ঢাকা ০৯:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
Logo নবম পে-স্কেলের শেষ ধাপে সরকার: বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপনের সম্ভাবনা Logo খাদ্যগুদামে নয়ছয়ের দিন শেষ, সিন্ডিকেটের মদদদাতারাও রেহাই পাবে না: খাদ্যমন্ত্রী Logo নেপালে ভয়াবহ বন্যা: ৩৬০-এর বেশি মৃত্যু, নিখোঁজ ১,৪০০ Logo মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আদর্শ অনুসরণে শান্তিপূর্ণ দেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর Logo আমি এখানে বসা তথ্যমন্ত্রী হিসেবে, কারো আত্মীয় হিসেবে নয়: পার্থ Logo মালয়েশিয়ায় অভিযানে ২৫২ জন আটক, ১৬৪ জনই বাংলাদেশি Logo রাষ্ট্রপতির শপথের পর মন্ত্রিসভায় শপথ নিলেন মঈন খান, পার্থ, সাচিং ও শামীম Logo মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন আরও চারজন, আজই শপথের আভাস Logo রুহুল কবির রিজভী হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব Logo ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

৪৮ বছরে বিএনপি: সংগ্রামের উত্তরাধিকার থেকে নতুন বাংলাদেশের পরীক্ষায়

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
  • আপডেট সময় ১২:২৩:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২৫২১ বার পড়া হয়েছে

একটি রাজনৈতিক দলের ৪৮ বছর পূর্ণ হওয়া কেবল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একই সঙ্গে অতীতের রাজনৈতিক সংগ্রাম, অর্জন ও সীমাবদ্ধতার মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতের পথচলার অঙ্গীকারের সময়। ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।

প্রায় পাঁচ দশকের এই পথচলায় বিএনপি কখনো রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, কখনো বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করেছে, আবার কখনো দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। ফলে বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তবে ২০২৬ সালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তাৎপর্য অতীতের তুলনায় ভিন্ন। কারণ এবার বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে না; রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব দায়িত্বও পালন করছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর দলটি সরকার গঠন করেছে এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।

অর্থাৎ এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য একই সঙ্গে অতীতের উত্তরাধিকার, বর্তমানের রাষ্ট্র পরিচালনার পরীক্ষা এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণের দায়িত্বের প্রতীক।

জিয়াউর রহমান থেকে তারেক রহমান: নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন

বিএনপির প্রতিষ্ঠার সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা, কৃষি ও শিল্পের বিকাশ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার ধারণা দলটির রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব ছিল। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি একটি বড় গণভিত্তিক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর সরকার গঠন এবং সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এরপর নির্বাচন, সরকার পরিচালনা, বিরোধী রাজনীতি এবং আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দলটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে।

২০২৬ সালে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন সেই ধারাবাহিকতায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়; বিএনপির রাজনীতিতে একটি প্রজন্মগত রূপান্তরেরও ইঙ্গিত।

তবে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে অতীতের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজনের সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়।

আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা

বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় একটি রাজনৈতিক দলের বড় শক্তি হলো জনগণের প্রত্যাশাকে রাজনৈতিক দাবিতে রূপ দেওয়া। কিন্তু ক্ষমতায় এসে সেই প্রত্যাশাকে বাজেট, আইন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও কার্যকর জনসেবায় রূপ দেওয়া অনেক কঠিন।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার এখন সেই পরীক্ষার মুখোমুখি।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা গ্রহণই শেষ কথা নয়। জনগণ শেষ পর্যন্ত জানতে চাইবে- প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়িত হলো, কতটা মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনল এবং সেই পরিবর্তনের সুফল কতটা ন্যায্যভাবে বণ্টিত হলো। এখানেই সরকার হিসেবে বিএনপির নতুন বাস্তবতা।

রাজনৈতিক আন্দোলনে জনপ্রিয় স্লোগান গুরুত্বপূর্ণ; রাষ্ট্র পরিচালনায় তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দক্ষতা, আর্থিক শৃঙ্খলা, নীতি বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহি।

পরিবার কার্ড: সামাজিক সুরক্ষার নতুন সম্ভাবনা

সরকারের আলোচিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে একটি কার্যকর কল্যাণমূলক কর্মসূচি শুধু অর্থ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে।

পরিবার কার্ডের ক্ষেত্রে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, নির্ভুল ডিজিটাল ডাটাবেজ, স্বচ্ছ অর্থ বিতরণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা।

কর্মসূচিটি যদি দলীয় পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তে নাগরিক অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার কাঠামোয় প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের কল্যাণ রাষ্ট্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষক কার্ড ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি

কৃষি ও উৎপাদনের সঙ্গে বিএনপির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দর্শনের একটি সম্পর্ক রয়েছে। সেই জায়গা থেকে কৃষক কার্ড কর্মসূচিও তাৎপর্যপূর্ণ।

কৃষককে শুধু আর্থিক সহায়তা দিলেই হবে না; তাকে উৎপাদনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বীজ, সার, সেচ, কৃষিঋণ, আধুনিক প্রযুক্তি, কৃষি পরামর্শ, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণ- সবকিছুর সমন্বিত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কৃষক কার্ড একটি কার্যকর উৎপাদনমুখী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে।

কৃষকের আয় বাড়ানো শুধু কৃষকের স্বার্থ নয়; এর সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জড়িত।

খাল খনন: ঐতিহ্য থেকে জলবায়ু বাস্তবতায়

জিয়াউর রহমানের সময়ের খাল খনন কর্মসূচি বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে পরিচিত একটি উদ্যোগ। বর্তমান সরকার সেই ধারণাকে নতুন বাস্তবতায় প্রয়োগের চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশে জলাবদ্ধতা, বন্যা, কৃষির সেচ, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানি ব্যবস্থাপনা আগামী দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে খাল খনন যেন শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না থাকে। খাল দখলমুক্ত করা, পানি সংরক্ষণ, সেচব্যবস্থা, পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এর সমন্বয় জরুরি।

অন্যথায় বড় প্রকল্পের অর্থ ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা: মানুষের ওপর বিনিয়োগ

রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু সড়ক, সেতু বা অবকাঠামো নির্মাণে মাপা যায় না। মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধিই টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ড্রেস ও স্কুল ব্যাগের মতো উদ্যোগ দরিদ্র পরিবারের ওপর শিক্ষাব্যয়ের চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

তবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সেবা ও মানের ওপর। হাসপাতালের শয্যা বাড়ালেই হবে না; চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে শিক্ষার্থীর হাতে বই-খাতা বা পোশাক দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে।

অর্থনীতি ও জ্বালানি: সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা

সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি অর্থনীতি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, শিল্পায়ন এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা- এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃশ্যমান ফলাফল প্রয়োজন।

বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতের সঙ্গে যুক্ত। শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা- সবকিছুর ওপর জ্বালানির প্রভাব রয়েছে।

এখানে বিএনপির সামনে একটি বড় সুযোগ হলো ঐতিহাসিক উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক চিন্তাকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং, দক্ষ মানবসম্পদ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্র করে একটি নতুন অর্থনৈতিক কৌশল প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে দক্ষতা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতার ওপর।

তরুণরাই নির্ধারণ করবে আগামী বাংলাদেশ

বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি তাই শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতারও অন্যতম শর্ত।

তরুণদের শুধু রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নয়, রাষ্ট্র নির্মাণের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শিক্ষা থেকে দক্ষতা, দক্ষতা থেকে কর্মসংস্থান, কর্মসংস্থান থেকে উদ্যোক্তা সৃষ্টি- এই পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত নীতির আওতায় আনতে হবে।

একজন তরুণ যেন শুধু চাকরি খোঁজার মানুষ না হয়ে উদ্যোক্তা, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, ফ্রিল্যান্সার কিংবা বৈশ্বিক সেবাদাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন- এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

গণতন্ত্রের পরীক্ষাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়

বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বহুদলীয় গণতন্ত্র। ক্ষমতায় এসে এই ধারণাকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতায় রূপ দেওয়া এখন দলের অন্যতম বড় দায়িত্ব।

কার্যকর সংসদ, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা- এসবই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক উপাদান।

সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে বিরোধী মতকে সহ্য করার সক্ষমতা এবং সমালোচনাকে রাষ্ট্র পরিচালনার সংশোধনী উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা।

কারণ গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনে জয়লাভের নাম নয়; গণতন্ত্র হলো ক্ষমতার ব্যবহার কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং নাগরিক কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করছেন- তারও পরীক্ষা।

আগামী পাঁচ বছর: সাতটি বড় চ্যালেঞ্জ

বিএনপির সামনে আগামী পাঁচ বছরে কয়েকটি বড় পরীক্ষা স্পষ্ট।

প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তৃতীয়ত, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা। চতুর্থত, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার। পঞ্চমত, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। ষষ্ঠত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি। সপ্তমত, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

এর পাশাপাশি বৈদেশিক সম্পর্ক, রপ্তানি বাজার, প্রবাসী আয়, বিদেশি বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তরও সরকারের সাফল্য নির্ধারণ করবে।

অতএব আগামী দিনের বিএনপিকে শুধু রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেই চলবে না; তাকে হতে হবে প্রশাসনিকভাবে দক্ষ, অর্থনৈতিকভাবে বাস্তববাদী এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জবাবদিহিমূলক।

৪৮ বছর: গৌরবের চেয়ে বড় এখন দায়িত্ব

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই একটি বিশেষ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠা, খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং বিরোধী রাজনীতির অভিজ্ঞতা দলটিকে যে রাজনৈতিক পুঁজি দিয়েছে, তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন রাষ্ট্র পরিচালনায়।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক ও উৎপাদনমুখী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এসব উদ্যোগের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সম্ভাবনাকে স্থায়ী সাফল্যে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।

কারণ সরকার গঠন একটি রাজনৈতিক বিজয়; কিন্তু একটি ভালো রাষ্ট্র নির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব।

৪৮ বছর পূর্তিতে বিএনপির সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত- তারা অতীতের রাজনৈতিক শক্তিকে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতায় কতটা রূপান্তর করতে পারবে?

জাতীয়তাবাদ যদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার শক্তিতে পরিণত হয়, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, সামাজিক সুরক্ষা যদি প্রকৃত দরিদ্রের কাছে পৌঁছে এবং গণতন্ত্র যদি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহির ভিত তৈরি করে- তাহলেই বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম নতুন অর্থ পাবে।

বাংলাদেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে জীবনের বাস্তব পরিবর্তনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা চায় নিরাপদ জীবন, স্থিতিশীল অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার, মানসম্মত শিক্ষা, সহজ স্বাস্থ্যসেবা এবং মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক অধিকার।

সুতরাং ৪৮ বছর পূর্তির সবচেয়ে বড় বার্তা হতে পারে- সংগ্রামের উত্তরাধিকার এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতায় রূপান্তরিত করার সময়।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সামনে সেই সুযোগ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে বড় দায়িত্বও।

ইতিহাস একটি রাজনৈতিক দলকে জন্ম দেয়; কিন্তু ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার কাজ।

বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস তাই শুধু অতীতের গৌরবের গল্প নয়- এটি এখন নতুন বাংলাদেশের সামনে একটি বড় রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পরীক্ষার নাম।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


প্রিন্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

৪৮ বছরে বিএনপি: সংগ্রামের উত্তরাধিকার থেকে নতুন বাংলাদেশের পরীক্ষায়

আপডেট সময় ১২:২৩:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একটি রাজনৈতিক দলের ৪৮ বছর পূর্ণ হওয়া কেবল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একই সঙ্গে অতীতের রাজনৈতিক সংগ্রাম, অর্জন ও সীমাবদ্ধতার মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতের পথচলার অঙ্গীকারের সময়। ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।

প্রায় পাঁচ দশকের এই পথচলায় বিএনপি কখনো রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, কখনো বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করেছে, আবার কখনো দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। ফলে বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তবে ২০২৬ সালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তাৎপর্য অতীতের তুলনায় ভিন্ন। কারণ এবার বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে না; রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব দায়িত্বও পালন করছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের পর দলটি সরকার গঠন করেছে এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।

অর্থাৎ এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য একই সঙ্গে অতীতের উত্তরাধিকার, বর্তমানের রাষ্ট্র পরিচালনার পরীক্ষা এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণের দায়িত্বের প্রতীক।

জিয়াউর রহমান থেকে তারেক রহমান: নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন

বিএনপির প্রতিষ্ঠার সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা, কৃষি ও শিল্পের বিকাশ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার ধারণা দলটির রাজনৈতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনে কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব ছিল। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি একটি বড় গণভিত্তিক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর সরকার গঠন এবং সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এরপর নির্বাচন, সরকার পরিচালনা, বিরোধী রাজনীতি এবং আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দলটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে।

২০২৬ সালে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন সেই ধারাবাহিকতায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়; বিএনপির রাজনীতিতে একটি প্রজন্মগত রূপান্তরেরও ইঙ্গিত।

তবে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে অতীতের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রয়োজনের সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায়।

আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা

বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় একটি রাজনৈতিক দলের বড় শক্তি হলো জনগণের প্রত্যাশাকে রাজনৈতিক দাবিতে রূপ দেওয়া। কিন্তু ক্ষমতায় এসে সেই প্রত্যাশাকে বাজেট, আইন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও কার্যকর জনসেবায় রূপ দেওয়া অনেক কঠিন।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার এখন সেই পরীক্ষার মুখোমুখি।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনা গ্রহণই শেষ কথা নয়। জনগণ শেষ পর্যন্ত জানতে চাইবে- প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়িত হলো, কতটা মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনল এবং সেই পরিবর্তনের সুফল কতটা ন্যায্যভাবে বণ্টিত হলো। এখানেই সরকার হিসেবে বিএনপির নতুন বাস্তবতা।

রাজনৈতিক আন্দোলনে জনপ্রিয় স্লোগান গুরুত্বপূর্ণ; রাষ্ট্র পরিচালনায় তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দক্ষতা, আর্থিক শৃঙ্খলা, নীতি বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহি।

পরিবার কার্ড: সামাজিক সুরক্ষার নতুন সম্ভাবনা

সরকারের আলোচিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে একটি কার্যকর কল্যাণমূলক কর্মসূচি শুধু অর্থ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে।

পরিবার কার্ডের ক্ষেত্রে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, নির্ভুল ডিজিটাল ডাটাবেজ, স্বচ্ছ অর্থ বিতরণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা।

কর্মসূচিটি যদি দলীয় পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তে নাগরিক অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার কাঠামোয় প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের কল্যাণ রাষ্ট্রের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষক কার্ড ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি

কৃষি ও উৎপাদনের সঙ্গে বিএনপির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দর্শনের একটি সম্পর্ক রয়েছে। সেই জায়গা থেকে কৃষক কার্ড কর্মসূচিও তাৎপর্যপূর্ণ।

কৃষককে শুধু আর্থিক সহায়তা দিলেই হবে না; তাকে উৎপাদনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বীজ, সার, সেচ, কৃষিঋণ, আধুনিক প্রযুক্তি, কৃষি পরামর্শ, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণ- সবকিছুর সমন্বিত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কৃষক কার্ড একটি কার্যকর উৎপাদনমুখী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে।

কৃষকের আয় বাড়ানো শুধু কৃষকের স্বার্থ নয়; এর সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জড়িত।

খাল খনন: ঐতিহ্য থেকে জলবায়ু বাস্তবতায়

জিয়াউর রহমানের সময়ের খাল খনন কর্মসূচি বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে পরিচিত একটি উদ্যোগ। বর্তমান সরকার সেই ধারণাকে নতুন বাস্তবতায় প্রয়োগের চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশে জলাবদ্ধতা, বন্যা, কৃষির সেচ, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানি ব্যবস্থাপনা আগামী দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে খাল খনন যেন শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ না থাকে। খাল দখলমুক্ত করা, পানি সংরক্ষণ, সেচব্যবস্থা, পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এর সমন্বয় জরুরি।

অন্যথায় বড় প্রকল্পের অর্থ ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা: মানুষের ওপর বিনিয়োগ

রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু সড়ক, সেতু বা অবকাঠামো নির্মাণে মাপা যায় না। মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধিই টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ড্রেস ও স্কুল ব্যাগের মতো উদ্যোগ দরিদ্র পরিবারের ওপর শিক্ষাব্যয়ের চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

তবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সেবা ও মানের ওপর। হাসপাতালের শয্যা বাড়ালেই হবে না; চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে শিক্ষার্থীর হাতে বই-খাতা বা পোশাক দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে।

অর্থনীতি ও জ্বালানি: সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা

সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি অর্থনীতি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, শিল্পায়ন এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা- এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃশ্যমান ফলাফল প্রয়োজন।

বিশেষ করে জ্বালানি নিরাপত্তা অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতের সঙ্গে যুক্ত। শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা- সবকিছুর ওপর জ্বালানির প্রভাব রয়েছে।

এখানে বিএনপির সামনে একটি বড় সুযোগ হলো ঐতিহাসিক উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক চিন্তাকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং, দক্ষ মানবসম্পদ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্র করে একটি নতুন অর্থনৈতিক কৌশল প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে দক্ষতা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতার ওপর।

তরুণরাই নির্ধারণ করবে আগামী বাংলাদেশ

বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি তাই শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতারও অন্যতম শর্ত।

তরুণদের শুধু রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নয়, রাষ্ট্র নির্মাণের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শিক্ষা থেকে দক্ষতা, দক্ষতা থেকে কর্মসংস্থান, কর্মসংস্থান থেকে উদ্যোক্তা সৃষ্টি- এই পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত নীতির আওতায় আনতে হবে।

একজন তরুণ যেন শুধু চাকরি খোঁজার মানুষ না হয়ে উদ্যোক্তা, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ, ফ্রিল্যান্সার কিংবা বৈশ্বিক সেবাদাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন- এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

গণতন্ত্রের পরীক্ষাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়

বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বহুদলীয় গণতন্ত্র। ক্ষমতায় এসে এই ধারণাকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতায় রূপ দেওয়া এখন দলের অন্যতম বড় দায়িত্ব।

কার্যকর সংসদ, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা- এসবই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক উপাদান।

সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে বিরোধী মতকে সহ্য করার সক্ষমতা এবং সমালোচনাকে রাষ্ট্র পরিচালনার সংশোধনী উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা।

কারণ গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনে জয়লাভের নাম নয়; গণতন্ত্র হলো ক্ষমতার ব্যবহার কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং নাগরিক কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করছেন- তারও পরীক্ষা।

আগামী পাঁচ বছর: সাতটি বড় চ্যালেঞ্জ

বিএনপির সামনে আগামী পাঁচ বছরে কয়েকটি বড় পরীক্ষা স্পষ্ট।

প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তৃতীয়ত, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা। চতুর্থত, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সংস্কার। পঞ্চমত, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ। ষষ্ঠত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি। সপ্তমত, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

এর পাশাপাশি বৈদেশিক সম্পর্ক, রপ্তানি বাজার, প্রবাসী আয়, বিদেশি বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তরও সরকারের সাফল্য নির্ধারণ করবে।

অতএব আগামী দিনের বিএনপিকে শুধু রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেই চলবে না; তাকে হতে হবে প্রশাসনিকভাবে দক্ষ, অর্থনৈতিকভাবে বাস্তববাদী এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জবাবদিহিমূলক।

৪৮ বছর: গৌরবের চেয়ে বড় এখন দায়িত্ব

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই একটি বিশেষ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠা, খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং বিরোধী রাজনীতির অভিজ্ঞতা দলটিকে যে রাজনৈতিক পুঁজি দিয়েছে, তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন রাষ্ট্র পরিচালনায়।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক ও উৎপাদনমুখী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এসব উদ্যোগের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সম্ভাবনাকে স্থায়ী সাফল্যে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।

কারণ সরকার গঠন একটি রাজনৈতিক বিজয়; কিন্তু একটি ভালো রাষ্ট্র নির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব।

৪৮ বছর পূর্তিতে বিএনপির সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত- তারা অতীতের রাজনৈতিক শক্তিকে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতায় কতটা রূপান্তর করতে পারবে?

জাতীয়তাবাদ যদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার শক্তিতে পরিণত হয়, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, সামাজিক সুরক্ষা যদি প্রকৃত দরিদ্রের কাছে পৌঁছে এবং গণতন্ত্র যদি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহির ভিত তৈরি করে- তাহলেই বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম নতুন অর্থ পাবে।

বাংলাদেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে জীবনের বাস্তব পরিবর্তনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা চায় নিরাপদ জীবন, স্থিতিশীল অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার, মানসম্মত শিক্ষা, সহজ স্বাস্থ্যসেবা এবং মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক অধিকার।

সুতরাং ৪৮ বছর পূর্তির সবচেয়ে বড় বার্তা হতে পারে- সংগ্রামের উত্তরাধিকার এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতায় রূপান্তরিত করার সময়।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সামনে সেই সুযোগ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে বড় দায়িত্বও।

ইতিহাস একটি রাজনৈতিক দলকে জন্ম দেয়; কিন্তু ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার কাজ।

বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাস তাই শুধু অতীতের গৌরবের গল্প নয়- এটি এখন নতুন বাংলাদেশের সামনে একটি বড় রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পরীক্ষার নাম।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


প্রিন্ট