গ্রামীণ ঐতিহ্য থেকে গরুর গাড়ি আজ বিলুপ্তির পথে

ক্রাইম প্রতিদিন, শাহ্ আলম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ : গ্রাম বাংলার প্রাচীন যোগাযোগ মাধ্যমগুলো মধ্যে এক সময় প্রধান অবলম্বন হিসেবে গরুর গাড়ি ব্যবহৃত হতো। মানুষ যখন পশুকে যোগাযোগের মাধ্যমে হিসাবে ব্যবহার করতে শিখলো তখন গরুর গাড়িই যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।

পাশাপাশি বিবাহের অথিতির ক্ষেত্রেও গরুর গাড়ির কোন বিকল্প ছিলনা। তাই গরুর গাড়ি একটা ঐতিহ্যের অংশও বটে। প্রাচীন ইতিহাসের ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় গরু মহিষের গাড়ির প্রচলন প্রাচীনকাল থেকেই। অভিজাত পরিবারের সদস্যরা গরুর গাড়িকেই যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতো।

আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যেত গরুর গাড়ি চড়েই। এক সময় এ জেলার যে কোন গ্রামেই চোখে পড়তো গরু কিংবা মহিষের গাড়ি। কিন্তু এখন যন্ত্রচালিত যানবাহনের কারনে সেই দৃশ্য খুব একটা আর চোখে পড়ে না। এ ব্যাপারে সরজমিনে কথা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জের পারচৌকা গ্রামের ৭৫ বছর বয়স্ক পুরনো গাড়িয়ান মহসিন আলীর সাথে। তিনি জানান এক সময় হামারঘে দিগে(এলাকায়) ভাল দুটা বল (বলদ) ও একখানটা(একটা) গরুর গাড়ি থাকলে গৃহস্থালি চালাইতে আর কুনু চিন্তা করতে হতোকনা।

এ্যার পর বিহা (বিয়ে) লিয়া গেলে মজা কইরা য্যামন খ্যাতে (খেতে) প্যাতুং তেমন বকশিশ হিসাবে টাকাও প্যাতুং(পেতাম)। এখন এগল্যা কিছুই ন্যায়। ঘাঁটা(রাস্তা) পাকা হয়্যা গেছে, টেরাকে(ট্রাকে) আর বাসে সব কর‍্যা লিছে।

শুধু গাড়িয়ান মহসিনই নয় তার ভাই চাঁদু(৮৫),রাঘববাটির চাঁন মুন্সীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার পুরোনো গাড়িয়ানদের সাথে কথা বলে একই রকম ভাষ্য পাওয়া যায়।

এক সময় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটারের রাস্তা পাড়ি দিয়ে কৃষকেরা জমি চাষাবাদ এবং মালামাল বহনের জন্য এটি ব্যবহার করতো।আধুনিক যুগে পাওয়ার টিলার আসার কারণে গরু দিয়ে চাষাবাদ যেমন হয়না ঠিক তেমনি গরুর গাড়ির কাজও পাওয়ার টিলার দিয়ে করা হয়। কালের বিবর্তনে এই গরুর গাড়ি আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে।

যে কারণে শহরের ছেলে-মেয়েরা দূরে থাক, বর্তমানে গ্রামের ছেলে-মেয়েরাও গরুর গাড়ির সঙ্গে অপরিচিত হয়ে যাচ্ছে। যন্ত্রের আধুনিক আবিস্কার এবং কৃষকদের মাঝে প্রযুক্তির ছোয়া ও যন্ত্রের নতুনত্বের কারনে গরুর গাড়ির জায়গা দখল করে নিয়েছে বাস,ট্রাক, ভ্যান, অটোরিকশা, নছিমন-করিমন, ভটভটিসহ নানান যন্ত্র চালিত যানবাহন।

এ বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারী কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ও লোকজ সাংস্কৃতিক গবেষক ড.মাঝহারুল ইসলাম তরু বলেন,গরুর গাড়ি একটি স্বাস্থ্য সম্মত যানবাহন।

এখানে বায়ু দূষণ ও সড়ক দূর্ঘটনার তেমন কোন সুযোগ নেই কিন্তু দুঃখের বিষয় গরুর গাড়ির ঐতিহ্য দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে ফলে পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার আমিনুজ্জামান জানান, দ্রুতগতির যানবাহন সমাজে অধিক পছন্দনীয় হওয়ায় গরুর গাড়ির ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনা। আদিনা ফজলুল হক কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক জিয়াউল হক বলেন, গরুর গাড়ি গ্রাম বাংলার আদিম ঐতিহ্য এর ইতিহাস সমাজে ধরে রাখার জন্য বাৎসারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এর ব্যবহার থাকা উচিৎ। বিনোদপুর ডিগ্রী কলেজের ইতিহাসের শিক্ষক সফিকুল ইসলাম মতে,পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর সাথে গরুর গাড়ির পরিচিতি তুলে ধরা উচিৎ।

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 11
    Shares