Home / উপ-সম্পাদকীয় / শবে বরাত পালন করা কি জায়েয নাকি বিদআত?

শবে বরাত পালন করা কি জায়েয নাকি বিদআত?

ক্রাইম প্রতিদিন, ডেস্ক : কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ইচ্ছেমত একটি গোষ্ঠী পবিত্র শবে বরাত এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অনেক আগ থেকেই এই গোষ্ঠী মুসলিমদের ঈমান ধ্বংস করার মিশনে নেমেছে। কারন এরা বুঝতে পেরছে মুসলিমদের পরিপূর্ণ ইসলাম থেকে খারিজ করে দিতে মুসলিমদের আমল ধ্বংস করতে হবে শুধু ঈমান ধ্বংস করলেই হবে না। এদের এসব প্রতারনাপূর্ন আই ওয়াশ মুলক কথাবার্তায় অনেক সাধারন মুসলিম বিভ্রান্ত হয়ে পবিত্র শবে বরাত এর নিয়ামতকে পরিত্যাগ করছে। তাদেরকে সঠিক ভাবে বুঝানোর জন্য আমি কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে শবে বরাতের তাৎপর্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি। যদিও শবে বরাত পালন করা জায়েয নাকি বিদয়াত তা নিয়ে আসলে অনেক বড় ব্যাখ্যা আছে যার সবকিছু এখানে তুলে ধরা সম্ভব না। আশা করে যতটুকু তুলে ধরেছি, একটু ধর্য ধরে পড়বেন, তাহলে বুঝতে অসুবিদা হবে না।

একটি গোষ্ঠী মানুষকে এইবলে আই ওয়াশ করে, শবে বরাত বলে হাদিস কুরআনে কিছু নেই্‌, এটা স্রেফ একটা বিদাত। আবার মানুষকে এভাবে ভয় দেখায় প্রত্যেক বিদাতি পথভ্রষ্ট, প্রত্যেক বিদাতি জাহান্নামী, আপনি পথভ্রষ্ট হবেন আপনি জাহান্নামী হবেন?

সাধারণ লোকেরাতো আর জানেনা কোনটা হাদিসে আছে, কোনটা হাদিসে নেই, কোনটা বিদাত আর কোনটা আমলযোগ্য। তাই এদের কথায় তারা সহজেই বিভ্রান্ত হয়ে যায়। এরা আপনাকে বুঝাবে সবে বরাত সম্পর্কে হাদিসে যা এসেছে তা জাল জইফ বাতিল হেন তেন। চলুন তাহলে দেখা যাক শবে বরাত সম্পর্কিত হাদিস ও এর সনদগুলি।

শবে বরাত” শব্দের অর্থ ভাগ্যের রাত বা বিমুক্তির রাত।“শবে বরাত” ফার্সি শব্দ যার আরবি “লাইলাতুল বরাত”।“শবে বরাত” বলতে আরবি ৮ম মাস শাবানের ১৪ তারিখের দিবাগত রাতকে বুঝায়। “শবে বরাতের” উৎপত্তি মুলত দুটি আয়াত এবং একটি হাদিসের উপর ভিত্তি করে।

আয়াত দুটি হলঃ اِنَّاۤ اَنۡزَلۡنٰهُ فِىۡ لَيۡلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ‌ اِنَّا كُنَّا مُنۡذِرِيۡنفِيۡهَا يُفۡرَقُ كُلُّ اَمۡرٍ حَكِيۡمٍۙ অর্থঃ َআমি এটি এক বরকত ও কল্যাণময় রাতে নাযিল করেছি৷ কারণ, আমি মানুষকে সতর্ক করতে চেয়েছিলাম৷ এটা ছিল সেই রাত যে রাতে আমার নির্দেশে প্রতিটি বিষয়ে বিজ্ঞোচিত ফায়সালা দেয়া হয়ে থাকে৷(সুরা দুখান ৪৪ঃ ৩-৪)

আর যেটিকে হাদিস বলা হয় সেটি আসলে কোন হাদিস নয়। সকল সাহাবি এবং তাবীঈয়ের মতের বিপরীতে একটি মাত্র মত এসেছে। তাও কোন সাহাবি থেকে নয়। মতটি বিখ্যাত সাহাবি ইবনু আব্বাস (রাঃ)-এর খাদেম ইকরিমাহের। তিনি বলেন এই আয়াতে “বরকতময় রাত” বলতে “মধ্য শাবানের” রাতকে বুঝান হয়েছে। বক্তব্যটি এসেছে “আন-নাদর ইবনু ইসমাইল”-এর থেকে। যে কিনা কুফার একজন গল্পকার ছিলেন। তিনি বাক্তিগত ভাবে সৎ হলেও তার বর্ণনার ভুলের কারণে তিনি দুর্বল বলে আখ্যা পেয়েছেন মুহাদ্দিসগণের থেকে। এসব মুহাদ্দিসগণের মধ্যে ইমাম শাফেয়ী,ইয়াহিয়া বিন ময়িন ও ছিলেন। তিনি ইকরিমাহের বক্তব্যকে ভুল করে ইবনু আব্বাসের(রাঃ) বক্তব্য বলেছিলেন। এবার মূল আলোচনায় আশা যাক।উপরোক্ত আয়াতে কিছু একটা নাজিলের কথা বলা হয়েছে। আর সেটি যে কোরআন তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। কারণ তারপরে বলা আছে যে আল্লাহ ওই জিনিসটি নাজিল করেছিলেন মানুষকে সতর্ক করতে।সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে যে ওই নাজিল হওয়া জিনিস নিসসন্দেহে কোরআন।

আর আল্লাহ বলেনঃ شَهۡرُ رَمَضَانَ الَّذِىۡٓ اُنۡزِلَ فِيۡهِ الۡقُرۡاٰنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنٰتٍ مِّنَ الۡهُدٰى وَالۡفُرۡقَان‌ِۚ فَمَنۡ شَهِدَ مِنۡكُمُ অর্থঃ রমযানের মাস, এ মাসেই কুরআন নাযিল করা হয়েছে , যা মানব জাতির জন্য পুরোপুরি হিদায়াত এবং এমন দ্ব্যর্থহীন শিক্ষা সম্বলিত, যা সত্য –সঠিক পথ দেখায় এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দেয়।

শবে বরাত সম্পর্কিত আরও কিছু হাদীস :

  • “হযরত আয়েশা ছিদ্দিক্বা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, একদা হুজুরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে রাত্রি রাতযাপন করছিলাম। এক সময় উনাকে বিছানায় না পেয়ে আমি মনে করলাম, তিনি হয়তো অন্য কোন আহলিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর হুজরা শরীফে তাশরীফ নিয়েছেন। অতঃপর আমি তালাশ করে উনাকে জান্নাতুল বাকীতে পেলাম। সেখানে তিনি উম্মতের জন্য আল্লাহ পাকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। এ অবস্থা দেখে আমি স্বীয় হুজরা শরীফে ফিরে এলে তিনিও ফিরে এলেন এবং বললেন, আপনি কি মনে করেন আল্লাহ পাকের হাবীব হুজুরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনার সাথে আমানতের খিয়ানত করেছেন? আমি বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি ধারনা করেছিলাম যে, আপনি হয়তো আপনার অন্য কোন আহলিয়ার হুজরা শরীফে তাশরীফ নিয়েছেন। অতঃপর হুজুরপাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক শা’বানের ১৫ তারিখ রাত্রিতে পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন অর্থাৎ রহমতের খাছ নাযিল করেন। অতঃপর তিনি বনু কালবের মেদের গায়ে যত পশম রয়েছে তার চেয়ে বেশী সংখ্যক বান্দাকে ক্ষমা করে থাকেন”।(সুনানে তিরমিযী (২/১২১,১২২) , (মুসনাদে আহমাদ ৬/২৩৮) ইবনে মাজাহ, রাযীন, মিশকাত শরীফ)
  • মধ্য শাবানের রাতে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিলোকের দিকে দৃষ্টি দান করেন এবং সবাইকে মাফ করে দেন কেবল মুশরিক ব্যক্তি ছাড়া ও যার মধ্যে ঘৃণা বিদ্বেষ রয়েছে তাকে ছাড়া। বর্ণনায়, মুয়াজ বিন জাবাল।
  • আল্লাহ তা’আলা মধ্য শাবানের রাতে তাঁর বান্দাদের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। তিনি বিশ্বাসীদেরকে মাফ করেন ও অবিশ্বাসীদের ক্ষমা স্থগিত করেন এবং হিংসা-বিদ্বেষীদেরকে তাদের নিজ অবস্থায় রেখে দেন (সেদিনের জন্য যখন তারা সংশোধিত হয়ে তাঁকে ডাকবে)। বর্ণনায়, আবু সা’বাহ আল খাশানী (রা.)।
  • “হযরত আয়েশা ছিদ্দিক্বা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত, একদা আল্লাহ পাকের হাবীব হুজুরে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে হযরত আয়িশা সিদ্দিকা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! আপনি কি জানেন, লাইলাতুন নিছফি মিন শা’বান বা শবে বরাতে কি সংঘটিত হয়? তিনি বললেন, হে আল্লাহ পাকের হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এ রাত্রিতে কি কি সংঘটিত হয়? আল্লাহ পাকের হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ রাতে আগামী এক বছরে কতজন সন্তান জম্মগ্রহণ করবে এবং কতজন লোক মৃত্যূবরণ করবে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। আর এ রাতে বান্দার (এক বছরের) আমলসমূহ আল্লাহ পাকের নিকট পেশ করা হয় এবং এ রাতে বান্দার (এক বছরের) রিযিকের ফায়সালা হয়”।(বাইহাকী, ইবনে মাজাহ, মিশকাত শরীফ)
  • আবু বাকর (রা.) বর্ণনা করেন আল্লাহ তা’আলা মধ্য শাবানের রাতে (দুনিয়ার আসমানে) আসেন এবং সকলকে মাফ করে দেন কেবল সেই ব্যক্তি ছাড়া যার হৃদয়ে ঘৃণা বিদ্বেষ রয়েছে এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরিক সাব্যস্ত করে (অর্থাৎ মুশরিক)। (আল-আলবানী বলেন,“হাদিসটি অন্য সূত্রে সহীহ।”তাখরীজ মিশকাত আল মাসাবীহ, (ক্রম, ১২৫১)(ইবন হাজর আল-আসক্বালানী তাঁর আল-আমাল আল-মুথলাক্বাহ গ্রন্থ (ক্রম, ১২২)
  • “হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ননা করেন, আল্লাহ পাকের হাবীব হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যখন অর্ধ শা’বানের রাত তথা শবে বরাত উপস্থিত হবে তখন তোমরা উক্ত রাতে সজাগ থেকে ইবাদত-বন্দেগী করবে এবং দিনের বেলায় রোযা রাখবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক উক্ত রাতে সূর্যাস্তের সময় পৃথিবীর আকাশে রহমতে খাছ নাযিল করেন। অতঃপর ঘোষাণা করতে থাকেন, কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি ক্ষমা করে দিব। কোন রিযিক প্রার্থনাকারী আছো কি? আমি তাকে রিযিক দান করব। কোন মুছিবগ্রস্ত ব্যক্তি আছো কি? আমি তার মুছিবত দূর করে দিব। এভাবে সুবহে ছাদিক পর্যন্ত ঘোষাণা করতে থাকেন” ( সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস১৩৮৪ )
  • ” হযরত আবু মুসা আশয়ারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ননা করেন, আল্লাহ পাকের হাবীব হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক শা’বান মাসের ১৫ তারিখ রাত্রিতে ঘোষনা করেন যে, উনার সমস্ত মাখলুকাতকে ক্ষমা করে দিবেন। শুধু মুশরিক ও হিংসা-বিদ্বেষকারী ব্যতীত।” (ইবনে মাযাহ্, আহমদ, মিশকাত শরীফ)

শবে বরাতের রাতে যে সকল লোকের আমল কবুল হয় না :

  • মুশরিক অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে যে কোন প্রকারের শিরকে লিপ্ত হয়।
  • যে ব্যক্তি কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী।
  • আত্মহত্যার ইচ্ছা পোষণকারী।
  • যে ব্যক্তি অপরের ভাল দেখতে পারে না অর্থাৎ পরশ্রীকাতরতায় লিপ্ত।
  • যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, চাই তা নিকটতম আত্মীয় হোক বা দূরবর্তী আত্মীয় হোক।
  • যে ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়।
  • যে ব্যক্তি মদ্যপানকারী অর্থাৎ নেশাকারী।
  • যে ব্যক্তি গণকগিরি করে বা গণকের কাছে গমণ করে।
  • যে ব্যক্তি জুয়া খেলে।
  • যে ব্যক্তি মাতা-পিতার অবাধ্য হয়।
  • টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী পুরুষ ইত্যাদি ব্যক্তির দুআ তওবা না করা পর্যন্ত কবুল হয় না।

শবে বরাতের আমল বা করনীয় :

  • এই রাতে কবর জিয়ারত করা যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই দলবদ্ধ ও আড়ম্বরপূর্ণ না হয়ে একাকী হওয়া উচিত।
  • শবে বরাতের রাত্রিতে নামায, দুআ, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির-আযকার, দরূদ শরীফ ইত্যাদিতে লিপ্ত থাকা ভাল।
  • এই রাত্রিতে দীর্ঘ সিজদায় রত হওয়া উচিত।
  • শবে বরাতের পরের দিন অর্থাৎ ১৫ই শাবান রোযা রাখা।

শবে বরাত সম্পর্কিত প্রচলিত ভ্রান্ত বিশ্বাস ও আমল :

  • এ রাতে কুরআন মাজীদ লাওহে মাহফুজ হতে প্রথম আকাশে নাযিল করা হয়েছে।
  • এ রাতে গোসল করাকে সওয়াবের কাজ মনে করা ।
  • মৃত ব্যক্তিদের রূহ এ রাতে দুনিয়ায় তাদের সাবেক গৃহে আসে।
  • এ রাতে হালুয়া রুটি তৈরী করে নিজেরা খাওয় ও অন্যকে দেওয়া।
  • বাড়ীতে বাড়ীতে এমনকি মসজিদে মসজিদে মিলাদ পড়া।
  • আতশবাজি করা,সরকারী- বেসরকারী ভবনে আলোক সজ্জা করা। কবরস্থানগুলো আগরবাতি ও মোমবাতি দিয়ে সজ্জিত করা।
  • লোকজন দলে দলে কবরস্থানে যাওয়া।
  •  এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ, সম্পাদক ও প্রকাশক, ক্রাইম প্রতিদিন, সভাপতি, অপরাধ মুক্ত বাংলাদেশ চাই।

আরও পড়ুন.......

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 57
    Shares