সংবাদ শিরোনাম
Home / জাতীয় / বিশেষ প্রতিবেদন / পাহারা বসিয়েও দুই মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি হাসিবুল

পাহারা বসিয়েও দুই মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি হাসিবুল

ক্রাইম প্রতিদিন, ডেস্ক : দুই মেয়েকে হত্যার পর স্ত্রীর আত্মহত্যার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না হাসিবুল ইসলাম। তিনি জানান, মেয়ে দুটি তার কলিজার টুকরা ছিল। তারা যখন যা খেতে চেয়েছে তাই খাইয়েছেন। হাতাশাগ্রস্ত স্ত্রীকে সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখতেন। ঢাকায় জমি কিনে তার নামে দলিল করে দেয়ার কথাও বলতেন। একবার আত্মহত্যার চেষ্টার পর দুইজনকে পাহারায় বসিয়েছিলে। তবুও এই মর্মান্তিক ঘটনা। এতে একদম ভেঙে পড়েছেন তিনি।

গত ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যায় রাজধানীর মিরপুরের বাঙলা কলেজের কাছে পাইকপাড়ার সরকারি কোয়ার্টারের ১৩৪ নম্বর ভবনের চারতলার ফ্ল্যাট থেকে জেসমিন আক্তার ও তার দুই মেয়ের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। জেসমিন আক্তার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে কর্মরত ছিলেন। তার স্বামী হাসিবুল ইসলাম সংসদ সচিবালয়ের সহকারী লেজিসলেটিভ ড্রাফটসম্যান। তাদের চঞ্চল দুই মেয়ে হাসিবা তাহসিন হিমি (৮) ও আদিবা তাহসিন হানি (৪) এখন চিরঘুমে সবার চোখে আড়ালে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে হাসিবুল ইসলাম শুক্রবার সকালে বলেন, আমি বউ-বাচ্চা নিয়ে খুবই সুখে-শান্তিতে ছিলাম। আমার সংসারে কোনো অভাব ছিল না। আমার শ্যালকও আমাদের সঙ্গে বসবাস করেছে। ওর (স্ত্রী) মাথায় সমস্যা ছিল। ও মাঝে মাঝে বলত- আমার বেঁচে থেকে কী লাভ! আমি মরে গেলে আমার বাচ্চাদের কে দেখবে?

তিনি বলেন, ‘তার চিকিৎসার জন্য সেদিনই আমি জাতীয় সংসদের কর্মরতদের জন্য গাড়িতে করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে গেছি। গাড়িতে যারা ছিল সবাই দেখেছে। বিকেলে বাসায় এসে দেখি তারা দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়েছে। বউয়ের মাথায় মাইগ্রেনের সমস্যা থাকায় আমি ডাকিনি। নামাজ পড়ে আসার পর আমার শ্যালক বলে- ওরা তো এতক্ষণ পর্যন্ত ঘুমায় না। দরজাও খোলা যাচ্ছে না। ডাকলেও শুনে না। সে-ই দরজা ভাঙছে আমার সামনে। বউয়ের খালাত বোনও ছিল। ঘরের ভেতরে সব দেখে আমার মাথা আর ঠিক নাই। আল্লা একি করল! বাচ্চা দুটি আমার কলিজার সঙ্গে মিশে ছিল। আমার একি হয়ে গেল। সংসারে কোনো অভাব ছিল না। মাছ-মাংস দিয়ে ফ্রিজ ভরা। বাজারঘাট করতাম নিয়মিত।’

হাসিবুল বলেন, ‘এই দীর্ঘ ছুটির আগে বউ বাজার থেকে ভাল মাছ কিনে আনার কথা বলেছিল। সে বলেছিল আমি অফিসে যাব না। তুমি মাছটা কিনে রাখ। বউই টাকা দিল। বলল- পরে আমাকে শোধ করে দিও। পরে আমি তাকে টাকা শোধ করে দিয়েছি। ওর পরামর্শ মতো বাজার করলাম। সে বলল- পরের দিন তোমার অফিসের গাড়িতে করে যাওয়া যাবে না? আমি বললাম- যাবে। আমার গাড়িতেই তাকে মৃত্যুর দিন হাসপাতালে নামিয়ে দিলাম। তখনও কোনো সিগনাল বুঝতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘এর আগেও একদিন ঘুমের ওষুধ খেয়েছিল। তারপর হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েছি। ইন্ডিয়ার কলকাতায় দেখাচ্ছি।
বউকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমাকে কি মানসিক ডাক্তার দেখাবো? বউ বলেছিল, যেসব ওষুধ খাচ্ছি খেয়ে দেখি। ভাল না লাগলে আমি যাব।’

এর আগেও তো উনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। এরপরও কি তিনি সতর্ক হননি?- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বাচ্চা দুটিকে কখনও ছাড়ি না। তাদের পাহারা দেয়ার জন্য দুজনকে সব সময় রেখেছি। একজন হল আমার আপন শ্যালক, আরেকজন মামাতো শ্যালিকা। এই দুইজন ২৪ ঘণ্টা পাহারা দিতো।

তিনি দাবি করে বলেন, আমাদের সম্পর্ক খুবই ভাল ছিল। তাকে নিয়ে আমি অনেক জায়গায় বেড়াতে গিয়েছি। এর আগে যমুনা নদীতে গেলাম। ওকেসহ বাচ্চাগুলোকে নিয়ে প্রত্যেক বছর দুই-তিনটি পিকনিকে যাই। বছরে ৫/৬টি দাওয়াত খেতে যাই। চাকরি নিয়ে বউ মন খারাপ করলে বলতাম- তোমার মন খারাপ করার দরকার নাই। চাকরি ছেড়ে দাও। যত টাকা লাগবে আমি দেব। মাসে তোমার নিজস্ব হাতখরচ বাবদ ৫ হাজার টাকাও দেব। বউ বলত- কষ্ট করে আর কয়েকদিন চাকরি করি। ঢাকায় একটা বাড়ি নাই আমাদের।

আমি বলতাম, হজে যাওয়ার আগে আমি একটি বাড়ি করে দেব তোমাকে। সমিতির মাধ্যমে জমি কিনে তোমার নামে দলিল করব। দলিলটাও তোমাকে দিয়ে যাব। প্রয়োজনে লোন নেব। তোমার লোন নেয়ার দরকার নাই। আমিই লোন নেব। ওর বেতনের টাকা আমি কখনও নিতাম না। ওর বেতনের টাকা ওই খরচ করত। কাপড়-চোপড় কিনত।

আপানাদের সবার ভাষ্য মতে সংসার তো তিনি স্বাভাবিক আচরণই করত, কিন্তু হঠাৎ করে এমন আত্মঘাতী হলেন কেন?– এ প্রশ্নের জবাবে হাসিবুল ইসলাম বলেন, বউ প্রায়ই বলত- আমি মরে গেলে বাচ্চাদের কে দেখবে। কথাটা প্রায়ই বলত। আমি বলতাম তুমি মরবে কেন? ওর জন্য কাজের লোকও দেখতাম। বাড়িতে ফোন করে বলেছিলাম কাজের লোক দেখার জন্য। বলেছি- যত টাকা লাগে কাজের লোক দেখ। এছাড়া ওর মামাতো বোন আছে। আমি বাচ্চাদের দেখব। তাকে এভাবে বুঝাতাম। আর শ্যালক তো সার্পোট দেবে। বলতাম তোমার ভাইকে বিয়ে দিয়ে বউ নিয়ে আমাদের বাসায় থাকবে। শ্যালক তো ঢাকায় চাকরি করে। ওরা বিনা পয়সায় থাকবে। এভাবে পরিকল্পনা করতাম।

মেয়ে দুটির কথা বলতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, আমি অফিস থেকে আসলে মেয়ে দুটির একটি ঘাড়ে আরেকজন পিঠে উঠত। ওর মা তখন ফ্রি। আমরা মেয়ে দুটি যতক্ষণ পর্যন্ত রাতে না ঘুমাত ততক্ষণ তাদের দেখভাল করতাম। ছোট মেয়েটা আমাদের কাছে আর বড় মেয়েটা ওর মামার কাছে ঘুমাত। বাচ্চাগুলো ছিল আমার শরীরের পোশাকের মতো। বাচ্চারা যখনই কিছু খেতে চাইত রাত-দিন নাই তাদের খাওয়াতাম। তাদের জিজ্ঞেস করতাম কোথায় খাবে? তারা বলত- সমবায় বাজারে। আমি কোনো দামদামি করতাম না। বাচ্চারা যখন যেটা খেতেচাইত সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিয়ে যেতাম।

তিনি বলেন, শয়তান তার (বউ) ওপর এমনভাবে ভর করেছিল আমি অনেক বোঝানোর পরও এ ঘটনা ঘটালো। আমি তাকে বুঝাতাম তোমার কিসের অভাব? আমি মরে গেলেও তুমি অনেক টাকা পাবে। আমার প্রপার্টি আছে তুমি সব পাবে। তাছাড়া তোমার টাকা আছে। এত টাকার দরকার কী? তুমি যা চাও তাই আমি এনে দিব। টেনশন করবে না। অনেক বুঝাইছি। কোনো কাজ হয়নি।

প্রসঙ্গত, লাশ উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ মায়ের আত্মহত্যার সন্দেহের কথা বললেও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বলেছেন, আঘাতের ধরনগুলো ব্যতিক্রমধর্মী। মঙ্গলবার মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে সংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে একথা বলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. এএম সেলিম রেজা।

তিনজনের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, জেসমিনের গলার পাশাপাশি দুই হাতে কবজির কাছে কাটা ছিল। বুকে ছিল অন্তত বারোটি আঘাতের চিহ্ন। বড় মেয়ে হিমির পেটে তিনটি আঘাতের চিহ্ন এবং বাঁ হাতের কবজির কাছে কাটা ছিল। ছোট মেয়ে হানির পেটে এবং ডান হাতের কবজির কাছে কাটা ছিল। দুজনেরই গলা কাটা ছিল।

এ ঘটনায় এখনও কোনো মামলা হয়নি। নিহতদের ঠাকুরগাঁওয়ে হাসিবুল ইসলামের পারিবারিক করবে দাফন করা হয়েছে। তাদের মৃত্যু নিয়ে তার শ্বশুর বাড়ি থেকে এখনও কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি।

Print Friendly, PDF & Email

আরও পড়ুন.......

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 54
    Shares