বনপলাশের পদাবলি : জীবন অরণ্যে শেকড়ের সুর

রূপক আল-মামুন : প্রকৃতি, প্রেম ও জীবন-বীক্ষার কবি অলোক কুমার চক্রবর্ত্তীর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ বনপলাশের পদাবলি। কাব্যগ্রন্থটি এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বিশ্বসাহিত্য ভবন থেকে প্রকাশিত হয়েছে। দুটি পর্বে বিভক্ত ‘অবলোকন’ প্রথম পর্ব আর দ্বিতীয় পর্ব ‘অনুভব’ নামে কবিতাগুলো সজ্জিত। জীবন-প্রকৃতি এবং সৌন্দর্য অনুভবে কবি তাঁর কবিতায় অনন্য-ভাষায় সুনিপুণ গাঁথুনিতে কবিতার শরীরে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছেন। যার ফলে কবিতা কথা বলে উঠেছে, পাঠকের আপন জিঞ্জাসার প্রতি উত্তর হয়ে কল্পনার বৃত্তে ভিন্নতর ব্যঞ্জনার আস্বাদ উপস্থাপন করেছে। সমকালীন কবিতা-চর্চার ধারাবাহিকতায় কবি তাঁর লেখনীর প্রমাণ রেখেছেন বাঙময় উপস্থাপনায়। প্রথম কবিতা ‘আবাহন ন জনামি’র দুটি পঙক্তি এক্ষেত্রে উপস্থাপন যোগ্য বলে মনে করছি-“কৃষ্ণ চূড়ার লালে রাঙা হয়ে ওঠো একত্রিত অদম্য প্রত্যয়, তৃষ্ণার্ত আশায় রাখ না সেই চোখ, অন্তর্লীনে অদম্য তৃষ্ণায়…!” কবির ‘জনান্তিকে’ কবিতায় প্রেম ভাবনা পাঠককে আলোড়িত করে যায় শিহরিত প্রেয়সীর অজ¯্র অপেক্ষা কল্পনায়-“আকাক্সিক্ষত চুম্বনের সেই ধ্বনি/ শুনে শুনে এখনও সময় কাটে, জীবনের নান্দীপাঠে তুমি এখনও সজাগ।” কবি তার প্রেমের বিরহকে এঁকেছেন প্রেমিকার ভালোবাসার গভীর উজ্জীবনে নতুনত্বের বিপুলতায়। আরও বলা যায় কূল ছাপিয়ে সে প্রেম যেন অপার অপেক্ষাতেও চির সবুজ চির অ¤øান। অপরদিকে সামাজিকতার প্রেক্ষাপটে মানবিকতার জয়গান মানবতার দাবীকে জোরালো ভাবে প্রকাশ করেছে ‘আমিও মানুষ’ কবিতায়-“যতই বলি আমিই সেরা/শিরের মাঝে শ্রেষ্ঠ শিরোস্ত্রাণ/আমরা সবাই মানুষ তোমার মতোই/ মাটির মাঝে মিশে যাওয়াই শেষ পরিণাম।” অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সাদা মন ও মননে মনুষ্যত্ববোধের সঠিক উপলব্ধি কবিকে মাটি ও মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যায়-“শুধু একটি কথা কই-/মন্দির আর মসজিদ ভাঙ্গো/ শ্রেষ্ঠত্বের দোহাই টানো/পুড়লে হৃদয় মানুষ আর/মানুষ থাকে কই?” নগরজীবনের বাসÍবিকতা গ্রামবাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে আড়াল করতে দেয়নি একান্ত পল্লীর পললিত শিল্পিত কবি মন। এ-প্রসঙ্গে কবির ‘রোদের পদাবলিতে’ কবিতায় গ্রাম বাংলার প্রকৃত রূপ যেন চিত্রিত হয়েছে অনন্য বর্ণিল বণার্য়ণে-“এখনও মালতী বনে ¯িœগ্ধ সন্ধ্যা নামে/পাটের জাগের মাঝে ভেসে ওঠে কৃষাণীর লাল পেড়ে শাড়ি/অথবা পাত পেড়ে ভাত খেয়ে আকাশ দেখার অবকাশ” এমন নির্মল সরস অনুভূতি আমাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শেকড়ের শুদ্ধ সন্ধানে।

ঘুণেধরা সমাজকে এঁকেছেন বিচিত্র ভাবনার তীর্যক আলোয়, যা পাঠক মনকে জাগিয়ে রাখে সচেতন মানসের আবহেÑ“তুমিও নষ্ট এখন আমি নিজেও হয়েছি নষ্ট/কী লাভ বলো: সত্য তোমায় ভালোবাসলেই কষ্ট!” কবি চক্রবর্ত্তী কবিতার রূপোলি বনে বনচড়–ই উড়িয়ে খুঁজে খুঁজে প্রাণ দিয়েছেন নির্মেঘ সমুজ্জ্বল আকাশ নির্মাণে। ‘বনপলাশের পদাবলি’ নাম কবিতায় যা প্রতিফলিত হয়েছে সুনিপুণ অনুভূতির রং তুলিতে- “প্রিয় কবিতা আমার, তোমাকে ছুঁয়ে দেখার তীব্র বাসনায় আজ/খোলা উঠোন লালন করছে আদুল আকাশ;শুধু একটু স্পর্শ দাও/নিবিড়তার মাঝে জড়ানো প্রত্যাশিত একান্ত হাতের প্রেমের সুবাতাস” অপর একটি পঙক্তিতে কবির ব্যাকুল মন কবিতার প্রেমেই যেন নিবিষ্ট তা পাঠক মাত্রই অনুভব করতে পারেন-“ব্যাকুল ভ্রমরের মতো আকাক্সক্ষা যেন গড়েছে প্রেমের মহল” অন্যদিকে রূপ-অরূপের সন্ধানে কবি আরও বেশি বিস্মিত যা স্বরূপের সন্ধানে কবিতায় প্রস্ফুটমান-“আমাতেই দেখি এক অপূর্ব বিস্ময়!/সাধীষ্ঠানে বিরাজিত নৃত্যরত অরূপ-রতন” কবি চক্রবর্ত্তী অপেক্ষাকে তুলে এনেছেন ঐতিহ্য আর অতীতের গভীর নিখাদ অনুভব দিয়ে-“রমণীর রোদে দেওয়া শাড়ীর মতোন; আমর অতীত আমার লজ্জিত ইতিহাস/ তুমিও অপেক্ষায় থেকো বেহুলার মতোন/কোমললোভনকান্তি মখমলে লালসালু, তুমিও অপেক্ষায় থেকো”
শার্ল বোদলেয়ারের আদর্শ কবির চিন্তা ও আঙ্গিক নির্মাণে অনুপ্রাণিত করেছে। যা কবিকে কবিতার সঠিক পথ নির্দেশনা দিয়েছে। এক নিমোর্হ নি:সঙ্গ নক্ষত্রলোকে কবি যেন তাঁর কবিতায় একান্তে সৃজন করে চলেছেন নিরালোকে বিচিত্র ভুবন। তাই বলা যায়, কবি অলোক কুমার চক্রবর্ত্তী বাংলা কবিতার জগতে প্রেম, প্রকৃতি ও জীবন-বীক্ষার কবিত্ব নিয়ে আগামী দিনে আলো ছড়াবেন নি:সন্দেহে।

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 7
    Shares