উপজেলা পর্যায় থেকে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা খুঁজে বের করে অর্থায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন উদ্যোক্তা তৈরির এ কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত প্রত্যেক উদ্যোক্তাকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন দেওয়া হবে। এর মধ্যে অর্ধেক থাকবে ব্যাংক ঋণ এবং বাকি অর্ধেক দেওয়া হবে অনুদান হিসেবে।
বৃহস্পতিবার (৩ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা হবে।
উপজেলা পর্যায়েই খোঁজা হবে উদ্যোক্তা
কর্মসূচির আওতায় দেশের তফশিলি ব্যাংকগুলো তাদের বিদ্যমান শাখা নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা খুঁজে বের করবে। আগ্রহীদের ব্যবসায়িক ধারণা, সম্ভাব্যতা এবং প্রকৃত অর্থের চাহিদা যাচাই-বাছাইয়ের পর অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হবে।
নির্বাচিত উদ্যোক্তার জন্য সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার অর্থায়ন প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অর্ধেক অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ হিসেবে এবং বাকি ১০ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে।
গ্রাহক পর্যায়ে এ ঋণের সুদ বা মুনাফার হার সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এ ঋণের বিপরীতে কোনো সহায়ক জামানত প্রয়োজন হবে না।
ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অনুদানও ঋণে পরিণত হবে
তবে নির্ধারিত সময়ে ঋণের অর্থ পরিশোধ না করলে উদ্যোক্তার জন্য বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হবে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অনুদান হিসেবে দেওয়া অর্থও সুদবিহীন ঋণে রূপান্তরিত হবে।
একই সঙ্গে ঋণ হিসাবটি প্রচলিত ব্যাংকিং নিয়মে শ্রেণিকৃত হয়ে খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা ভবিষ্যতে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা হারাতে পারেন।
বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর
কর্মসূচিতে আবেদনের ক্ষেত্রে কিছু যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের মধ্যে আবেদনের শেষ তারিখে বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলার বাসিন্দা হলে আবেদন করা যাবে।
তবে আবেদনকারীর আগে ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক নয়। নতুন উদ্যোক্তারাও আবেদন করতে পারবেন। এজন্য আবেদনকারীর একটি বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক ধারণা থাকা প্রয়োজন।
যেসব উদ্যোগে অর্থায়ন মিলবে
কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে হস্তশিল্প, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, সেবা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগসহ সব ধরনের বৈধ ব্যবসায়িক উদ্যোগ এ কর্মসূচির আওতায় বিবেচনা করা হবে।
আবেদন করতে কোনো ফি লাগবে না। সংশ্লিষ্ট উপজেলার বাসিন্দারা দেশের যেকোনো তফশিলি ব্যাংকের শাখায় নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে পারবেন।
৬৪ উপজেলায় শুরু হচ্ছে কার্যক্রম
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কর্মসূচির বিস্তারিত নির্দেশনা সংবলিত সার্কুলার আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর জারি করা হবে। সার্কুলার জারির পর এক মাস আবেদন গ্রহণ করা হবে।
প্রাথমিকভাবে দেশের আট বিভাগের আট জেলা-মানিকগঞ্জ, ফেনী, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, ভোলা, হবিগঞ্জ, রংপুর ও নেত্রকোনা- এর ৬৪টি উপজেলায় কর্মসূচি শুরু হবে।
প্রতিটি উপজেলা থেকে ১০ জন করে মোট ৬৪০ জন তরুণ উদ্যোক্তা প্রাথমিক পর্যায়ে নির্বাচিত হবেন।
পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য জেলার উপজেলাতেও কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে। তখন প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের।
অর্থের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও মেন্টরশিপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ শুধু ঋণ বা অনুদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞ মেন্টরের পরামর্শ, ব্যবসা নিবন্ধন, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা এবং বাজার সংযোগের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে অর্থের পাশাপাশি ব্যবসায়িক দক্ষতা, বাজার সম্পর্কে ধারণা এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে উপজেলা পর্যায় থেকেই টেকসই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, এ কর্মসূচির মাধ্যমে শুধু সফল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি হবে না, একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণরা নিজস্ব উদ্যোগে ব্যবসা গড়ে তুলে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
সম্পাদক: ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
© ২০১৬–২০২৬ ক্রাইম প্রতিদিন। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।