Home / এক্সক্লুসিভ / কুড়িগ্রাম ৩ : উদ্ধারে মরিয়া জাপা, ছাড় দিতে নারাজ আ’লীগ-বিএনপি

কুড়িগ্রাম ৩ : উদ্ধারে মরিয়া জাপা, ছাড় দিতে নারাজ আ’লীগ-বিএনপি

ক্রাইম প্রতিদিন, রুহুল আমিন রুকু, কুড়িগ্রাম : জাতীয় পার্টির দীর্ঘ দিনের দখলে থাকা কুড়িগ্রাম-৩ আসনটি নিজেদের নিয়ন্ত্রনে নিতে তৎপর আওয়ামীলীগ ও বিএনপি। জাপা চেয়ারম্যান জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন বর্তমান এমপি হেভিওয়েট প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী একে এম মাঈদুল ইসলামকে বাদ দিয়ে আসনটি ধরে রাখতে নতুন কাউকে দলের মনোনয়ন দিয়ে চমক দিবেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থী বর্তমান জাপা এমপি’র সহোদর ভাই জেলা বিএনপি’র সভাপতি ও শিল্পপতি তাসভীর উল ইসলাম আসনটি দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তবে বর্তমান এমপি’র প্রতিনিধি’র মাধ্যমে প্রকল্প লুটপাট ও নানা রকম দূর্নীতির কারণে ঐ পরিবার থেকে ভোটাররা মুখ ফিরেয়ে নিতে পারেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিনেও এখানে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের কোন একক জনপ্রিয় নেতা তৈরি না হওয়া, দলের অভ্যন্তরে উপ-দলীয় কোন্দল ও হাফ ডজন প্রার্থী একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করায় আসনটি দখলে নেয়া তাদের জন্যেও কঠিন হবে। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনও ক্লিন ইমেজের প্রার্থী দিয়ে আসনটি তাদের দখলে নেয়ার জন্য এখন থেকেই বেশ ধর্মীয় সুরসুড়ি দিয়ে গোপনে তৎপরতা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় এ আসনটি কার দখলে যাবে তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
কুড়িগ্রাম-৩ আসনটি উলিপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন, ১টি পৌরসভা ও চিলমারী উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। তবে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন কুড়িগ্রাম-৩ আসন থেকে চিলমারী উপজেলার ৪টি ইউনিয়ন বাদ দিয়ে আসন পূনঃবিন্যাস করলে এখানে ভোটের সমীকরণ অন্যরকম হবে। আগামীতে কে হবেন এই আসনের কান্ডারী তা নিয়ে এলাকার হাট-বাজার ও চায়ের দোকানগুলোতে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।
জাতীয় পার্টির বর্তমান এমপি একেএম মাঈদুল ইসলাম মুকুল গত সংসদ নির্বাচনে বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে দুই-একবার ছাড়া কার্যতঃ এলাকায় আসা বন্ধ করে দেন। এ সুযোগে তার চাচাতো ভাই একেএম শফিকুল ইসলাম দারা এমপি’র প্রতিনিধি হয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা ভাগ-বাটোয়ারায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। অভিযোগ রয়েছে, এমপি’র বরাদ্দের সিংহভাগ প্রকল্প জাতীয়পার্টির নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে বিএনপি ঘরোনার তাদের পারিবারিক সম্পর্কের লোকজনদের দিয়ে বাস্তবায়ন করায় এর অধিকাংশ প্রকল্পেই থাকে অদৃশ্য। ফলে শুরু থেকেই জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা ছিলেন বিক্ষুব্ধ। সম্প্রতি জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতাকর্মীরা একেএম মাঈদুল ইসলামকে দলের মনোনয়ন না দেয়ার জন্য প্রকাশ্যে বৈঠক করে রেজুলেশন দলের চেয়ারম্যান বরাবর প্রেরণ করেন। উপজেলা জাপা নেতাকর্মীদের অভিযোগ, মাঈদুল ইসলাম কৌশলে তার অবর্তমানে তারই আপন ছোটভাই জেলা বিএনপি’র সভাপতি তাসভীর উল ইসলামকে এ আসনের এমপি বানাতে কৌশলে বিএনপি ঘরোনার লোকজন দিয়ে তার কার্যক্রম চালাচ্ছেন। এ কারনেই জাপা’র ত্যাগী নেতাকর্মীদের সাথে মাঈদুল ইসলামের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময়ে তিনি দলীয় কোন কর্মকান্ডে জড়িত না থাকায় জাপার এ দূর্গখ্যাত এ আসনটির নেতাকর্মীরা কার্যতঃ নিক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। দলের ঘনিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, আসনটি ধরে রাখতে জাপা চেয়ারম্যান হোসাইন মুহাম্মদ এরশাদ অনেক আগ থেকেই কর্মীদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। সূত্রটির মতে জাপা চেয়ারম্যান ঠিক সময়ে উলিপুরে এসে ক্লিন ইমেজের সবার কাছে গ্রহনযোগ্য ব্যক্তিকে দলের প্রার্থী হিসেবে ঘোষনা দিয়ে চমক সৃষ্টি করবেন। এ আসনে জাপা’র প্রার্থী হিসেবে সনিক প্রাইম গ্রুপের চেয়ারম্যান ডা.আক্কাস আলী সরকার ও জাপার আবু তাহের খাইরুল হক এটির নাম শোনা যাচ্ছে। রাজনৈতিক কারনে গুরুত্বপূর্ণ এ আসনটি রক্ষায় ইতোপূর্বে এরশাদ নিজেই প্রার্থী হয়ে তখনকার তার প্রতিপক্ষ প্রার্থী একেএম মাঈদুল ইসলামকে শোচণীয় ভাবে পরাজিত করেছিলেন।
এদিকে, শাসকদল আওয়ামীলীগের নির্ভরযোগ্য কোন প্রার্থী না থাকায় আসনটি তাদের জন্য দখলে নেয়া কঠিন হবে। প্রায় হাফ ডজন নেতা নিজেদেরকে দলের প্রার্থী দাবী করে প্রচারণায় রয়েছেন। এদের অনেকেই একে অন্যের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনায়ও ব্যস্ত। দলের অভ্যন্তরে উপ-দলীয় কোন্দল ও গ্রুপিং এর কারনে সরকারে নানামূখি উন্নয়ন কার্যক্রম মানুষের কাছে তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্ত স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেত্রী অধ্যক্ষ নাসিমা বানুর দূর্ঘটনাজনিত কারনে মৃত্যুর পর এ আসনটিতে আওয়ামীলীগ ক্লিন ইমেজের প্রার্থী সংকটে পড়ে। বর্তমান আওয়ামীলীগের বেশির ভাগ স্থানীয় নেতা-নেত্রী তদবির বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ায় দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে বির্তকিত হয়ে পড়েন। এ কারনে নিজেদেরকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রচারণায় থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তেমন প্রভাব পড়ছে না। কারও কারও ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও রয়েছে নানামুখি বির্তক। এ অবস্থায় আসনটি উদ্ধারে দলের হাইকমান্ডকে অত্যন্ত বিচক্ষনতার সাথে প্রার্থী মনোনয়নের পদক্ষেপ নিতে হবে বলে স্থানীয় ত্যাগী নেতাকর্মীরা মনে করেন। বর্তমানে আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে মাঠে প্রচারণায় রয়েছেন, উলিপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মতি শিউলী, চিলমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী সরকার বীর বিক্রম, সাবেক সংসদ সদস্য আমজাদ হোসেন তালুকদার, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক বীরমুক্তিযোদ্ধা গোলাম হোসেন মন্টু, অবসর প্রাপ্ত অধ্যাপক এমএ মতিন ও সাজাদুর রহমান তালুকদার সাজু।
অপরদিকে জেলা বিএনপির সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় বিএনপি’র সদস্য শিল্পপতি তাসভির উল ইসলাম এ আসনে দলের একক প্রার্থী হিসেবে নিজেকে দাবী করলেও তারেক জিয়ার ঘনিষ্ঠ ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রিয় নেতা আব্দুল খালেক দলের মনোনয়ন চাইবেন বলে সাংবাদিকদের জানান। জেলা সভাপতি শিল্পপতি তাসভির উল ইসলাম ঢাকায় বসে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের তার আস্থাভাজন কিছু লোক দিয়ে দল পরিচালনা করায় শুরু থেকেই ত্যাগী নেতাকর্মীদের মাঝে অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীর মতে ঢাকায় থেকে তিনি কতিপয় ব্যক্তির হাতে অর্থদিয়ে দল পরিচালনা করায় এখানে আদর্শের চেয়ে অর্থই মূখ্য হয়ে পড়ছে। এ কারনে দলীয় সভানেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনসহ বিগতদিনের সরকার বিরোধী কোন আন্দোলনে ফটো সেশন ছাড়া কোন ভূমিকা রাখতে পারেননি বিএনপি। এছাড়া তাঁর আপন ভাই ও জাতীয় পার্টির বর্তমান এমপি মাঈদুল ইসলাম মুকুলের উন্নয়ন প্রকল্পের নানামুখি দূনীতির কারনে ঐ পরিবারের প্রতি মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে তাসভির উল ইসলাম বিএনপি’র মনোনয়ন পেলে তার জন্য জয়লাভ করা অনেকটা কঠিন হয়ে পড়বে। তারেক জিয়ার ঘনিষ্ঠ ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রিয় নেতা আব্দুল খালেক ছাত্রজীবন থেকেই বিএনপি’র রাজনীতির সাথে জড়িত। বিএনপি ঘরোনা লোকজনদের কাছে ক্লিন ইমেজের অধিকারী ঐ ছাত্র নেতার ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে রয়েছে একটি ভোটব্যাংক।
এছাড়া জাতীয় পার্টি ত্যাগ করে নতুন সততা দলের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম হাবীব দুলাল এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে শোনা যাচ্ছে। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনও ক্লিন ইমেজের প্রার্থী দিয়ে আসনটি তাদের দখলে নেয়ার জন্য এখন থেকেই বেশ ধর্মীয় সুরসুড়ি দিয়ে গোপনে তৎপরতা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় এ আসনটি কার দখলে যাবে তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

এই মুহূর্তে অন্যরা যা পড়ছে

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 16
    Shares