট্রিক টন সুপারি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। যার বাজার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩’শ ৫০ কোটি টাকা।

আরো জানা যায়, এ জেলায় সুপারি পাকা বিক্রি ছাড়াও পানিতে ভিজিয়ে এবং শুকিয়ে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে উৎপাদনের ৭০ ভাগ সুপারি পানিতে ভিজিয়ে জেলার বাইরে সরবরাহ করেন ব্যবসায়ীরা। আশ্বিন-কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে বিভিন্ন নদীনালা, খালডোবা, পুকুর ও জলাশয়ের পানিতে এসব সুপারি ভেজানো হয়। এরপর এসব সুপারি ঢাকা, চট্রগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, শ্রীমঙ্গলসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়ে থাকে। অন্যদিকে শুকনো সুপারি বিক্রি হয় প্রতি টন দুই থেকে আড়াই লাখ টাকায়।

সম্প্রতি জেলার কয়েকটি বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থান থেকে আগত ব্যবসায়ীরা প্লাস্টিকের কাগজ বিছিয়ে বসেছেন সুপারি কিনতে। ক্রয়কৃত সুপারি বস্তায় ভরে নিয়ে যাচ্ছেন তারা। বাজারে এখন প্রতি পোন (৮০টি) সুপারি বিক্রি হচ্ছে ১৩০-১৪০ টাকায়। মান ভালো হলে তা ১৪০-১৬০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কাহন (১৬) পোন সুপারি এখানে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২৪০ থেকে ২ হাজার ৫৬০ টাকায়।

জেলার সবচেয়ে বড় সুপারির হাট বসে দালাল বাজারে। এ বাজারে কোটি টাকার সুপারি বেচাবিক্রি হয়ে থাকে। সপ্তাহে দুইদিন (শুক্র ও সোমবার) এখানে সুপারির হাট বসে। এছাড়া জেলার রায়পুর উপজেলার মোল্লারহাট, রাখালিয়া, হায়দরগঞ্জ, সদর উপজেলার জকসিন, চন্দ্রগঞ্জ, ভবানীগঞ্জসহ রামগঞ্জ, কমলনগর ও রামগতি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সুপারির হাট বসে।

স্থানীয়রা জানান, জেলার বাসিন্দারা নিজ উদ্যোগে বাড়ি বা রাস্তার পাশে, পুকুরের পাড়ে ও ফসলি জমিতে বাগান করে সুপারি উৎপাদন করে আসছেন। সঠিক পরিচর্যার অভাবে ফসলটি আবাদ করে যথাযথ উৎপাদনশীলতা আদায় করা যাচ্ছে না। সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ, উন্নত বীজ সরবরাহ ও পৃষ্টপোষকতা দেয়া হলে সুপারির উৎপাদন এবং উৎপাদনশীলতা দুই-ই বাড়ানো সম্ভব হতো। জেলার বাসিন্দারা উন্নত জাতের সুপারি চাষ করে নিয়মিত আয়ের সুফলভোগী হতেন। এতে করে একদিক থেকে তাদের নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন হতো, অন্যদিক থেকে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিও হয়ে উঠত আরো সমৃদ্ধ।

সুপারি ব্যবসায়ী জামাল ও এমরান জানান, গত বছরের এ সময় সুপারির দাম ১০০ টাকার নিচে ছিল। এ বছর ফলন কিছুটা কম হওয়ায় চড়া দামে চাষীদের কাছ থেকে সুপারি কিনতে হচ্ছে। আরো কয়েকদিন পর বাজারে সুপারির দাম কিছুটা কমতে পারে।

উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবুল হোসেন জানান, সুপারি গাছের চারা রোপণের পর সঠিক পরিচর্যা করলে ৬-৭ বছরে ফলন পাওয়া যায়। সুপারি গাছ ২০-২৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। আগস্ট থেকে শুরু করে পরবর্তি বছরের মার্চ পর্যন্ত সুপারি সংগ্রহ চলে। একেকটি গাছে বছরে তিন থেকে পাঁচটি ছড়া আসে। গাছে ফুল আসার পর ৯-১০ মাস লেগে যায় ফল পাকতে। প্রতি ছড়ায় ৫০-১৫০ টি পর্যন্ত সুপারি থাকে।

এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. বেলাল হোসেন খান বলেন, সুপারি একটি অর্থকরী ফসল। এখানকার মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষে উপযোগী হওয়ায় সামান্য পরিচর্যায় ভালো ফলন আসে। এ অঞ্চলের অর্থনীতিক স্বচ্ছলতার পেছনে এ কৃষিপণ্যটির অবদান অনস্বীকার্য। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার কাঁচা-পাকা সুপারির দাম কিছুটা বেশি।

তিনি আরো বলেন, জনবল সংকটের পরও সুপারি চাষ, পরিচর্যা, ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণের বিষয়ে চাষীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষি বিভাগ।

আপনার মন্তব্য লিখুন
শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
x

Check Also

ফের ভাঙনের মুখে এরশাদের জাপা

ক্রাইম প্রতিদিন, ডেস্ক : আরেক দফা ভাঙনের মুখে ...