Home / এক্সক্লুসিভ / যৌতুকের জন্য গৃহবধূকে গাছে বেঁধে মধ্যযুগীয় নির্যাতন

যৌতুকের জন্য গৃহবধূকে গাছে বেঁধে মধ্যযুগীয় নির্যাতন

ক্রাইম প্রতিদিন, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে যৌতুক না দেওয়া, ছেলেসন্তান না হওয়া এবং স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের প্রতিবাদ করায় মাহফুজা খাতুন (৩২) নামে এক গৃহবধূকে মারধরের পর গাছে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয়েছে। শনিবার (১৭ মার্চ) দুপুরে কালীগঞ্জ উপজেলার রতনপুর ইউনিয়নের আড়ংগাছা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। গৃহবধূকে উদ্ধার করে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে পুলিশ দুই নারীকে গ্রেপ্তার করেছে।

নির্যাতিত মাহফুজা শ্যামনগর উপজেলার দক্ষিণ হাজীপুর গ্রামের আব্দুল গফফারের মেয়ে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন আড়ংগাছা গ্রামের আব্দুল মজিদ তরফদারের স্ত্রী গৃহবধূর ননদ মাছুমা বেগম (৩০) ও দেবর মহিবুল্লাহ গাজীর স্ত্রী মর্জিনা বেগম (২৫)।
চিকিৎসাধীন মাহফুজা খাতুন জানান, ২০০৪ সালে তার সঙ্গে আড়ংগাছা গ্রামের আব্দুল্লাহ গাজীর ছেলে অহিদুল্লাহ গাজীর বিয়ে হয়। বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা, দুটি গরু ও চার ভরি সোনার গহনা দেওয়া হয়। বিয়ের পর তাদের ঘরে তাউশি (১৩) ও টুন্নি (৮) নামের দুটি মেয়েসন্তান হয়। তাউশি কদমতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। টুন্নি নূরানী প্রি-ক্যাডেট স্কুলে কেজি ওয়ানের ছাত্রী।

মাহফুজা খাতুনের অভিযোগ, বাপের বাড়ি থেকে যৌতুকের টাকা আনতে অপারগতা প্রকাশ করা এবং ছেলেসন্তান জন্ম দিতে না পারায় স্বামী, শাশুড়ি, ননদ, দেবর ও তাদের স্ত্রীরা তার ওপর প্রতিনিয়ত নির্যাতন চালাতেন। ১১ ফেব্রুয়ারি তাকে টাকা আনতে বাপের বাড়িতে যেতে বলা হয়। আপত্তি করায় তাকে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন পিটিয়ে জখম করে।

খবর পেয়ে বাপের বাড়ির লোকজন তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে এক সপ্তাহ ভর্তি থাকার পর ছোট মেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়িতে আসেন তিনি। এর কয়েক দিন পর নুরনগর ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে একটি তালাকনামা পাঠানো হয়। তিনি তা না নিয়ে সাতক্ষীরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্বামী, শাশুড়ি, ননদ ও তার স্ত্রীসহ সাতজনের নামে মামলা দায়ের করেন। বিচারক হোসনে আরা আক্তার মামলা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য উপজেলা চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ২৩ ফেব্রুয়ারি তার ভাই বাবলুর রহমানকে নিয়ে সাতক্ষীরা পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ করলে তিনি শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দেন। তদন্ত কর্মকর্তা শ্যামনগর থানার উপপরিদর্শক লিয়াকত আলী তিনবার নোটিশ করেও নির্যাতনকারীদের থানায় হাজির করাতে পারেননি। এরই মধ্যে অহিদুল্লাহ গোপনে শ্যামনগরের সালমা খাতুন নামের এক মেয়েকে বিয়ে করেন। ঘটনার দিন শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ছোট মেয়ে টুন্নিকে নিয়ে স্বামীর বাড়িতে যান মাহফুজা। যাওয়ামাত্রই ঘরের মধ্যে ঢুকে তার স্বামীর নতুন স্ত্রী সালমাকে দেখতে পান। এ সময় স্বামী অহিদুল্লাহ, শাশুড়ি মনোয়ারা, দেবর মহিবুল্লাহ, তার স্ত্রী মর্জিনা, ননদ মাসুমা বেগম, ননদের স্বামী আব্দুল মজিদ তরফদার তাকে মারপিট শুরু করেন। তাকে রক্ষায় এগিয়ে গেলে ছোট মেয়ে টুন্নিকে লাথি মেরে ফেলে দেন তারা। একপর্যায়ে তিনি জীবন বাঁচাতে একটি ঘরের মধ্যে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। দরজা না খোলায় স্বামীসহ অন্যরা শাবল দিয়ে জানালা ভেঙে তাকে টানতে টানতে বাইরে আনেন। এর পর স্বামীসহ অন্যরা তার বুকে ও শরীরের বিভিন্ন অংশে শাবল ও লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকেন। এমনকি মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলার পর তার দুহাত দড়ি দিয়ে বেঁধে উঠানে একটি সবেদা গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখেন। অব্যাহত নির্যাতনে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

খবর পেয়ে এসআই সোহরাব হোসেন ও মাহফুজার বড় ভাই বাবলুর রহমান দুপুরে তাকে উদ্ধার করে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। কালীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. শারমিন আক্তার জানান, মাহফুজার বাম হাতের আঙুলে, ঘাড়ে, পিঠে, স্তন, পাছা, তলপেট ও জরায়ুতে ভারী জিনিস দিয়ে আঘাত করা হয়েছ। রক্তক্ষরণ হচ্ছে জরায়ু থেকে।

কালীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক সোহরাব হোসেন জানান, মাহফুজাকে নির্যাতনের অভিযোগে তার ভাই লাভলু মোল্লা বাদী হয়ে ভগ্নিপতি ও তাদের পরিবারের সাতজনের নামে মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে এজাহারভুক্ত আসামি মাসুমা খাতুন ও মর্জিনা খাতুনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আরও পড়ুন.......

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 32
    Shares