দেশের সরকারি খাদ্যগুদামগুলোতে মজুত খাদ্যশস্য নিয়ে কোনো ধরনের নয়ছয়, অনিয়ম বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা।
তিনি বলেছেন, খাদ্যগুদামকে কেন্দ্র করে কোনো সিন্ডিকেট গড়ে উঠলে কিংবা অনিয়মের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে এসব অনিয়মের নেপথ্যে থাকা মদদদাতা ও সহযোগীদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে যুগান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খাদ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
খাদ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের ৬৪ জেলার সরকারি খাদ্যগুদাম পর্যায়ক্রমে অনুসন্ধান ও নজরদারির আওতায় আনা হবে। কোথাও মজুতের হিসাবের সঙ্গে বাস্তব মজুতের গরমিল, খাদ্যশস্য আত্মসাৎ, সংরক্ষণে অনিয়ম কিংবা অন্য কোনো ধরনের দুর্নীতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, খাদ্য নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দায়িত্বে অবহেলা কিংবা দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই। জনগণের খাদ্য নিয়ে কোনো ধরনের ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না।
সরকারি খাদ্যগুদামে জবাবদিহি নিশ্চিতের নির্দেশ
আফরোজা খানম রিতা বলেন, সরকারি খাদ্যগুদাম জনগণের সম্পদ সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সেখানে মজুত খাদ্যশস্যের সঠিক হিসাব, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, খাদ্যগুদামকে কেন্দ্র করে কোনো সিন্ডিকেট গড়ে উঠলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে। কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে সেটিকে ছোটখাটো ভুল হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
মন্ত্রীর ভাষায়, কাগজে-কলমে এক ধরনের হিসাব আর বাস্তবে অন্য ধরনের মজুত- এমন চিত্র কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারি খাদ্যশস্য জনগণের সম্পদ। এর এক কেজিও অপচয়, আত্মসাৎ বা অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।
৬৪ জেলার খাদ্যগুদাম পর্যায়ক্রমে অনুসন্ধান
খাদ্যমন্ত্রী জানান, দেশের ৬৪ জেলার সরকারি খাদ্যগুদাম পর্যায়ক্রমে পরিদর্শন ও অনুসন্ধানের আওতায় আনা হবে। মজুত, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তদন্তের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, শুধু গুদামের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়, তদারকি ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
ঘিওরের ঘটনায় বিশেষ নজর
খাদ্যমন্ত্রী জানান, তার নিজ জেলা মানিকগঞ্জ থেকেই সরকারি খাদ্যগুদামে অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ঘিওর সরকারি খাদ্যগুদামে মজুত যাচাইয়ের সময় চাল ও গমের ঘাটতির বিষয়টি সামনে আসার পর ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তিনি বলেন, ঘিওরের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। দেশের অন্যান্য সরকারি খাদ্যগুদামেও একই ধরনের অনিয়ম রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
আফরোজা খানম রিতা বলেন, ঘিওরের ঘটনায় সরকার স্পষ্ট বার্তা দিতে চায়- সরকারি খাদ্যগুদামে নয়ছয় করার দিন শেষ। দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শুধু সরাসরি অনিয়মকারীরাই নন, এর পেছনে যারা মদদ দিয়েছেন বা সহযোগিতা করেছেন, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
খাদ্য পরীক্ষাগার আধুনিকায়নের পরিকল্পনা
খাদ্যমন্ত্রী জানান, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শুধু সাময়িক অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে দেশের খাদ্য পরীক্ষাগার ও ল্যাবরেটরিগুলো আধুনিকায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, শিশু থেকে বৃদ্ধ- সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি থাকবে।
খাদ্য নিরাপত্তায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
খাদ্যমন্ত্রী বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা শুধু পর্যাপ্ত খাদ্য মজুতের বিষয় নয়। মজুত খাদ্যশস্য সঠিকভাবে সংরক্ষিত আছে কি না, হিসাব সঠিক রয়েছে কি না এবং তা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না- এসব বিষয়ও নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, খাদ্য মন্ত্রণালয়কে আরও জনবান্ধব ও সেবামুখী করতে একাধিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। খাদ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণ- পুরো ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আফরোজা খানম রিতা বলেন, সরকারি খাদ্যগুদাম কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়; এটি জনগণের জন্য। জনগণের খাদ্য নিয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি বা সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না।
সম্পাদক: ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
© ২০১৬–২০২৬ ক্রাইম প্রতিদিন। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।