// ফাহমিদা হামিদ //
মেয়ের নতুন স্কুলের কালচারাল প্রোগ্রামে এসে খুব এনজয় করছিল অবন্তি। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের চমৎকার চমৎকার সব পারফরমানেন্স দেখে অভিভুত। কখনো হেসে গড়িয়ে পড়ছিলো আনন্দে।
পাশে বসা ভদ্রমহিলা বারবারই খেয়াল করছিলেন অবন্তিকে। কেমন যেন চেনা চেনা একটা হাসি।
অথচ মনে করতে পারছে না অবন্তি কে ইনি?
বেশ কবার চোখাচোখি হতেই ভদ্রমহিলা মিষ্টি করে হাসলেন,বললেন
—– বাচ্চাগুলোর অসাধারণ পারফরমেন্স তাই না?
অবন্তি মাথা নাড়লো
—— সত্যিই তাই।
তারপর হঠাৎ করেই অবন্তিকে অবাক করে দিয়ে বললেন,
—— আপনি অবন্তি?
ভীষন অবাক হয়ে তাকালো অবন্তি ভদ্রমহিলার দিকে। আজকের আগে কখনও দেখা হয়েছে বলেতো মনে পড়ছে না। এ শহরে স্বামীর বদলীর চাকরীর সুবাদে তিন মাস হলো আসা। মেহরীনের আম্মু, ম্যাডাম,মিসেস মেসবাহ, ভাবী, আন্টি এসবের বাইরে তার যে একটা সুন্দর নাম আছে তাতো প্রায় ভুলতেই বসেছিল অবন্তি। তাও আবার অপরিচিত শহরে অচেনা মহিলার মুখে।
কৌতুহলি চোখে তাকিয়ে বলে ওঠলো,
——কিন্তু আ প নি ? চিনতে পারছি নাতো।
—— আমাকে চিনবার কথাও নয় আপনার।
—— তাহলে আপনি আমার নাম জানলেন কি করে?
—— সেতো অনেক বড় কাহিনী। আমি অনেক দিন থেকেই আপনার নাম জানি। এবং খুঁজে ফিরি ।
এতক্ষনে অবন্তির একটু রাগ হলো। কি অদ্ভুত এই মহিলা। নিজের পরিচয় না দিয়ে শুধু হেঁয়ালি করে চলেছে।
—— আপনি কিন্তু এখনও বললেন না আপনার পরিচয়।
মহিলার হাসিতে রহস্য ঘেরা। বললেন,
—– পরিচয়তো অবশ্যই বলবো। তবে একটু ধৈর্য্য ধরতে হবে। ভয় পাবেন না। আমি এ স্কুলেরই টিচার,প্রভাতী শাখার। দিলারা বেগম। অনুষ্ঠানে কলিগদের সারিতেই বসেছিলাম, হঠাৎ আপনাকে দেখে আপনার কাছেই এগিয়ে এসেছি নিশ্চিত হতে। প্রথম দেখেছিলাম স্কুলে মেয়েকে যেদিন ভর্তি করাতে নিয়ে এসেছিলেন আপনার সাহেবের সাথে। আর কি আশ্চর্য জানেন, আপনাকে এক পলক দেখেই মন বলছিলো, আপনি অবন্তি। সেই টানা চোখ, টিকালো নাক, এমন কি ভ্রুর পাশে কালো তিলটা পর্যন্ত।
খুব ইচ্ছে করছিলো তক্ষুনি সামনে গিয়ে পরিচিত হতে। কিন্তু আপনার সাহেব সংগে থাকার কারনে নিজেকে সামলে নিলাম। ভাবলাম সবেতো এলেন এ শহরে। একা যখন পাবো, ঠিক আলাপ সেরে নিবো।
তারপর একটু থামলেন। বললেন,
—-আমার উপযাচকতায় বিরক্ত হবেন না প্লিজ। শুধু অনুরোধ করবো, ভুল বুঝবেন না আমাকে। উৎস আমার শাশুড়িমা। আমার বিশ্বাস আপনাকে দেখলে উনি খুশি হবেন নিশ্চিত। যদিও তিনি স্বাভাবিক জীবনে নেই। বয়স হয়েছে,শারীরিক সমস্যা কত শত, মনটা ভালো না রাখতে পারলে কি নিয়ে বাঁচবেন বলেন?
অবন্তি ঠিক বুঝতে পারছে না, জবাবে কি বলা উচিত তার। তবু বললো,
—— কে উনি? আপনার শাশুড়িমা বুঝি আপনাদের সাথেই থাকেন?
ম্লান হাসলেন দিলারা। মাথা নাড়লেন মৃদু।
—– জ্বি একসাথেই থাকি আমরা। তবে আমি শাশুড়িমার কাছে নাকি শাশুড়ি মা আমার কাছে, জানি না।
অবন্তি ধীরে ধীরে কেমন যেন ঘোরের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষন আগের অজানা অচেনা দিলারাকে কেন জানি ভালো লাগতে শুরু করেছে। মমতাময়ী মনে হচ্ছে।
এরমধ্যে মেহরীন এসে ম্যাডামকে মায়ের সাথে কথা বলতে দেখে অবাক চোখে ম্যামকে সালাম দিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলো,
——- মা, তুমি আমাদের ম্যামকে চিনো? আমাদের বাংলা ক্লাশ নেন।
ম্যাম মেহরিনের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন
—— নিজে নিজেই তোমার মায়ের সাথে পরিচয় করে নিলাম।
বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন এবার দিলারা,
—– আবার দেখা হবে। ভালো থাকবেন অবন্তী।
মেহরিন দ্বিগুন অবাক হয়ে বললো মাকে,
——- ম্যাম তোমার নামও জানেন?
ভদ্রমহিলার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কিছুটা অন্যমনস্ক কন্ঠে মেয়ের প্রশ্নের জবাবে বললো অবন্তি,
——- হুম্ সমবয়সী বন্ধুর নামতো জানাই যায়।
স্কুল অনুষ্ঠানের পর কদিন ছুটি। অবন্তির বারবার মনে হতে লাগলো, দিলারা কি ভীষন চালাক গোছের কেউ? সাহেবের সাথে প্রথম দেখায় নাকি মনে হয়েছে সে অবন্তি। নির্ঘাত মেসবাহর পরিচিত কিংবা আরো কিছু। সামনে আসবার সাহস হয় নি সেদিন, অথচ একা পেয়ে নিকটাত্মীয়ের মত কত কথাই যে বললো। তবে কি মেসবাহর মুখে শোনা সেই প্রথম ভালোবাসা ইনি? হতেও পারে। হলোই বা। বোকা মহিলা, জানেনা আমাদের এত বছরের সংসারটা কতটা বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে। দুজনের কাছে দুজনার অতীত নিতান্তই পেরুনো সময় ছাড়া আর কিছু নয়। জানিতো মেসবাহ ভার্সিটি পড়ার সময় একটি মেয়েকে ভালোবাসতো, কিন্তু ঐ যে বাঙালিয়ানার কমন সমস্যা, বেকার প্রেমিক সাহস করে প্রেমিকাকে নিয়ে পালাতে না পেরে ” সুখি হও” আশীর্বাদসহ চিরবিদায় পর্ব। ব্যস। পরবর্তীতে এ নিয়ে কোন আবেগি সময় ক্ষেপন বা অবহেলার কোন ব্যাপারই ঘটে নি অবন্তি আর মেসবাহর দেড়যুগের দাম্পত্য জীবনে।। ছেলেবেলায় কতজনইতো হোঁচট খায় ,চলতে গিয়ে ব্যাথা পায়, ফুলে যায়, কখনওবা কাঁটা ছেঁড়াও হয়, দাগও রয়ে যায় ক্ষত শুকিয়ে। তা বলে উহু আহার ব্যাপারতো থাকে না, অন্তত তাদের নেই।
অবন্তি আর মেসবাহের আদর্শের মিল, ভাবনার মিলটা শতভাগ একই।
দিলারা ম্যাম কি ভেবেছেন, কায়দা করে অবন্তি নামটা জেনে একটা কাহিনী ফেঁদে মেসবাহর সংসারে ঝড় তুলে মজা নিবেন।
হা হিতোস্মি। নিজের মনেই হাসলো অবন্তি। দুকথা যে শুনিয়ে দিয়ে আসবে তারও জো নেই। কন্যার টিচার বলে কথা।
মেসবাহকে বলতে গিয়েও বললো না বিষয়টা। বিবেকে বাঁধলো, এতকাল পরে সন্দেহের আঁচ জানতে পারলে অবন্তি মেসবাহর কাছে ছোট হয়ে যাবে নির্ঘাত। আর তাছাড়া, সবই অনুমান। দেখাই যাক না সারপ্রাইজটা কি দিতে চান দিলারা। আর উনার শাশুড়িমাটাই বা কে? নয়নপুরের কেউ নয়তো?
ছুটির দুদিন এ প্রসংগ নিজের মাঝে নেড়ে চেড়ে চুপটি করে থাকলো অবন্তি। রোববারে ড্রাইভার গাড়ি বের করতেই অবন্তিও উঠে বসলো। যথারীতি মেয়েকে ছুটির পর বাসায় নামিয়ে ড্রাইভারকে নিয়ে আবারও স্কুল গেট।
দারোয়ান নকিব মিয়ার কাছ থেকে দিলারা ম্যামের কোয়ার্টারটা চিনে নিয়ে এগোলো সেদিকেই। ফিরে না আসা পর্যন্ত স্কুল গেটেই অপেক্ষা করতে বললো ড্রাইভারকে। এটাও বলতে ভুললো না, বেশি দেরী হলে যেন ঘন ঘন হর্ণ দিতে থাকে গাড়ির।
ডোর বেলটায় হাত দিতে না দিতেই টুক করে লক ঘুরিয়ে বেরিয়ে এলেন দিলারা ম্যাম।
সেই সহজাত হাসিটি ফুটিয়ে ব্যস্ত আহ্বান জানালেন,
—— আরেহ্ আপনি?আসেন অবন্তি, আসেন।
তারপর অবন্তির মুখোমুখি সোফাটায় বসতে বসতে বললেন,
—— স্কুল থেকে ফিরে আপনার কথাই মনে করছিলাম। ভাবছিলাম আপনাকে রিকোয়েস্ট করবো মাকে দেখতে আসার। কি ভাগ্য দেখেন, সত্যি সত্যি আপনাকে পেয়ে গেলাম ঘরে বসেই।
অবন্তি এবার সত্যিই অধীর হলো মনে মনে। কারা এরা?
দিলারার হাতে হাত রেখে নীল পাড়ের আকাশি রঙ শাড়ি পরনে , স্লিপার পায়ে ধীর পদক্ষেপে পর্দা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন শাশুড়ি মা। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। মুখটা চেনা লাগলেও ঠিক ঠাওর করতে পারলো না অবন্তি।
দিলারা হাত ধরে অবন্তির পাশটিতে বসিয়ে দিলেন,
—— চেনা যায় মা?
অবন্তিকে অবাক করে দিয়ে বৃদ্ধা বললেন,
—— অবন্তি।
দিলারা বললেন,
—— বুঝতে পারছেন কি, ইনি রক্তে মাংসের মানুষ অবন্তি।
মাথা নাড়লেন মা।
—— তাহলেতো হয়েই গেলো। অবন্তি কথা বলেন মার সাথে। দেখেন আপনার কৌতুহলের জবাব মিলে কিনা। ততক্ষনে আমি তিন কাপ চা বানিয়ে আনি।
বলতে বলতেই ভেতর বাড়িতে আড়াল হলেন দিলারা।
শীর্ণ হাত দুটি বাড়িয়ে অবন্তির হাত দুটো স্পর্শ করলেন মা। কাঁপা কাঁপা কন্ঠের কথাগুলো কেমন যেন ছাড়া ছাড়া। কথা না বুঝলেও অবন্তি পুরোপুরি ফিরে গেলো সেই অষ্টাদশীর সময়টায়।
নয়নপুর কলেজের ঠিক বিপরীতে ছিলো একটি দ্বিতল বাড়ি। সেলিমদের বাড়ি। খুব ছোটবেলায় সে তার বাবাকে হারিয়ে একমাত্র অবলম্বন হিসেবে মাকে আঁকড়েই বড় হয়েছে। চারুকলায় গ্রাজুয়েশন শেষের দিকে যখন,হঠাৎ একদিন মাকে ওর ঘরে নিয়ে গিয়ে চেয়ারটায় টেনে বসালো। টেবিলের উপর কাপড়ে ঢেকে রাখা একটা ক্যানভাস উন্মুক্ত করতে বললো। যদিও এটা নতুন কিছু নয়। সেলিম যখন ওর কোন কাজ শেষ করতো এভাবেই মাকে দেখাতো, মতামত চাইতো। ভালো মন্দের সমালোচনা চাইতো। তেমনি ভাবেই সেদিনও মার গলা জড়িয়ে জানতে চাইলো, কেমন এঁকেছি বলো মা? শুধু সুন্দর নাকি অনেক বেশি সুন্দর?
মা হাসতে হাসতে বল্লেন,
—— অনেক সুন্দর।
—— তাহলে তোমার আপত্তি নেইতো ঘরে আনতে?
—— তার মানে?
—– অবন্তিকে আমি খুব পছন্দ করি মা। কিন্তু আমার সাথে তোমার পছন্দ না মিললেতো হবে না।
—–আসল না দেখে নকল বিচার হয় নাকি?
——- আসল দেখতে যাবে তুমি অবন্তিদের বাড়ি? এবং কালই।
পরদিনই হাজির মা ছেলে নয়নপুরে অবন্তিদের বাড়িতে। সরাসরি বাবা মায়ের কাছে প্রস্তাব নিয়ে।
অবন্তির বাবা মা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখালেন না,আবার গ্রহনও করলেন না। আপ্যায়ন করলেন,অবন্তিকে ডেকে আলাপও করিয়ে দিলেন। আসবার আগে বললেন, এখানকার পাট চুকিয়ে আগামী মাসেই তারা চলে যাবেন বদলীর অর্ডার এসেছে। অবন্তির পড়াটা শেষ হলে, ছেলের খোঁজ খবর নিয়ে পছন্দ হলে তারাই যোগাযোগ করবেন। তবে শর্ত তার আগে মেয়েকে এ ব্যাপারে কিছু বলা যাবে না। বিরক্ত করা যাবে না। লেখাপড়ার ব্যাঘাত ঘটবে।
অবন্তি মিলিয়ে দেখলো এইতো সেই মায়ের মুখ। চেনা চোখ, চেনা সেই দৃষ্টি। যদিও বয়সের ছাপে অনেকটাই মলিন। যেন বিষন্নতায় ঢেকে গেছে সেদিনের স্নিগ্ধ সুন্দর মুখশ্রী। মনের মাঝে আরও উঁকি দিলো মায়ের পাশ ঘেঁষে বসা ক্রিম কালারের সার্ট পরিহিত উজ্জ্বল চেহারার এক যুবকের ইনোসেন্ট মুখটিও।
এতদিন পর অন্তরে চাপা দেয়া বাকি কথাগুলোও নিঃশব্দে জেগে ওঠলো চোখের তারায়।
তারপরদিনই কলেজ গেটে দেখা হয়েছিলো সেলিমের সাথে অবন্তির। হয়েছিলো টুকটাক কথাও। তার প্রতিকৃতি এঁকে মাকে অবন্তির কথা বলেছে, এটা জানার পর অষ্টাদশী অবন্তি ভীষন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিল তখন। এটুকুতেই সেলিমের ভালোলাগার রঙ অবন্তিকেও ছুঁয়ে দিয়েছিল। অতটুকুই। দ্রুতই পরীক্ষা শেষের দিনটি এসে গেলো। অবন্তিদের নয়নপুর ছাড়বার দিনও।
যাবার মুহুর্তে শেষ দেখায় সেলিম শুধু বলেছিল,
—— আমি তোমার অপেক্ষায় থাকলাম আবার নয়নপুরে ফিরে আসবে।
অবন্তির অষ্টাদশি মনটা তখন পুরোই আবেগে ভরা। স্যান্ডেলের ডগায় মাটি খোঁচাতে খোঁচাতে মুখ নিচু করে বলেছিলো,
—— আপনি আনতে পারলে অবশ্যই ফিরবো নয়নপুরে,কথা দিইলাম ।
তারপর আর এক মুহুর্ত দেরি করে নি অবন্তি। লজ্জায় পিছু ফিরে তাকায়ও নি পর্যন্ত। সামনের রিকশায় উঠে সোজা বাড়ি।
ঢাকায় আসার পর খুব মনে পড়তো নয়নপুরের কথা, ভালোলাগার কথা, সেলিমের অকপটে বলে যাওয়া টুকরো টুকরো কথাও। দুচোখ বন্ধ করে সেলিমের দীর্ঘ দেহী, শ্যামলা রঙের বড় বড় চোখ দুটিও অবন্তি মন জুড়ে অনুভব করতো।
কিন্তু নয়নপুরের সেলিম কি আর খবর রেখেছে? বাবা মা না চাইলে জানা সম্ভবও নয়। তারপর অবন্তিও একসময় বুঝে ফেলে অল্প বয়সের মোহটা একটা সময় কেটেই যায়। সবই বয়সের ধর্ম।
বাস্তবটা আসলে অনেক কঠিন।
পড়া শেষ হয়, হয় সংসার, হয় সন্তান সন্ততি। সরকারী চাকুরীজীবি স্বামীর সাথে সাথে নতুন নতুন শহর প্রদক্ষিনও হয় বছর দুই তিন পর পর। এভাবেই পুরনো ভাবনাগুলোর ডালপালা ছেঁটে নিজের সংসার জগতটায় এতটাই মিশে যায় , এতটাই মধুর ব্যস্ততায় সময় ক্ষেপন করে যে পুরনো কত কিছুই চাপা পড়ে যায় মনের অতলে।
——- একি,ঘর জুড়ে এমন নীরবতা কেন?
হাতে খাবার ভরা ট্রে টা রাখতে রাখতে বললেন দিলারা।
অবন্তি নিজেকে সামলে নিয়ে হাসলো একটু,বললো
—— আমিতো পুরোই সারপ্রাইজড। ভাবলাম, গোয়েন্দাগিরি করবো, এখনতো দেখছি নিজেই ধরা খেয়ে যাচ্ছি। এই কমলগন্জে এসে নয়নপুর পেয়ে যাবো, একটুও ভাবি নি।
দিলারা তাড়া দিলেন,
—– আগে চা পর্বটা শেষ হয়ে যাক। তারপর চলেন,ভেতর বাড়িটা ঘুরে দেখবেন।
ভেতরে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখে অবন্তি বাড়িটির পরিপাটি সবকিছু। ভাবে দিলারা কর্মজীবী হয়েও এতটা সময় দেন কি করে? করিডোর জুড়ে চমৎকার চমৎকার টবে ইনডোর প্লান্টের সাজে হরেক রঙিন পাতারা। দেয়ালে টাঙানো অপূর্ব সব পেইন্টিং। তাক জুড়ে ঝকঝকে তকতকে বইয়ের সারি। জায়গায় জায়গায় রাখা অপূর্ব ঢ়ঙের সো পিসও। এতটা মেইনটেইন করেন কি করে দিলারা নামের এই গুনী মানুষটি। ধীর পদক্ষেপে মাও আসেন। বসেন টেবিলের সামনের চেয়ারটায়। এতক্ষনে খেয়াল করে অবন্তি, মস্ত ক্যানভাস জুড়ে অবন্তির হাসি মাখা মুখের একটা ঢাউস ছবি টেবিল জুড়ে রাখা। কাগজটা বেশ পুরনো বুঝাই যাচ্ছে। ডান চোখটা হাসির তোড়ে কিঞ্চিৎ ভাঁজ, কপালে ছোট ছোট অবাধ্য চুল ছড়ানো, বাঁ ভ্রুর পাশে কালো তিল। গোলাপি ঠোঁটজোড়া ঈষৎ ফাঁক করা। পুরো ছবিজুড়ে মোটা হরফে লেখা ” অবন্তি”। এক কোনে কিছুটা ছেঁড়াও।
অবন্তির গলার কাছটায় হঠাৎ করেই কেমন যেন অস্বস্তি দলা পাকাতে থাকে। মনে হয় এভাবে না জেনে স্রেফ কৌতুহল মেটাতে এখানে আসাটা মোটেও উচিত হয় নি। এ বাড়ির এত লক্ষী সুগৃহিনী দিলারার চোখের দিকে চাইতে কেমন যেন জড়তা কাজ করতে শুরু করে অবন্তির।
দিলারার কথায় সম্বিৎ ফিরে অবন্তির,
——- এটা সেই ছবি, প্রথম দেখার তাইনা?
সম্ভবত বয়সটা তখন টিন এজে।
আপনাকে দেখে নতুন করে জানলাম,সুন্দর চিরদিনই সুন্দর।
অবন্তি খুব অস্বস্তিতে উঠে দাঁড়ালো এবার। কব্জি ঘুরিয়ে ঘড়িটায় চোখ রেখে বললো,
—— আজ আসি আমি।
দিলারার কন্ঠ তখনও সাবলীল।
—— প্লিজ শেষটুকু না শুনেই যাবেন না অবন্তি। মা আপনাকে চেতনে অবচেতনে কত কথাই বলেন রাত দিন এই ছবিটার সামনে এলেই। আজ সরাসরি আপনিই না হয় শুনলেন।
তারপর পরম মমতায় মার মাথায় হাত রেখে দিলারা জিজ্ঞেস করে,
—— মা, অবন্তিকে কিছু বলবেন না? ছবি নয় আজকে সত্যিকারের অবন্তি আপনার সামনে।
কোন প্রতিক্রিয়া দেখালেন না মা। ছবির মুখমন্ডলে আলতো করে হাত বুলালেন শুধু।
দিলারা বলে চললেন আর অবন্তির চোখে ভেসে ওঠতে লাগলো এক একটা ছবির এপিসোড যেন।
নয়নপুর থেকে অবন্তিরা চলে যাবার পর মা ধরে নিয়েছিলেন অবন্তির বাবা আর কখনই যোগাযোগ করবেন না। এরই মাঝে সেলিম গ্রাজুয়েশন শেষে একটা বেসরকারী জবে জয়েনও করলো । মা শুন্য বাড়িটায় ক্রমে হাঁপিয়ে ওঠতে লাগলেন। কত ভালো ভালো ঘরের প্রস্তাব এলো স্বজনদের মাধ্যমে, পাড়া পড়শীর মাধ্যমে। কিন্তু সেলিমের এক গোঁ। অবন্তির বাবাতো যোগাযোগ করবেনই বলেছেন।
হঠাৎ করেই মা আক্রান্ত হোন জন্ডিসে। এতটাই দূর্বলতায় পেয়ে বসলো যে সংসারের দায়িত্ব পালনই কঠিন হয়ে পড়লো। সার্বক্ষনিক দেখভালের জন্য সাহায্যকারী থাকলেও মানসিকভাবে মুষড়ে গেলেন অনেক খানি। ঠিক এসময়ই মায়াবতীর আগমন ঐ বাড়িতে। স্থানীয় মেয়েদের স্কুলে জয়েন করতে। ওর মা একসময় সেলিমের মায়ের সাথেই লেখাপড়া করেছেন। বাল্যসখি যাকে বলে। আর এতে সবচেয়ে লাভবান হলেন মা।
আদরে যত্নে একটু একটু করে পুরোই সেরে ওঠলেন। তবে মনে শিকড় গেঁথে রইলো মায়াবতীর সীমাহীন মায়া।
এরই মাঝে খবর এলো, মায়াবতীর একমাত্র আশ্রয়স্থল মা আর নেই। সদ্য মা মারা যাওয়ায় কন্যাটিকে পৌঁছে দেবার কোন নির্ভরযোগ্য ঠিকানাই পেলেন না।
মায়াবতীর মায়াতেও ডুবে গেছেন উনি ততদিনে। বুদ্ধি ঠাউরে সেলিমকে জানালেন অবশেষে, অবন্তির বাবা অবন্তির বিয়ে অন্যত্র দিয়ে ফেলেছেন। অপেক্ষার কিছু নেই আর।
সেলিম কথা বলতে ভুলে গেলো যেন। মা সর্ব প্রথমে যে কাজটা করলেন তা হলো সেলিমের ঘর থেকে অবন্তির ছবিটি চিলেকোঠার ঘরে স্থানান্তর। একের পর এক নিরবতার মাঝে দেখতে লাগলো সেলিম মায়ের নিত্য নতুন সিদ্ধান্তগুলি। মায়াবতীর সাথে সেলিমের বিয়েটাও সম্পন্ন করলেন। ভাবলেন, এবার নিশ্চিন্ত অপেক্ষার শুরু নাতি নাতনি আগমনের।
কিন্তু মানুষের ভাবনা আর ভবিতব্যতো এক নয়।বিয়ের সাত দিনের মাথায় সেলিমদের বাড়ির সামনে এসে থামলো নীল রঙা টয়োটাটা। ড্রাইভার ডিগি খুলে বের করতে লাগলো প্যাকেট প্যাকেট মিষ্টি, ফলের ঝুড়ি আর বিশাল সাইজের রুই কাতলা।
হ্যাঁ অবন্তির বাবা কথা দিয়েছিলেন, রাখতে এসেছেন। মেয়ের বিয়ের কথা পাকা করে ফিরবেন বলে।
পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়লো ঘটনার ঘনঘটা।
সেলিম এ ঘটনার পর বাড়িছাড়া হলো। মা অনুশোচনা দহনে দগ্ধ হতে হতে মানসিক নিয়ন্ত্রনটা হারিয়ে ফেললেন পুরোপুরি।
সাইক্লিয়াটিস্ট দেখানো হলো। দীর্ঘ চিকিৎসার পর কিছুটা সেরে ওঠতেই সেই মায়াবতীর উপর ছেড়ে দিলেন নিজেকে। নাওয়া খাওয়া সহ যাবতীয় জীবন যাপন।
কিন্তু সমাজে নানান উপদেশ, নানান বিশ্লেষন। একসময় টেকা দায় হয়ে ওঠলো নয়নপুরে মায়াবতীর। চেষ্টা তদবীরে একেবারে দক্ষিণে বদলীটা জুটেও গেলো। সেই থেকে অনেকটা সময় পেরিয়ে এভাবেই দিন গুজরান মা মেয়ের।
মালামাল গুছিয়ে যখন গাড়িতে ওঠলো ওরা, ঠিক তক্ষুুনি মা হঠাৎ করেই চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলেন, অবন্তিকে নিয়েছো?অবন্তি, অবন্তি কোথায়?
সেই থেকে অবন্তিও নয়নপুর থেকে এইখানে দুজনের সাথে।
এখানে আসার পর থেকে মা কেমন যেন শীতল হয়ে যেতে থাকলেন। ছবিটার সামনে বসেই দীর্ঘ সময় কাটান। আশ্চর্য, মা অনেকটা স্থিরও হলেন।
এতক্ষনে অবন্তি অবাক বিস্ময়ে খেয়াল করলো, ছবিটার দিকে তন্ময় হয়ে মা তাকিয়ে আছেন তখনও।
অবন্তি দিলারার হাত ছুঁয়ে দিলো পরম মমতায়। মৃদু স্বরে বললো
—— সন্দেহ নেই মায়াবতীটাই আপনি। মাত্র সাতটা দিনের দায়ভার নিয়ে সারা জীবনের একাকীত্ব মেনে নিলেন? আর ঘর বাঁধলেন না কেন?
—– একাকীত্ব কোথায়? এই যে মা আছেন।
যেদিন মাতৃহারা হয়েছিলাম সেদিন থেকেই আমার দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন তিনি নিজেই। যা পালন করতে গিয়ে লন্ডভন্ড করেছেন নিজের সাজানো বাগান। আর আমি দেখে শুনে এসব মাড়িয়ে চলে যাই কি করে অবন্তি? তবে এটা ঠিক, আমি মনে প্রাণে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, যেভাবেই হোক আপনার কাছে পৌঁছুবো একদিন। অবন্তির গল্পটা অবন্তির জানা উচিত। হয়তো শান্ত নদীতে একটু কাঁপন লাগবে। এর বেশি নয়। কারন, অবন্তির অগোচরে ঘটা মস্ত গল্প এটা, অবন্তিকে ঘিরেই শুধু। দায় নেই কোন।
অবন্তি ঝাপসা দৃষ্টিটা ছুঁড়ে দেয় দিলারার চোখে,
——- সেলিম কি মাঝে মাঝে খবর নেয়? মা কে এসে দেখে যায়?
—— না অবন্তি। সেলিম নিখোঁজ হবার দেড়মাসের মাথায় আমরা জানতে পারি সে সড়ক দূর্ঘটনায় পাড়ি জমিয়েছে বহুদূর। যেখান থেকে আসার আর কোন পথ নেই।
——- মানছি পুরোটাই নিয়তি। তারপরও একটা কথা জেনে যেতে চাই দিলারা, বলবেন কি সত্যি করে? মায়ের এ অবস্থার জন্য দায়ভার মার একার নয়, দায় আমারও। আপনারও কি একটু হলেও রাগ হয় না আমার উপর?
—– একটুও নয়। সামনে তাকিয়ে মাকে খেয়াল করে দেখেন,মা কোন ছবির দিকে তাকিয়ে নেই।তাকিয়ে আছে নিজের প্রাণাধিক পুত্রের অপূর্ব শিল্পকর্মের দিকে। মাঝে মাঝে ছুঁয়ে দিচ্ছেন মুখচ্ছবিটাকে নয়, ছুঁয়ে দিচ্ছেন হারানো সন্তানের হাতের তুলির স্পর্শ নেয়ার অতৃপ্ত আকাঙ্খায়।
এখানে আপনি কিংবা আমি মা সন্তানের জীবনে ঘটা ঘটনার একটা উপলক্ষ্য মাত্র। আমাদের ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায় কিছুই ঘটে নি।
ড্রাইভারের ঘন ঘন হর্ণের আওয়াজ বাজতে শুরু করেছে ততক্ষনে। গলায় আর একটু জোর এনে দিলারার খুব কাছ ঘেঁষে দাঁড়ালো অবন্তি
——— আসি দিলারা। মা একটু স্বাভাবিকতায় ফিরলে বলবেন, অন্তর্যামী ভবিতব্য জেনেই ঘটনার ঘনঘটা সাজান । তাইতো মায়ের মায়াবতী নির্বাচন শতভাগই সঠিক।
অবন্তির গাড়িটি দৃষ্টির আড়াল না হওয়া পর্যন্ত দিলারা চেয়ে রইলো একাগ্রচিত্তে। সেটা অনেক অনেক পিছনের দূর অতীতে নাকি অবন্তির চলে যাওয়ার এই মুহুর্তের? অনুমান করাটা সত্যিই দূরহ।
সম্পাদক: ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
© ২০১৬–২০২৬ ক্রাইম প্রতিদিন। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।