ঝিনাইদহ-৩ : নৌকার মাঝি একাধিক, নবীনে বিএনপি

ক্রাইম প্রতিদিন, এস.এম রায়হান উদ্দীন,কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) : কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর এ দু’টি উপজেলা নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন ঝিনাইদহ -৩। আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কে সামনে রেখে সারা দেশের মত এ আসনেও বইছে নির্বাচনি হাওয়া। তফসিল ঘোষণার অনেক আগে থেকেই মনোনয়ন প্রত্যাশীরা আগাম প্রচারনা শুরু করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। আ.লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন থেকে এ আসনে নৌকার মাঝি হতে একাধিক প্রার্থী বিভিন্নভাবে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। নির্বাচনি এলাকায় সরকারের উন্নয়ন কাজের প্রচার, কর্মিসভা, উঠান বৈঠক, গনসংযোগ, মোটর শোভাযাত্রা, ও ভোটারদের সঙ্গে করছেন নিয়মিত শুভেচ্ছা বিনিময়।

এলাকার মোড়ে মোড়ে বিভিন্ন ভাবে লাগানো হয়েছে প্রার্থীদের ছবি সংবলিত বিলবোর্ড ও ব্যানার। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা এলাকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে যেমন ভোটারদের কাছে পৌছাচ্ছেন, তেমনি দলের নীতি-নির্ধারকদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন। এমনকি প্রচারণার একটি বড় মাধ্যম হিসাবে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক কে ব্যবহার করছেন।
আ.লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশায় দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণ ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ও গণসংসোগ করে যাচ্ছেন বর্তমান ও সাবেক সাংসদ ছাড়াও সাবেক ছাত্রলীগের তরুণ নেতা। সবাই এলাকায় শক্ত অবস্থান তৈরী করতে দিন-রাত মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন।

দু’টি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত (কোটচাঁদপুর-মহেশপুর) সংসদীয় আসন ঝিনাইদহ-৩। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৮শ’ ৮৪ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮১ হাজার ৭শ’১৯ জন এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৭৯ হাজার ১শ’ ৬৫ জন । মূলত আসনটি বিএনপির হলেও ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনটি আ.লীগ তাদের দখলে নেয়। পরবর্তিতে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ গ্রহন না করায় আসনটি আ.লীগ নিজেদের দখলেই রেখেছেন।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে গত ৫টি নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের ৬ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯ ভোটের মধ্যে বিএনপির শহিদুল ইসলাম মাষ্টার ৬১ হাজার ৩৯১ ভোট পেয়ে এ আসন থেকে জয়ী হন। ১৯৯১ সালের এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর এএসএম মোজাম্মেল হক ৪৪ হাজার ৮৬১ ভোট এবং আওয়ামী লীগের সাজ্জাতুজ জুম্মা পেয়েছিলেন ৩১ হাজার ৪১২ ভোট।

১৯৯৬ সালের ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির শহিদুল ইসলাম মাষ্টার ৬৫ হাজার ৭২৫ ভোট পেয়ে পূনঃরায় নির্বাচিত হন। জামায়াতে ইসলামীর এএসএম মোজাম্মেল হক ৫৬ হাজার ৪৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাজ্জাতুজ জুম্মা ৫০ হাজার ৮৮২ ভোট পেয়ে ৩য় স্থানেই থাকেন।

২০০১ সালের ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামাত জোটগত ভাবে নির্বাচন করায়,এই আসনে বিএনপি জোটের পক্ষে শহিদুল ইসলাম মাষ্টার ১ লাখ ২৭ হাজার ২৩ ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসনটি বিএনপি তাদের দখলেই রাখে। সাজ্জাতুজ জুম্মা পূনঃরায় আওয়ামী লীগের পক্ষে মনোনয়ন পেলেও তিনি ৮৪ হাজার ২৮৯ ভোট পেয়ে আবারো ব্যার্থ হন।

পরবর্তিতে ২০০৮ সালের ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামাতের দুর্গ হিসাবে পরিচিত এই আসনটিতে হানা দেয় আ.লীগ। বিএনপি-জামাত জোট গত ভাবে নির্বাাচনে অংশগ্রহন করলেও জামাত নিজেদের দলের পক্ষ থেকে আলাদা প্রার্থী দেওয়ায় ভোটের হিসাব পাল্টে যায়। আ.লীগ দলীয় ভাবে তাদের প্রার্থী পরিবর্তন করে সে সময়কার মহেশপুর পৌর মেয়র এ্যাডঃ শফিকুল আজম খাঁন চঞ্চলকে মনোনয়ন দেন আ.লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়ে এ্যাডঃ শফিকুল আজম খাঁন চঞ্চল ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৬১ ভোট পেয়ে প্রথম বার এই আসন থেকে আ.লীগ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসনটি তাদের দখলে নেয়।
২০০৮ সালের ওই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর মো. মতিয়ার রহমান ৮১ হাজার ৭৩৯ ও বিএনপির শহিদুল ইসলাম মাষ্টার ৫৯ হাজার ১৫ ভোট পেয়ে পরাজিত হয়ে আসনটি হাত ছাড়া হয়।

সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি জোট নির্বাচনে না আসায় আ. লীগের বর্তমান এমপি নবী নেওয়াজ ৪৬ হাজার ১০৫ ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসনটি আ.লীগ তাদের দখলেই রেখেছেন। ৫ জানুয়ারীর এই নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থী হিসাবে জাতীয় পার্টির কামরুজ্জামান স্বাধীন ১ হাজার ৪৬৫ ভোট পেয়েছিলেন।

এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা মামলার কারনে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় না থাকলেও তারা মনে করছেন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনি পরিবেশ তৈরী হলেই নেতা-কর্মীসহ স্থানীয় বিএনপি মাঠে সক্রিয় হবেন। বিএপির দলীয় সূত্রে জানা যায়, আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে বিএনপির দলীয় প্রার্থী নবীন মুখেই থাকছেন। বিগত ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহন করার পরেই এ আসন থেকে নির্বাচিত তিন বারের জাতীয় সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম মাষ্টার ইন্তেকাল করায় বিএনপির ভরসা এখন নবীণে।

বর্তমানে এ আসন থেকে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেতে নেতা-কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় অনেক নেতা। এদের মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সহ-সম্পাদক আমিরুজ্জামান খাঁন শিমুল, বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক কন্ঠ শিল্পি মনির খাঁন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিষ্টার রুহুল কুদ্দুস চৌধুরী কাজল, মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আলহাজ্ব লতিফুর রহমান মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জি. মোমিনুর রহমান মমিন, সাবেক সাংসদ শহিদুল ইসলামের জৈষ্ঠ্য পুত্র ও মহেশপুর উপজেলা বিএনপি নেতা মেহেদী হাসান রনি, এ দিকে জামায়াতের সুরা সদস্য অধ্যাপক মতিয়ার রহমান ধানের শীষ নিয়ে বিএনপির প্রার্থী হবেন বলে শোনা যাচ্ছে।

এছাড়া জাতীয় পার্টি থেকে ব্যারিস্টার কামরুজ্জামান স্বাধীন, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক আব্দুর রহমান প্রার্থী হতে মাঠে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ঝিনাইদহ-৩ আসনে আ.লীগের বেশ কয়েকজন শক্তিশালী প্রার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্যে বর্তমান এমপি নবী নেওয়াজ, সাবেক সংসদ সদস্য এ্যাড. শফিকুল আজম খাঁন চঞ্চল, মহেশপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাজ্জাতুজ জুম্মা, সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা এবং কেন্দ্রীয় আ.লীগের বন ও পরিবেশ উপ-কমিটির সদস্য রেজাউল করিম টিটোন, আওয়ামী আইনজীবি সমিতির সদস্য ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী, সাবেক সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য পারভীন তালুকদার মায়া, কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা এম.এম জামান মিল্লাত, কেন্দ্রীয় আ.লীগ উপ-কমিটির সাবেক নেতা টি.এম আজিবর রহমান মোহন, জেলা কৃষক লীগ নেতা ও এস.বি.কে ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান সাজ্জাদুল ইসলাম সাজ্জাদ।

আ.লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী সাবেক সংসদ সদস্য এ্যাড. শফিকুল আজম খাঁন চঞ্চল প্রতিবেদককে জানান, আমি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তৃণমূল আ.লীগ থেকে এসেছি, আমার রক্তে আ.লীগ মিশে আছে, তিনি বলেন, নৌকাকে বিজয়ী করতে হলে তৃণমূলে যে ধরনের নেতৃত্ব প্রয়োজন, বহু বছর ধরে এই দু’ উপজেলায় সবার পাশে থেকে মাঠ পর্যায়ে আ.লীগের নেতা-কর্মীদের নিয়ে সেই নেতৃত্ব সৃষ্টি করেছি। এবং বিগত সময়ে আমি সংসদ সদস্য থাকাকালে এই এলাকাতে অনেক উন্নয়ন মূলক কাজ করেছি। আমি কোন সময় জনবিচ্ছিন্ন হয়নি। যেহেতু জননেত্রী শেখ হাসিনা ও দলের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, যে নেতা তৃণমূল সহ সাধারণ ভোটারের আস্থাভাজন ও জনপ্রিয় তাকেই আগামী সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। এইজন্য আমি শতভাগ আশাবাদী এবারও দলীয় মনোনয়ন পেয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়নের ধারা অব্যহত রাখতে নৌকার বিজয় নিয়ে এই আসনটি শেখ হাসিনাকে উপহার দিতে পারবো।

বর্তমান সংসদ সদস্য নবী নেওয়াজ আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এই প্রতিবেদককে বলেন, আমার সময়ে এই দুই উপজেলাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। উন্নয়নের এই ধারা অব্যহত রাখতে জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে আবারো মনোনয়ন দিবেন বলে আমি আশাবাদী। তিনি বলেন গত ৫ বছরে আমি এলাকার ব্যপক উন্নয়ন করেছি, এবং কোন রকম দলীয় বিশৃঙ্খলা করেনি, তাই আমি আবারো মনোনয়ন পাবো এবং নৌকার বিজয় নিশ্চিত করবো।

এদিকে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পেতে আগ্রহী প্রার্থীদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান,নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরী হলে, এবং জনগণ ভোট দিতে পারলে এই আসনে বিএনপির কোন বিকল্প নেই।
সাধারণ নেতা-কর্মীরা মামলার ভয়ে এলাকাতে থাকতে পারছেন না।

বিএনপির মনোনয়ন পেতে আগ্রহী কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক কন্ঠ শিল্পি মনির খাঁন এই প্রতিবেদককে বলেন, বিএনপির আসন হিসাবে পরিচিত ঝিনাইদহহ-৩ । দলীয় নীতি-নির্ধারকরা এই আসন থেকে আমাকে মনোনয়ন দিবেন বলে আমি আশাবাদি। তবে যাকেই ধানের শীষ মার্কা দেওয়া হোক না কেন, তার সাথেই কাজ করার কথা জানান। তিনি বলেন, জামাতের নিবন্ধন বাতিল হওয়ার কারনে তাদের নির্বাচন করার কোন সুযোগ নায়। যদিএই আসন থেকে জামাত মনোনয়ন চায়, তাহলে তাদের ধানের শীষ মার্কা নিয়ে ভোট করতে হবে। তবে বিএনপির আসন হিসাবে পরিচিত কোটচাঁদপুর-মহেশপুর থেকে বিএনপি দলের বাহিরে মনোনয়ন যাওয়ার কোন সুযোগ নাই।

সাবেক সাংসদ মরহুম শহিদুল ইসলামের জৈষ্ঠ্য পুত্র ও মহেশপুর উপজেলা বিএনপি নেতা মেহেদী হাসান রনির সাথে যোগাযোগ করা হলে, তিনি বলেন আমার বাবার জনপ্রিয়তার কারনে এই এলাকার মানুষ আমাকে সেই স্থানে বসাতে চায়। সেই হিসাবে দল থেকে আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি বাবার জনপ্রিয়তা ও দলের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্য রাখার চেষ্টা করবো। তবে দল যাকেই মনোনয়ন দিক তার সাথেই কাজ করার আশা প্রকাশ করেন।
এছাড়াও মনোনয়ন প্রত্যাশী অনেক রাজনৈতিক নেতাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সাধারণ ভোটাররা জানান, ভোটের পরিবেশ তৈরী এবং অবাধ ও সুষ্ঠু ভাবে ভোট দিতে পারলে, আমরা তাকেই এমপি হিসাবে বেছে নিবো যে প্রার্থী এলাকার উন্নয়ন করবে, মাদক ও সন্ত্রাস মুক্ত সমাজ গড়বে, সবসময় জনগণের পাশে থাকবে, এবং একজন জন প্রতিনিধি হিসাবে সবার কাছে গ্রহনযোগ্যতা পাবে।

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 13
    Shares