Home / লিড নিউজ / কলেরা চিকিৎসায় বিশ্বে রোল মডেল বাংলাদেশ

কলেরা চিকিৎসায় বিশ্বে রোল মডেল বাংলাদেশ

ক্রাইম প্রতিদিন, ডেস্ক : কলেরা রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশকে এখন রোল মডেল হিসেবে ধরা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফসহ বড় বড় আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা এরই মধ্যে কলেরার মতো প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসায় বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যখন কলেরার মতো পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে চিন্তিত তখন দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ রোগটি নিয়ে মাঠপর্যায়ের কাজ ও গবেষণার মাধ্যমে এর প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। এর যথাযথ কারণও আছে।

কারণ, আইসিডিডিআরবি গ্লোবাল আউটব্রেক অ্যালার্ট অ্যান্ড রেসপন্স নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের সরকারকে কলেরার চিকিৎসা এবং এর মহামারী নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞ সহায়তা প্রদান করে আসছে। শুধু ২০১৬ সালেই প্রতিষ্ঠানটি সুদান, ইরাক, সিরিয়া ও ইথিওপিয়ার কলেরা নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছিল। সর্বশেষ যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের একটি চিকিৎসা দলকে কলেরার চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ দিয়ে বিশ্বের নজরে এসেছে আইসিডিডিআরবি।

এ ছাড়া কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরেও কলেরা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সংস্থাটি। ২০১৬ সালে হাইতির ভূমিকম্প বিপর্যয়ের পর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে আইসিডিডিআরবির কলেরা ক্যাম্পেইন হচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ ওরাল ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এখন পর্যন্ত দেশ-বিদেশে আইসিডিডিআরবিই বিশ্বের একমাত্র আন্তর্জাতিক সংস্থা, যা বৈশ্বিক কলেরার মহামারী মোকাবিলায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্রের হাসপাতালটিতে দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে পানিবাহিত রোগ, ডায়রিয়া ও কলেরার মতো রোগ নিয়ে মাঠপর্যায়ের গবেষণা করা হচ্ছে। বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৯১ হাজার মানুষ কলেরায় প্রাণ হারায় আর বাংলাদেশে কলেরায় প্রতি বছর মৃত্যুবরণ করে সাড়ে ৪ হাজার মানুষ।

বাংলাদেশে আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা যায়, স্বল্প মূল্যের দুই ডোজের মুখে খাওয়ার একটি কলেরার টিকা কলেরাকবলিত দেশগুলোয় কলেরা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। আইসিডিডিআরবির গবেষণায় প্রথমবারের মতো দেখা যায়, কলেরা প্রাদুর্ভাবপ্রবণ এলাকায় পাঁচ বছরের অধিক বয়সী শিশু ও প্রাপ্তবয়সীদের কলেরা প্রতিরোধে মুখে খাওয়ার কলেরা টিকা ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন ‘শ্যানকল’-এর এক ডোজ অত্যন্ত কার্যকর। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এ টিকাটি নিয়ে সুপারিশ করেছে। এই গবেষণায় নেতৃত্বদানকারী আইসিডিডিআরবির সংক্রামক রোগ বিভাগের বিজ্ঞানী ড. ফেরদৌসি কাদরী বলেন, এক ডোজ ওসিভি টিকা দেওয়ার পর কমপক্ষে ছয় মাস পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কলেরাজনিত মারাত্মক পানিশূন্যতা রোধের ক্ষেত্রে টিকাটি অত্যন্ত কার্যকর ও নিরাপদ। একই সঙ্গে মানবসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি জরুরি সময়ে এক ডোজ ওসিভি টিকা ব্যবহার করে কলেরাজনিত মহামারী সহজেই প্রতিরোধ করা যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দেন।

গত বছরের ৫ অক্টোবর আইসিডিডিআরবি, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের চিকিৎসক ও নার্সদের একটি দলকে কলেরা ব্যবস্থাপনার ওপর সপ্তাহব্যাপী বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ প্রদান করে। এই দলে ২০ জন ইয়েমেনি ডাক্তার ও নার্স আইসিডিডিআরবির ঢাকা হাসপাতালে (যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডায়রিয়ার চিকিৎসা কেন্দ্র) কলেরা ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশিক্ষণ নেয়। দলটি অক্টোবরের ৫ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত প্রশিক্ষণ নেয়। উল্লেখ্য, ইয়েমেনে ৬ লাখ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয় এবং এতে ২ হাজার ৩৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। দেশটিতে চলমান মানবিক সংকটের জন্য কুয়েতি উইমেনস ফিলানথ্রোপিক টিম, আইসিডিডিআরবিকে ইয়েমেনি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণে আর্থিক সহায়তা করে। আইসিডিডিআরবির উপনির্বাহী পরিচালক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘ইয়েমেনে কলেরার প্রাদুর্ভাব নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম। আমরা দলটিকে মহামারী নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ, নজরদারি, কেস ম্যানেজমেন্ট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও স্যানিটেশনের ওপর প্রশিক্ষণ দিই।’ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোয় এখনো কলেরা মহামারীতে মানুষের প্রাণহানি ঘটছে।

আর এসব দেশের কলেরা প্রতিরোধে অভিজ্ঞ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হচ্ছে। এমনকি সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে কক্সবাজারে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে কলেরা প্রতিরোধের অংশ হিসেবে ইউনিসেফ, ডব্লিউএইচওর সঙ্গে একত্রে কাজ করছে আইসিডিডিআরবি। আইসিডিডিআরবি বিজ্ঞানীরা রোহিঙ্গাদের মধ্যে কলেরার প্রতিষেধক দিয়ে যাচ্ছেন। এ লক্ষ্যে সংস্থাটির প্রায় ৯ লাখ ডোজ কলেরা প্রতিষেধক দেওয়ার কথা রয়েছে। আর এটি হতে যাচ্ছে ২০১৬ সালে হাইতি বিপর্যয়ের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ ওরাল ভ্যাকসিনেশন।

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 2
    Shares