
বাংলাদেশের গ্যাস সংকটকে যদি শুধু ‘গ্যাস কম’- এই একটি বাক্যে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়ালেই থেকে যাবে। দেশে গ্যাসের ঘাটতি বাস্তব; কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তব গ্যাসের অপচয়, লিকেজ, অবৈধ সংযোগ, পুরোনো অবকাঠামো, মিটারিংয়ের সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বল নজরদারিও।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি তখনই চোখে পড়ে, যখন একদিকে গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানার বয়লার ও উৎপাদন ইউনিট বন্ধ থাকে বা সক্ষমতার নিচে চলে, অন্যদিকে কোথাও কোথাও অবৈধ সংযোগে গ্যাস জ্বলতে থাকে।
এটি শুধু আইন ভঙ্গের প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি, শিল্পোৎপাদন, জননিরাপত্তা এবং সর্বোপরি জবাবদিহির প্রশ্ন।
গ্যাস সংকট: ঘাটতি যেমন বাস্তব, ব্যবস্থাপনাগত সংকটও তেমনি
বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা বর্তমানে প্রায় ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মধ্যে। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ অনেক সময় এর চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম থাকে। আগস্টের মাঝামাঝি পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ছিল প্রায় ২,৪৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট। অন্যদিকে জুলাইয়ের এলএনজি টার্মিনাল দুর্ঘটনার সময় সরবরাহ আরও নিচে নেমে গিয়েছিল।
অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান এখন বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার অন্যতম স্থায়ী চ্যালেঞ্জ।
এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান শিল্পাঞ্চলগুলোতে। গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহের ভালুকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কম চাপের কারণে বয়লার, ডাইং ও উৎপাদন ইউনিট পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। কোথাও উৎপাদন কমছে, কোথাও কারখানাকে তুলনামূলক ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে- যেখানে বৈধ গ্রাহক পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না, সেখানে অবৈধ সংযোগ কীভাবে টিকে থাকে?
পাঁচ হাজারের বেশি অবৈধ সংযোগ: পরিসংখ্যানের আড়ালে বড় প্রশ্ন
অবৈধ গ্যাস সংযোগ বাংলাদেশের জন্য নতুন সমস্যা নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিযানের পরিসংখ্যান সমস্যাটির ব্যাপ্তি নতুন করে সামনে এনেছে।
তিতাস গ্যাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলে এক মাসেই ৫,১২৮টি অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ব্যাসের প্রায় ২১ কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন অপসারণ করা হয়। তিতাসের হিসাবে, এর ফলে দৈনিক প্রায় ৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় হওয়ার কথা, যার আনুমানিক আর্থিক মূল্য প্রতিদিন প্রায় ৩৬ লাখ ৯১ হাজার ৯১৯ টাকা।
এক মাসে পাঁচ হাজারের বেশি সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া নিছক একটি প্রশাসনিক সাফল্যের পরিসংখ্যান নয়; এটি একই সঙ্গে একটি ব্যবস্থাপনাগত প্রশ্ন।
এত বিপুলসংখ্যক অবৈধ সংযোগ তৈরি হলো কীভাবে? কত দিন ধরে এগুলো চলছিল? কারা এসব সংযোগ স্থাপন করেছে? কীভাবে পাইপলাইন বসানো হলো? কোথায় ছিল নজরদারি?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- এই সংযোগগুলো টিকিয়ে রাখতে কারা সহযোগিতা করেছে?
প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গিয়ে শুধু সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
অবৈধ সংযোগের দায় শুধু গ্রাহকের নয়
একটি অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিজে নিজে তৈরি হয় না। কেউ পাইপলাইন বসায়, কেউ সংযোগ দেয়, কেউ অর্থ নেয়, কেউ স্থানীয় প্রভাব ব্যবহার করে এবং কোনো না কোনো পর্যায়ে নজরদারি ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়।
তাই অবৈধ সংযোগ শনাক্ত হলে শুধু ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়। তদন্ত করতে হবে পুরো সরবরাহ-চক্রের বিরুদ্ধে।
তিতাসের এপ্রিলের অভিযানের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবৈধ সংযোগ প্রদানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৪ কর্মকর্তা ও ১৬ কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং পাঁচ ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এ ধরনের ব্যবস্থা কি নিয়মিত, স্বচ্ছ ও ফলপ্রসূ হচ্ছে?
কারণ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর একই এলাকায় যদি আবার সংযোগ তৈরি হয়, তাহলে শুধু গ্রাহককে দায়ী করলে চলবে না; সংশ্লিষ্ট এলাকায় নজরদারি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থার কার্যকারিতাও পর্যালোচনা করতে হবে।
নরসিংদী: অবৈধ সংযোগের ঝুঁকির বাস্তব উদাহরণ
নরসিংদীর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই সমস্যার আরেকটি দিক সামনে এনেছে। আগস্টে নরসিংদীর সদর ও শিবপুর উপজেলায় যৌথ অভিযানে ১৮টি অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। একই অভিযানে প্রায় ১৫ লাখ টাকা বকেয়া বিল আদায় এবং আটটি মামলায় ২ লাখ ৭ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
আরও উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে জুলাইয়ে। আমিরগঞ্জ ও রায়পুরা এলাকায় তিতাসের ১৪ ইঞ্চি সঞ্চালন পাইপলাইনে অবৈধ সংযোগের কারণে সৃষ্ট লিকেজ মেরামতের জন্য আশুগঞ্জ থেকে নরসিংদীগামী লাইনে প্রায় ১০ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
এখানে সমস্যাটি শুধু গ্যাস চুরি নয়। একটি অবৈধ সংযোগ কীভাবে পুরো সঞ্চালন ব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, এই ঘটনাই তার প্রমাণ।
অর্থাৎ অবৈধ সংযোগের ক্ষতি তিন স্তরে- প্রথমত, রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতি। দ্বিতীয়ত, মূল্যবান জ্বালানির অপচয়। তৃতীয়ত, জননিরাপত্তা ও সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি।
সিস্টেম লসের সবটাই কি গ্যাস চুরি?
গ্যাস ব্যবস্থাপনার আলোচনায় ‘সিস্টেম লস’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে সিস্টেম লসের পুরোটা গ্যাস চুরি- এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না।
লিকেজ, পুরোনো পাইপলাইন, মিটারিংয়ের ত্রুটি, প্রযুক্তিগত ক্ষতি এবং ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার কারণেও সিস্টেম লস হতে পারে।
কিন্তু একই সঙ্গে অবৈধ সংযোগের বাস্তব উপস্থিতিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই প্রয়োজন গ্যাসের প্রবাহের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হিসাব মিলিয়ে দেখা।
উৎপাদন ও আমদানি থেকে শুরু করে সঞ্চালন, বিতরণ এবং গ্রাহক পর্যায়- প্রতিটি স্তরে কত গ্যাস ঢুকল এবং কত গ্যাস বিল হলো, তার মধ্যে পার্থক্য কত, সেটি নিয়মিত ও স্বাধীনভাবে নিরীক্ষা করা জরুরি।
এলএনজি কিনছি, অথচ গ্যাস হারাচ্ছি
বাংলাদেশের গ্যাস ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যগুলোর একটি এখানেই। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় চাহিদা পূরণে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার, জাহাজ পরিবহন, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ক্রমেই বেশি যুক্ত হয়ে পড়ছে।
২০২৬ সালের ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে টার্মিনালটির একটি ইউনিট আংশিকভাবে চালু হলে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। এই ঘটনার প্রভাব শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক গ্রাহক- সব খাতেই পড়ে।
একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলে যদি জাতীয় গ্যাস সরবরাহে এত বড় ধাক্কা লাগে, তাহলে আমাদের নিজস্ব বিতরণ ব্যবস্থায় প্রতিটি ঘনফুট গ্যাসের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা আরও জরুরি।
কারণ সমীকরণটি খুবই সহজ- দেশীয় উৎপাদন কমছে + আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে + চাহিদা বাড়ছে + অবৈধ ব্যবহার ও লিকেজ থাকছে = জ্বালানি সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
শিল্পে গ্যাসের সংকট মানে শুধু কারখানার সমস্যা নয়
গ্যাসের ঘাটতিকে অনেক সময় শিল্পমালিকের সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে এর প্রভাব অনেক বিস্তৃত।
একটি শিল্পকারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস থাকলে উৎপাদন হয়। উৎপাদন হলে শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাজ পায়, রপ্তানি বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রা আসে এবং সরকার রাজস্ব পায়।
অন্যদিকে গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন কমে, মেশিনের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয় এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ে।
ফলে গ্যাস সরবরাহের প্রশ্নটি শুধু শিল্পমালিকের সুবিধা-অসুবিধার প্রশ্ন নয়। এটি জাতীয় উৎপাদনক্ষমতা, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্ন।
একই কথা বিদ্যুৎ ও সার খাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন চাপে পড়ে। সার কারখানায় গ্যাসের ঘাটতি হলে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থাৎ গ্যাস সংকটের প্রভাব একটি দীর্ঘ অর্থনৈতিক শৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ে- গ্যাস → বিদ্যুৎ → শিল্প → উৎপাদন → রপ্তানি → কর্মসংস্থান → কৃষি → ভোক্তা বাজার।
অভিযান দরকার, কিন্তু শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়
অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে অভিযান অবশ্যই চালাতে হবে। তিতাসের ওয়েবসাইটেও অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও পাইপলাইন অপসারণের মাসিক প্রতিবেদন প্রকাশের ধারাবাহিকতা রয়েছে।
কিন্তু বছরের পর বছর অভিযান চালানোর পরও যদি নতুন অবৈধ সংযোগ পাওয়া যায়, তাহলে বুঝতে হবে- শুধু বিচ্ছিন্নকরণ দিয়ে সমস্যার মূল সমাধান হচ্ছে না। প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
প্রতিটি বৈধ সংযোগকে ডিজিটাল ডাটাবেসে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাইপলাইনের GIS-ভিত্তিক ম্যাপিং করতে হবে। কোন এলাকায় কতটি বৈধ সংযোগ, কতটি বিচ্ছিন্ন সংযোগ এবং কোথায় বারবার অবৈধ সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে- এসব তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় রাখতে হবে।
উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন এবং আধুনিক লিকেজ-ডিটেকশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে কোনো বিচ্ছিন্ন অবৈধ সংযোগ পুনরায় স্থাপিত হলে সেটিকে সাধারণ অপরাধ হিসেবে না দেখে নেটওয়ার্কভিত্তিক তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
দরকার ‘জাতীয় অবৈধ গ্যাস সংযোগ ডাটাবেস’
অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত ডাটাবেস তৈরি করা সময়ের দাবি।
সেখানে অন্তত এসব তথ্য থাকা উচিত- জেলা, উপজেলা ও এলাকার নাম; অবৈধ সংযোগের সংখ্যা; আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প সংযোগের ধরন; কতটি বার্নার বা চুলা পাওয়া গেছে; কত কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন অপসারণ করা হয়েছে; আনুমানিক কত গ্যাস সাশ্রয় হয়েছে; কত টাকা জরিমানা ও বকেয়া আদায় হয়েছে; কতটি মামলা হয়েছে; কর্মকর্তা, কর্মচারী বা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে; এবং বিচ্ছিন্ন সংযোগের কতটি পরে পুনরায় পাওয়া গেছে।
এই তথ্য প্রকাশ্যে এলে একটি এলাকায় অভিযান চালানোর পর প্রকৃত পরিবর্তন হচ্ছে কি না, সেটিও পরিমাপ করা সম্ভব হবে।
প্রয়োজন জাতীয় গ্যাস অডিট
বাংলাদেশের জন্য এখন শুধু ‘কত গ্যাস আছে’- এই হিসাব যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন জাতীয় গ্যাস অডিট।
প্রতিদিন কত গ্যাস দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদিত হচ্ছে, কত এলএনজি আমদানি হচ্ছে, জাতীয় গ্রিডে কত প্রবেশ করছে, সঞ্চালন ও বিতরণ পর্যায়ে কত যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত বৈধ গ্রাহকের কাছে কত পৌঁছাচ্ছে- তার পূর্ণ হিসাব থাকা দরকার।
একই সঙ্গে জানতে হবে- সিস্টেম লস কত? প্রযুক্তিগত ক্ষতি কত? লিকেজে কত হারাচ্ছে? অবৈধ সংযোগে আনুমানিক কত যাচ্ছে? অভিযানের মাধ্যমে কত গ্যাস সাশ্রয় হয়েছে?
এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে গ্যাস সংকট নিয়ে জনআলোচনা আবেগনির্ভর না হয়ে তথ্যনির্ভর হবে।
সমাধান: শুধু গ্যাস বাড়ানো নয়, গ্যাস বাঁচানোও
বাংলাদেশকে একই সঙ্গে দুটি পথে এগোতে হবে। একদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে হবে, নতুন সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান করতে হবে, এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখী করতে হবে এবং সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
অন্যদিকে বর্তমানে যে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তার প্রতিটি ঘনফুটের সর্বোচ্চ দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন-
১. অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতা নীতি।
২. অবৈধ সংযোগদাতা চক্রের বিরুদ্ধে সরবরাহ-চেইনভিত্তিক তদন্ত।
৩. পুরোনো পাইপলাইন দ্রুত সংস্কার।
৪. লিকেজ শনাক্তে আধুনিক প্রযুক্তি।
৫. স্মার্ট মিটারিং ও স্বয়ংক্রিয় ডাটা সংগ্রহ।
৬. GIS-ভিত্তিক পাইপলাইন ও সংযোগ ব্যবস্থাপনা।
৭. সিস্টেম লসের স্বাধীন ও নিয়মিত অডিট।
৮. উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত পরিদর্শন।
৯. অভিযানের ফলাফল প্রকাশ্যে প্রকাশ করা।
১০. কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারের দায় নির্ধারণে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
শেষ কথা: গ্যাস সংকটের পাশাপাশি জবাবদিহির সংকটও আছে
বাংলাদেশে গ্যাসের ঘাটতি বাস্তব। কিন্তু এই সংকটকে শুধু ভূগর্ভস্থ গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না।
কারণ একই সময়ে দেশীয় উৎপাদন কমছে, আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি বাড়ছে, শিল্পে গ্যাসের চাপ কমছে এবং বিদ্যুৎ ও উৎপাদন ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ছে। এর মধ্যেই তিতাসের অভিযানে হাজার হাজার অবৈধ সংযোগ এবং কিলোমিটারের পর কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন শনাক্ত হচ্ছে। শুধু এপ্রিলেই ৫,১২৮টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও প্রায় ২১ কিলোমিটার পাইপলাইন অপসারণের তথ্য এসেছে।
এই পরিসংখ্যান আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের সামনে দাঁড় করায়- অবৈধ গ্যাস সংযোগ কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি জ্বালানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার দৃশ্যমান উপসর্গ।
তাই শুধু চুলা কেটে দিলে হবে না। শুধু পাইপলাইন কেটে দিলেও হবে না। জরিমানা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রয়োজন সেই নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা, যে নেটওয়ার্ক অবৈধ সংযোগ তৈরি করে।
প্রয়োজন সেই ব্যবস্থাপনা চিহ্নিত করা, যে ব্যবস্থাপনায় অবৈধ সংযোগ দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে।
প্রয়োজন এমন জবাবদিহি নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো এলাকায় বারবার একই ধরনের অবৈধ সংযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে।
কারণ বাংলাদেশ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন বিদেশ থেকে ব্যয়বহুল এলএনজি এনে ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে। অথচ দেশের ভেতরেই মূল্যবান গ্যাসের অপচয় ও অবৈধ ব্যবহার ঠেকাতে আমরা এখনও পুরোপুরি সফল নই।
এটি শুধু জ্বালানি সংকট নয়। এটি ব্যবস্থাপনার সংকট। এটি স্বচ্ছতার সংকট। এটি জবাবদিহির সংকট।
আর সবচেয়ে বড় কথা- যে দেশে শিল্পকারখানা উৎপাদনের জন্য গ্যাসের অপেক্ষায় থাকে, সেখানে অবৈধ চুলায় গ্যাস জ্বলার কোনো নৈতিক, অর্থনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় যুক্তি থাকতে পারে না।
বাংলাদেশকে তাই শুধু প্রশ্ন করতে হবে না- “গ্যাস কোথায়?”
প্রশ্ন করতে হবে আরও গভীরে গিয়ে- “যে গ্যাস আমাদের আছে, তার কতটা বৈধভাবে ব্যবহার হচ্ছে, কতটা অপচয় হচ্ছে এবং কতটা অবৈধ পথে যাচ্ছে- রাষ্ট্র কি তার প্রতিটি ঘনফুটের হিসাব জানে?”
এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু নতুন গ্যাস পাওয়ার ওপর নির্ভর করে না; বর্তমান গ্যাসের প্রতিটি ঘনফুটের সঠিক হিসাব, সাশ্রয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপরও নির্ভর করে।
বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বড় সংস্কারের প্রথম ধাপ হতে পারে তাই খুব সহজ একটি নীতি- “গ্যাস শুধু খুঁজব না, গ্যাসের প্রতিটি ঘনফুটের হিসাবও রাখব।”
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক
সম্পাদক: ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
© ২০১৬–২০২৬ ক্রাইম প্রতিদিন। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।