১১ বছরের অপেক্ষার অবসান? মূল বেতন বাড়তে পারে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ | দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা | অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্ভাবনা প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা
নবম পে-স্কেলের শেষ ধাপে সরকার: বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপনের সম্ভাবনা
- আপডেট সময় ০৯:৩৩:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
- / ২৫৩৭ বার পড়া হয়েছে
দীর্ঘ প্রায় ১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বা নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আগামী সোমবার (৩১ আগস্ট) মন্ত্রিসভা বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব উঠতে পারে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়া গেলে বৃহস্পতিবারের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তুতি রয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত কত টাকা মূল বেতন হবে, কোন গ্রেডে কতটা বৃদ্ধি হবে, ভাতার হার কত হবে এবং কোন তারিখ থেকে কোন সুবিধা কার্যকর হবে- এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও সরকারি প্রজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নতুন পে-স্কেল নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের পর্যালোচনা শেষে এখন মূলত মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষা রয়েছে।
কমিশনের সুপারিশ বনাম সচিব কমিটির প্রস্তাব- কোথায় কতটা কাটছাঁট?
নবম জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল।
কমিশনের প্রস্তাবে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়।
এর মধ্যে-
* সর্বনিম্ন মূল বেতন: ৮,২৫০ – ২০,০০০ টাকা
* সর্বোচ্চ মূল বেতন: ৭৮,০০০ – ১,৬০,০০০ টাকা
অর্থাৎ কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসত।
কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সচিব কমিটি মূল বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশের মধ্যে রাখার সুপারিশ করেছে।
অর্থাৎ কমিশনের সুপারিশ এবং সরকারের সম্ভাব্য চূড়ান্ত কাঠামোর মধ্যে পার্থক্য থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
১০ সদস্যের কমিটি কী করেছে?
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পদ্ধতি নির্ধারণ এবং আর্থিক সক্ষমতা পর্যালোচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটিতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা রয়েছেন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব ও আইন সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা রয়েছেন।
এই কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল-
কমিশনের সুপারিশ কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, একসঙ্গে বাস্তবায়ন করলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কী ধরনের চাপ তৈরি হবে এবং কীভাবে পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন করা যায়- তা নির্ধারণ করা।
সেই হিসাবেই দুই ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
একসঙ্গে নয়, দুই ধাপে পে-স্কেল
সরকারের সম্ভাব্য পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- নতুন পে-স্কেল একবারে পুরোপুরি কার্যকর না করে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন।
* প্রথম ধাপ: ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে মূল বেতন কার্যকর করার পরিকল্পনা।
* দ্বিতীয় ধাপ: পরবর্তী অর্থবছর থেকে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা সমন্বয়ের পরিকল্পনা।
অর্থাৎ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন কাঠামো কার্যকর করার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে এর আর্থিক সুবিধা ধাপে ধাপে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এতে সরকারের একসঙ্গে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপ কমবে।
কিন্তু সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে- মূল বেতন বাড়লেও ভাতা যদি পরে বাড়ে, তাহলে বাস্তবে তাঁদের মাসিক আয় কতটা বাড়বে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: টাকা আসবে কোথা থেকে?
নতুন পে-স্কেল নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু শুধু বেতন নয়- এর অর্থনৈতিক ভারও।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছেন।
তাঁদের বেতন, ভাতা ও পেনশন বাবদ সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
নবম বেতন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
এই বিপুল অতিরিক্ত ব্যয়ই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কারণ বেতন বাড়ানোর অর্থ শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে অতিরিক্ত টাকা তুলে দেওয়া নয়। এর সঙ্গে পেনশন, ভবিষ্যৎ আর্থিক দায়, ভাতা এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় কাঠামোও জড়িয়ে আছে।
বাজেটে বাড়তি ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি- এর কতটা যাবে পে-স্কেলে?
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জনপ্রশাসন-নিট খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।
আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা।
অর্থাৎ এক বছরে বরাদ্দ বেড়েছে- ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের হিসাবে, এই বাড়তি বরাদ্দের অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নে ব্যয় হতে পারে।
তবে পুরো অতিরিক্ত বরাদ্দকে পে-স্কেলের অর্থ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জনপ্রশাসন খাতের অন্যান্য ব্যয়ও এর আওতাভুক্ত।
তবু বাজেটের এই পরিবর্তন নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১১ বছরে বদলে গেছে জীবনযাত্রার হিসাব
অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে।
বর্তমান কাঠামোতে-
* সর্বনিম্ন মূল বেতন: ৮,২৫০ টাকা
* সর্বোচ্চ মূল বেতন: ৭৮,০০০ টাকা
কিন্তু এই সময়ের মধ্যে খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পরিবহনসহ জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ফলে নামমাত্র বেতন একই থাকলেও বাস্তবে সেই বেতনের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
এখানেই নতুন পে-স্কেলের যৌক্তিকতা নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের দাবি সবচেয়ে জোরালো।
তবে অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে বেতন বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাজারে পণ্যের দাম যদি একই সঙ্গে বেড়ে যায়, তাহলে বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল অনেকটাই কমে যেতে পারে।
বেতন বাড়বে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি কি বাড়বে?
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে লাখ লাখ সরকারি কর্মচারীর ব্যয়যোগ্য আয় বাড়বে। এর ফলে বাজারে ভোগ ও চাহিদা বাড়তে পারে।
এটি অর্থনীতির জন্য একদিকে ইতিবাচক- কারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে।
অন্যদিকে উৎপাদন ও সরবরাহ যদি সেই হারে না বাড়ে, তাহলে অতিরিক্ত চাহিদা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
অতএব, নতুন পে-স্কেলের সঙ্গে সরকারের সামনে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে-
বেতন বাড়িয়ে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং একই সঙ্গে বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা।
কারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারেন?
কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নিম্ন বেতনধারীদের মূল বেতন তুলনামূলকভাবে বড় হারে বাড়ানোর প্রস্তাব ছিল।
এটি বাস্তবায়িত হলে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেতে পারেন।
অন্যদিকে উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত কাঠামোতে কমিশনের সুপারিশ কতটা বহাল থাকবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচারিত গ্রেডভিত্তিক বেতনের তালিকাকে চূড়ান্ত সরকারি তালিকা হিসেবে গ্রহণ না করার পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।
সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা বনাম সরকারের সক্ষমতা
নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বড়।
১১ বছর ধরে একই জাতীয় বেতন কাঠামো থাকার পর তাঁরা এমন একটি কাঠামো চান, যা বর্তমান বাজারদর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু সরকারের জন্য হিসাবটি ভিন্ন।
বেতন বাড়ালে শুধু চলতি অর্থবছরের ব্যয় বাড়বে না; ভবিষ্যতের প্রতিটি অর্থবছরেও সেই বাড়তি বেতন ও সংশ্লিষ্ট সুবিধা বহন করতে হবে।
এর সঙ্গে নতুন নিয়োগ, পেনশন, বিভিন্ন ভাতা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়ও যুক্ত হবে।
তাই একটি পে-স্কেল ঘোষণা করা যতটা সহজ, সেটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই রাখা ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রজ্ঞাপনই বলবে আসল হিসাব
মন্ত্রিসভায় প্রস্তাব উঠলেও শেষ কথা বলবে সরকারি প্রজ্ঞাপন।
কারণ প্রজ্ঞাপনেই স্পষ্ট হবে-
* কোন গ্রেডে কত মূল বেতন;
* বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত হার;
* বাড়িভাড়ার হার;
* চিকিৎসা ভাতা;
* অন্যান্য ভাতা;
* পেনশনের ওপর প্রভাব;
* বকেয়া বা এরিয়ার পাওয়ার নিয়ম;
* কার্যকর হওয়ার তারিখ;
* দুই ধাপে বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি।
সুতরাং মন্ত্রিসভা অনুমোদন পেলেও প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক তালিকা বা দাবিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
শেষ কথা
নবম পে-স্কেল শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, সরকারি ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ পেনশন দায়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত।
একদিকে ১১ বছর ধরে বেতন কাঠামো অপরিবর্তিত থাকায় সরকারি কর্মচারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে একসঙ্গে বিপুল ব্যয় করলে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এই দুই বাস্তবতার মাঝখানেই সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় কী সিদ্ধান্ত হয়, আর সেই সিদ্ধান্তের পর প্রজ্ঞাপনে সরকারি চাকরিজীবীদের হাতে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা বাড়ে- এখন সেই অপেক্ষাতেই প্রায় ২৩ লাখ সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগী।
ক্রাইম প্রতিদিনের অনুসন্ধানী নজর থাকবে- ঘোষণার পর বাস্তবে কার বেতন কত বাড়ল, সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় কত দাঁড়াল এবং এই বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে কতটা পাল্লা দিতে পারল।
প্রিন্ট
























