Home / জাতীয় / বিশেষ প্রতিবেদন / নির্মাণ সামগ্রীর উর্দ্ধমূল্যে ভবন ব্যবসায়ে ধস : বেকারত্বের শংকায় নির্মাণ শ্রমিক

নির্মাণ সামগ্রীর উর্দ্ধমূল্যে ভবন ব্যবসায়ে ধস : বেকারত্বের শংকায় নির্মাণ শ্রমিক

ক্রাইম প্রতিদিন, এম.লিটন-উজ-জামান, কুষ্টিয়া : কর্মব্যস্ত শহুরে নাগারিক জীবনে আবাসন যোগানে কুষ্টিয়াতেও গড়ে উঠেছে আবাসন ব্যবসায়ীদের নানা নামের বিল্ডার্স কোম্পানী। গত এক দশক ধরে গড়ে উঠা এসব আবাসন ব্যবসায়ীদের হাত ধরে কুষ্টিয়া শহরের প্রাণ কেন্দ্রে ছোট বড় মাঝারি মিলে প্রায় ৫০টি বহুতল ভবন নির্মাণ করে সেখানে অন্তত ২হাজার পরিবারের আবাসন সংস্থান করেছে এসব কোম্পানীগুলো। এখাতে সব মিলিয়ে অন্তত ১৫হাজার প্রান্তিক শ্রমজীবি নির্মাণ শ্রমিকের কর্মক্ষেত্র হয়েছিলো। বেশ ভালই চলছিলো। কিন্তু সম্প্রতি নির্মাণ সামগ্রীর উর্দ্ধগামী মূল্যের নেতিবাচক প্রভাবে এব্যবসায়ের সাথে সংশ্লিষ্টরা পড়েছে বিপাকে। আবাসন ক্রেতাদের সাথে পূর্বের চুক্তি মতে নির্মাণ সম্পন্ন করতে লোকসানের বোঝা ভর করেছে বলে অভিযোগ বিল্ডার্স কোম্পানীগুলোর। এতে অবকাঠামো নির্মাণের গতিশীলতায় পড়েছে ভাটা। কর্মহীণ শ্রমিকের মানবেতর জীবন। ঘটনার সত্যতা থাকায় সরকারী কাজেও প্রাক্কলন ব্যয় বৃদ্ধির কথা জানালেন গণপূর্ত বিভাগ।

কুষ্টিয়া জেলা নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তাইজাল হোসেন ক্রাইম প্রতিদিনকে বলেন, জেলায় সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন ভবন নির্মাণ প্রকল্পগুলির চলমান কার্যক্রম এখন স্থবির। সম্প্রতি হঠাৎ নির্মাণ সামগ্রীর উর্দ্ধমুখি মূল্যের প্রভাবে হিসেব মেলাতে পারছেন না নির্মাণাধিন প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। এতে এই খাতে নিয়োজিত সকল ধরনের শ্রমিক বেকারত্বের শংকাসহ পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ক্ষুধার যন্ত্রনায় অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ছে জেলার(শুধুমাত্র নির্মাণ/রাজমিস্ত্রী)প্রায় ৭হাজার নির্মাণ শ্রমিকের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ। পরিস্থিতির উত্তোরণে সরকারের সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন মহলের কাছে দাবি জানান এই শ্রমিক নেতা।

সদর উপজেলার হরিপুর গ্রামের নির্মাণ শ্রমিক আয়ুব আলী ক্রাইম প্রতিদিনকে বলেন, এমনিতেই মালিক পক্ষ সুযোগ পেলেই আমাদের ন্যায্য মজুরি থেকে ঠকান। তারপর আবার অধিকাংশ বিল্ডিং নির্মাণ এখন বন্ধ রেখেছে মালিকরা। দিন এনে দিন খাওয়া শ্রমিকরা কাজের সন্ধানে যে দুই একটার কাজ চলছে সেখানে গিয়ে ভীড় করলেই মালিকরা কম মজুরী দিয়ে কাজ করানো সুযোগ নেয়। এভাবে বেশীদিন চললে বেঁচে থাকা জন্য আমাদের অন্য পথ দেখতে হবে।

শহরের মজমপুরের রড ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম ক্রাইম প্রতিদিনকে বলেন, ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত প্রধাণত রড, সিমেন্ট, ইটসহ ধাতব জাতীয় সামগ্রীর আকাশচুম্বি মূল্যবৃদ্ধির ফলে শহরের অধিকাংশ বিল্ডিং এর কাজ বন্ধ রেখেছে ঠিকাদাররা। এমনও দিন যাচ্ছে সারাদিন আমাদের বওনি(কেনাবেচা) হচ্ছে না। দোকানের কর্মচারীদের বেতন মজুরী দিতে হচ্ছে ক্যাশ ভেঙ্গে। এছাড়া এসব ব্যবসায়ের সাথে জড়িত কুলিরাও সারাদিন পর খালি হাতে বাড়ি যাচ্ছে। তারা ব্যাংক ঋণসহ নানাবিধ ভাবে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে জানান এই ব্যবসায়ী।

বিল্ডার্স ব্যবসায়ী ইকবাল হাসান খোকন ক্রাইম প্রতিদিনকে বলেন, গত এক দশকে কুষ্টিয়া শহরের প্রানকেন্দ্রে অন্তত ৫০টি বহুতল ভবনের ২০লক্ষ বর্গফুট আয়তনে প্রায় ২হাজার পরিবারের আবাসন সংস্থান নির্মাণ করে ক্রেতাদের সাথে চুক্তি মতে ইতোমধ্যে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই সময়কালে এখাতে প্রায় ৫শত কোটি টাকার ব্যবসায়ী লেনদেন হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ কোন প্রকার যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত প্রধানত: রড,সিমেন্ট, ইটসহ আনুষঙ্গিক নির্মাণ উপকরণের লাগামহীণ মূল্যবৃদ্ধির কারণে উন্নয়নের এই খাতটি স্থবির। বিল্ডার্স ব্যবসায়ীরা ভবন নির্মাণে হিসেব মেলাতে পারছেন না আবাসন ক্রেতাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ মূল্যে। উন্নয়নের ধারা অব্যহত রাখতে এই সমস্যা সৃষ্টির সাথে জড়িত সিন্ডিকেট চক্রের লাগাম ধরতে সরকারের প্রতি আবেদন জানান।

কুষ্টিয়া বিল্ডার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল মতিন ক্রাইম প্রতিদিনকে বলেন, আসাসন ভবন বা যে কোন ধরণের ভবন নির্মাণ সামগ্রীর সিংহভাগ দখলকারী উপকরণগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য রড, সিমেন্ট, ইট, বালি-পাথর ছাড়াও প্রায় ২০০শত প্রকার নির্মাণ উপকরণের সমন্বয়ে একটি ভবন নির্মাণ শেষে তার আসল চেহারায় দৃশ্যত: হয়। ব্যস্ততম আধুনিক নাগরিক জীবনের আশ্রয়/আবাসন তৈরীর ব্যবসায়ের সাথে জেলাতে প্রায় ১৬টি বিল্ডার্স কোম্পানী জড়িত। উর্দ্ধগতির সামগ্রী মূল্যের কারণে চলমান কাজ বন্ধ করা ছাড়া কোন উপায় নেই। এতে একদিকে চুক্তিবদ্ধ সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে না পেরে ক্রেতাদের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে অন্যদিকে এখানে কর্মরত নির্মাণ, কাঠ, টাইলস, রং, স্যানেটারি, ইলেক্ট্রিকসহ নানা খাতের শ্রমিকরাও এখন বেকার হয়ে পড়ছে।

কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ জেড এম শফিউল হান্নান ক্রাইম প্রতিদিনকে বলেন, নির্মাণ সামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরকারী খাতের অবকাঠামো নির্মানে কোন বাধা না হলেও সামগ্রীক ভাবে বেসরকারী খাতে এর সীমাহীন নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে স্বীকার করে হঠাৎ এই মূল্যবৃদ্ধির লাগাম ধরতে না পারলে আগামীতে সকল প্রকার সরকারি অবকাঠামো নির্মাণেও প্রাক্কলন ব্যয় বেড়ে যাবে।

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 4
    Shares