ঢাকা ০৩:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হবিগঞ্জে নাসীরুদ্দীন-সারজিসের গাড়িতে হামলা: ঘটনার আগে-পরে যা ঘটেছিল?

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
  • আপডেট সময় ০১:২০:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
  • / ৫৪৩ বার পড়া হয়েছে

হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও দলটির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের গাড়িতে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ শহরের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পর এনসিপির পক্ষ থেকে হামলার জন্য ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দায়ী করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি ও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, এনসিপি নেতাদের বক্তব্যের পর স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।

ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

 

কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে ঘটনা

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেলে হবিগঞ্জ শহরের টাউন হল এলাকায় এনসিপির একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেন।

কর্মসূচি শেষে নেতারা সার্কিট হাউসের উদ্দেশে রওনা হন। শহরের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় পৌঁছালে তাদের গাড়িবহর লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে বলে এনসিপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।

এ সময় সারজিস আলমের গাড়ি নিরাপত্তার জন্য সোনালী ব্যাংকের কার্যালয়ে আশ্রয় নেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়।

অন্যদিকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বহর থেকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে পৌঁছান বলে জানা গেছে।

 

এনসিপির বক্তব্য

এনসিপির নেতারা অভিযোগ করেছেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের গাড়িবহরে হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, হামলার সময় কয়েকজন সাংবাদিক ও দলীয় নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে এ ধরনের হামলা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং এটি রাজনৈতিক সহনশীলতার পরিপন্থী।

 

ছাত্রদলের বক্তব্য

অভিযোগ অস্বীকার করে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান বলেন, এনসিপি নেতাদের বক্তব্যের কারণেই স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।

তিনি দাবি করেন, বিএনপি নেতাদের নিয়ে দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

তবে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে হামলায় তাদের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

ঘটনার আগে কী হয়েছিল?

ঘটনার আগে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে এনসিপির একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সেখানে দেওয়া কিছু বক্তব্যকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় বলে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন।

তবে ওই বক্তব্য এবং পরবর্তী হামলার ঘটনার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হতে পারে।

 

পুলিশের বক্তব্য

হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদ হোসেন জানান, এনসিপির পদযাত্রা শেষে ছাত্রদলের নেতারা বিক্ষোভ করেন। এতে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে এনসিপির কয়েকজন নেতাকে নিরাপদে সার্কিট হাউসে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

তবে হামলার ঘটনায় কারা জড়িত ছিল বা কী কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে- এ বিষয়ে পুলিশ বিস্তারিত তদন্ত করছে।

যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন

হবিগঞ্জের ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে-

* গাড়িবহরে হামলা কি পূর্বপরিকল্পিত ছিল, নাকি তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফল?

* হামলার সঙ্গে কারা জড়িত ছিল?

* ঘটনার আগে কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য বা কর্মসূচি পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছিল কি না?

* আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি ছিল কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রশ্ন

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে একই সঙ্গে কোনো ঘটনার দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে অভিযোগের পাশাপাশি প্রমাণ ও তদন্তের ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

 

উপসংহার

হবিগঞ্জে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলমের গাড়িতে হামলার অভিযোগ নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। এনসিপি এটিকে হামলা হিসেবে দেখছে, আর ছাত্রদল বলছে- ঘটনার পেছনে ছিল বক্তব্যজনিত উত্তেজনা।

ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক সাংবাদিক কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

নিউজটি শেয়ার করুন

হবিগঞ্জে নাসীরুদ্দীন-সারজিসের গাড়িতে হামলা: ঘটনার আগে-পরে যা ঘটেছিল?

আপডেট সময় ০১:২০:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও দলটির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলমের গাড়িতে হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ শহরের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পর এনসিপির পক্ষ থেকে হামলার জন্য ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দায়ী করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি ও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, এনসিপি নেতাদের বক্তব্যের পর স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।

ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

 

কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে ঘটনা

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেলে হবিগঞ্জ শহরের টাউন হল এলাকায় এনসিপির একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেন।

কর্মসূচি শেষে নেতারা সার্কিট হাউসের উদ্দেশে রওনা হন। শহরের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় পৌঁছালে তাদের গাড়িবহর লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে বলে এনসিপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।

এ সময় সারজিস আলমের গাড়ি নিরাপত্তার জন্য সোনালী ব্যাংকের কার্যালয়ে আশ্রয় নেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে সার্কিট হাউসে নিয়ে যায়।

অন্যদিকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বহর থেকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে পৌঁছান বলে জানা গেছে।

 

এনসিপির বক্তব্য

এনসিপির নেতারা অভিযোগ করেছেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের গাড়িবহরে হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, হামলার সময় কয়েকজন সাংবাদিক ও দলীয় নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে এ ধরনের হামলা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং এটি রাজনৈতিক সহনশীলতার পরিপন্থী।

 

ছাত্রদলের বক্তব্য

অভিযোগ অস্বীকার করে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান বলেন, এনসিপি নেতাদের বক্তব্যের কারণেই স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।

তিনি দাবি করেন, বিএনপি নেতাদের নিয়ে দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

তবে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে হামলায় তাদের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

ঘটনার আগে কী হয়েছিল?

ঘটনার আগে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে এনসিপির একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সেখানে দেওয়া কিছু বক্তব্যকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় বলে কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন।

তবে ওই বক্তব্য এবং পরবর্তী হামলার ঘটনার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হতে পারে।

 

পুলিশের বক্তব্য

হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদ হোসেন জানান, এনসিপির পদযাত্রা শেষে ছাত্রদলের নেতারা বিক্ষোভ করেন। এতে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে এনসিপির কয়েকজন নেতাকে নিরাপদে সার্কিট হাউসে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

তবে হামলার ঘটনায় কারা জড়িত ছিল বা কী কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছে- এ বিষয়ে পুলিশ বিস্তারিত তদন্ত করছে।

যেসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন

হবিগঞ্জের ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে-

* গাড়িবহরে হামলা কি পূর্বপরিকল্পিত ছিল, নাকি তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফল?

* হামলার সঙ্গে কারা জড়িত ছিল?

* ঘটনার আগে কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য বা কর্মসূচি পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছিল কি না?

* আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি ছিল কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রশ্ন

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে একই সঙ্গে কোনো ঘটনার দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে অভিযোগের পাশাপাশি প্রমাণ ও তদন্তের ফলাফলকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

 

উপসংহার

হবিগঞ্জে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সারজিস আলমের গাড়িতে হামলার অভিযোগ নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া গেছে। এনসিপি এটিকে হামলা হিসেবে দেখছে, আর ছাত্রদল বলছে- ঘটনার পেছনে ছিল বক্তব্যজনিত উত্তেজনা।

ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক সাংবাদিক কলামিস্ট ও বিশ্লেষক