Home / এক্সক্লুসিভ / যে ৬ কারণে রক্তাক্ত পার্বত্য অঞ্চল

যে ৬ কারণে রক্তাক্ত পার্বত্য অঞ্চল

ক্রাইম প্রতিদিন, ডেস্ক : আবারও রক্ত ঝরেছে পাহাড়ি এলাকায়। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় আক্রমণকারীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন তিনজন। স্থানীয় পুলিশ নিহতদের ইউপিডিএফের কর্মী বলে নিশ্চিত করেছে।

গত কয়েক মাস ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রামে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।

এর আগে নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান হত্যাকাণ্ড এবং তার পরদিনই তার শেষকৃত্যে যাওয়ার পথে আরও পাঁচজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এসব হত্যাকাণ্ডের পর পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন করে উত্তেজনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতির জন্যে অনেকেই সরকারকে দায়ী করছেন।

তারা বলছেন, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। আবার অনেকে দাবি করছেন, ক্ষমতা ও সম্পদ নিয়ন্ত্রণে পাহাড়ি সংগঠনগুলোর দ্বন্দ্বে এ রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

এখানে এ রকম ৯টি কারণের কথা উল্লেখ করা হলো:

১. শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন:

দীর্ঘ সশস্ত্র লড়াই এরপর পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি বাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের শান্তিচুক্তি সই হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর। তারপর অতিক্রান্ত হয়েছে ২০ বছরেরও বেশি সময়।

কিন্তু এই চুক্তির কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে সেটা নিয়ে আছে বড় ধরনের বিতর্ক। সরকার পক্ষ বলছে, বাস্তবায়নের কাজ চলছে। কিন্তু পাহাড়িদের অভিযোগ- চুক্তিতে তাদের যেসব অধিকার দেয়ার কথা বলা হয়েছিল তার কিছুই তারা এখনও পায়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম গবেষক ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, পাহাড়িদের স্বশাসন দেয়ার কথা ছিল। কথা ছিল যে তারা নিজেরাই নিজেদের শাসন করবে। কিন্তু সে রকমটা হয়নি। তাদের অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা ছিল কিন্তু সেসব বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে একটা হতাশা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে সরকারের সঙ্গে এই চুক্তি হয়েছিল, বর্তমানে ক্ষমতাসীন সেই সরকারের দাবি- চুক্তির অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

যেসব এখনও হয়নি সেগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়নের কাজ চলছে। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, সরকার এটাকে দেখছেন শুধুমাত্র প্রশাসনিকভাবে।

সঞ্জীব দ্রং বলেন, চুক্তি অনুসারে একটি মন্ত্রণালয় হওয়ার কথা, মন্ত্রণালয় হয়েছে। আঞ্চলিক পরিষদ হওয়ার কথা, সেটা হয়েছে। ভূমি কমিশন গঠনের কথা ছিল, সেটাও গঠিত হয়েছে। কিন্তু এসব তো কোনো কাজই করতে পারছে না। তাহলে এসব হয়ে লাভটা কি হলো?

তারা বলছেন, পাহাড়িরা তাদের কথা রেখেছে। অস্ত্র সমর্পণ করেছে। চুক্তি করেছে। তারপর ফিরে এসেছে স্বাভাবিক জীবনে। কিন্তু সরকারের দিক থেকে যতটা আন্তরিকতা ও সাহসের সঙ্গে অগ্রসর হওয়ার কথা ছিল তারা সেটা করেনি।

২. আঞ্চলিক ও পার্বত্য পরিষদের নির্বাচন:

শান্তিচুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৭ সালের পরের বছরই গঠিত হয়েছিল আঞ্চলিক পরিষদ। এবং বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি- এই তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ।

কিন্তু তারপর থেকে গত দুই দশকে এসব পরিষদে একবারেরও জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। শুরুতে যাদের সেসব পরিষদে বসানো হয়েছিল তারাই এখনও এসবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

এসব পরিষদের নির্বাচন হওয়ার কথা স্থানীয় ভোটারদের হাতে। কিন্তু সেই ভোটারদের তালিকাও তৈরি হয়নি। কারা ভোটার হবেন এবং কারা হবেন না- এ নিয়েও রয়েছে বিরোধ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আমেনা মহসিন বলেন, নতুন করে গঠিত এসব প্রতিষ্ঠানের কার কি ক্ষমতা, সেটা স্পষ্ট নয়। তাদের কাছে ক্ষমতাও পূর্ণ হস্তান্তর হয়নি। সরকারের দিক থেকে একরকম কথা বলা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আবার এসব প্রতিষ্ঠানের নেতারা বলছেন অন্য কথা। সেখানে আগে থেকে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে আসছিল সেগুলোর সঙ্গে এসব নতুন প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক ও আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

৩.ভূমি সমস্যা:

পার্বত্য চট্টগ্রামে জমির মালিকানা নিয়ে আছে বিশেষ কিছু আইন। ব্রিটিশ আমলের সেসব আইন অনুসারে ভূমির মালিকানা প্রথাগতভাবে সেখানে যারা বসবাস করে আসছে সেসব পাহাড়ি মানুষের।

এসব ভূমির মালিকানার কোনো দলিলপত্র নেই তাদের কাছে। কিন্তু পরে বাঙালিদের যখন সেখানে নিয়ে গিয়ে তাদের জন্যে বসতি গড়ে দেয়া হলো তখন শুরু হলো ভূমি নিয়ে বিরোধ। এটিকে দেখা হয় সঙ্কটের মূল কারণ হিসেবে।

আমেনা মহসিন বলেন, শান্তিচুক্তির মধ্যেই অনেক সমস্যা ছিল। চুক্তিতে ভূমি কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে কিন্তু সেখানে বাঙালি সেটেলারদের কথার কোনো উল্লেখ ছিলো না। কিন্তু এদের কারণেই তো ভূমি নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য ২০০১ সালে গঠিত হয়েছিল ভূমি কমিশন। কিন্তু গত ১৭ বছরে তারা একটি বিরোধেরও নিষ্পত্তি করতে পারেনি। শুরুতে যে আইন তৈরি করা হয়েছিল সেটা নিয়েও ছিলো অনেক সমস্যা।

দেড় দশক পাল্টাপাল্টি বিতর্কের পর সেই আইনের সংশোধন হয়েছে ২০১৬ সালে। কিন্তু সেই আইন কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তার জন্যে যেসব রুলস বা বিধিমালার প্রয়োজন সেগুলো এখনও তৈরি হয়নি।

সঞ্জীব দ্রং বলেন, এই আইন সংশোধন হতেই লেগে গেল ১৫ বছর। বিধিমালা হলো না এখনও। এ থেকে বোঝা যায় যে ভূমি কমিশন কার্যকর করার ব্যাপারে সরকার কতটা আন্তরিক।

৪. পাহাড়িদের বিভেদ:

শান্তিচুক্তি হওয়ার পর থেকে গত ২০ বছর পাহাড়িদের সংগঠনগুলো নানা ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে প্রায়শই সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায় এবং তাতে খুনোখুনির ঘটনাও ঘটছে।

চুক্তি হয়েছিল সন্তু লারমার নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বা পিসিজেএসএস সংগঠনের।

২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই সংগঠন থেকে সিনিয়র কিছু নেতা বের হয়ে গঠন করেন আরো একটি গ্রুপ- পিসিজেএসএস- এম এন লারমা।

১৯৯৭ সালেই চুক্তির বিরোধিতা করে তৈরি হয়েছিল ইউপিডিএফের। সম্প্রতি সেটাও ভেঙে গঠিত হয়েছে নতুন আরেকটি গ্রুপ- ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক।

অনেকে মনে করেন, চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ার হতাশা থেকে এসব সংগঠন ভেঙে যাচ্ছে। যেমনটা মনে করেন সঞ্জীব দ্রং। তিনি বলেন, ২০ বছর দীর্ঘ সময়। কারো কারো জন্যে এই সময়টা হয়তো অতো বেশি কিছু নয় কিন্তু যারা অপেক্ষায় থাকে তাদের জন্যে এটা একটা দীর্ঘ সময়। যদি চুক্তি বাস্তবায়িত হতো তাহলে হয়তো এ রকম হতো না।

৫.বাঙালিদের বসতি ও অবিশ্বাস:

সত্তরের দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দরিদ্র লোকজনকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। শুরু হয় জিয়াউর রহমানের শাসনামলে।

বলা হয় মোট পাঁচ লাখের মতো বাঙালিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের আমলেই নেয়া হয়েছিল চার লাখের মতো।

সেই সংখ্যা এখন বেড়ে কত হয়েছে তার হিসেব পাওয়া যায়নি। তবে গবেষকরা বলেন, চার দশকেরও বেশি সময় পর পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি ও বাঙালির সংখ্যা এখন প্রায় সমান সমান।

এই বাঙালিদের বলা হয় সেটেলার। প্রত্যেককে পাঁচ একর করে জায়গা দেয়ার কথা বলে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাদের ওপর একের পর এক হামলার পর তাদের জন্যে আলাদা করে তৈরি করা হয়েছে গুচ্ছগ্রাম। পরে গুচ্ছগ্রামেও হামলা হয়েছে। তাদের মধ্যে অবিশ্বাসও প্রকট।

বাঙালিদের সংগঠনের দাবি পাহাড়িদের সংগঠন নিষিদ্ধ করা হোক। আর পাহাড়িদের দাবি এসব বহিরাগত বাঙালিদের সরিয়ে তাদের যেখান থেকে আনা হয়েছে সেখানে তাদের ‘সম্মানজনকভাবে’ পুনর্বাসন করা হোক।

আমেনা মহসিন বলছেন, বর্তমানে যে ব্যবস্থায় সবকিছু চলছে তাতে সেখানে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে আস্থা তৈরি হওয়া সম্ভবও নয়। এখানে হয়তো নানা ধরনের এনজিও কাজ করছে। তারা পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে বৈঠক করাচ্ছে। এভাবে বৈঠক করিয়ে তো আর আস্থা তৈরি করা যায় না।

৬.পিছিয়ে পড়া উন্নয়ন ও দুর্গম এলাকা:

অনেকেই বলেন, সারা দেশে যেভাবে উন্নয়ন হয়েছে সেভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন হয়নি। দুর্গম এলাকা হওয়ার কারণে উন্নয়নের জন্য সেখানে যে বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করার কথা ছিল সে রকমও হয়নি।

সারা দেশে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে সেই নেটওয়ার্ক হয়েছে বহু বহু বছর পরে। অনেক জায়গাতে এখনও নেটওয়ার্ক নেই। মোবাইল ফোনের কথাবার্তাতেও আড়িপাতার অভিযোগ রয়েছে।

সঞ্জীব দ্রং বলেন, অনেক কিছুর বেলাতেই একটা জিনিস খেয়াল করবেন- বলা হয় যে বাংলাদেশের ৬১টি জেলাতেই আছে কিন্তু তিনটি জেলাতে নেই এবং সেই তিনটি জেলা হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা। সেই হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম তো অবশ্যই অবহেলিত।

আমেনা মহসিন বলছেন, অনেক ধরনের উন্নয়নকাজ হচ্ছে। সেসব ঠিক আছে কিন্তু এসব কতটা পাহাড়ি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের মতামতের ভিত্তিতে হচ্ছে সেটা নিয়ে একটা বড় প্রশ্ন তো আছেই।

অস্থিরতার পেছনে আরো একটি কারণ হচ্ছে এর ভৌগোলিক অবস্থান। প্রত্যন্ত, দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকা হওয়ার কারণে নিরাপত্তা বাহিনী খুব দ্রুত ও সহজে সেখানে পৌঁছাতে পারে না।

গত কয়েক বছরে ওই এলাকায় অনেক রাস্তাঘাট হয়েছে। তৈরি হয়েছে নতুন নতুন সেতুও, বিশেষ করে বান্দরবানে। সাজেকের মতো দুর্গম এলাকাতেও তৈরি হয়েছে পর্যটনকেন্দ্র।

কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনও এ রকম দুর্গম জায়গা রয়ে গেছে যেখানে যেতে হয় হেঁটে এবং সেসব জায়গায় পৌঁছাতে দু’তিন দিনও লেগে যেতে পারে। -বিবিসি বাংলা অবলম্বনে।

Print Friendly, PDF & Email