Home / এক্সক্লুসিভ / ৯৯ ভাগ শিল্প-কারখানায় নেই পরিবেশগত ছাড়পত্র

৯৯ ভাগ শিল্প-কারখানায় নেই পরিবেশগত ছাড়পত্র

ক্রাইম প্রতিদিন, ডেস্ক : বর্তমানে দেশের ছোট বড় শিল্প-কারখানা ও অর্থনৈতিক ইউনিটের সখ্যা প্রায় ৮৩ লাখ। এর মধ্যে মাত্র ৪৯ হাজার ৯৬৭টির অনুকূলে পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েছে শিল্প-কারখানার মালিকরা। অর্থাৎ দশমিক ৬০ শতাংশ কল-কারখানার ছাড়পত্র রয়েছে। বাকি ৯৯ দশমিক ৪০ শতাংশের ক্ষেত্রে পরিবেশগত কোনো ছাড়পত্র নেই। এসব কারণে কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যে পরিবেশ বিপর্যয় দিন দিন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, বর্তমানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় এমন শিল্প-কারখানা ও অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ৮৩ লাখ। অথচ পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ সংশোধনের পর ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৯ হাজার ৯৬৭টি শিল্প-কারখানা ও প্রকল্পের অনুকূলে পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় বলছে, অনেক বিভাগীয় শহরেও পরিবেশ অধিদপ্তরের অফিস নেই। তাছাড়া এ খাতে জনবলের সংকট রয়েছে তাই এ বিপুল সংখ্যক শিল্প-কারখানা ও প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র যথাসময়ে প্রদান এবং শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মনিটরিং কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব দেখভালের দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরকেই নিতে হবে। এ অধিদপ্তরের পর্যাপ্ত অফিস এবং লোকবল যদি না থাকে তাহলে সরকারকে অফিস ও লোকবলের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে পরিবেশ দূষণ সমস্যাটি বিশ্বব্যাপী গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। তাই এ বিষয়ে আরও গুরুত্বের সঙ্গে সরকারকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

‘পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় ও জেলা অফিসের সংখ্যা বাড়ানো এবং এ খাতে আরও জনবল প্রয়োজন’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন সম্প্রতি তৈরি করেছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশগত সমস্যা দিন দিন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। পরিবেশের সমস্যা মোকাবিলাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বর্তমান সরকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং উন্নয়নকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত দিয়েছে, যা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানের ১৮ (ক) অনুচ্ছেদ সংযোজন করেছে। ওই অনুচ্ছেদ মোতাবেক রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবে, জীববৈচিত্র্য জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণির নিরাপত্তা বিধান করবে। এতে বলা হয়েছে, দেশের পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিবেশগত মান উন্নয়ন, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রশমনে বাংলাদেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭সহ জারিকৃত বিভিন্ন বিধিমালার আওতায় পরিবেশ অধিদপ্তরের উপর ব্যাপক দায়িত্ব ও ক্ষমতা অর্পিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাতিসংঘের আওতায় প্রণীত পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত ২০টির অধিক কনভেনশন, প্রটোকল ও চুক্তিসমূহে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে অর্পিত বাধ্যবাধকতা প্রতিপালনে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে পরিবেশ অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিক রয়েছে। এছাড়া বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব মোকাবিলায় এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ (এসডিজি) অর্জনের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে অধিদপ্তরের কাজের কলেবর অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এর ১২ (১) ধারা মোতাবেক শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছ থেকে বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিবেশগত ছাড়পত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক। পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান প্রক্রিয়ায় প্রতিটি শিল্প-কারখানা ও প্রকল্প সরেজমিন পরিদর্শন এবং একইসঙ্গে দূষণ ব্যবস্থা কার্যকর কি না মনিটরিং করতে হয়। এছাড়া প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর প্রতিটি শিল্প-কারখানা ও প্রকল্পের তরল ও বায়বীয় বর্জ্যের নমুনা সংগ্রহণ ও তা গবেষণাগারে পরীক্ষা করে ফলাফল প্রদান করতে হয়, যার ভিত্তিতে পরিবেশগত ছাড়পত্র নবায়ন করা হয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ সংশোধনের পর ২০১০ সাল থেকে অদ্যাবধি প্রায় ৪৯ হাজার ৯৬৭টি শিল্প-কারখানা ও প্রকল্পের অনুকূলে পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান করা হয়েছে। ক্রমবর্ধমান শিল্পায়নের প্রেক্ষাপটে পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদন সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে পরিবেশগত ছাড়পত্রবিহীন শিল্প-কারখানা ও প্রকল্পের সংখ্যা। এ বিপুল সংখ্যক শিল্প-কারখানা ও প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র যথাসময়ে প্রদান এবং শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মনিটরিং কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য উপযুক্ত সংখ্যক জনবল প্রয়োজন যা বর্তমানে পরিবেশ অধিদপ্তরে নেই।

এতে উল্লেখ করা হয়, বিদ্যমান কাঠামোর আওতায় বর্তমানে পরিবেশ অধিদপ্তর অনুমোদিত ৭৩৫ জনবল নিয়ে সদর দপ্তরসহ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল বিভাগীয় বা আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ২১টি জেলা অফিস (ঢাকা, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর টাঙ্গাইল, মুন্সিগঞ্জ নরসিংদী, গাজীপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, কক্সবাজার, রংপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ নোয়াখালি, ফেনী এর মাধ্যমে সারাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নবসৃষ্ট রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয় না থাকায় এসব বিভাগ এবং জেলায় পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনা সম্ভব হচ্ছে না।

পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে দেশব্যাপী ৬৪টি জেলায় গড়ে ওঠা প্রায় ৬ হাজার ৮০০টি ইট ভাটা এবং যত্রতত্র বেআইনিভাবে গড়ে ওঠা আরও ১ হাজার ২০০ এর বেশি ইটভাটায় সৃষ্ট বায়ু দূষণ ও পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ এনফোর্সমেন্ট ও মনিটরিং জোরদার করা যাচ্ছে না। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর অফিস না থাকায় ৪৩টি জেলার জনগণকে পরিবেশ সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কাজে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে বিভাগীয় কার্যালয়ে আসতে হচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী, শিল্পোদ্যোক্তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা প্রদানের বাধ্যবাধকতা থাকলেও জনবলের অভাবে সময়মতো সেবা প্রদান করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি সেবার মান ও পরিমাণ অক্ষুণ্ণ রাখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক ও শিল্প উদ্যেক্তারা সব জেলায় পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা বিভিন্ন সময়ে অবহিত করেছেন। বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে ছাড়পত্র প্রদান বিষয়ক সেবা আরও তরান্বিত ও গণমুখী করার জন্য সময়াবদ্ধ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার স্বার্থে অফিস সম্প্রসারণ ও জনবল বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

বিষয়ে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী বলেন, ইতোমধ্যে শিল্প উদ্যোক্তাদের চাহিদামতো পর্যবেক্ষণ পূর্বক পরিবেশগত ছাড়পত্র দেয়ার জন্য বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রংপুর ও ময়মনসিংহে পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া যেসব জেলায় প্রয়োজন সেসব জেলায় অধিদপ্তরের অফিস ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সয়েল, ওয়াটার এন্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক শহীদ আক্তার হোসাইন বলেন, এতগুলো কল-কারখানায় পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকাটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। যেসব কল-কারখানা পরিবেশগত ছাড়পত্র না নিয়ে গড়ে উঠছে তারা তাদের বর্জ্য শোধন করছে কি না কেউ জানতে পারছে না। এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এর ফলে পানি, মাটি, শব্দ, বায়ু সবকিছুই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। পরিবেশকে তীব্রভাবে দূষিত করছে। এর ফলে জীববৈচিত্র্যের উপর মারাত্মকভাবে সংকট দেখা দিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কল-কারখানা থেকে নির্গত তরল বর্জ্যের গুণগত মান পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী বজায় থাকছে কি না তা নিয়মিত মনিটর করা প্রয়োজন। আর এসব দেখভালের দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। এ অধিদপ্তরের পর্যাপ্ত অফিস এবং লোকবল যদি না থাকে তাহলে সরকারকে অফিস ও লোকবলের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে পরিবেশ দূষণ সমস্যাটি বিশ্বব্যাপী গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। তাই এসব বিষয়ে আরও গুরুত্বের সঙ্গে সরকারকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

আরও পড়ুন.......

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন
  • 17
    Shares