সংবাদ শিরোনাম
Home / এক্সক্লুসিভ / ৪ বছর পর দাফন করা হলো লাইজুর মরদেহ

৪ বছর পর দাফন করা হলো লাইজুর মরদেহ

ক্রাইম প্রতিদিন, ডেস্ক : দীর্ঘ ৪ বছর হিমঘরে থাকা হিন্দু থেকে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত নীলফামারীর হোসনে আরা লাইজুর (নীপা রানী রায়) মরদেহ ইসলামিক রীতি অনুযায়ী আজ দাফন করা হবে।

শুক্রবার বেলা সোয়া ১১টায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘর থেকে লাইজুর মরদেহ তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নীলফামারীর ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতেমার উপস্থিতিতে নীপার মরদেহ গ্রহণ করেন তার শ্বশুর জহুরুল ইসলাম।

এসময় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অজয় কুমার ও ডোমার থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) ইব্রাহীম খলিল উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে গত ১২ এপ্রিল হাইকোর্টের বিচারপতি মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরীর একক বেঞ্চ ইসলামিক রীতি অনুযায়ী লাইজুর মরদেহ দাফনের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি হোসনে আরা লাইজুর দাফনের পূর্বে তার (লাইজু/নীপা) পরিবারকে (মা-বাবাকে) দেখার সুযোগ করে দিতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেয়া হয়।

মরদেহ গ্রহণের পর লাইজুর শ্বশুর জহুরুল ইসলাম বলেন, লাইজুর জানাজার নামাজ শেষে আজ বিকেল ৫টায় তার নিজ গ্রামে ছেলে হুমায়ুন ফরিদ লাজুর কবরের পাশে সমাহিত করা হবে।

জানা যায়, নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বামুনিয়া ইউনিয়নের খামার বমুনিয়া গ্রামের অক্ষয় কুমার রায়ের মেয়ে নীপা রানী রায়ের সঙ্গে একই উপজেলার পূর্ব বোড়াগাড়ী গ্রামের জহুরুল ইসলামের ছেলে হুমায়ুন ফরিদ লাজু প্রেমের সম্পর্কের জেরে ২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর পালিয়ে যান। এরপর নীপা রানী রায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মোছা. হোসনে আরা বেগম লাইজু নাম নেন। নীলফামারী নোটারি পাবলিক ক্লাবের মাধ্যমে অ্যাভিডেভিটে দুই লাখ ১ হাজার ৫০১ টাকা দেনমোহরে হুমায়ুন ফরিদ লাজুকে বিয়ে করেন তিনি।

এদিকে অক্ষয় কুমার রায় ২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবর বাদী হয়ে নীলফামারী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। মামলার পর স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ের সকল কাগজপত্রসহ আদালতে হাজির হয়ে জবানবন্দী প্রদান করেন লাইজু। পরে আদালত সার্বিক বিবেচনায় অপহরণ মামলাটি খারিজ করে দেন।

তবে মেয়ের বাবা মামলার খারিজ আপিলে তার মেয়েকে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও মস্তিষ্কবিকৃত (পাগল) দাবি করে আদালতে কাগজপত্র দাখিল করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে মেয়েটির শারীরিক পরীক্ষার জন্য রাজশাহী সেফ হোমে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন।

পরে ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারি হুমায়ূন ফরিদ ওরফে লাজু বিষপান করে আত্মহত্যা করেন। এরপর লাজুর আত্মহত্যার বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করে মেয়ের বাবা মেয়েকে (নীপা রানী ওরফে মোছা. হোসনে আরা বেগম লাইজু) নিজ জিম্মায় নিতে আদালতে আবেদন করেন। আদালত তা মঞ্জুর করলে ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি মেয়েকে নিয়ে বাবা তার বাড়িতে নিজ জিম্মায় রাখেন। তবে মেয়েকে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও মস্তিস্কবিকৃত (পাগল) দাবি করে আদালতে আগে যে মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল সেটি চলমান থেকে যায়।

এদিকে ২০১৪ সালের ১০ মার্চ কীটনাশক পান করেন লাইজু। পরে তাকে ডোমার উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি করা হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঘটনার দিন রাত ৮টার দিকে তিনি মারা যান। ডোমার থানা পুলিশ হাসপাতাল থেকে মেয়েটির মরদেহ রাতেই উদ্ধার করে। পরদিন (১১ মার্চ) নীলফামারী জেলার মর্গে লাইজুর মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়।

এরপর পুত্রবধূ দাবি করে তার শ্বশুর জহুরুল ইসলাম ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক লাইজুর দাফন ও বাবা অক্ষয় কুমার রায় হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে মেয়ের সৎকারের জন্য নীলফামারী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করেন। আদালত উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে লাইজুর মরদেহ তার শ্বশুরের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেন।

এদিকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তার আদেশে লাইজুর মরদেহ শ্বশুরের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দিলেও সে আদেশের বিরুদ্ধে লাইজুর বাবা আপিল করেন। ফলে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নীপার মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরেই থেকে যায়।

এরপর জজ আদালত লাইজুর মরদেহ তার বাবার কাছেই হস্তান্তরের নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করেন লাইজুর শ্বশুর। পরে গত ১২ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) সেই আবেদনের নিষ্পত্তি করে আদালত ইসলামিক রীতি অনুযায়ী লাইজুর মরদেহ দাফনের আদেশ দেন।

Print Friendly, PDF & Email