Home / লিড নিউজ / ‘বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে বন্দুকযুদ্ধের নামে আনিছকে হত্যা করা হয়েছে’

‘বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে বন্দুকযুদ্ধের নামে আনিছকে হত্যা করা হয়েছে’

ক্রাইম প্রতিদিন, সাতক্ষীরা : ‘আগের দিন পুলিশ বাড়িতে এসে হুমকি দিয়ে গেছে। পরদিন সন্ধ্যায় এসে তিন হাজার টাকাও নিয়ে গেছে। এর পরদিন তাকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে গিয়ে বন্দুকযুদ্ধের নামে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’

শুক্রবার দুপুরে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করে এসব অভিযোগ করেন বন্দুকযুদ্ধে নিহত সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার আনিছুর রহমানের স্ত্রী নাজমা খাতুন। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে নিহত আনিছুরের মেয়ে রিমা।

নাজমা খাতুন বলেন ‘আমার স্বামী আনিছুর রহমান গাজী ভাংড়ি লোহা লক্কড়ের ব্যবসা করতেন। একটি জুতোর দোকানও ছিল তার। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেটি ভেঙেচুরে দেয়া হয়। এরপর থেকে তিনি নদীতে মাছ ধরে ও নিজেদের একটি ঘেরে মাছ চাষ করে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। অথচ আমার স্বামীকে মাদক চোরাচালানি বানিয়ে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করা হয়েছে।’

উল্লেখ্য, ২৮মে রাতে চোরাচালানিদের দুই গ্রুপের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার পাকুড়িয়া গ্রামের আনিছুর রহমান গাজীর স্ত্রী নাজমা খাতুন।

ঘটনার পরদিন কলারোয়া থানার ওসি বিপ্লব কুমার নাথ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ২৮ মে রাত সোয়া ২টায় তার কাছে খবর আসে যে দেয়াড়া পিছলাপোলের মাঠে মাদক চোরাচালানিদের দুটি বিবদমান গ্রুপ মাদক ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি করছে। এ খবর পেয়ে খোরদো পুলিশ ক্যাম্পের এসআই সিরাজুল ইসলাম একদল পুলিশ সদস্য নিয়ে সেখানে পৌঁছে তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ তিন রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে।

ওসি আরও জানান, কিছুক্ষণ পর গোলাগুলি থেমে গেলে ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়। তার নাম আনিছুর রহমান (৪০)। কলারোয়ার পাকুড়িয়া গ্রামের সুরত আলির ছেলে সে। তার বিরুদ্ধে সাতক্ষীরা জেলায় ১০টি মাদক মামলা রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি ওয়ানশুটার গান জব্দ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

অপরদিকে কলারোয়ার খোরদো পুলিশ ক্যাম্পের এএসআই এজাজ মাহমুদ বলেন, এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আমি আনিছুরের বাড়ি যাইনি। আমি তাকে ধরিনি। এমনকি টাকাও নেইনি। পরদিন তাকে চোখ বেঁধে তুলেও আনিনি। এসব অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা।

নাজমা খাতুন অভিযোগ করেন, ২৭ মে রোববার খোরদো পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই এজাজ মাহমুদ তার বাড়িতে এসে বলে যান আনিছকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। ওই দিন রাতে দেয়াড়া বাজার থেকে বাড়ি ফেরার সময় স্বামী আনিছুরের কাছ থেকে ওই এএসআই তিন হাজার টাকাও নেন এবং বলেন বিষয়টি তিনি মিটমাট করে দেবেন।

তিনি জানান, ২৮ মে সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে খোড়দো পুলিশ ফাঁড়ির সেই এএসআই এজাজ মাহমুদ ও এএসআই তরিকুল ইসলামসহ চারজন সাদা পোশাকধারী পুলিশ মোটরসাইকেলযোগে তাদের বাড়িতে আসেন। ঘরে শুয়ে থাকা স্বামী আনিছকে তারা হাতকড়া পরিয়ে বাইরে এনে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি দিয়ে চোখ বেঁধে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে চলে যায়। এই দৃশ্য খোড়দো বাজারের লোকজন এবং পাড়া প্রতিবেশীরা প্রত্যক্ষ করেছেন।

নাজমা খাতুন বলেন, স্বামীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরপরই খোড়দো ক্যাম্পে গিয়ে খোঁজ নেয়া হলে তারা বলেন, আমরা আনিছুরকে ধরিনি। কলারোয়া থানায় গেলেও একই কথা বলে পুলিশ। সন্ধ্যা নাগাদ খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে কলারোয়া রিপোর্টার্স ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করতে যাই। কিন্তু তারা বলেন, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে যেতে। রাতে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে যাওয়ার পর সভাপতি বলেন, থানায় জিডি করতে এবং পরদিন সকালে সাতক্ষীরায় আসতে।

নাজমা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি রাত সাড়ে ৯টার দিকে জিডি করতে কলারোয়া থানায় গেলে ওসি বিপ্লব কুমার নাথ তা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন ‘দুই-তিন দিন অপেক্ষা করুন’।

তবে ওই জিডিতে নাজমা খাতুন পুলিশকে দোষারোপ না করে বলেন ‘সকাল ১০টার দিকে ২-৩ জন অজ্ঞাতব্যক্তি আমার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। এরপর আমার স্বামী আর ফিরে আসেননি। এ বিষয়ে থানায় জিডি এন্ট্রি করা হোক’।

নাজমা খাতুন আরও বলেন, রাত ১২টার দিকে আবারও স্বামীর খোঁজে থানায় গেলে পুলিশ আমাদের ঢুকতে দেয়নি। ২৯ মে সকালে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছ থেকে মোবাইল ফোনে জানতে পারি আমার স্বামীর মৃত্যুর খবর। এরপর কলারোয়া থানায় এসে স্বামী আনিছুরের গুলিবিদ্ধ মুখমণ্ডল বিকৃত লাশ দেখে চমকে উঠি।

এ ঘটনাকে মাদক ব্যবসার মালামাল ভাগাভাগি নিয়ে গোলাগুলির নাটক সাজিয়ে তাকে হত্যা করেছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমার সংসার তছনছ করে দিয়েছে পুলিশ’।

নাজমা খাতুন বলেন, পুলিশ তার স্বামীর নামে কমপক্ষে পাঁচটি মাদক মামলা দিয়েছে। এসব মামলায় প্রতিবার দুই আড়াই মাস করে চারবার জেলও খেটেছেন। মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে জিআর ২৮৬/১০ ( তারিখ ১১.১০.২০১০)। এই মামলায় ১০৬ বোতল ফেনসিডিলসহ আটক শাহারুল ও মোহাম্মদ আলীর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আনিছুরকে কলারোয়ার ইলিশপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। দ্বিতীয় মামলা জিআর ৮৭/১৬ (তারিখ ২৭.০৩.২০১৬)। এই মামলায় উলুডাঙা গ্রামের একটি গভীর নলকূপ এলাকা থেকে ইয়াবা সেবনরত অবস্থায় ৫০ পিস ইয়াবাসহ আনিছুরসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়।

আরেক মামলা জিআর ৭৭/২০১৬ ( তারিখ ১৫.০৩.২০১৬)। এক্ষেত্রে ৫০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার মুক্তার গাজির স্বীকারোক্তি অনুযায়ী গ্রেফতার করা হয় আনিছুরকে। আরেকটি মামলা জিআর ২৬৪/১৭ (তারিখ ১৭.০৬.১৭)। কলারোয়ার পাকুড়িয়া গ্রামের আমজাদের বাড়ির কাছ থেকে ১০ পিস ইয়াবাসহ আনিছুরকে গ্রেফতার করা হয়।

এছাড়া জিআর ২৭/১৮ (তারিখ ২৯.০১.১৮) তারিখে ২৪ পিস ইয়াবাসহ পাকুড়িয়া গ্রামের জামে মসজিদের কাছ থেকে আনিছুরকে গ্রেফতার করা হয়।

এ মামলা প্রসঙ্গে আনিছুরের স্ত্রী বলেন, আনিছুরকে ধরে নিয়ে থানার মধ্যে ফেলে তার কাছে এই ইয়াবা দেয় পুলিশ।

সংবাদ সম্মেলনে এসব মামলার বিষয়বস্তু তুলে ধরে নাজমা খাতুন দাবি করেন, কোথাও ফেনসিডিল বা ইয়াবা ধরা পড়লেই পুলিশ সেই মামলার সঙ্গে তার স্বামীকে জড়িয়ে দেয়। এসব মামলায় তিনি কমপক্ষে চারবার জেল খেটেছেন। প্রতিবারে দুই থেকে আড়াই মাস পর্যন্ত জেলে ছিলেন তিনি। তিনি বিএনপির একজন সমর্থক।

তবে এ প্রসঙ্গে খোরদো পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই সিরাজুল ইসলাম বলেন, আনিছুর, তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে সবাই ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের বারবার বলা হয়েছে মাদক কারবার ছাড়তে।

মাদকের বিষয়ে সরকারের জিরো টলারেন্স উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আনিছুর কলারোয়ার কুশোডাঙ্গা ইউনিয়নের পিছলাপোল মাঠে দুই গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। এর সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পর্ক নেই।’

নাজমা খাতুন আরও বলেন, আনিছুরকে হত্যার পর তার দুই সন্তান সদ্য এসএসসি পাস করা রিয়াজুল ইসলাম ও অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া রিমা খাতুনের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে গেল।

নাজমা খাতুন বলেন, আমার স্বামী কোনো অপরাধ করে থাকলে প্রচলিত আইনে তার বিচার হতে পারত। কিন্তু পুলিশ মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যে বীভৎস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা মেনে নেয়া যায় না। আমি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন নিহত আনিসুরের বড় ভাই ওজিয়ার রহমান, তার স্ত্রী ফরিদা খাতুন, আনিছুরের মেয়ে রিমা ও ছেলে রিয়াজুল।

Print Friendly, PDF & Email

এই মুহূর্তে অন্যরা যা পড়ছে