April 24, 2019

অপরাধের প্রকারভেদ

ক্রাইম প্রতিদিন : অপরাধ মূলতঃ দু’টি ধারায় বিভক্ত।
• লঘু অপরাধ : যাতে জরিমানা কিংবা অনধিক এক বছরের জন্যে কারাগারে প্রেরণ করা হয়ে থাকে।
• গুরুতর অপরাধ : সাধারণত, এক বছরের ঊর্ধ্বে থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
সমাজবিজ্ঞানী এবং অপরাধবিজ্ঞানীরা অপরাধ আচরণকে নানা দৃষ্টিকোণ দেখেন। বস্ত্তত এটি নির্ধারিত হয় সংশ্লিষ্ট অপরাধ আচরণের মাত্রার ওপর। তবে সাধারণভাবে অপরাধ আচরণকে ছয়টি ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো-
1. সহিংস আপরাধ: অপরাধ বিজ্ঞানী ও সামাজিক বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই বিশ্বাস করেন যে, যাদের আত্ম নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কম, সেই ধরণের মানুষ সুযোগ পেলেই সহিংস অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। এই তথ্য জানিয়ে ড. ডেনসন বলেছেন, ‘এক ধরণের ঝোঁকের বশত এ রকম কাজ গুলো করা হয়।’
এ ধরনের অপরাধ মূলত ব্যক্তির বিরুদ্ধে হয়ে থাকে। এ সম্পর্কীয় অপরাধ আচরণ গুলো হলো- খুন আইন বহির্ভূতভাবে কোনো মানব সন্তানকে হত্যা করা ।
যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণ : কারও ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন করা।
প্রহার বা আঘাত : কেউ কেউ প্রহার করাকে “হালকা” অর্থে ব্যবহার করেছেন, যেখানে মূল আরবিতে “হালকা” বলে কোন শব্দ নাই। অনেকে আবার আঘাত শব্দটি ব্যবহার করেছেন প্রহারের বদলে। তাদের যুক্তি হল, প্রহার শব্দটি প্রাপ্ত হয়েছে আরবি দা-রা-বা শব্দ হতে যার অনুবাদিত অর্থ হবে আঘাত, প্রহার না। আর আঘাত মানসিকও হতে পারে, কিন্তু প্রহার কেবল শারীরিকই হয়ে থাকে।
কোনো ব্যক্তি শারীরিকভাবে অন্য কোনো ব্যক্তিকে আঘাত করে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কোনো কাজ করে যাতে এ বিশ্বাস জন্ম নেয় যে এর মাধ্যমে তাকে শারীরিকভাবে ক্ষতি করার উদ্দেশ্য।
ডাকাতি: জোরপূর্বক বা ভয় দেখিয়ে কোনো ব্যক্তির নিকট হতে কোনো সম্পদ, অর্থ অথবা ব্যক্তিগত কোনো মালামাল ছিনিয়ে নেয়া।
2. সম্পত্তি বিষয়ক অপরাধ : অপরাধমূলক কর্মকান্ডের একটি সাধারণ রূপ হচ্ছে সম্পত্তি বিষয়ক অপরাধ। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর মূল লক্ষ্য থাকে যে কোনো প্রকারেই হোক অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া অথবা অন্যের সম্পদের হানি করা। যেমন- পকেট মারা, দোকানে চুরি, সিদেঁল চুরি, মোটর গাড়ি চুরি, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি।
3. জন শৃংখলা বিষয়ক অপরাধ : এটি পূর্বে আলোচিত ঐক্যমত্য ভিত্তিক ধারণার সাথে সম্পর্কিত। প্রত্যেক সমাজেই জনসাধারণের মূল্যবোধ ও নৈতিকতা বিরোধী কাজ হয়ে থাকে, যা আইনসিদ্ধ নয়। যেমন- জনসম্মূখে মদ্যপান, পতিতাবৃত্তি, জুয়া খেলা, অবৈধ মাদক ব্যবহার প্রভৃতি। এধরনের অপরাধকে অনেক সময় শিকারহীন অপরাধও বলা হয়। কারণ এগুলো কেবলমাত্র অপরাধীর নিজেরই ক্ষতি করে থাকে।
4. ভদ্রবেশী অপরাধ : ইতিহাসে নাম করা এক অপরাধবিজ্ঞানী সাদারলেন্ড এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে হোয়াইট কালার অপরাধ (White collar Crime) নাম দেন। বাংলায় প্রতিশব্দ বলা যেতে পারে ভদ্রবেশী অপরাধ। তিনি তাঁর বিভিন্ন লিখায় তুলে ধরেছিলেন কি ভাবে প্রতিনিয়ত আমাদের সমাজে এসব ভদ্রবেশী অপরাধ সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষতি করছে। তিনিই সর্বপ্রথম এমন কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনার জন্য সুপারিশ করেন। এরপর এই ধারণাটি ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে পরিচিত হতে থাকে। প্রচলিত সাধারণ শ্রেণীর অপরাধ যে কোন শ্রেণীর ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হতে পারে। তবে হোয়াইট কালার অপরাধ চতুর ও উচ্চবিত্ত লোকদের দ্বারায় বেশি সংগঠিত হয়ে থাকে। সকল শ্রেণীর মানুষের হোয়াইট কালার অপরাধ করার মত সুযোগ থাকে না। সাধারণ মানুষ সহজে তা বুঝতে পারে না। অনেক সময় বুঝলেও তাদের কিছু করার উপায় থাকে না। অপরাধীরা এই ক্ষেত্রে নিজেদের কর্মকাণ্ড গুলোকে অপরাধ হিসেবে মানতে রাজী নন।
হোয়াইট কালার বা ভদ্রবেশী অপরাধ সমূহ : সমাজের উচ্চ শ্রেণীর লোকেরা নিজের স্বার্থের জন্য বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য এমন সব অনৈতিক ও অমানবিক কাজ করে থাকে যা সাধারণ মানুষের ও দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। আবার প্রত্যক্ষভাবে তা ক্ষতি না করলেও পরোক্ষভাবে সাধারণ মানুষ ও দেশের ব্যাপক ক্ষতি করে থাকে। যেমনঃ বিজ্ঞাপনে মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করা, অন্যের সৃষ্ট কর্ম নিজের বলে চালিয়ে দেওয়া, কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য নিজের প্রকৃত আয় গোপন করা, কারো সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অপরকে ভুল বুঝানো, বিশ্বাস ভঙ্গ করা, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার থেকে কৌশলে বঞ্চিত করা, শেয়ার বাজারে কারসাজি করা, ফান্ডের টাকার অপব্যবহার করা, দাম বাড়াবার জন্য মজুতদারি, ইন্সুরেন্স প্রতারণা, বিদেশে দেশের অর্থ প্রাচার করা, করো ক্ষতি করার উদ্দেশে তাঁর গোপনীয় বিষয় ফাঁস করা, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কথা অনুযায়ী কাজ না করা বা নিম্ম মানের কাজ করে দেওয়া, এক প্রকারের চাকরী দেওয়ার নামে অন্য প্রকারের চাকরী করাতে কাউকে বাধ্য করা কিংবা চাকরীর নামে টাকা জমা নিয়ে তা আর ফেরত না দেওয়া, ঘুষ নেওয়া ও দিতে বাধ্য করা, সরকারি অফিসে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার নামে অবৈধভাবে অর্থ নেওয়া, অবৈধ কাজকে বৈধ বলে চালিয়ে দেওয়া, উন্নয়নখাতের অর্থ আত্মসাত্ করা, রোগীর শরীরে বিনা প্রয়োজনে অস্ত্রপচার, সরকারি হাসপাতালে সঠিকভাবে রোগী না দেখে প্রাইভেট ক্লিনিকে রোগী দেখার প্রবণতা, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানী থেকে পারসেন্টিজ নেওয়ার জন্য ডাক্তার কর্তৃক রোগীকে নিম্ম মানের ওষুধ প্রেস্ক্রাইভ করা অথবা নিজের লাভের জন্য অপ্রয়োজনে মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ প্রেস্ক্রাইভ করা। প্রকৌশলী কর্তৃক অর্থ আত্মসাত্ পূর্বক নিম্নমানের ব্রিজ ও রাস্তাঘাট তৈরি, দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তা কর্তৃক প্রতিপক্ষ থেকে ঘুষ নিয়ে রিমান্ডে কাউকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা, আবার পুলিশ রিমান্ডে দাগী আসামীকে কোন কথা বের করতে কোন প্রকার নির্যাতন করবেনা বলে সংশ্লিষ্ট অপরাধী পক্ষ থেকে মোটা অংকের ঘুষ নেওয়া, পুলিশ কর্তৃক ৫৪ ধারায় ধৃত নিষ্পাপ ব্যাক্তিকে প্রভাবশালী মহলের চাপে বিভিন্ন মামালায় ফাঁসিয়ে দেওয়া, আইনজীবীর মক্কেলের সাথে অসধাচারণ ও হয়রানী করা, মক্কেলের গোপন তথ্য অপর পক্ষের কাছে সরবরাহ করা ইত্যাদি।
5. সংঘবদ্ধ অপরাধ : গোটা বিশ্বে সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে সন্ত্রাসবাদই বর্তমানে অন্যতম সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ধর্মকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা জঙ্গিগোষ্ঠী এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী চক্রের নাশকতা স্বভাবতই বিশ্ববাসীর শান্তি বিনষ্টের প্রধান কারণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে প্রতিনিয়ত টিকে থাকার লড়াইয়ের মধ্যে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী চক্র মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় তা বিশ্ববাসীর জন্য ভয়াবহতা ডেকে এনেছে। আর বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ যে কত ভয়াবহ তা দেশবাসী এবং বিশ্ববাসীও প্রত্যক্ষ করছে দীর্ঘদিন ধরে। অস্বীকারের উপায় নেই, এসব গোষ্ঠীর রয়েছে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর সমর্থন ও অর্থপ্রাপ্তির যোগসূত্র। আরো উদ্বেগের যে, এসব অপরাধী বা সন্ত্রাসী নিজস্ব ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থেকে তাদের কার্যকলাপ চালাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ও রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের আলাপ-আলোচনায় বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ভদ্রবেশী অপরাধের ক্ষেত্রে বৈধ কর্মচারীরা অবৈধ কর্মকান্ডের মাধ্যমে সুবিধা অর্জন করে। যেমন- ব্যাংকের একজন ক্যাশিয়ার ব্যাংকের একজন বৈধ কর্মচারী হিসেবে তহবিল জালিয়াতির সাথে যুক্ত হতে পারে না। অপরদিকে, সংঘবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে অবৈধ সংগঠনগুলোই অবৈধ কাজের সাথে যুক্ত থাকে। যেমন- চোরাচালান, মাদকদ্রব্যের ব্যবসা, পতিতাবৃত্তি, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক লাভের জন্য ভয় দেখানো প্রভৃতি।
6. আধুনিক প্রযুক্তিগত অপরাধ : প্রাত্যহিক জীবনে কম্পিউটারের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের সাথে সরাসরি জড়িত নতুন ধরনের অপরাধই হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তিগত অপরাধ। উদাহরণ হিসেবে ইন্টারনেট ভিত্তিক সাইবার অপরাধের কথা বলা যায়। সাইবার অপরাধের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। যেমন-
ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ : অশ্লীল বিষয় বা পর্ণোগ্রাফি বিক্রয়, বণ্টন ও প্রকাশ, সাইবার স্টকিং, সাইবার হয়রানি প্রভৃতি।
সম্পত্তির বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ : হ্যাকিং, ক্র্যাকিং, পাইরেসি, ভাইরাস প্রভৃতি।
সরকারের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ : সাইবার সন্ত্রাসবাদ।আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে দুর্বৃত্তরা অপরাধ করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও নানা অপকর্মের দিকে ধাবিত করছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কীভাবে আক্রমণ করতে হবে, সে ব্যাপারেও মাঝে-মাঝে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় প্রচারণা চালায় অপরাধীরা। এদিকে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অপরাধীদের অনেক কৌশলের কাছেই মার খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সব সমাজেই অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে একই ধরনের অপরাধের জন্য বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতিতে বিভিন্ন শাস্তির বিধান বিদ্যমান। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে শাস্তির ধরন ধর্মীয় নিয়মনিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। গণতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক দেশের শাস্তির বিধান তৈরি হয় রাষ্ট্রীয় দর্শন ও নীতি থেকে। তবে সব রাষ্ট্রেই শাস্তি ব্যাপারে কিছু মূল নীতি থাকে। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় শাস্তির খাতিরে শাস্তি দেয়া হয় বিরল। শাস্তির উদ্দেশ্য থাকে একদিকে অপরাধজনিত ক্ষতি আদায় করা, আদায়যোগ্য না হলে অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থকে মানসিক প্রবোধ দেয়া, অপরদিকে অপরাধীকে শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে অপরাধ বিষয়ে অন্যদের সাবধান করা। প্রাচীনকাল থেকে উনবিংশ শতকের বিশের দশক পর্যন্ত অপরাধ ও শাস্তি সংজ্ঞায়িত হয়েছে মূলত ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন দ্বারা। অপরাধ ও শাস্তি ব্যাপারে বিভিন্ন ধর্মের জন্য বিভিন্ন অনুশাসন থাকায় একই সমাজের সদস্য হওয়া সত্তেও একই ধরনের অপরাধের জন্য বিভিন্ন ধর্মের অপরাধীর জন্য শাস্তি ছিল বিভিন্ন ধরনের। সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করতে হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে,গন সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে হবে দেশের আনাচে কানাচে, কারন কেবল মাত্র শিক্ষাই পারে অন্ধকার দুর করে পৃথিবীকে আলোকিত করতে।
লেখক : এ জেড এম মাইনুল ইসলাম, সম্পাদক ও প্রকাশক, ক্রাইম প্রতিদিন, সভাপতি, অপরাধ মুক্ত বাংলাদেশ চাই।

আরও পড়ুন ....

চারদিকে আগুন, পুড়ছে মানুষ, দায় কার?

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে করণীয়

স্মৃতির পাতায় জাতির জনক

এফবিজেও`র চেয়ারম্যানকে অনলাইন সম্পাদক পরিষদের শুভেচ্ছা

অনলাইন সম্পাদক পরিষদের ১৩ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি গঠন

আজ মাইনুল ইসলাম পলাশ’র জন্মদিন

অনলাইন ডেস্ক