Home / জাতীয় / দুদক / কুষ্টিয়ায় দূর্ণীতির অভিযোগে ২ শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

কুষ্টিয়ায় দূর্ণীতির অভিযোগে ২ শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

ক্রাইম প্রতিদিন, এম.লিটন-উজ-জামান, কুষ্টিয়া : আকন্ঠ দূর্ণীতি-অনিয়মের নিত্য ঘটনায় ভঙ্গুর হওয়া কুষ্টিয়া সুগার মিলের দূর্নীতি তদন্তে নেমেছেন দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয় কুষ্টিয়ার তদন্তকারী দল। তদন্তে বেড়িয়ে আসা সত্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী জনাব আহসান সিদ্দিক (৫৯), কুষ্টিয়া চিনিকলের সাবেক মহা-ব্যবস্থাপক মাধব চন্দ্র মন্ডল (৫২), যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী মডার্ণ স্টীল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্ত্বাধিকার আবুল কাশেম (৫৩) ও দিলীপ চন্দ্র সাহা (৪৮) গণের বিরুদ্ধে পারস্পরিক যোগসাজসে জালিয়াতি ও দূূর্ণীতি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন দুদক। বুধবার বেলা সাড়ে তিনটার সময় কুষ্টিয়া মডেল থানায় দুদক কুষ্টিয়ার উপসহকারী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বাদি হয়ে দন্ডবিধির ৪০৯/৪০২/৪৬৭/৪৬৮//৪৭১/১০৯ ধারা তৎসহ ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলাটি করেন। মামলা নং ৩৭/১১৭ তারিখ ২১/০৩/২০১৮। বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ নাসির উদ্দিন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশন, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, কুষ্টিয়ার ই/আর নং ১৪/২০১৬ এর অনুসন্ধানকালে জব্দকৃত/প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র/তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, রেণউইক, যজ্ঞেশ্বর এন্ড কোং (বি.ডি) লিঃ (আর.জে.সি) বাংলাদেশে বিদ্যমান ১৫ (পনের) টি সরকারী চিনিকলের কেন্দ্রীয় ওয়ার্কসপ হিসাবে কাজ করে। বিদ্যমান চিনিকলসমূহের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ/সরঞ্জামাদী চাহিদার প্রেক্ষিতে আর জে সি কর্তৃক প্রস্তুত/মেরামতপূর্বক সংশ্লিষ্ট চিনিকলে সরবরাহ করা হয়। তবে চাহিত যে সমস্ত যন্ত্রাংশ/সরঞ্জামাদী আর জে সি কর্তৃক প্রস্তুত/মেরামত করা সম্ভব হয় না, কেবলমাত্র সে সমস্ত যন্ত্রাংশ/সরঞ্জামাদী শিল্প মন্ত্রণালয় ও আর.জে.সি কর্তৃক যৌথভাবে তালিকাভূক্ত সাব কন্ট্রাকটিং নীতি ও সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান হতে প্রস্তুত/মেরামতপূর্বক আর জে সি‘র মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট চিনিকলে সরবরাহ করা হয়।

কুষ্টিয়া সুগার মিলের কারখানা বিভাগের মহা-ব্যবস্থাপক (কারখানা) জনাব মাধব চন্দ্র মন্ডল চিনি উৎপাদনে কারখানার সকল দায়-দায়িত্ব পালন করেছেন। কারখানা বিভাগে মওজুদ বা ডেলিভারি রেজিস্টার তিনি সংরক্ষণ করেননি। কুষ্টিয়া সুগার মিলে ০৩ (তিন) টি “রোটর টাইপ এয়ার কমপ্রেসপার ফর সালফার হাউজ” ব্যবহার করা হয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কুষ্টিয়া সুগার মিলস লিমিটেড এর স্মারক নং-৭১৭, তারিখ- ১৫/০৪/২০১৫ ইং মূলে সালফার হাউস এয়ার কম্প্রেসার পুলিসহ ২ (দুই) টি মেরামতের জন্যে আর. জে. সি তে প্রেরণ করা হয়। আর.জে.সি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব আহসান সিদ্দিক এর নির্দেশে কোনরূপ দরপত্র আহবান ব্যতীত মেরামতের জন্য সরাসরি জনাব মোঃ আবুল কাশেম, স্বত্ত্বাধিকারী, মডার্ণ স্টীল ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রতিনিধি জনাব দিলীপ চন্দ্র সাহার নিকট ১৪/০৫/২০১৫ তারিখে হস্তান্তর করা হয়। নিয়মানুযায়ী ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে মেরামত কার্য সম্পাদন করার কথা থাকলেও ০১ (এক) টি ১২/১১/২০১৫ তারিখে এবং অন্যটি ৩০/০৫/২০১৬ তারিখে মেরামত কার্যক্রম সম্পাদন করে আর.জে.সি’র মাধ্যমে কুষ্টিয়া সুগার মিলস লিঃ এর নিকট হস্তান্তর করা হয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কুষ্টিয়া সুগার মিলস লিমিটেড এর স্মারক নং- ৯৭২ তারিখ- ১১/১০/২০১৫ ইং মূলে সালফার হাউস এয়ার কম্প্রেসার পুলিসহ ০১ (এক) টি ত্রুটিমুক্ত (পূর্বে মেরামতকৃত) করার জন্যে আর.জে.সি তে প্রেরণ করা হয়। যা মডার্ণ স্টীল ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রতিনিধি জনাব দিলীপ চন্দ্র সাহার নিকট ২০/০৩/২০১৬ তারিখে হস্তান্তর করা হলেও তা ফেরত প্রদান করেননি।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কুষ্টিয়া সুগার মিলস লিমিটেড এর স্মারক নং- ১৮৫৭ তারিখ- ১৭/১০/২০১৫ ইং মূলে একটি “রোটর টাইপ এয়ার কমপ্রেসার ফর সালফার হাউজ” যন্ত্র নতুন তৈরীর জন্য অভিপ্রায় পত্র(লেটার অব ইনডেন্ট) আর. জে. সি তে প্রেরণ করেন। আর.জে.সি’র সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব আহসান সিদ্দিকের অনুমোদনক্রমে অসৎ উদ্দেশ্যে কোনরূপ দরপত্র ব্যতীত তাঁর কার্যালয়ের স্মারক নং- ৯৭২ তারিখ- ১৯/১০/২০১৫ ইং মোতাবেক মেসার্স মডার্ণ স্টীল ইঞ্জিনিয়ারিং কে এয়ার কমপ্রেসার ফর সালফার হাউজ (মটর ও স্টাটার সহ) কমপ্লিট নতুন তৈরী পূর্বক সরবরাহ করার জন্য লেটার অব ইনডেন্ট প্রদান করা হয়। অসৎ উদ্দেশ্যে লেটার অব ইনডেন্টে মেশিনের কোনরূপ মূল্য উল্লেখ করা হয়নি। তৎপ্রেক্ষিতে মডার্ণ স্টীল ইঞ্জিনিয়ারিং, নারায়ণগঞ্জ কর্তৃক গত ১২/১১/২০১৫ তারিখে একটি কথিত নতুন এয়ার কমপ্রেসার আর.জে.সি এর মাধ্যমে সরবরাহ চালান নং-৬৬২, তারিখ- ১২/১১/২০১৫ মূলে কুষ্টিয়া সুগার মিলে প্রেরণ করা হয়, যা জনাব মাধব চন্দ্র মন্ডল কার্যাদেশের কাগজপত্র ব্যতীত উহা মডার্ণ স্টীল ইঞ্জিনিয়ারিং, নারায়ণগঞ্জ এর নিকট হতে গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে আর.জে.সি এর স্মারক নং-১২৯৩, তারিখ-২৫/১২/২০১৬ ইং মূলে মেসার্স মডার্ণ স্টীল ইঞ্জিনিয়ারিং কে নতুন এয়ার কমপ্রেসারটির কার্যাদেশ প্রদান করে। যাতে এয়ার কমপ্রেসারের মূল্যমান ৭,০৫,০০০/- (সাত লক্ষ পাঁচ হাজার) টাকা নির্ধারণ করা হয়। বিধিমতে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে কার্যাদেশ প্রদান করা হলে মূল্য কম হত মর্মে অনুসন্ধানকালে জানা যায়। উক্ত কার্যাদেশের মর্মানুযায়ী মডার্ণ স্টীল ইঞ্জিনিয়ারিং কর্তৃক আর.জে.সি’র স্মারক নং-৯৭২ তারিখ- ১৯/১০/২০১৫ সংক্রান্ত “লেটার অব ইনডেন্ট” অনুযায়ী সরবরাহকৃত কথিত নতুন এয়ার কমপ্রেসারটি গত ১২/১১/২০১৫ তারিখে সরবরাহ করা হয়, যা নতুন এয়ার কমপ্রেসার নয় মর্মে বিশেষজ্ঞ মতামতসহ রেকর্ডপত্র অনুযায়ী প্রতীয়মান হয়।

কুষ্টিয়া সুগার মিলে (কুসুমি) ২০১৫ সনের মাড়াই মওসুম শুরু হলে গত ১০/১২/২০১৫ তারিখে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুটি এয়ার কমপ্রেসার বন্ধ হয়ে যায়। তৎপ্রেক্ষিতে আর.জে.সি’র তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনাব আহসান সিদ্দিকীর ১৩/১২/২০১৫ তারিখের নির্দেশক্রমে মডার্ণ স্টীল ইঞ্জিনিয়ারিং, নারায়ণগঞ্জ কর্তৃক সরবরাহ চালান নং-৮৯১, তারিখ-১৩/১২/২০১৫ মূলে “ধারে” একটি এয়ার কমপ্রেসার সরবরাহ করা হয়। মাড়াই মওসুম শেষে “ধারে” প্রেরিত এয়ার কমপ্রেসারটি গত ২৪/০১/২০১৭ তারিখে কুষ্টিয়া সুগার মিলের সরবরাহ চালান নং-২৫৪ মূলে আর.জে.সিকে ফেরৎ প্রদান করা হয়। চাহিত নতুন এয়ার কমপ্রেসার তৈরীর চুড়ান্ত কার্যাদেশ নং-১২৯৩, তারিখ-২৫/১২/২০১৬ মডার্ণ স্টীল প্রাপ্ত হয়, যা ইতোপূর্বে কথিত নতুন মর্মে সরবরাহ দেখানো হয়েছে। তবে চুড়ান্ত বিল করার সময় ঐ কার্যাদেশের বিপরীতে মডার্ণ স্টীল ইঞ্জিনিয়ারিং, নারায়ণগঞ্জ এর প্রতিনিধি জনাব দিলীপ কুমার সাহা কর্তৃক ইতোপূর্বে “ধারে” সরবরাহকৃত বিতর্কিত চালান নং-৮৯১, তারিখ ১৩/১২/২০১৫ ব্যবহার করে বিল প্রস্তুতের জন্য প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র কুষ্টিয়া সুগার মিলে মাল প্রবেশের গেট পাস (আই জি পি), মাল প্রাপ্তির রিপোর্ট (এম আর আর), মালের গুনগত মান (কোয়ালিটি) সহ আনুষাঙ্গিক ভূয়া/অবৈধ কাগজপত্র সৃজন ও সংযুক্ত করে ৭,০৫,০০০/- (সাত লক্ষ পাঁচ হাজার) টাকার বিল দাখিল ও ১০/০১/২০১৭ তারিখে উত্তোলন করে আত্মসাত করেছেন।

মামলার বাদি দুর্নীতি দমন কমিশন, সমন্বিত জেলা কার্যালয়, কুষ্টিয়ার ডিএডি মোস্তাফিজুর রহমান জানান,(১) আহসান সিদ্দিক, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, রেণউইক যজ্ঞেশ্বর এন্ড কোং(বি.ডি) লিঃ, কুষ্টিয়া, বর্তমানে- প্রধান প্রকৌশলী, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন, প্রধান কার্যালয়, ০১, দিলকুশা বা/এ, ঢাকা-১০০০; (২) জনাব মাধব চন্দ্র মন্ডল, সাবেক মহা-ব্যবস্থাপক (কারখানা), কুষ্টিয়া সুগার মিলস লিঃ, কুষ্টিয়া, বর্তমানে- মহা-ব্যবস্থাপক (কারখানা), নাটোর সুগার মিলস লিঃ, জেলা-নাটোর; (৩) জনাব মোঃ আবুল কাশেম, স্বত্ত্বাধিকারী, মডার্ণ স্টীল ইঞ্জিনিয়ারিং, ৫৩৮ মিজমিজি, মৌচাক, নারায়ণগঞ্জ, পিতা-মোঃ নুরুল ইসলাম, সাং-ডাকরা, পোঃ-খিরণশাল, থানা-চৌদ্দগ্রাম, জেলা-কুমিল্লা এবং (৪) জনাব দিলীপ চন্দ্র সাহা, পিতা-মৃত হারাধন চন্দ্র সাহা, সাং-কুকুরীখিল, ডাক-মাহিনী বাজার, থানা-নাঙ্গলকোট, জেলা-কুমিল্লা কর্তৃক পরস্পর যোগসাজসে ক্ষমতার অপব্যবহারপূর্বক দূর্নীতি ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কুষ্টিয়া সুগার মিলের একটি পুরাতন এয়ার কমপ্রেসার ছাড়াও সরকারের ৭,০৫,০০০/- (সাত লক্ষ পাঁচ হাজার) টাকা আত্মসাতের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমানিত। সেকারনে তাদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধির ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ এবং ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা দায়েরের সুপারিশ করে অনুসন্ধান প্রতিবেদন উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে প্রেরণ করা হয়েছিলো। তৎপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রধান কার্যালয়, ঢাকার স্মারক নং-০৪.০১.৫০০০.৬৪৪.০১.০১০.১৬-৭৬৮০ তাং- ০৫/০৩/২০১৮ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন, বিভাগীয় কার্যালয়, খুলনার স্মারক নং-০০.০১.০০০০.৭৩১.০১. ০৮৯.১৬-৩৭৩, তারিখ-১৯/০৩/২০১৮ খ্রিঃ মূলে মামলা দায়েরের অনুমোদন প্রদান করায় বর্ণিত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এবিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয় কুষ্টিয়ার উপ-পরিচালক মোঃ লুৎফর রহমান বনিক বার্তা প্রতিনিধির সাথে আলাপকালে জানান, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের চিনিকল গুলি ধ্বংসের মুখে, নানা মহল থেকে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ আসছে। এই মামলার তদন্তকালে আরও গভীর ভাবে অনুসন্ধান করে দেখা হবে, আরও কেউ জড়িত আছে কিনা অথবা আরও বড় কোন ধরণের অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে কিনা সেটাও দেখা হবে। সত্যতা পেলে সমস্ত অপরাধীদেরই আইনের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে।

আরও পড়ুন.......

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 80
    Shares