চাঁদপুর-৪ : গ্রুপিংয়ে কাবু আ.লীগ-বিএনপি

ক্রাইম প্রতিদিন : চাঁদপুর জেলার ৫টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল ২৬৩নং চাঁদপুর-৪ ফরিদগঞ্জ আসন। ১৯৭৭ সাল থেকে দীর্ঘ সময় এখানে আওয়ামী লীগের কোনো সংসদ সদস্য ছিলেনই না। দীর্ঘ ৩৮ বছর পর এখানে আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য পায়। তাও আবার ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। তবে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে এখানে আওয়ামী লীগ এখন অনেক সুসংহত ও শক্তিশালী।

নির্বাচনে এখানকার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। কোনো প্রকার বাধা ছাড়াই এখানে সব দল প্রচার-প্রচারণা করতে পারছে। তবে এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে গ্রুপিং তুঙ্গে।

১৫টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ নির্বাচনী আসন। এখানে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ লোকের বাস। প্রবাসী অধ্যুষিত শিল্পপতি ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের এলাকা হওয়ায় জেলার রাজনৈতিক মেরুকরণে এই উপজেলার প্রভাব থাকে সবচেয়ে বেশি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী ও বিজিত প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল সাড়ে ৭ হাজার। এ আসনের ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৪ হাজার ১০৩ জন। অর্থাৎ গত ৯ বছরে ভোটার বেড়েছে প্রায় ১ লাখ। নতুন এই ভোটাররাই আগামী নির্বাচনের জন্য টার্নিং পয়েন্ট হবে বড় দু’টি দলের জন্য।

আওয়ামী লীগের মনোনোয়ন দৌড়ে এখানে যে ক’জন এগিয়ে আছেন তারা হলেন, বর্তমান এমপি ড.মোহাম্মদ শামছুল হক ভূঁইয়া, নৌকা প্রতীকের সাবেক প্রার্থী জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক শফিকুর রহমান, চাঁদপুর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জাহিদুল ইসলাম রোমান। এছাড়াও জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা.হারুনুর রশিদ ও জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক, জননেত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা.এ.কে.এম মোস্তফা হোসেন।

বর্তমান এমপি দীর্ঘ সময় ধরে তৃণমূল আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিশে আছেন। ঘন ঘন দলীয় এবং সরকারি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করে রাখছেন তিনি। বিগত সময়ে তার মতো কোনো এমপি এলাকায় এত সময় দেননি। বিষয়টিকে দলীয় নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ খুবই ভালোভাবে নিয়েছেন। তাছাড়া এ ৫ বছরে রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগেও তার ভালো সম্পর্ক।

অপরদিকে নীতি ও আদর্শে বলিয়ান হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক শফিকুর রহমান। তিনি ২০০১ সালের ১ অক্টোবর এবং ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীকের কাছে সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। সাংবাদিক শফিকুর রহমান নির্বাচনের আগে পরে ঢাকাতেই অবস্থান করেন। তাই সাধারণ নেতা-কর্মী ও জনগণ থেকে তিনি একটু দূরেই আছেন। তবে তার ন্যায়-নিষ্ঠার কারণে সমাজে তিনি সমাদৃত।

এছাড়া ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসা অ্যাডভোকেট জাহিদুল ইসলাম রোমান। বাবা মরহুম অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘদিন জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। যুব সমাজের কাছে তুমুল জনপ্রিয় এই নেতা নির্বাচনী মাঠকে গরম করে রাখছেন। ফরিদগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের বিজয়ে তার রয়েছে মুখ্য ভূমিকা।

এদিকে বিগত যে কেনো সময়ের চেয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা বিএনপি বর্তমানে খুব খারাপ সময় পার করছে। ঘরে বাইরে সবখানেই তারা অশান্তিতে আছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে অনৈক্যই তাদের ঐক্য।

একদিকে ক্ষমতাশীনদের রাজনৈতিক চাপ অন্যদিকে নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং উপজেলা বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে দিন দিন দুর্বল করে দিচ্ছে। তবে উপজেলা বিএনপির বড় সুবিধা হলো এখানে তাদের বহু নিজস্ব ভোট রয়েছে। যারা চাইলেও বিএনপিকে ভোট দেবে, না চাইলেও ভোট দিবে। বিএনপির প্রবীন নেতারা মনে করছেন সাংগঠনিকভাকে শক্তি অর্জন না করতে পারলে এই ভোট ধরে রাখা যাবে না।

মূলত ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফরিদগঞ্জ বিএনপির গ্রুপিং শুরু। যখন আলমগীর হায়দার খান এমপি ছিলেন তখন পর্যন্ত এখানে বিএনপিতে তেমন কোনো গ্রুপিং ছিলো না। তিনি অসুস্থ হওয়ার পর কেন্দ্রীয় বিএনপিকে বিকল্প প্রার্থী খুঁজতে হয়।

৮০’র দশকের মাঝামাঝি থেকে ফরিদগঞ্জে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম পাটোয়ারীর বিএনপির হাই কমান্ডের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। আলমগীর হায়দারের পেছনের শক্তি মূলত তিনিই ছিলেন। সেই কৃতজ্ঞতা থেকে হয়তো তিনি সেসময় প্রথমে মোতাহার হোসেন পাটোয়ারীকে সমর্থন করেন এ আসনে বিএনপির মননোয়নের জন্য। কিন্তু বহু নাটকিয়তার পর শেষ পর্যন্ত টিকিট গেল সাবেক এমপি হারুনুর রশিদের হাতে।

পরদিন সাবেক এমপি আলমগীর হায়দারের কারিশমায় উপজেলাবাসী জানতে পারে না মোতাহার হোসেন নয়, এমএ হান্নানই উপজেলা বিএনপির মনোনোয়ন পেয়েছেন। তখনই চিত্রনাট্যে হাজির হন লায়ন হারুনুর রশিদ। তিনি মামলা ঠুকে দেন এম.এ হান্নানের বিরুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত ধানের শীষ হারুনুর রশিদেরই হয়। সেই যে শুরু গ্রুপিং আজ অবধি চলছে।

অপরদিকে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত এমএ হান্নানও বিএনপির মনোনয়নের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বিশিষ্ট শিল্পপতি ও মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ভাইস-চেয়ারম্যান এমএ হান্নান একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তা প্রায় নিশ্চিত। তার দাবি ২০০৮ সালে তার মনোনয়ন ছিনতাই হয়েছে। এবার তাই আর কোনো ছাড় নয়। বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেলেও স্বতন্ত্র নির্বাচন করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

এছাড়াও বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন, বিশিষ্ট আইনজীবী ঢাকা ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো.আব্বাস উদ্দিন ও জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি হুমায়ুন কবির বেপারী।

অন্যদিকে ২০১৪ সালে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে প্রথমে জাতীয় পার্টি এই আসনটি পেয়েছিল। কিন্তু আদালতের আদেশে মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায় জাতীয় পার্টির প্রার্থীর। এ আসনে এবারও মনোনয়ন প্রত্যাশী দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুল ইসলাম মিলন।

এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা আল্লামা মুকবুল হোসাইন এ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী।

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ (মার্কসবাদী) জেলা নেতা কমরেড আলমগীর হোসেন দুলাল ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ উপজেলা নেতা হারুনুর রশিদও মনোনয়ন চাইছেন।