Home / জাতীয় / বিশেষ প্রতিবেদন / এমপি আশিকুর রহমানের বিশাল উন্নতি, জমি কমেনি তবুও জমি বিক্রি থেকে বিশাল আয়

এমপি আশিকুর রহমানের বিশাল উন্নতি, জমি কমেনি তবুও জমি বিক্রি থেকে বিশাল আয়

ক্রাইম প্রতিদিন : ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেওয়া হলফনামায় নিজের আয়ের উৎস দেখিয়েছেন ব্যবসা, কৃষি ও চাকরি; যা থেকে বার্ষিক আয় ৯ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। কৃষিতে বার্ষিক আয় ৩৬ হাজার টাকা। ব্যবসা থেকে বছরে তার আয় ৬ লাখ টাকা আর চাকরির বেতন-ভাতাদি মিলে ৩ লাখ টাকা। অস্থাবর সম্পদ হিসেবে ব্যাংকে ছিল ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা।

অবশ্য তার চেয়ে তার স্ত্রীর বেশি সম্পদ বলে তিনি হলফনামায় উল্লেখ করেছিলেন। তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে (অ্যাকাউন্ট) জমা ছিল ২৫ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এর বাইরে বিভিন্ন কোম্পানিতে তার নিজের নামে শেয়ার ছিল ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকার এবং স্ত্রীর নামে ছিল ৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকার। এ ছাড়া যানবাহন ছিল ৮০ লাখ টাকার।

শুধু তাই নয়, তিনি ঋণগ্রস্তও ছিলেন। পূবালী ব্যাংকে তার ঋণ ছিল ৩৬ লাখ ৬০ হাজার ২৯২ টাকা।

মাত্র ৫ বছর পরেই চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। তিনি তো আর ঋণগ্রস্ত নেই-ই, সারা দেশের মানুষকেই ঋণ দেন। নিজেই প্রতিষ্ঠা করেছেন একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক! নাম মেঘনা ব্যাংক। এই ব্যাংকে আছে তার স্ত্রী, দুই পুত্র আর এক কন্যার শেয়ারও।

অত্যন্ত ‘সফল’ এই ব্যক্তির নাম এইচ এন আশিকুর রহমান। তিনি রংপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এবং মেঘনা ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। একইসঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ। ছেলে রাশেক রহমানও আওয়ামী লীগের নেতা। ছিলেন কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহসম্পাদকও। আর স্ত্রী রেহানা আশিকুর রহমান মেঘনা ব্যাংকের পরিচালক।

৯ মে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকটির শেয়ার হোল্ডারদের মধ্যে আশিকুর রহমান ও তার স্ত্রী ছাড়াও আছেন দুই ছেলে রাশেক রহমান ও শারেক রহমান এবং মেয়ে ইশমাম রাইদা রহমান।

মেঘনা ব্যাংকে শুধু আশিকুর রহমান এবং তার স্ত্রীর বিনিয়োগই ১৭ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর আশিকুর রহমানের জমা দেওয়া আরেক হলফনামার তথ্যমতে, তার নিজের নামে ২টি বিলাসবহুল গাড়ি আছে; মূল্য তার হিসাবেই ১ কোটি টাকা। স্ত্রীর নামে আছে ৩টি গাড়ি, মূল্য তার দেওয়া হিসাবে ১৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা। আর ব্যাংকে নিজের নামে জমা আছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ও স্ত্রীর নামে জমা আছে ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

এ ছাড়া এই হলফনামায় আশিকুর রহমানের কোনো ব্যাংক ঋণ নেই বলেও উল্লেখ করা হয়।

জমি কমেনি তবু জমি বিক্রি থেকে বিশাল আয়

২০০৮ সালের হলফনামায় তার কৃষি সম্পত্তি ছিল ১২ লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ টাকার। ২০১৩ সালের হলফনামায় তিনি দেখিয়েছেন তার কৃষি জমি আছে ২৫ বিঘা। তার দেওয়া তথ্য অনুয়ায়ী, যার মূল্যমান ১২ লাখ টাকা।

তবে জমির পরিমাণ না কমলেও জমি বিক্রি করে তার ১১ কোটি ৮২ লাখ ১২ হাজার ৬১ টাকা আয় হয়েছে বলে দাবি করেছেন হলফনামায়।

২০০৮ সালের হলফনামায় যে জমি-জমার উল্লেখ পাওয়া যায়, তার তুলনায় ২০১৩ সালের হলফনামা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়- আশিকুর রহমান ও তার স্ত্রীর জমিজমা কমেনি, বরং বেড়েছে। ২০০৮ সালে উল্লেখ করা কৃষি জমির সাথে পরের পাঁচ বছরে যুক্ত হয়েছে ঢাকার বনানীতে ১০ কাঠা জমি এবং তার ওপর ছয়তলা বাসা। এর অর্ধেক তিনি স্ত্রীকে ‘উপহার’ দিয়েছেন। তার হিসাবমতেই এর দাম প্রায় এক কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রংপুর শহরে ১৬ কাঠা জমি। চট্টগ্রামে নাগরিক হাউজিংয়ে প্লট। মিঠাপুকুরে একটি আবাসিক ভবন, ফরিদপুর গ্রামে আরেকটি আবাসিক ভবন।

২০০৮ সালের হলফনামায় ব্যাংক ঋণ দেখানো হয়েছিল ৩৬ লাখ ৬০ হাজার ২ শত ৯২ টাকা। ২০১৩ সালের হফলনামায় তার কোনো ব্যাংক ঋণ নেই দেখানো হয়েছে।

২০০৮ সালে ব্যবসা, কৃষি ও চাকরি ক্ষেত্রে যথাক্রমে ৬ লাখ, ৩৬ হাজার, ৩ লাখ অর্থাৎ মোট আয় ছিল ৯ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ২০১৩ সালের হলফনামায় কৃষি থেকে আয় দেখিয়েছেন ১ লাখ, নিজ কোম্পানিতে চেয়ারম্যান হিসেবে ৫ লাখ ১০ হাজার এবং জমি বিক্রয় করে আয় ১১ কোটি ৮২ লাখ ১২ হাজার ৬১ টাকা।

২০০৮ সালে ব্যাংকে তার নিজের জমা দেখানো হয়েছিল ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা, শেয়ার দেখানো হয়েছিল ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকার, সোনা ৪০ তোলা- তার দেওয়া তথ্যমতে মূল্যমান ৫ হাজার টাকা। স্ত্রীর জমা ছিল ২৫ লাখ ২৮ হাজার ৮৩৬ টাকা, শেয়ার ৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকার এবং সোনা ১২৫ তোলা; তার দেওয়া তথ্যমতে মূল্যমান ১৫ হাজার টাকা।

২০১৩ সালের হলফনামায় উল্লেখ করেন- নিজের নামে জমা ৩২ হাজার ৬৪১ টাকা, স্ত্রীর সঙ্গে যৌথ ব্যাংক হিসাবে (অ্যাকাউন্ট) ১ কোটি ৪৮ লাখ ৬১ হাজার ৭৭৯ টাকা। এ ছাড়া স্ত্রীর সঙ্গে যৌথ এফডিআর ১ কোটি টাকা। আর শুধু স্ত্রীর নামে জমা আছে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা, এফডিআর ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৭৫০ টাকা এবং ঋণ আছে ৪৭ লাখ ৯৯ হাজার ৯৬৫ টাকা।

২০০৮ সালে আশিকুর রহমানের যানবাহন ছিল ৮০ লাখ টাকার। ২০১৩ সালের হলফনামায় তিনি নিজের নামে গাড়ি দেখিয়েছেন একটি মার্সিটিজ গাড়ি ৩০ লাখ টাকার এবং একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার ৭০ লাখ টাকার। আর স্ত্রীর আছে একটি নিশান গাড়ি ৮ লাখ টাকার, টয়োটা সিডান ৫ লাখ টাকা এবং একটি মাইক্রোবাস, যার দাম তার মতে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

২০১৩ সালে তার কেনা শেয়ার দেখানো হয়েছে- বাংলাদেশ ডিজেল মটর এন্ড সার্ভিসেস (বাংলাদেশ) লিমিটেডের ৪০০ শেয়ার; যার মূল্য তিনি দিয়েছেন ৩ লাখ টাকা, বাংলাদেশ কনসোরসিয়াম লিমিটেডে ৩০০০ শেয়ার; যার মূল তিনি দিয়েছেন ৩ লাখ টাকা, নিউজেন করপোরেশনের ৭৫০ শেয়ার; যার মূল্য ৭৫ হাজার টাকা, যমুনা সুপার মিল লিমিটেডে ২৫০০ শেয়ার; যার মূল্য তিনি দিয়েছেন ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং মেঘনা ব্যাংক শেয়ার ১০ কোটি ৭০ লাখ টাকার।

এ ছাড়া রেহানা আশিকুর রহমানের শেয়ার দেখানো হয়েছে- বুরাক এক্সপ্রেসের ৩৯০০ শেয়ার; যার মূল্য ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা, বুরাক ইন্টারন্যাশনালের ১৫০ শেয়ার; যার মূল্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ডিজেল মটর সার্ভিসেস (বাংলাদেশ) লিমিটেডে ৩৫০ শেয়ার; যার মূল্য ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। পাশাপাশি গোল্ড ব্রিক্স লিমিটেডে ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকার শেয়ার এবং মেঘনা ব্যাংকের ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার শেয়ার।

এ ব্যাপারে এইচ এন আশিকুর রহমানের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। প্রথমদিকে তার ফোন বাজলেও কেউ ধরেননি। পরে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন.......

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 47
    Shares