বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে বঙ্গভবন। রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুলের নামই চূড়ান্ত হবে কি না, সেটি জানতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা করতে হবে।
তবু প্রশ্ন উঠেছে- কেন মির্জা ফখরুল? কেন এখন?
এর উত্তর খুঁজতে হলে বিএনপির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পথচলার দিকে তাকাতে হবে।
সংকটের সময়ে দৃশ্যমান নেতৃত্ব
বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন দলের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যখন কারাবন্দী ছিলেন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের বাইরে থেকে দল পরিচালনা করছিলেন, তখন দেশের রাজনৈতিক মাঠে বিএনপির বড় একটি অংশের নেতৃত্ব দিতে হয়েছে ফখরুলকে।
দলের কর্মসূচি ঘোষণা, সংবাদ সম্মেলন, আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে বক্তব্য, নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ- সব মিলিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ছিলেন বিএনপির রাজনৈতিক মুখ।
ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব থেকে মহাসচিব- দীর্ঘ এই পথচলায় দলের ভেতরে তাঁর একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দলীয় গণ্ডির বাইরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও তিনি তুলনামূলকভাবে সংযত ও গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের একটি অংশ মনে করেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা এবং দলের কঠিন সময়ে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে বসানো হলে সেটি হবে মর্যাদাপূর্ণ রাজনৈতিক সম্মান।
কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে-
ফখরুলকে কি বিএনপির বেশি প্রয়োজন বঙ্গভবনে, নাকি সরকার ও দলের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায়?
রাষ্ট্রপতি পদ: সম্মান, নাকি সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরত্ব?
রাষ্ট্রপতি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদগুলোর একটি। একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদকে এই পদে বসানো নিঃসন্দেহে সম্মানের।
কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত। ফলে একজন সক্রিয় রাজনৈতিক নেতাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে তিনি প্রত্যক্ষ দলীয় রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে চলে যাবেন।
মির্জা ফখরুলের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি শুধু বিএনপির মহাসচিব নন, তিনি সরকারেরও একজন অভিজ্ঞ মন্ত্রী।
তাঁকে বঙ্গভবনে পাঠানোর অর্থ হবে- একদিকে একজন পরীক্ষিত রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে সম্মানিত করা; অন্যদিকে দল ও সরকার হারাবে একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যবস্থাপককে।
এ কারণেই বিএনপির ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে- ফখরুলের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ ব্যবহার কোথায়?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সহজ সমীকরণ
সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলটির প্রার্থীই এগিয়ে থাকবেন- এমন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ফলে নির্বাচনটি অনেকটাই বিএনপির অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
অর্থাৎ প্রশ্ন এখন বিএনপি বনাম অন্য কোনো দল নয়; প্রশ্ন হলো- বিএনপির প্রার্থী কে?
মির্জা ফখরুল ছাড়াও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খানের নাম বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হয়েছে।
তবে ফখরুলের নামের রাজনৈতিক গুরুত্ব কিছুটা আলাদা।
কারণ তিনি দলের মহাসচিব। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির প্রকাশ্য রাজনৈতিক মুখ। সংকটের সময়ে দলের মাঠের রাজনীতি সামলানোর অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে।
ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপিতে কী বদলাবে?
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে বিএনপির সাংগঠনিক নেতৃত্বে।
তাঁর জায়গায় নতুন মহাসচিব নির্বাচন করতে হবে। আর নতুন মহাসচিব নির্বাচন মানেই দলের ভেতরে নতুন নেতৃত্বের ভারসাম্য তৈরি হওয়া।
কে মহাসচিব হবেন, তাঁর সঙ্গে দলের চেয়ারম্যানের সমন্বয় কেমন হবে, সাংগঠনিকভাবে কার প্রভাব বাড়বে- এসব প্রশ্ন সামনে আসবে।
অর্থাৎ একজনকে বঙ্গভবনে পাঠানোর সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু রাষ্ট্রপতি ভবন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পড়বে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতেও।
বিএনপিতে দুই ধরনের মত
মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়ে বিএনপির ভেতরে দুই ধরনের চিন্তা রয়েছে বলে দলীয় নেতাদের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
এক পক্ষ মনে করছে, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে বঙ্গভবনে পাঠানো উচিত। এটি হবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি।
অন্য পক্ষ মনে করে, নতুন সরকারের জন্য মির্জা ফখরুলের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে মাঠে রাখা বেশি প্রয়োজন। সরকার পরিচালনা, রাজনৈতিক সমন্বয় এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে।
দ্বিতীয় মতটির গুরুত্বও কম নয়।
কারণ একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা তৈরি হতে কয়েক দশক সময় লাগে। কিন্তু একটি সাংবিধানিক পদে কাউকে বসানো তুলনামূলকভাবে সহজ।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাজনীতিবিদ- কেন?
বিএনপি এবার রাষ্ট্রপতি পদে একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদকে মনোনয়ন দিতে চায়- দলীয় নেতাদের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত রয়েছে।
এর মাধ্যমে বিএনপি হয়তো একটি রাজনৈতিক বার্তাও দিতে চাইছে। রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে তারা রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বিষয়টি ভিন্ন।
রাষ্ট্রপতি তখন কেবল একটি দলের নেতা থাকবেন না; তিনি হবেন পুরো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান। তাই দলীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের দৃষ্টি তাঁর সিদ্ধান্তের দিকে।
মির্জা ফখরুলের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকলেও চূড়ান্ত ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অন্য কোনো সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না।
রাজনীতিতে শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
শেষ কথা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যদি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হন, তাহলে সেটি হবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একেবারে নতুন অধ্যায়।
একজন মহাসচিব, যিনি বছরের পর বছর দলের কঠিন সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি তখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসবেন।
কিন্তু সেই সঙ্গে বিএনপির সামনে তৈরি হবে আরও বড় প্রশ্ন- তাঁর জায়গায় কে আসবেন?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- বিএনপি কি ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেশি প্রয়োজন মনে করছে, নাকি সরকারের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায়?
এই সিদ্ধান্তের মধ্যেই লুকিয়ে থাকবে বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
ফখরুলের জন্য বঙ্গভবন হতে পারে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার সম্মানজনক পরিণতি। আবার তাঁকে সরকারে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্তও বোঝাতে পারে- বিএনপি মনে করছে, তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এখনো দল ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশি প্রয়োজন।
তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না।
এটি একই সঙ্গে বিএনপির নেতৃত্ব, সরকারের রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুল কোথায় যাচ্ছেন- বঙ্গভবনে, নাকি রাজনীতির মাঠেই থাকছেন- সেই উত্তরই এখন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত প্রশ্ন।
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক | সাংবাদিক | কলামিস্ট | রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সম্পাদক: ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
© ২০১৬–২০২৬ ক্রাইম প্রতিদিন। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।