Home / উপ-সম্পাদকীয় / সাংবাদিকদের উপর নির্যাতন বন্ধ হবে কবে?

সাংবাদিকদের উপর নির্যাতন বন্ধ হবে কবে?

ক্রাইম প্রতিদিন, ডেস্ক : রাজধানীসহ সারাদেশে সাংবাদিকদের ওপর বর্বরোচিত হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন ‘ক্রাইম প্রতিদিন.কম’ এর সম্পাদক, ‘অপরাধ মুক্ত বাংলদেশ চাই’ এর সভাপতি এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ।

সংবাদপত্র রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হলেও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নানা হামলা, নির্যাতন ও হয়রানীর স্বীকার হতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলো গনমাধ্যমের জন্য চরম অশনিসংকেত বলে বলেও মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন সাংবাদিক ও পুলিশ উভয়েই দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে, কেউ কারও প্রতিপক্ষ বা শত্রু না, তারপরও এ ধরনের ঘটনা, সত্যি আমি নির্বাক, হতাশ, আমি ঘটনাগুলির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

৩০ এপ্রিল ২০১৭, সাবেক পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক একটি সুন্দর ও নিরাপদ সমাজ গঠনে পুলিশ ও সাংবাদিকদের একসাথে কাজ করার আহবান জানিয়েছেন। তাপরও আমরা প্রায় দেখছি পুলিশ কতৃক সাংবাদিক নির্যাতন। কিন্তু কেন? তা আমার বোধগম্য নয়।

পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী যখন যার অপকর্ম, দুর্নীতির খবর প্রকাশ পায় তখন তারাই সাংবাদিকদের ওপর এসব ন্যাককার জনক হামলা চালায়। এসব হামলায় কখনও কখনও সাংবাদিকদের প্রাণ দিতে হয়। সাংবাদিকদের ওপর অযাচিত আক্রমণ, সহিংস ঘটনার বিচারিক তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে নির্যাতনের ঘটনা কমছে না বলে মনে করেন তিনি।

সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে সাংবাদিকতা একটি মহৎ পেশা, এ কথা আজ নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ১৬ অক্টোবর, ২০১৭ তারিখে রাষ্ট্রপতি এম আবদুল হামিদ সাংবাদিকতাকে একটি মহৎ পেশা হিসাবে উল্লেখ করে কোনো সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে রিপোর্টারদের প্রতি আহ্বান জানান।

উদ্ভব ও বিকাশের পটভূমিতে সাংবাদিকতা আজ সত্য, ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠার অবিরাম প্রয়াস। এই প্রয়াসের মূল চালিকাশক্তি একজন সাংবাদিকের নিজ পেশার প্রতি আপসহীন নীতি, দায়িত্ববোধ ও সাহস। সাংবাদিকদের এই সাহসিকতা রোধে সুবিধাবাদী গোষ্ঠী বরাবরই সাংবাদিক সমাজে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করতে চায়। তা করা হয় হুমকি, হত্যা, জেলে পুরে, মামলা দিয়ে কিংবা সাংবাদিকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের মাধ্যমে।

পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানাভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন সাংবাদিকরা। সম্পতি পেশাগত দায়িত্ব পালন কালে ঢাকার পল্টন মোড়ে বাংলা টিভির রিপোর্টার আরমান কায়সার ও ক্যামেরাম্যান মানিককে বেধরক পিটিয়েছে পুলিশ। কি কারনে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন সাংবাদিককে লাঞ্চিত করা হলো পুলিশের কাছ থেকে তা এখনো জানা যায়নি, ঘটনা যাই হোক তার সুষ্ঠু সমাধান আছে। কিন্তু এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন জাতির বিবেক কলম সৈনিককে রাস্তায় লাঞ্চিত করার অধিকার পুলিশকে রাষ্ট্র দিয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। একজন সভ্য পুলিশ কখনো এ আচরন করতে পারেনা, আমরা এঘটনার সাথে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তার দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তির দাবী করছি। দেশে পুলিশের মহামান্য আইজিপি মহোদয় ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের নিকট আমাদের প্রশ্ন সাংবাদিকরা কি রাষ্ট্র ও পুলিশের প্রতিপক্ষ? বর্তমান মিডিয়া বান্ধব সরকারের কাছে সাংবাদিক নির্যাতন মুক্ত একটি বাংলাদেশ দেখতে চেয়ে ছিলাম আমরা। কিন্তু অত্যান্ত দুঃখ জনক হলেও সত্য যে, সাংবাদিকরা আজ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের স্বীকার। দেশব্যাপী যে কয়টি আলোচিত সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বা ঘটছে তা পুলিশের মাধ্যমেই ঘটছে। এমন তো হওয়ার কথা না?

সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের অনিয়মের বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করতে গেলে পড়তে হচ্ছে প্রতিবন্ধকতার মুখে। শিকার হতে হচ্ছে নির্যাতনের। সাংবাদিকদের ওপর এমন নির্যাতনের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলছে!

বস্তুনিষ্ঠ সত্য কোন সংবাদ প্রকাশ হলেই তাদের ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। যেটা কোনো সভ্য দেশের মানুষ আশা করে না। বিগত দিনে আমাদের দেশে যে সমস্ত সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদের বিচার না হওয়ায় সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও আক্রমণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অপরাধীরা একজোট হয়ে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হচ্ছে। অপরাধী চক্রের মতো যেন পিছিয়ে নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। নির্যাতনকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার দায়িত্ব যাদের হাতে সেই পুলিশই এখন একের পর এক সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী দেশের পুলিশকে জনবান্ধব হওয়ার জন্য বললেও সেখানে হচ্ছে তার উল্টো। যে দেশে জাতির বিবেক সাংবাদিক সমাজ পুলিশের নির্যাতনের শিকার হতে হয় সে দেশে সাধারণ মানুষের অবস্থা কি, ভেবে দেখার সময় এসেছে।

সাংবাদিক হত্যার বিচার এবং হয়রানি-নির্যাতনের ঘটনার ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ না হওয়ায় এ সব ঘটনা বেড়ে গেছে। দ্বিধাবিভক্তি দূর করে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করতে না পারলে এ সব ঘটনা প্রতিরোধ করা যাবে না। সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের পাশাপাশি একটি কার্যকর সুরক্ষা কৌশল ও নীতিমালাও জরুরি। বিচারহীনতার কারণে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশ, সন্ত্রাসী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা নির্যাতন এবং হয়রানি করছে। হত্যাকাণ্ডসহ সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের ঘটনার সঠিক বিচার হলে এসব ঘটনা মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছাতো না।

দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর পুলিশের নির্যাতনে পুলিশের ভেতরে পেশাদারিত্বের অভাব দেখা দিয়েছে। সেইসঙ্গে পুলিশের শৃঙ্খলাও ভেঙে গেছে। তারা সাধারণ মানুষের পাশাপাশি অপরাধের কথা তুলে ধরায় এখন সাংবাদিকদের নির্যাতন করছে। মিথ্যা মামলায় হয়রানি করছে। রাজনৈতিক নেতা ও অপরাধীদের পাশাপাশি পুলিশের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের নির্যাতন ও হয়রানি করা হচ্ছে। সাংবাদিক সংগঠনগুলো ও সাংবাদিক নেতাদের পক্ষ থেকে এ সব ঘটনার জোরালো কোনো প্রতিবাদ ও পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় দিন দিন নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা বাড়ছে।

অনেক সময় সাংবাদিক নেতারাও এ সব ঘটনার বিরুদ্ধে যথাযথ প্রতিবাদ করছেন না। প্রতিবাদ করলে ভিন্নমতের সাংবাদিক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবেন এ আশঙ্কায় অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিক নেতারাও গণমাধ্যমে মন্তব্য করতেও বিব্রতবোধ করছেন। সাংবাদিকদের হত্যা নির্যাতন প্রতিরোধসহ সব অধিকার আদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের সকল সাংবাদিক সমাজকে একত্রে আন্দোলন করতে হবে।

কোন দলীয় অবস্থানে থেকে কখনো সকল সাংবাদিকের স্বার্থ রক্ষা করা যাবে না। সাংবাদিকদের রাজনীতি করতে বাধা নেই। দায়িত্ব পালনকালে মহান পেশার কথা মনে রেখে দলমতের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে হবে। দেশের সকল মানুষের মধ্যে দলীয় আদর্শ থাকতে পারে কিন্তু সেটা যদি দলীয় আনুগত্যে পরিণত হয় তাহলে অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব হবে না। ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের মাত্রাও কমবে না।

নিজেদের কথা চিন্তা করে দেশের সকল সাংবাদিক একত্র হয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে একদিকে যেমন নির্যাতনের ঘটনা কমবে, তেমনি সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশও ফিরে আসবে।

পুলিশ, রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীসহ যখন যার অপকর্ম ও দুর্নীতির খবর পত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলে প্রকাশ পায় তারাই তখন সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়। মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করে। বিগত দিনে আমাদের দেশে অনেক সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, কিন্তু অধিকাংশেরই বিচার হয়নি।

এ বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা কমছে না। সাংবাদিকের কাজ অপরাধ ও দুর্নীতির খবর প্রকাশ করা। সাংবাদিক পেটানো পুলিশের কাজ নয়। সাংবাদিকরা যদি অন্যায় করে দেশীয় আইনে তাদের বিচার হবে। বিচার করার দায়িত্ব আদালতের, পুলিশের না।

Print Friendly, PDF & Email

এই মুহূর্তে অন্যরা যা পড়ছে