ঢাকা ১২:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
Logo বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি নতুন বিমান কেনার চুক্তি করেছে : মাহদী আমিন Logo অর্থনীতি-বাণিজ্যে সহযোগিতা বাড়াতে তারেক রহমান ও এরদোয়ানের বৈঠক Logo জাতিসংঘের ভাষণে ট্রাম্পে : ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার হুমকি Logo বিশ্বমঞ্চে প্রথম ভাষণ দিতে নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী Logo অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য অনেকটাই উন্মোচিত বলে দাবি করেছে পুলিশ : দুপুরে সংবাদ সম্মেলন Logo হতাশ হয়ে মাথা গরম না করে জনগণের দাবি মেনে নেওয়া উচিত : জামায়াত আমির Logo ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনে সৌদির ২৬ বিমান অভিযান, দাবি হুথিদের Logo একাদশে ভর্তির প্রথম ধাপের ফল প্রকাশ, ক্লাস শুরু ২৪ সেপ্টেম্বর Logo জাতিসংঘ অধিবেশনে যেতে মাহমুদ আব্বাসকে ভিসা দেয়নি ওয়াশিংটন Logo সংগীতশিল্পী সালমার বাবা ফজলুল হক আর নেই

বৈষম্য

ক্রাইম প্রতিদিন ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১১:৩২:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২৫০৯ বার পড়া হয়েছে

ফাহমিদা রিআ'র ছোট গল্প "বৈষম্য"

বৈষম্য

// ফাহমিদা রিআ //

লাউ চিংড়ির তরকারির সাথে পুই চচ্চড়ি আর ধনে পাতার চাটনি সাজিয়ে লাল চালের ভাপ ওঠা ভাত বেড়ে সলিমকে খেতে ডাকে আরমানী ।
কবুতরের খােপগুলিতে তার দিয়ে বাঁধন দিচ্ছিল সলিম মিয়া । বাতাসের দিন আসছে , তাই একটু সাবধান হওয়া । হাত না থামিয়ে বললাে ,
—–এট্টু দেরি হবি , তুই ততক্ষণে পুকুরে একটা ডুব দিয়ে আয় , এক সংগে খাবানে । ”
—–আমার যে কাপড় ধুতি রয়েছে আজ । তুমারে খাইয়ে তবেইতাে ঘাটে যেতি হবি ।
—–বেলা পইড়ে এলাে । আজ কাপড় ধুতি হবে না ।

মানুষটার এই এক দোষ , যেদিন দুপুরে বাড়িতে থাকবে আরমানীকে না নিয়ে খাবে না কিছুতেই । ছেলে দুটিকে গ্রামের জুনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি করানাের পর থেকে বাড়িটা সারা দুপুর খাঁ খাঁ করে । গ্রামের চার মাথার মােড়ে একটা চায়ের দোকান আর ছােট ক্ষেতে ফসল ফলিয়ে চারটি প্রাণীর দিন যায় এক রকম । সবচেয়ে বড় কথা , উপচে পড়া ভালবাসা আছে সংসারটায় , তাই দৈন্যতা মুছে যায় ওতেই ।

হাতের তালুতে নারকেল তেল ঢেলে মাথায় ঘষতে ঘষতে পুকুর ঘাটের দিকে এগিয়ে যায় আরমানী । দুটো ডুব দিয়ে তড়িঘড়ি করে ফিরেও আসে । ঘরের বেড়ায় কাপড় শুকোতে গিয়ে উঠোনে অপরিচিত কণ্ঠ শুনে ।
—–কে এলাে এই ভর দুপুরে ?

ঘােমটা টেনে উঠোন পেরিয়ে ঘরে ঢুকে আরমানী ।

সলিমের কণ্ঠ কানে আসে,
—– আমার বিশ্বাস হতিছে না বাবা । এ তুমি কি খবর শােনালে আমায় । ঠিক আছে , এসে যখন পইড়েছো আর হারাচ্ছিনে । এখন চারটে খেয়ে নাও , পরে সব কথা শুনবাে ।

আরমানী বুঝতে পারে কোন অতিথ মেহমান এসছে দূরের । কিন্তু এমন কারাে কথা আগেতাে শুনেনি ।
—– কইগাে , খাবার বাড়াে জলদি ।
বলতে বলতে ঘরে ঢুকে সলিম মিয়া । দু’চোখে খুশী যেন উপচে পড়ছে । অতিথির পরিচয় এক কথায় যা বললাে সলিম মিয়া, আরমানী তা শুনে ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠলাে যেন । নতুন করে এ আবার কোন আপদ এলাে এতকাল পরে । সলিম মিয়ার আগের পক্ষের একমাত্র মেয়ে সেলিনার স্বামী এসেছে । অনেক খুঁজে শ্বশুরকে বের করেছে । জামাইতাে পরের ছেলে , তার এত টান থাকবে কেন শ্বশুরকে দেখার , নিশ্চয় শ্বশুরের ভিটেয় ভাগ বসাতে চায় । এসব আগাম ভাবনা ভাবতে ভাবতে আরমানী বিষন্ন মুখে খাবার তুলে দেয় দুটি পাতে । শ্বশুর জামাইয়ের অনেক কথা হয় খেতে খেতে । সলিম যে মেয়ের জন্য এত অস্থির থাকতাে মনে মনে আরমানী কখনও টের পায়নি তাে এই পনের বছরের সংসারে ।

পাক ঘরের পাশে ছনের চালা তুলে দুই ছেলের জন্য ছােট্ট একটা ঘর তুলে দিয়েছে সলিম মিয়া । লতিয়ে উঠা কুমড়াে গাছটা সবুজে ছেয়ে ফেলেছে পুরাে চালটাই ।সলিম মিয়া জামাইকে নিয়ে সেই ঘরে বসে শুরু করে অতীতের স্মৃতিচারণ ।

গ্রামের দুলাল কন্ট্রাকটর টেন্ডারে কাজ পেল সেই খুলনা অঞ্চলে । সেই সুত্রে লেবারের কাজে আটজনের সংগে সলিমেরও যাওয়া । বিশ – বাইশ বছরের সুঠাম যুবক । দূর দেশে মাস ছয়েকের কাজে গেছে । গ্রামে একা পড়ে রয়েছে বিধবা মা । মাঝে মধ্যে তাই ছটফট করে উঠে মনটা ।

ঘটনাক্রমে সেই অঞ্চলের মুদি দোকানদার হারু মিয়ার সংগে আলাপ হয় । এক সময় ঘনিষ্ঠতা বাড়ে । শেষতক হারু মিয়া ও তার স্ত্রীর প্ররােচণায় তাদের মেয়ে জরিকে বিয়েও করে সলিম ।

কাজ ফুরোলাে কিন্তু সলিম ফিরলাে না নিজ গাঁয়ে । বিধবা মা কেঁদে বুক ভাসালাে । তার জোয়ান – ছেলেকে যাদু করে হারু মিয়া ঘরজামাই করে রেখে দিয়েছে । পর হয়ে গেছে ছেলে । হতাশায় আর অভাবে ভুগে ভুগে দু’মাসের মধ্যে মরেও গেল সলিমের মা।

অনেক পরে খবর পেল সলিম । অনুশােচনায় মনটা ক্ষত – বিক্ষত হতে থাকলাে । বাপের ভিটেতে ফিরে যাবার জন্য মন স্থির করলাে । তবুও তাে তার দুঃখিনী মার ভিটাতে সকাল – সন্ধ্যা বাতি জ্বালাতে পারবে ।
কিন্তু জরির বাবা – মা একমাত্র মেয়েকে এত দূর অঞ্চলে পাঠাবে না সাফ জানিয়ে দিল । দোকান ভিটে বাড়ী এসব তারা মরে গেলে জরিরই হবে , শেষ বয়সে তাদের দেখা শুনার জন্যই মেয়েকে ঘর জামাই করে রাখবে এসবের বিনিময়ে । সলিমের বিক্ষিপ্ত মন তবুও টিকতে চাইলাে না ।

জরিও অবশেষে সলিমের সংগী হলাে মনের উপর জোর করেই । কিন্তু সলিমের এমন দীন হীন অবস্থা আর অভাবের তাড়নায় অনভ্যস্ত জরি পাল্লা দিতে গিয়ে রীতিমত হিমশিম খেতে লাগলাে । গরীব হলেও হারুমিয়ার একমাত্র সন্তান হিসেবে জরি মানুষ হয়েছে হাতের কাছে সব কিছু পেয়েই । একগুয়ে আর জেদী স্বভাবটাও রপ্ত হয়েছিলো অতি আদরের কারণে । অভাবের তাড়নায় জরির সাথে সলিমেরও সারাক্ষণ খিটখিটে কথা বার্তা চলতে থাকে । জরির সহ্যের সীমা ছাড়তে ছাড়তে এক সময় সলিমও সীমা হারিয়ে ফেলে । এক কথা দুকথা তর্ক শেষে এক পর্যায়ে সলিমের হাতের চেলাকাঠ পড়ে জরির পিঠের উপর । সেই যে পাঁচ মাসের মেয়ে সেলিনাকে কোলে করে জরি ঘর ছেড়েছে আর ফিরে আসেনি সলিমের সংসারে। রাগ কমে গেলে সলিম আবার আনতে গিয়েছে । হারু মিয়ার দলবল জোর করে তালাক নামা লিখিয়ে নিয়ে ফেরৎ পাঠিয়েছে আপন গাঁয়ে ।

কিছুদিন পর খবর এসেছে সলিম মিয়ার কাছে , হারুমিয়া জরির আবার বিয়ে দিয়ে ঘর জামাই রেখেছে । মেয়েকে নিয়ে আসবার টান অনুভব করলেও আনতে পারেনি শেষতক সলিম। জগৎ সংসারে তার কেইবা আছে যে মেয়েকে পেলে পুষে বড়টি করবে , ভাগ্যে থাকলে একদিন বাপ মেয়ের দেখা হবেই ।

সেই ভাগ্যই আজ তার ঘরে । বছর খানেক হলাে সেলিনার বিয়ে হয়েছে । সেই পাঠিয়েছে তার স্বামীকে, ঠিকানা খুঁজে বাবার সন্ধানে।

সলিম মিয়ার চোখে অনেকদিন পর আজ সেলিনার শিশু মুখটা ভেসে উঠে বার বার হৃদয় নাড়া দিয়ে । বিকেল বেলা সলিম মিয়া থলে হাতে বাজারের দিকে যাবার কালে আরমানীকে বলে যায় ,
—–জামাই মানুষ ঘরে , অনাদর যেন না হয় । কখন কি লাগবে একটু খোঁজ – খবর কইরাে । রাতের ট্রেনে খুলনা যেতি চায় – সেলিনারে নিয়ে ফিরবে সপ্তাখানেক পর ।
কথার জবাব দেয় না আরমানী , কলসটা কাঁখে নিয়ে পুকুর ঘাটে হাঁটা দেয় ।
সবই বুঝে সলিম । দুপুরের পর থেকে সদা হাস্যোজ্জ্বল আরমানীর বিষন্নতাটুকু সে টের পায় । কি আর করা । না বুঝার ভান করে সেও কাজ চালিয়ে নিচ্ছে । ষোলটা বছর পর তার মেয়েকে সে দেখতে পাবে । একি কম ভাগ্যের কথা । সেই যে কোন অতীতে জরির কাছে আঘাত পেয়ে গ্রাম সম্পর্কীয় এক খালার বিধবা বােনঝি আরমানীকে সলিম বিয়ে করে। ঐ ঘটনার বছর খানেক পর । তারপর পনেরটি বছর কেটেছে সংসারে । এর মধ্যে ফারুখ – ফয়েজ দুই ছেলের বাবা হয়েছে । সুখের সংসারে একটিবারের জন্যও তাে জরি বা সেলিনার কথা মনে পড়েনি । হঠাৎ করে সেলিনার নাম শুনে বুকের মাঝে লুকিয়ে থাকা কোন গহীন থেকে এত মায়া ছলকে উঠে তার মনকে ভিজিয়ে দিল ।

ফারুক – ফয়েজ স্কুল থেকে ফিরে তাদের ঘরে নতুন মানুষ দেখে অবাক হয় । সেলিনার স্বামী তাদের ডেকে পাশে বসায় ।
ফারুখ বড় বড় চোখ করে তাকায়,
—– আপনেরেতে আমরা চিনি নে ।
আরমানী ঘরে ঢুকতে ঢুকতে শুনতে পায় ছেলে দুটিও দিব্যি বাপের মত আলাপ জুড়ে দিয়েছে ।

আরমানী ওদের নাম ধরে ডাকতেই ওরা ছুটে এসে মাকে জিজ্ঞেস করে,
—– মানুষটা কে মা ? খুব সুন্দর কইরে কথা কতি পারে ।
আরমানী সে কথার জবাব না নিয়ে ওদের খেতে বসায় । দুই ভাই নিত্যকার মত হাজারটা কথা বলে আর খায় । ফারুখ বলে ,
—–মানুষটা কয় কি জান মা ? তার নাম নাকি রাজা , কিন্তু রাজ্য নাই ।

আরমানীর হাত থেকে কাঁসার চামুচটা পড়ে যায় সশব্দে টিনের থালার উপর । শব্দটা গিয়ে লাগে ঠিক বুকের মাঝখানটায় । এতক্ষণের উদাসীনতা হঠাৎই সরব হয়ে উঠে যেন । ফারুখের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে
—–রাজা ? পােলাটার বাড়ী কোনে ?
ফয়েজ দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বলে,
—–সেইটেইতাে মজা । বলে কি ঘর বাড়ী নেই । পাইক – পেয়াদা নেই , হাতী ঘােড়া নেই , তবুও সে রাজা ।
আরমানী এবার বিরক্তির সুরে বলে ,
—–হয়েছে হয়েছে । আর কথা কতি হবি না । বেলা পইড়ে এলাে । এবার খেয়ে উঠ্ শিগগিরই ।

মুখে বলে ঠিকই , কিন্তু মনটা চলে যায় সেই সুদূরে । ফেলে আসা ষােল বছর আগের সেই অতীতে ।

সন্ধ্যের পিদিম হাতে নিজেই ঢােকে সেই ঘরে।কি জানি কিসের টান অনুভবে এসে জড়ো হয় । ছেলেটি টান টান হয়ে শুয়ে চোখ বুজে পড়ে রয়েছে । সেদিকে তাকিয়ে আরমানীর কেমন যেন মায়া হয় ।মনকে অনকে বুঝায় , দুত্তোর রাজা নাম কি একজনেরই হয় নাকি ? কুপি রেখে দোরের কাছে এসে আবারও ফিরে গিয়ে ডাকে ,
—–সাঁঝ বেলাতে শুয়ে থাকতি নেই । ফারুখ – ফয়েজদের নিয়ে একটু ঘুইরে এসাে গাঁয়ে ।

তন্দ্রাই এসে গিয়েছিল বােধ হয় ছেলেটির । আরমানীর কণ্ঠ শুনে ধড়মড়িয়ে উঠে বসে । বলে , —–বাজান কি ফিরছে ?
আরমানী সে কথার জবাব না দিয়ে বলে-
—– ফারুখের কাছে জানলাম তােমার নাম রাজা ? বাড়ি কোনে ?
রাজা হাসে এবার –
—–মায়ে নাকি খুব সখ করে নাম রেখেছিল গরীবের ছেলের নাম রাজা । এতিম খানার স্যারে বলতাে এতিম খানাটাই তাের রাজ্য রে রাজা ।

আরমানী ভেতরে ভেতরে ব্যস্ত হয় । মুখে বলে তােমার বাড়ী কোনে ছিল সেইটে আগে জানতি চাইছি ।
রাজা হাসে তেমনি নির্লিপ্ত ভাবে –
—–এতিমের আবার বাড়ী ঘর । বাবার হায়াত ছিল না , মরলাে । সেই সাথে মাও পালিয়ে বাঁচলাে আমার ফেলে দিয়ে । কে একজন দয়া দেখিয়ে সেই চার বছর বয়সে এতিমখানায় ভর্তি করে দিয়েছিল । ওরাই খেতে পরতে দিয়েছে , লেখাপড়া শিখিয়েছে । একটা পাস দেয়ার পর অফিসে একটা ছােট খাট চাকরিও জুটিয়ে দিয়েছে । তবে রাজার ভাগ্য বলে কথা , হারু মিয়ার দোকনসহ নাতনীকে পেয়েছি । অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা । হা হা হা…..

একটানা এতগুলাে কথা বলে থামে রাজা ।একটু বেশী কথা বলে ছেলেটি , তবে আকর্ষণও করে কথার যাদুতে । আরমানীর আর কিছুই জানবার নেই । চোখের পর্দায় একের পর এক ছবির আসা যাওয়া চলতে থাকে । মামা – মামীর অভাবের সংসারে বােঝা স্বরূপ মানুষ হওয়া আরমানীর বিয়ে হয়েছিল চির রুগ্ন দিন মজুরের সাথে । বিয়ের পরের বছরেই কোল জুড়ে যখন ছেলে এলাে আরমানীর সব দুঃখ ভুলে গেল । রাজ্যের সুখ তার কোল জুড়ে । তাই নাম রাখলাে রাজা । কিন্তু অর্ধমৃত দিনমজুর স্বামীটি পুরােপুরি মরে গেল রাজার বয়স চার না হতেই । মামা – মামীর চক্ষু শুল হয়ে ফিরে এলাে অসহায় দুটো প্রানী ।

কিছু দিন পর আপদ তাড়াতে সক্রিয় মামা – মামী দু’প্রান্তে বিচ্ছেদ ঘটালাে মা ও ছেলের । সেই কবেকার কথা । বিধবা আরমানীর আবার সংসার হয়েছে । সলিম পােড় খাওয়া মানুষ। আরমানীকে সুখে ভরিয়ে রেখেছে । ফারুখ – ফয়েজের দুটো পিঠে পিঠি ছেলেকে মানুষ করতে করতে সুখের ধন রাজাকে মনে পড়েছে , আঁচলে চোখ মুছেছে প্রতিটি দিনই ।
সবার অগােচরে পুষে রাখা দুঃখটা আজ যেন বেরিয়ে পড়তে চাইছে । এ যে তারই রাজা । খুব বলতে ইচ্ছে করে ,
—–রাজা তাের নাভীর বাঁ পাশটায় একটা কাটা দাগ আছে, বাপ? ছোটবেলায় আঘাত পাওয়া সেই দাগটা ?
কিন্তু বলা হয় না । বলবার সাহস যোগায় না আরমানীর। রাজা মাকে চিনতে পেরে স্বার্থপর ভাবে যদি। ভাবে নিজের সুখ তৈরির জন্য মা তাকে দুরে ঠেলে দিয়েছে ।

সলিম বাজার থেকে ফিরতেই আরমানীর হাত দুটো ব্যস্ত হয়ে উঠে ।কাটা বাছা করে দু’চুলােতে লাকড়ি ঠেলতে থাকে । গনগন করে জ্বলে চুলাের আগুন । তার চেয়েও জ্বলে তার মাতৃহৃদয় ।

রাতের খাবার খেতে বসে রাজা । আরমানী মাছের মুড়ােটা তুলে দিতে দিতে বলে-
—–আজ রাতটা থেইকে কালকে যেও । অতটা পথ আবারও হয়রান হয়ে যাওয়া ।
রাজা আপত্তি করে ,
—–না মা আজই যেতে হবে রাতের ট্রেনে । সেলিনা কত আশা নিয়ে পথ চেয়ে বসে রয়েছে বাজানের খবরের আশায় ।
সলিম শুন্য উঠোন পানে দৃষ্টি রেখে বলে
—– তাই যাও বাবা । সেলিনারে নিয়ে যত তাড়াতাড়ি পার আসবা , আমারও বুকটা খালি খালি লাগতিছে তােমারে দেখার পর থেইকে ।
হঠাৎ আরমানী বলে উঠে অনেকটা নিজের অজান্তেই বুঝিবা ,
—–না রাজা আজ যেতি পারবে না । সাঁঝের বেলা শুইয়ে থাকতে দেখছি তারে । হয়রানি কাটুক শরীলটায় , কাল যাবে ।
রাজা এবং সলিম দু’জনেই অবাক বিস্ময়ে তাকায় আরমানীর দিকে ।
রাজার অনুভবে নাড়ীর কোন অদৃশ্য টান অনুরনন তােলে কিনা বােঝা যায় না , তবে সলিম বুঝে সৎ মায়ের চিরাচরিত রূপই বুঝি ফুটে উঠেছে আরমানীর চোখে – মুখে সেলিনার আগমনের বার্তায় ।
আর সবকিছু ছাড়িয়ে আরমানী ভাবে , তার মনের পুষে রাখা গােপন দুঃখটা এভাবে উপচে পড়ছে কেন আজ ? হায়রে মন , মায়ের মন । পিতা তার সন্তানের কামনায় অধীর হতে পারে ষােল বছর পর খবর শুনে কিন্তু মা ষােল বছর পর এত কাছে পেয়েও নাড়ী ছেড়া ধন ছেলেকে আপন করে নিতে পারে না সর্বসমক্ষে কি এক অজানা ভয়ে ।
সন্তানের পিতার সাথে সন্তানের মাতার এই বৈষম্যটাই কি তবে সেই অজানা আশংকা যা সমাজে দিনের পর দিন লালন পালন হচ্ছে , বেড়ে উঠছে সেই কবে থেকে আজোবধি ?

***************
ফাহমিদা রিআ
মালিবাগ, ঢাকা।


প্রিন্ট
ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

বৈষম্য

আপডেট সময় ১১:৩২:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বৈষম্য

// ফাহমিদা রিআ //

লাউ চিংড়ির তরকারির সাথে পুই চচ্চড়ি আর ধনে পাতার চাটনি সাজিয়ে লাল চালের ভাপ ওঠা ভাত বেড়ে সলিমকে খেতে ডাকে আরমানী ।
কবুতরের খােপগুলিতে তার দিয়ে বাঁধন দিচ্ছিল সলিম মিয়া । বাতাসের দিন আসছে , তাই একটু সাবধান হওয়া । হাত না থামিয়ে বললাে ,
—–এট্টু দেরি হবি , তুই ততক্ষণে পুকুরে একটা ডুব দিয়ে আয় , এক সংগে খাবানে । ”
—–আমার যে কাপড় ধুতি রয়েছে আজ । তুমারে খাইয়ে তবেইতাে ঘাটে যেতি হবি ।
—–বেলা পইড়ে এলাে । আজ কাপড় ধুতি হবে না ।

মানুষটার এই এক দোষ , যেদিন দুপুরে বাড়িতে থাকবে আরমানীকে না নিয়ে খাবে না কিছুতেই । ছেলে দুটিকে গ্রামের জুনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি করানাের পর থেকে বাড়িটা সারা দুপুর খাঁ খাঁ করে । গ্রামের চার মাথার মােড়ে একটা চায়ের দোকান আর ছােট ক্ষেতে ফসল ফলিয়ে চারটি প্রাণীর দিন যায় এক রকম । সবচেয়ে বড় কথা , উপচে পড়া ভালবাসা আছে সংসারটায় , তাই দৈন্যতা মুছে যায় ওতেই ।

হাতের তালুতে নারকেল তেল ঢেলে মাথায় ঘষতে ঘষতে পুকুর ঘাটের দিকে এগিয়ে যায় আরমানী । দুটো ডুব দিয়ে তড়িঘড়ি করে ফিরেও আসে । ঘরের বেড়ায় কাপড় শুকোতে গিয়ে উঠোনে অপরিচিত কণ্ঠ শুনে ।
—–কে এলাে এই ভর দুপুরে ?

ঘােমটা টেনে উঠোন পেরিয়ে ঘরে ঢুকে আরমানী ।

সলিমের কণ্ঠ কানে আসে,
—– আমার বিশ্বাস হতিছে না বাবা । এ তুমি কি খবর শােনালে আমায় । ঠিক আছে , এসে যখন পইড়েছো আর হারাচ্ছিনে । এখন চারটে খেয়ে নাও , পরে সব কথা শুনবাে ।

আরমানী বুঝতে পারে কোন অতিথ মেহমান এসছে দূরের । কিন্তু এমন কারাে কথা আগেতাে শুনেনি ।
—– কইগাে , খাবার বাড়াে জলদি ।
বলতে বলতে ঘরে ঢুকে সলিম মিয়া । দু’চোখে খুশী যেন উপচে পড়ছে । অতিথির পরিচয় এক কথায় যা বললাে সলিম মিয়া, আরমানী তা শুনে ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠলাে যেন । নতুন করে এ আবার কোন আপদ এলাে এতকাল পরে । সলিম মিয়ার আগের পক্ষের একমাত্র মেয়ে সেলিনার স্বামী এসেছে । অনেক খুঁজে শ্বশুরকে বের করেছে । জামাইতাে পরের ছেলে , তার এত টান থাকবে কেন শ্বশুরকে দেখার , নিশ্চয় শ্বশুরের ভিটেয় ভাগ বসাতে চায় । এসব আগাম ভাবনা ভাবতে ভাবতে আরমানী বিষন্ন মুখে খাবার তুলে দেয় দুটি পাতে । শ্বশুর জামাইয়ের অনেক কথা হয় খেতে খেতে । সলিম যে মেয়ের জন্য এত অস্থির থাকতাে মনে মনে আরমানী কখনও টের পায়নি তাে এই পনের বছরের সংসারে ।

পাক ঘরের পাশে ছনের চালা তুলে দুই ছেলের জন্য ছােট্ট একটা ঘর তুলে দিয়েছে সলিম মিয়া । লতিয়ে উঠা কুমড়াে গাছটা সবুজে ছেয়ে ফেলেছে পুরাে চালটাই ।সলিম মিয়া জামাইকে নিয়ে সেই ঘরে বসে শুরু করে অতীতের স্মৃতিচারণ ।

গ্রামের দুলাল কন্ট্রাকটর টেন্ডারে কাজ পেল সেই খুলনা অঞ্চলে । সেই সুত্রে লেবারের কাজে আটজনের সংগে সলিমেরও যাওয়া । বিশ – বাইশ বছরের সুঠাম যুবক । দূর দেশে মাস ছয়েকের কাজে গেছে । গ্রামে একা পড়ে রয়েছে বিধবা মা । মাঝে মধ্যে তাই ছটফট করে উঠে মনটা ।

ঘটনাক্রমে সেই অঞ্চলের মুদি দোকানদার হারু মিয়ার সংগে আলাপ হয় । এক সময় ঘনিষ্ঠতা বাড়ে । শেষতক হারু মিয়া ও তার স্ত্রীর প্ররােচণায় তাদের মেয়ে জরিকে বিয়েও করে সলিম ।

কাজ ফুরোলাে কিন্তু সলিম ফিরলাে না নিজ গাঁয়ে । বিধবা মা কেঁদে বুক ভাসালাে । তার জোয়ান – ছেলেকে যাদু করে হারু মিয়া ঘরজামাই করে রেখে দিয়েছে । পর হয়ে গেছে ছেলে । হতাশায় আর অভাবে ভুগে ভুগে দু’মাসের মধ্যে মরেও গেল সলিমের মা।

অনেক পরে খবর পেল সলিম । অনুশােচনায় মনটা ক্ষত – বিক্ষত হতে থাকলাে । বাপের ভিটেতে ফিরে যাবার জন্য মন স্থির করলাে । তবুও তাে তার দুঃখিনী মার ভিটাতে সকাল – সন্ধ্যা বাতি জ্বালাতে পারবে ।
কিন্তু জরির বাবা – মা একমাত্র মেয়েকে এত দূর অঞ্চলে পাঠাবে না সাফ জানিয়ে দিল । দোকান ভিটে বাড়ী এসব তারা মরে গেলে জরিরই হবে , শেষ বয়সে তাদের দেখা শুনার জন্যই মেয়েকে ঘর জামাই করে রাখবে এসবের বিনিময়ে । সলিমের বিক্ষিপ্ত মন তবুও টিকতে চাইলাে না ।

জরিও অবশেষে সলিমের সংগী হলাে মনের উপর জোর করেই । কিন্তু সলিমের এমন দীন হীন অবস্থা আর অভাবের তাড়নায় অনভ্যস্ত জরি পাল্লা দিতে গিয়ে রীতিমত হিমশিম খেতে লাগলাে । গরীব হলেও হারুমিয়ার একমাত্র সন্তান হিসেবে জরি মানুষ হয়েছে হাতের কাছে সব কিছু পেয়েই । একগুয়ে আর জেদী স্বভাবটাও রপ্ত হয়েছিলো অতি আদরের কারণে । অভাবের তাড়নায় জরির সাথে সলিমেরও সারাক্ষণ খিটখিটে কথা বার্তা চলতে থাকে । জরির সহ্যের সীমা ছাড়তে ছাড়তে এক সময় সলিমও সীমা হারিয়ে ফেলে । এক কথা দুকথা তর্ক শেষে এক পর্যায়ে সলিমের হাতের চেলাকাঠ পড়ে জরির পিঠের উপর । সেই যে পাঁচ মাসের মেয়ে সেলিনাকে কোলে করে জরি ঘর ছেড়েছে আর ফিরে আসেনি সলিমের সংসারে। রাগ কমে গেলে সলিম আবার আনতে গিয়েছে । হারু মিয়ার দলবল জোর করে তালাক নামা লিখিয়ে নিয়ে ফেরৎ পাঠিয়েছে আপন গাঁয়ে ।

কিছুদিন পর খবর এসেছে সলিম মিয়ার কাছে , হারুমিয়া জরির আবার বিয়ে দিয়ে ঘর জামাই রেখেছে । মেয়েকে নিয়ে আসবার টান অনুভব করলেও আনতে পারেনি শেষতক সলিম। জগৎ সংসারে তার কেইবা আছে যে মেয়েকে পেলে পুষে বড়টি করবে , ভাগ্যে থাকলে একদিন বাপ মেয়ের দেখা হবেই ।

সেই ভাগ্যই আজ তার ঘরে । বছর খানেক হলাে সেলিনার বিয়ে হয়েছে । সেই পাঠিয়েছে তার স্বামীকে, ঠিকানা খুঁজে বাবার সন্ধানে।

সলিম মিয়ার চোখে অনেকদিন পর আজ সেলিনার শিশু মুখটা ভেসে উঠে বার বার হৃদয় নাড়া দিয়ে । বিকেল বেলা সলিম মিয়া থলে হাতে বাজারের দিকে যাবার কালে আরমানীকে বলে যায় ,
—–জামাই মানুষ ঘরে , অনাদর যেন না হয় । কখন কি লাগবে একটু খোঁজ – খবর কইরাে । রাতের ট্রেনে খুলনা যেতি চায় – সেলিনারে নিয়ে ফিরবে সপ্তাখানেক পর ।
কথার জবাব দেয় না আরমানী , কলসটা কাঁখে নিয়ে পুকুর ঘাটে হাঁটা দেয় ।
সবই বুঝে সলিম । দুপুরের পর থেকে সদা হাস্যোজ্জ্বল আরমানীর বিষন্নতাটুকু সে টের পায় । কি আর করা । না বুঝার ভান করে সেও কাজ চালিয়ে নিচ্ছে । ষোলটা বছর পর তার মেয়েকে সে দেখতে পাবে । একি কম ভাগ্যের কথা । সেই যে কোন অতীতে জরির কাছে আঘাত পেয়ে গ্রাম সম্পর্কীয় এক খালার বিধবা বােনঝি আরমানীকে সলিম বিয়ে করে। ঐ ঘটনার বছর খানেক পর । তারপর পনেরটি বছর কেটেছে সংসারে । এর মধ্যে ফারুখ – ফয়েজ দুই ছেলের বাবা হয়েছে । সুখের সংসারে একটিবারের জন্যও তাে জরি বা সেলিনার কথা মনে পড়েনি । হঠাৎ করে সেলিনার নাম শুনে বুকের মাঝে লুকিয়ে থাকা কোন গহীন থেকে এত মায়া ছলকে উঠে তার মনকে ভিজিয়ে দিল ।

ফারুক – ফয়েজ স্কুল থেকে ফিরে তাদের ঘরে নতুন মানুষ দেখে অবাক হয় । সেলিনার স্বামী তাদের ডেকে পাশে বসায় ।
ফারুখ বড় বড় চোখ করে তাকায়,
—– আপনেরেতে আমরা চিনি নে ।
আরমানী ঘরে ঢুকতে ঢুকতে শুনতে পায় ছেলে দুটিও দিব্যি বাপের মত আলাপ জুড়ে দিয়েছে ।

আরমানী ওদের নাম ধরে ডাকতেই ওরা ছুটে এসে মাকে জিজ্ঞেস করে,
—– মানুষটা কে মা ? খুব সুন্দর কইরে কথা কতি পারে ।
আরমানী সে কথার জবাব না নিয়ে ওদের খেতে বসায় । দুই ভাই নিত্যকার মত হাজারটা কথা বলে আর খায় । ফারুখ বলে ,
—–মানুষটা কয় কি জান মা ? তার নাম নাকি রাজা , কিন্তু রাজ্য নাই ।

আরমানীর হাত থেকে কাঁসার চামুচটা পড়ে যায় সশব্দে টিনের থালার উপর । শব্দটা গিয়ে লাগে ঠিক বুকের মাঝখানটায় । এতক্ষণের উদাসীনতা হঠাৎই সরব হয়ে উঠে যেন । ফারুখের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে
—–রাজা ? পােলাটার বাড়ী কোনে ?
ফয়েজ দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে বলে,
—–সেইটেইতাে মজা । বলে কি ঘর বাড়ী নেই । পাইক – পেয়াদা নেই , হাতী ঘােড়া নেই , তবুও সে রাজা ।
আরমানী এবার বিরক্তির সুরে বলে ,
—–হয়েছে হয়েছে । আর কথা কতি হবি না । বেলা পইড়ে এলাে । এবার খেয়ে উঠ্ শিগগিরই ।

মুখে বলে ঠিকই , কিন্তু মনটা চলে যায় সেই সুদূরে । ফেলে আসা ষােল বছর আগের সেই অতীতে ।

সন্ধ্যের পিদিম হাতে নিজেই ঢােকে সেই ঘরে।কি জানি কিসের টান অনুভবে এসে জড়ো হয় । ছেলেটি টান টান হয়ে শুয়ে চোখ বুজে পড়ে রয়েছে । সেদিকে তাকিয়ে আরমানীর কেমন যেন মায়া হয় ।মনকে অনকে বুঝায় , দুত্তোর রাজা নাম কি একজনেরই হয় নাকি ? কুপি রেখে দোরের কাছে এসে আবারও ফিরে গিয়ে ডাকে ,
—–সাঁঝ বেলাতে শুয়ে থাকতি নেই । ফারুখ – ফয়েজদের নিয়ে একটু ঘুইরে এসাে গাঁয়ে ।

তন্দ্রাই এসে গিয়েছিল বােধ হয় ছেলেটির । আরমানীর কণ্ঠ শুনে ধড়মড়িয়ে উঠে বসে । বলে , —–বাজান কি ফিরছে ?
আরমানী সে কথার জবাব না দিয়ে বলে-
—– ফারুখের কাছে জানলাম তােমার নাম রাজা ? বাড়ি কোনে ?
রাজা হাসে এবার –
—–মায়ে নাকি খুব সখ করে নাম রেখেছিল গরীবের ছেলের নাম রাজা । এতিম খানার স্যারে বলতাে এতিম খানাটাই তাের রাজ্য রে রাজা ।

আরমানী ভেতরে ভেতরে ব্যস্ত হয় । মুখে বলে তােমার বাড়ী কোনে ছিল সেইটে আগে জানতি চাইছি ।
রাজা হাসে তেমনি নির্লিপ্ত ভাবে –
—–এতিমের আবার বাড়ী ঘর । বাবার হায়াত ছিল না , মরলাে । সেই সাথে মাও পালিয়ে বাঁচলাে আমার ফেলে দিয়ে । কে একজন দয়া দেখিয়ে সেই চার বছর বয়সে এতিমখানায় ভর্তি করে দিয়েছিল । ওরাই খেতে পরতে দিয়েছে , লেখাপড়া শিখিয়েছে । একটা পাস দেয়ার পর অফিসে একটা ছােট খাট চাকরিও জুটিয়ে দিয়েছে । তবে রাজার ভাগ্য বলে কথা , হারু মিয়ার দোকনসহ নাতনীকে পেয়েছি । অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা । হা হা হা…..

একটানা এতগুলাে কথা বলে থামে রাজা ।একটু বেশী কথা বলে ছেলেটি , তবে আকর্ষণও করে কথার যাদুতে । আরমানীর আর কিছুই জানবার নেই । চোখের পর্দায় একের পর এক ছবির আসা যাওয়া চলতে থাকে । মামা – মামীর অভাবের সংসারে বােঝা স্বরূপ মানুষ হওয়া আরমানীর বিয়ে হয়েছিল চির রুগ্ন দিন মজুরের সাথে । বিয়ের পরের বছরেই কোল জুড়ে যখন ছেলে এলাে আরমানীর সব দুঃখ ভুলে গেল । রাজ্যের সুখ তার কোল জুড়ে । তাই নাম রাখলাে রাজা । কিন্তু অর্ধমৃত দিনমজুর স্বামীটি পুরােপুরি মরে গেল রাজার বয়স চার না হতেই । মামা – মামীর চক্ষু শুল হয়ে ফিরে এলাে অসহায় দুটো প্রানী ।

কিছু দিন পর আপদ তাড়াতে সক্রিয় মামা – মামী দু’প্রান্তে বিচ্ছেদ ঘটালাে মা ও ছেলের । সেই কবেকার কথা । বিধবা আরমানীর আবার সংসার হয়েছে । সলিম পােড় খাওয়া মানুষ। আরমানীকে সুখে ভরিয়ে রেখেছে । ফারুখ – ফয়েজের দুটো পিঠে পিঠি ছেলেকে মানুষ করতে করতে সুখের ধন রাজাকে মনে পড়েছে , আঁচলে চোখ মুছেছে প্রতিটি দিনই ।
সবার অগােচরে পুষে রাখা দুঃখটা আজ যেন বেরিয়ে পড়তে চাইছে । এ যে তারই রাজা । খুব বলতে ইচ্ছে করে ,
—–রাজা তাের নাভীর বাঁ পাশটায় একটা কাটা দাগ আছে, বাপ? ছোটবেলায় আঘাত পাওয়া সেই দাগটা ?
কিন্তু বলা হয় না । বলবার সাহস যোগায় না আরমানীর। রাজা মাকে চিনতে পেরে স্বার্থপর ভাবে যদি। ভাবে নিজের সুখ তৈরির জন্য মা তাকে দুরে ঠেলে দিয়েছে ।

সলিম বাজার থেকে ফিরতেই আরমানীর হাত দুটো ব্যস্ত হয়ে উঠে ।কাটা বাছা করে দু’চুলােতে লাকড়ি ঠেলতে থাকে । গনগন করে জ্বলে চুলাের আগুন । তার চেয়েও জ্বলে তার মাতৃহৃদয় ।

রাতের খাবার খেতে বসে রাজা । আরমানী মাছের মুড়ােটা তুলে দিতে দিতে বলে-
—–আজ রাতটা থেইকে কালকে যেও । অতটা পথ আবারও হয়রান হয়ে যাওয়া ।
রাজা আপত্তি করে ,
—–না মা আজই যেতে হবে রাতের ট্রেনে । সেলিনা কত আশা নিয়ে পথ চেয়ে বসে রয়েছে বাজানের খবরের আশায় ।
সলিম শুন্য উঠোন পানে দৃষ্টি রেখে বলে
—– তাই যাও বাবা । সেলিনারে নিয়ে যত তাড়াতাড়ি পার আসবা , আমারও বুকটা খালি খালি লাগতিছে তােমারে দেখার পর থেইকে ।
হঠাৎ আরমানী বলে উঠে অনেকটা নিজের অজান্তেই বুঝিবা ,
—–না রাজা আজ যেতি পারবে না । সাঁঝের বেলা শুইয়ে থাকতে দেখছি তারে । হয়রানি কাটুক শরীলটায় , কাল যাবে ।
রাজা এবং সলিম দু’জনেই অবাক বিস্ময়ে তাকায় আরমানীর দিকে ।
রাজার অনুভবে নাড়ীর কোন অদৃশ্য টান অনুরনন তােলে কিনা বােঝা যায় না , তবে সলিম বুঝে সৎ মায়ের চিরাচরিত রূপই বুঝি ফুটে উঠেছে আরমানীর চোখে – মুখে সেলিনার আগমনের বার্তায় ।
আর সবকিছু ছাড়িয়ে আরমানী ভাবে , তার মনের পুষে রাখা গােপন দুঃখটা এভাবে উপচে পড়ছে কেন আজ ? হায়রে মন , মায়ের মন । পিতা তার সন্তানের কামনায় অধীর হতে পারে ষােল বছর পর খবর শুনে কিন্তু মা ষােল বছর পর এত কাছে পেয়েও নাড়ী ছেড়া ধন ছেলেকে আপন করে নিতে পারে না সর্বসমক্ষে কি এক অজানা ভয়ে ।
সন্তানের পিতার সাথে সন্তানের মাতার এই বৈষম্যটাই কি তবে সেই অজানা আশংকা যা সমাজে দিনের পর দিন লালন পালন হচ্ছে , বেড়ে উঠছে সেই কবে থেকে আজোবধি ?

***************
ফাহমিদা রিআ
মালিবাগ, ঢাকা।


প্রিন্ট