Home / ক্রাইম প্রতিদিন / সৌদিতে বাংলাদেশ দূতাবাসকর্মীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ

সৌদিতে বাংলাদেশ দূতাবাসকর্মীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ

ক্রাইম প্রতিদিন : নির্যাতিত, প্রতারিত, বিপর্যস্ত হয়ে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসা এক নারী গৃহকর্মী শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছে দেখেন তাঁর লাগেজটিরও খোঁজ নেই। এরপর বেঁচে থাকার শক্তিও তিনি হারিয়ে ফেলেন। সেই লাগেজের সন্ধানে বিমানবন্দরে ফের গিয়ে দিশাহারা অবস্থায় তিনি টয়লেটে ঢুকে বিষ পান করেন। কিন্তু ক্লিনাররা টের পেয়ে তাঁকে উদ্ধার করার পর হাসপাতাল হয়ে বেঁচে ফিরলেও দুর্ভাগ্য তাঁকে জেঁকে ধরেছে আরো। আত্মহত্যাচেষ্টার দায়ে এখন তিনি জেলে। কিন্তু বেঁচে থাকায় তাঁর কাছ থেকে জানা গেছে নির্যাতন ও প্রতারণার ভয়াবহ কাহিনি। সৌদিতে নিজ দেশের দূতাবাসে সহায়তা চাইতে গিয়েও তিনি প্রতারণার চক্করে পড়েন দূতাবাসেরই কয়েক কর্মীর। অভিযোগ করেছেন লোকমান নামের এক কর্মীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের।

সংসারের অভাব-অনটন দূর করার স্বপ্ন নিয়ে ২০১৭ সালের মার্চে সৌদি আরব গিয়ে গৃহকর্মীর কাজ নিয়েছিলেন ২২ বছর বয়সী মেয়েটি। কিন্তু সেখান থেকে শুরু হয় তাঁর দুর্দশা। হাড়ভাঙা খাটুনির পরও ঠিকমতো খাবার মেলেনি। বেতন চাইতেই শুরু হয় নির্যাতন। দুই মাস পর আরেক বাসায় কাজ জোটে, নির্যাতন বন্ধ হয়; কিন্তু বেতন জোটেনি। এর চার মাস পর মেয়েটি পালিয়ে দেশটির নারী কর্মীদের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যান। সেখানে ৯ মাস নারী কর্মীদের সেবা করলেও দেশে কোনো টাকা পাঠাতে পারেননি। এ অবস্থায় দেশে থাকা স্বজনদের পরামর্শে যান বাংলাদেশ দূতাবাসে।

সেখানে উল্টো তাঁর আরো করুণ পরিণতি হয়। লোকমান (৩৫) নামে দূতাবাসের এক কর্মী তাঁর অসহায়ত্বের সুযোগ নেয়। বিয়ে করবে বলে কথা দিয়ে মেয়েটির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কও করে লোকমান। এ কাজে সহায়তা করে দূতাবাসেরই কয়েক কর্মী। এভাবে কেটে যায় আট মাস। একপর্যায়ে মেয়েটি বিয়ের জন্য চাপ দিলে বুঝিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয় লোকমান। আশ্বাস দেয়, দেশে ফিরে বিয়ে করবে। এদিকে দেশে ফেরার পর নিজের লাগেজ খুঁজে পাচ্ছেন না মেয়েটি, যে লাগেজে ছিল তাঁর সামান্য সঞ্চয়ের সব জিনিসপত্র। এরই মধ্যে খবর পান, লোকমান দেশে ফিরে এসেছে, অথচ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করছে না। স্বজনদেরও কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন না মেয়েটি। শেষে অসহায় মেয়েটি লাগেজের খোঁজে শাহজালাল বিমানবন্দরে গিয়ে আরো দিশাহারা হয়ে কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান।

নিজ দেশের দূতাবাসে সহায়তার জন্য গিয়ে উল্টো ভাগ্যে জুটেছে প্রতারণা। গত মঙ্গলবার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় তলার টয়লেটে ঢুকে বিষ পান করেন তিনি। একটি চিরকুটও লিখে রাখেন। মেয়েটিকে টয়টেলের ক্লিনাররা উদ্ধার করার পর হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসকরা তাঁকে মরতে দেননি। একটু সুস্থ হয়ে মেয়েটি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মী, ব্যাংক লার্নিং সেন্টার ও পুলিশের কাছে নিজের করুণ কাহিনির বর্ণনা দিয়েছেন। সুইসাইডাল নোট (চিরকুট) এবং জবানবন্দিতে ওই নারী কর্মী দূতাবাসের প্রতিনিধি লোকমান ছাড়াও গাড়িচালক গোলাম, প্রতিনিধি ফাহাত ও মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে ধর্ষণে সহায়তার অভিযোগ করেছেন।

আত্মহত্যাচেষ্টার কারণে মেয়েটির বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেছে পুলিশ। চিকিৎসা শেষে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরপর আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। তবে পুলিশের ওই মামলায় চার দূতাবাস কর্মীকেও আসামি করা হয়েছে। অথচ গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পুলিশ ওই আসামিদের অবস্থান যাচাইসহ প্রয়োজনীয় তদন্তই শুরু করেনি। কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তবে গতকাল রাতে সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ঘটনাটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। একটি তদন্ত কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘লোকমান ও গোলাম দেশে গেছে। তারা ফিরলে তদন্তকাজ করা হবে।’

গতকাল ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থানায় গিয়ে জানা যায়, এসআই কবির হোসেন বাদী হয়ে বুধবার দণ্ডবিধির ৩০৯/১০৯ ধারায় আত্মহত্যা চেষ্টা ও সহায়তার অভিযোগে চারজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সবুজ রহমান বলেন, ‘আসলে লোকমান কোথায় আছে তা এখনো আমরা জানতে পারিনি। ভিকটিম বলছে দেশে এসেছে। আমি এয়ারপোর্টে খোঁজ নেব। আর মেয়েটি কোন হেফাজতে আছে তা আমি জানি না।’

মামলার এজাহারে দেখা যায়, দিনাজপুরের বিরল এলাকার মৃত আজহার আলীর মেয়ে ২০১৬ সালের ২ মার্চে রাজধানীর ফকিরাপুলের মনায়েম হাজী ট্রাভেলসের মাধ্যমে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদিতে যান। প্রথমে দুই মাস এক বাসায় কাজ করলেও তিনি কোনো বেতন পাননি। বেতন চাইলে মালিক তাঁকে মারধর করে। এরপর মালিক এক বান্ধবীর বাসায় নিয়ে রাখে। সেখানে চার মাস কাজ করলেও বেতন পাননি তিনি। ওই বাসা থেকে পালিয়ে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে সেখানকার নারী কর্মীদের দেখাশোনার কাজ করেন। এই কাজ করেন ৯ মাস। এরপর প্রতারিত হওয়ার ব্যাপারে প্রতিকার চাইতে বাংলাদেশ দূতাবাসে যান।

সেখানে দূতাবাস কর্মী লোকমান তাঁকে আশ্রয় দিয়ে বিয়ের কথা বলে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। এ কাজে দূতাবাসের গাড়িচালক গোলাম, প্রতিনিধি ফাহাত ও মেহেদী সহায়তা করে। মেয়েটি তাঁর বর্ণনায় জানান, বিয়ের ব্যাপারে চাপ দিলে লোকমান তাঁকে বুঝিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়। গত ২৮ জুলাই তিনি দেশে ফেরেন। এরপর লোকমান তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, গত ১৮ আগস্ট লোকমানও দেশে চলে এসেছে। এদিকে সৌদি থেকে ফেরার পর শাহজালাল বিমানবন্দরে নেমে লাগেজ খুঁজে পাননি এই নারী কর্মী। ওই লাগেজে তাঁর চার লাখ টাকার জিনিসপত্র ছিল। এসব কারণে চরম হতাশায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

গত মঙ্গলবার লাগেজ খুঁজতে বিমাবন্দরে যান তিনি। সেখানে তৃতীয় তলার টয়লেটে গিয়ে একটি চিরকুটে তিনি লিখে রাখেন ‘আমি যদি মরে যাই, তাহলে আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী লোকমান ও গোলামসহ ৩-৪ জন।’

পুলিশ জানায়, টয়লেটের ক্লিনাররা মেয়েটিকে উদ্ধার করে। পরে বিমানবন্দরের কর্মরত প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের জনশক্তি রপ্তানি জরিপ অফিসার আবু হেনা মোস্তাফাসহ পুলিশ তাঁকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নেওয়া হয়। চিকিৎসার পর আশকোনার ব্যাক লার্নিং সেন্টারে গিয়ে তিনি নিজের ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা জানান। এরপর বুধবার মামলা করে পুলিশ তাঁকে ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে উপস্থাপন করে।

ব্যাক লার্নিং সেন্টারের ইনফরমেশন অফিসার আল আমিন নয়ন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মেয়েটি এখন কাশিমপুর কারাগারে। সে একজন ভিকটিম। আমরা রবিবার তার জামিনের জন্য আবেদন করব।’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘লোকমানসহ আসামিরা কোথায় আছে সেটি এখন বলতে পারছি না। পরে এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লোকমান দূতাবাসের কর্মী বলে জেনেছি। এটি মন্ত্রণালয় ও দূতাবাস দেখবে।’

মেয়েটির করুণ অবস্থার খবর তাঁর স্বজনরাও জানে না। গতকাল মেয়েটির ভগ্নিপতি রহমত আলী মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ও অনেক কষ্ট করে বিদেশে গেছে। এরপর সমস্যা হইছে শুনছি। তবে কী হইছে তা আমাদের বলেনি।’ তিনি জানান, তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। বাবার মৃত্যুর পর তাঁদের সংসারে অভাব লেগেই ছিল। সাভারের জিরানী এলাকায় শ্রমজীবীর কাজ করে পরিবারের সদস্যরা সংসার চালায়। তাঁর এই শ্যালিকা এসএসসি পাস করার পর নিজেই কিছু করার চেষ্টা করছিলেন। একপর্যায়ে বিদেশে যান।

এই মুহূর্তে অন্যরা যা পড়ছে

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন