ঢাকা ০৭:৫৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্যাস সংকটে নাজেহাল দেশ, সমাধান হবে কবে?

ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
  • আপডেট সময় ০৫:১২:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
  • / ৮৮৯ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও নগরজীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ, সার কারখানা, বস্ত্রশিল্প, সিরামিক, কাচ, ইস্পাত, সিমেন্ট, সিএনজিচালিত পরিবহন এবং লাখো পরিবারের রান্নার ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাস সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও দ্রুত জাতীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক গ্যাস সংকট সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দিনের পর দিন আবাসিক এলাকায় গ্যাসের চাপ নেই। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কমেছে, অনেক কারখানা আংশিক সক্ষমতায় চলছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চালকেরা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (FSRU) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে, যেখানে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি টার্মিনালের ত্রুটিতেই কেন পুরো দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা এতটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল?

এর উত্তর খুঁজতে হলে বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা বিশ্লেষণ করতে হবে।

বাংলাদেশে গত এক দশকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলো পরিণত পর্যায়ে পৌঁছেছে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। এই বাস্তবতা নতুন নয়; জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন। কিন্তু উৎপাদন কমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উন্নয়নের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি।

বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের অফশোর এলাকায় উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান কার্যক্রম সীমিত ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু নতুন উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনুসন্ধান থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে সাধারণত কয়েক বছর সময় লাগে। ফলে দীর্ঘদিনের ঘাটতি অল্প সময়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।

দেশীয় উৎপাদনের এই ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ছিল, কারণ দ্রুত বাড়তে থাকা শিল্প ও বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে তাৎক্ষণিক বিকল্প সীমিত ছিল। কিন্তু এলএনজির ওপর অতিনির্ভরতা নতুন ঝুঁকিও তৈরি করেছে।

বর্তমানে দেশের আমদানিকৃত এলএনজির বড় অংশ দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। এর যেকোনো একটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়ে। সাম্প্রতিক সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে পর্যাপ্ত বিকল্প সক্ষমতা নেই। অর্থাৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সাময়িকভাবে অচল হলে সেটির ক্ষতি দ্রুত পুষিয়ে দেওয়ার মতো প্রস্তুতি সীমিত।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিমের পর্যবেক্ষণও একই দিকে ইঙ্গিত করে। তাঁর মতে, দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সক্ষমতা না থাকায় একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেই শিল্প ও অর্থনীতি বড় চাপের মুখে পড়ে। অন্যদিকে ড. ইজাজ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। তাঁর মতে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল এবং বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা ছাড়া এই ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসতে পারে।

এ সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে গেলে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহে সমস্যা হতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিলে ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়ে।

আবাসিক পর্যায়ে সংকটের চিত্র আরও মানবিক। অনেক পরিবার গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন রান্না সেরে রাখছেন। কেউ বিদ্যুৎচালিত চুলা বা এলপিজির ওপর নির্ভর করছেন। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এই বিকল্পগুলো অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে সিএনজি-চালিত যানবাহনের চালকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে তাঁদের আয় কমছে, যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে এবং নগর পরিবহন ব্যবস্থাও প্রভাবিত হচ্ছে।

তবে এই সংকটের জন্য শুধু একটি যান্ত্রিক ত্রুটি বা একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতাকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। আজ যে অনুসন্ধান শুরু হবে, তার ফল হয়তো পাঁচ থেকে সাত বছর পরে পাওয়া যাবে। আবার আজ যে অবকাঠামো নির্মাণ হবে, তা ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলার ভিত্তি তৈরি করবে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক নীতিগত পরিকল্পনার বিকল্প নেই।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইউরোপের অনেক দেশ একাধিক এলএনজি টার্মিনাল, গ্যাস সংরক্ষণ ব্যবস্থা, বহুমুখী সরবরাহ উৎস এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তির মাধ্যমে ঝুঁকি কমিয়েছে। কোনো একটি স্থানে সমস্যা দেখা দিলেও পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদে এমন একটি স্থিতিশীল ও বহুমাত্রিক জ্বালানি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।

একই সঙ্গে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিল্পে এখনো তুলনামূলক কম দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে একই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে বেশি উৎপাদন সম্ভব হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়াতে পারলেও গ্যাসের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।

বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত সচল করা, বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি আমদানি, শিল্প ও আবাসিক খাতে সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি। তবে সংকট সাময়িকভাবে কাটিয়ে ওঠাই যথেষ্ট নয়।

দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, অফশোর ব্লক দ্রুত উন্নয়ন, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, গ্যাস সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প সক্ষমতা তৈরি এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর মতো নীতিগত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে এই খাতে বিনিয়োগ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাস সরবরাহের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই বর্তমান সংকটকে শুধু একটি সাময়িক প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

গ্যাস সংকটে নাজেহাল দেশ- সমাধান হবে কবে? এর উত্তর কোনো এক সপ্তাহ বা এক মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সমাধান নির্ভর করছে দূরদর্শী পরিকল্পনা, দেশীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, বহুমুখী জ্বালানি কৌশল এবং সময়োপযোগী নীতিগত সংস্কারের ওপর। আজকের সংকট যদি সেই পরিবর্তনের প্রেরণা হয়ে ওঠে, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। অন্যথায় একই ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে, আর তার মূল্য দিতে হবে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষকেই।

 

ড. এ জেড এম. মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক | সাংবাদিক | কলামিস্ট | বিশ্লেষক

নিউজটি শেয়ার করুন

গ্যাস সংকটে নাজেহাল দেশ, সমাধান হবে কবে?

আপডেট সময় ০৫:১২:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও নগরজীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ, সার কারখানা, বস্ত্রশিল্প, সিরামিক, কাচ, ইস্পাত, সিমেন্ট, সিএনজিচালিত পরিবহন এবং লাখো পরিবারের রান্নার ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাস সরবরাহে সামান্য বিঘ্নও দ্রুত জাতীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক গ্যাস সংকট সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দিনের পর দিন আবাসিক এলাকায় গ্যাসের চাপ নেই। শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন কমেছে, অনেক কারখানা আংশিক সক্ষমতায় চলছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চালকেরা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (FSRU) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে, যেখানে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ৪৪ শতাংশ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি টার্মিনালের ত্রুটিতেই কেন পুরো দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা এতটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল?

এর উত্তর খুঁজতে হলে বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা বিশ্লেষণ করতে হবে।

বাংলাদেশে গত এক দশকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমেছে। বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলো পরিণত পর্যায়ে পৌঁছেছে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। এই বাস্তবতা নতুন নয়; জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে এ বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন। কিন্তু উৎপাদন কমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উন্নয়নের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি।

বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের অফশোর এলাকায় উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় অনুসন্ধান কার্যক্রম সীমিত ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু নতুন উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনুসন্ধান থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে সাধারণত কয়েক বছর সময় লাগে। ফলে দীর্ঘদিনের ঘাটতি অল্প সময়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।

দেশীয় উৎপাদনের এই ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ছিল, কারণ দ্রুত বাড়তে থাকা শিল্প ও বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে তাৎক্ষণিক বিকল্প সীমিত ছিল। কিন্তু এলএনজির ওপর অতিনির্ভরতা নতুন ঝুঁকিও তৈরি করেছে।

বর্তমানে দেশের আমদানিকৃত এলএনজির বড় অংশ দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। এর যেকোনো একটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা চাপে পড়ে। সাম্প্রতিক সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের জ্বালানি অবকাঠামোতে পর্যাপ্ত বিকল্প সক্ষমতা নেই। অর্থাৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সাময়িকভাবে অচল হলে সেটির ক্ষতি দ্রুত পুষিয়ে দেওয়ার মতো প্রস্তুতি সীমিত।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিমের পর্যবেক্ষণও একই দিকে ইঙ্গিত করে। তাঁর মতে, দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সক্ষমতা না থাকায় একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেই শিল্প ও অর্থনীতি বড় চাপের মুখে পড়ে। অন্যদিকে ড. ইজাজ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। তাঁর মতে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল এবং বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা ছাড়া এই ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসতে পারে।

এ সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে গেলে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহে সমস্যা হতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিলে ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়ে।

আবাসিক পর্যায়ে সংকটের চিত্র আরও মানবিক। অনেক পরিবার গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন রান্না সেরে রাখছেন। কেউ বিদ্যুৎচালিত চুলা বা এলপিজির ওপর নির্ভর করছেন। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য এই বিকল্পগুলো অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে সিএনজি-চালিত যানবাহনের চালকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে তাঁদের আয় কমছে, যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে এবং নগর পরিবহন ব্যবস্থাও প্রভাবিত হচ্ছে।

তবে এই সংকটের জন্য শুধু একটি যান্ত্রিক ত্রুটি বা একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতাকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। আজ যে অনুসন্ধান শুরু হবে, তার ফল হয়তো পাঁচ থেকে সাত বছর পরে পাওয়া যাবে। আবার আজ যে অবকাঠামো নির্মাণ হবে, তা ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলার ভিত্তি তৈরি করবে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক নীতিগত পরিকল্পনার বিকল্প নেই।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ইউরোপের অনেক দেশ একাধিক এলএনজি টার্মিনাল, গ্যাস সংরক্ষণ ব্যবস্থা, বহুমুখী সরবরাহ উৎস এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তির মাধ্যমে ঝুঁকি কমিয়েছে। কোনো একটি স্থানে সমস্যা দেখা দিলেও পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদে এমন একটি স্থিতিশীল ও বহুমাত্রিক জ্বালানি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।

একই সঙ্গে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিল্পে এখনো তুলনামূলক কম দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে একই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে বেশি উৎপাদন সম্ভব হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়াতে পারলেও গ্যাসের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব।

বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত সচল করা, বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি আমদানি, শিল্প ও আবাসিক খাতে সরবরাহের ভারসাম্য রক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি। তবে সংকট সাময়িকভাবে কাটিয়ে ওঠাই যথেষ্ট নয়।

দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা, অফশোর ব্লক দ্রুত উন্নয়ন, স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, গ্যাস সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প সক্ষমতা তৈরি এবং জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর মতো নীতিগত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে এই খাতে বিনিয়োগ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু বিদ্যুৎ বা গ্যাস সরবরাহের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই বর্তমান সংকটকে শুধু একটি সাময়িক প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

গ্যাস সংকটে নাজেহাল দেশ- সমাধান হবে কবে? এর উত্তর কোনো এক সপ্তাহ বা এক মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত সমাধান নির্ভর করছে দূরদর্শী পরিকল্পনা, দেশীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, বহুমুখী জ্বালানি কৌশল এবং সময়োপযোগী নীতিগত সংস্কারের ওপর। আজকের সংকট যদি সেই পরিবর্তনের প্রেরণা হয়ে ওঠে, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। অন্যথায় একই ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে, আর তার মূল্য দিতে হবে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষকেই।

 

ড. এ জেড এম. মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক | সাংবাদিক | কলামিস্ট | বিশ্লেষক