
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে ড. আবদুল মঈন খান রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করেছেন। শিক্ষকতা, গবেষণা, রাজনীতি এবং বিভিন্ন সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর সামনে এবার এমন একটি মন্ত্রণালয়, যার কার্যক্রম দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
স্থানীয় সরকারকে বলা হয় রাষ্ট্রের সবচেয়ে কাছের স্তর। জাতীয় পর্যায়ে সরকার যে নীতি গ্রহণ করে, তার অনেকটাই বাস্তবায়িত হয় স্থানীয় পর্যায়ে। গ্রামের রাস্তা থেকে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ও পয়োনিষ্কাশন থেকে নাগরিক সেবা- সব ক্ষেত্রেই স্থানীয় সরকারের ভূমিকা রয়েছে। ফলে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব শুধু প্রশাসনিক নয়; এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ড. মঈন খানের সামনে তাই প্রত্যাশার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়।
স্থানীয় সরকারকে কার্যকর করা
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার কাঠামো দীর্ঘদিনের। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন- প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, অর্থায়ন, জনবল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয় সরকারকে কার্যকর করতে হলে শুধু দায়িত্ব অর্পণ করলেই হবে না; সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, দক্ষ জনবল ও প্রশাসনিক সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।
বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে বহুদিন ধরে আলোচনা হলেও বাস্তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখনো কেন্দ্রনির্ভর। ফলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান অনেক সময় স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে পারে না।
ড. মঈন খানের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হবে- কেন্দ্র ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে দায়িত্বের একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা।
উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প ও সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্থানীয় পর্যায়ে ছোট-বড় অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। এসব প্রকল্পের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা।
কিন্তু প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের মতামত কতটা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, প্রকল্পের ব্যয় কতটা যৌক্তিক, কাজের মান কেমন এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হচ্ছে কি না- এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
একটি রাস্তা নির্মাণের পর কয়েক মাসের মধ্যেই যদি তা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে বলা গেলেও জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার হয়েছে বলা যায় না।
তাই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা, ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানো এবং কাজের মান যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করা গেলে অপচয় ও অনিয়ম কমানো সম্ভব।
নগরায়ণের চাপ
বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণের দিকে এগোচ্ছে। শহরে জনসংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে আবাসন ও নাগরিক সেবার চাহিদা। কিন্তু পরিকল্পিত নগরায়ণের অভাবে অনেক শহরেই তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট, যানজট ও পরিবেশদূষণ।
ঢাকার সমস্যা সবচেয়ে দৃশ্যমান হলেও একই ধরনের সমস্যা এখন দেশের অন্যান্য শহরেও দেখা যাচ্ছে।
নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিকল্প নেই। একটি শহরে আগামী ১০ বা ২০ বছরে কত মানুষ বসবাস করবে, কতটা পানি প্রয়োজন হবে, বর্জ্য কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে, কোথায় খোলা জায়গা থাকবে, কীভাবে জলাধার সংরক্ষণ করা হবে- এসব বিষয় আগে থেকেই পরিকল্পনায় রাখতে হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
বর্ষা এলেই দেশের বিভিন্ন শহর ও পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। কোথাও ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপ্রতুল, কোথাও খাল দখল হয়ে গেছে, কোথাও আবার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে নগর পরিকল্পনার কোনো সমন্বয় নেই। একইভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও একটি বড় নাগরিক সমস্যা।
বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ অপসারণ- প্রতিটি ধাপেই আধুনিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। শুধু শহরের রাস্তা পরিষ্কার করলেই বর্জ্য সমস্যার সমাধান হয় না।
এখানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
পল্লী উন্নয়নের নতুন ধারণা
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পল্লী উন্নয়নও ড. মঈন খানের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো গ্রাম ও কৃষিনির্ভর। তবে পল্লী উন্নয়নকে শুধু রাস্তা, কালভার্ট ও অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।
গ্রামীণ মানুষের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি, কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন- এসব বিষয়কে পল্লী উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।
একজন কৃষক উৎপাদন করলেন, কিন্তু ন্যায্য মূল্য পেলেন না- এটি শুধু কৃষির সমস্যা নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতিরও সমস্যা। তাই উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত একটি সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।
সমবায় খাতকে কার্যকর করা
সমবায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। ক্ষুদ্র কৃষক, উদ্যোক্তা ও উৎপাদকদের সংগঠিত করে তাদের উৎপাদন ও বিপণন সক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর সম্ভাবনা কাজে লাগবে না।
প্রয়োজন স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, দক্ষ নেতৃত্ব, আধুনিক হিসাবব্যবস্থা এবং বাজারের সঙ্গে সমবায়কে যুক্ত করা।
সমবায়কে যদি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা যায়, তাহলে এটি গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিজিটাল স্থানীয় সরকার
বর্তমান যুগে নাগরিক সেবা যত দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকেও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।
নাগরিক সনদ, ট্রেড লাইসেন্স, কর প্রদান, অভিযোগ জানানো, প্রকল্পের তথ্য দেখা কিংবা বিভিন্ন সরকারি সেবার আবেদন- এসবের বড় অংশ অনলাইনে আনা সম্ভব।
ডিজিটাল ব্যবস্থা শুধু নাগরিকের সময় বাঁচাবে না; এটি মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়মের সুযোগও কমাতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ড. মঈন খানের বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণ
স্থানীয় সরকার তখনই কার্যকর হয়, যখন স্থানীয় মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে।
একটি এলাকায় কী প্রয়োজন, কোন রাস্তা আগে সংস্কার করা দরকার, কোথায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা প্রয়োজন কিংবা কোন প্রকল্প মানুষের জন্য বেশি জরুরি- এসব বিষয়ে স্থানীয় মানুষের মতামত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো দরকার।
স্থানীয় সরকারকে শুধু সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধির প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে নাগরিক অংশগ্রহণের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
প্রশাসনিক সক্ষমতা ও জবাবদিহি
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো দায়িত্ব ও সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্যের অভাব। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তাদের প্রয়োজনীয় জনবল, অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তাও দিতে হবে। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় রাখতে হবে।
জনগণের কাছে জবাবদিহি ছাড়া স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ নেই।
একজন মন্ত্রীর জন্য তাই শুধু নীতিমালা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সেই নীতিমালা মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করাও জরুরি।
শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা কতটা কাজে আসবে
ড. মঈন খানের পেশাগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শিক্ষকতা। একজন শিক্ষক সাধারণত যুক্তি, বিশ্লেষণ, প্রশ্ন এবং তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত হন। রাষ্ট্র পরিচালনায় এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কারণ স্থানীয় সরকারের প্রতিটি সমস্যা একরকম নয়। একটি এলাকার সমস্যার সমাধান অন্য এলাকার ক্ষেত্রে কার্যকর নাও হতে পারে। তাই স্থানীয় বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা যদি মাঠের বাস্তবতা বোঝার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তা নীতিনির্ধারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সাফল্যের মাপকাঠি কী হবে?
ড. মঈন খানের নতুন দায়িত্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে- তাঁর সাফল্য কীভাবে পরিমাপ করা হবে?
শুধু কতগুলো সভা হলো, কতগুলো প্রকল্প অনুমোদন হলো কিংবা কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলো- এসব দিয়ে সাফল্য বিচার করা যথেষ্ট নয়। সাফল্য বিচার করতে হবে মানুষের অভিজ্ঞতা দিয়ে।
একজন নাগরিক যদি দ্রুত সেবা পান, একজন কৃষক যদি তাঁর পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান, একটি গ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা যদি উন্নত হয়, একটি শহরের জলাবদ্ধতা যদি কমে, একটি সমবায় যদি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে- তাহলেই স্থানীয় সরকারের সাফল্য দৃশ্যমান হবে।
সামনে বড় পরীক্ষা
ড. মঈন খানের সামনে এখন এমন একটি দায়িত্ব, যেখানে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা যেমন কাজে লাগবে, তেমনি তাঁকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখিও হতে হবে।
স্থানীয় সরকারকে কার্যকর করা, পল্লী উন্নয়নকে মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা, সমবায়কে শক্তিশালী করা, নগর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা- সব মিলিয়ে কাজের পরিধি বিশাল। তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো- রাষ্ট্রের সেবা ও উন্নয়নকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে যাওয়া।
একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। একজন মন্ত্রী বৃহত্তর পরিসরে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার সুযোগ পান। ড. মঈন খানের সামনে এখন সেই বৃহত্তর দায়িত্ব।
এই দায়িত্বে তাঁর সাফল্য নির্ভর করবে তিনি কতটা মানুষের কথা শুনতে পারেন, কতটা বাস্তব সমস্যাকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন এবং কতটা দক্ষতার সঙ্গে নীতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে দূরত্ব কমাতে পারেন- তার ওপর।
স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা মানে শুধু একটি মন্ত্রণালয়কে শক্তিশালী করা নয়; এর অর্থ রাষ্ট্রকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে যাওয়া।
ড. মঈন খানের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ অনেক, প্রত্যাশাও কম নয়। এখন সময় কথার চেয়ে কাজে সেই প্রত্যাশার উত্তর দেওয়ার।
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
সম্পাদক: ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
© ২০১৬–২০২৬ ক্রাইম প্রতিদিন। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।