ঢাকা ০৪:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
Logo নেপালে ভয়াবহ বন্যা: ৩৬০-এর বেশি মৃত্যু, নিখোঁজ ১,৪০০ Logo মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আদর্শ অনুসরণে শান্তিপূর্ণ দেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর Logo আমি এখানে বসা তথ্যমন্ত্রী হিসেবে, কারো আত্মীয় হিসেবে নয়: পার্থ Logo মালয়েশিয়ায় অভিযানে ২৫২ জন আটক, ১৬৪ জনই বাংলাদেশি Logo রাষ্ট্রপতির শপথের পর মন্ত্রিসভায় শপথ নিলেন মঈন খান, পার্থ, সাচিং ও শামীম Logo মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন আরও চারজন, আজই শপথের আভাস Logo রুহুল কবির রিজভী হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব Logo ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল Logo আজ দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন Logo ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিত করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত
তারেক রহমানের দিল্লি সফর ঘিরে অনিশ্চয়তা, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও ভারতের ভূমিকা

ঢাকা-দিল্লির আস্থার সংকট: মাঝখানে শেখ হাসিনা

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
  • আপডেট সময় ০৫:৪১:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
  • / ২৫৫৩ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সীমান্ত, নদী, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, জ্বালানি, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি। ভৌগোলিক বাস্তবতাই দুই দেশকে পরস্পরের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করেছে।

কিন্তু প্রতিবেশী হলেই সম্পর্ক সব সময় স্বস্তিদায়ক হয় না। কখনো কখনো ঘনিষ্ঠতার মধ্যেও তৈরি হয় অবিশ্বাস, আর সেই অবিশ্বাস যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও ছায়া ফেলে।

ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক এখন এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেটিকে কেবল একটি বিদেশ সফরের তারিখ নির্ধারণের বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এর পেছনে রয়েছে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাঁর প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের দাবি, ভারতের অবস্থান, ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া আস্থার ঘাটতি।

২১ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শেখ হাসিনা ও ভারতে অবস্থানরত অন্যান্য পলাতক আসামির প্রত্যর্পণ বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ঢাকার বক্তব্য- একটি অনুকূল ও অর্থবহ কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি না হলে উচ্চপর্যায়ের সফর নিয়ে তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই।

তাই প্রশ্নটি শুধু- তারেক রহমান দিল্লি যাবেন কি না?

মূল প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশ কি এমন একটি পরিবেশে দিল্লির সঙ্গে নতুন সম্পর্কের অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারবে, যেখানে তার সার্বভৌমত্ব, বিচারিক অধিকার, রাজনৈতিক মর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থ যথাযথ গুরুত্ব পাবে?

শেখ হাসিনা: একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি, নাকি নতুন সংকটের শুরু?

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছিল। দিল্লির কাছে তাঁর সরকার ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার।

কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর দমন-পীড়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন সেই রাজনৈতিক অসন্তোষকে বিস্ফোরণের পর্যায়ে নিয়ে যায়। আন্দোলন দমনে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়েন ও ভারতে চলে যান। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয় এবং ২০২৫ সালে অনুপস্থিতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি অবশ্য এই বিচার ও রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও আইনগতভাবে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এখন বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট- শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করে বাংলাদেশের আইন ও আদালতের মাধ্যমে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

ঢাকার দৃষ্টিতে এটি কেবল কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, বিচারিক কর্তৃত্ব এবং ২০২৪ সালের সহিংসতার জন্য দায় নির্ধারণের প্রশ্ন।

ভারত কেন শেখ হাসিনাকে ফেরত দিচ্ছে না?

এখানেই ঢাকা-দিল্লির আস্থার সংকট সবচেয়ে প্রকট।

বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে বিষয়টি আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ঢাকার প্রশ্ন- এই প্রক্রিয়ার শেষ কোথায় এবং কতদিনে?

শেখ হাসিনা ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থান করছেন- এটি বাংলাদেশের জন্য নিছক একটি আইনি বিষয় নয়। কারণ তিনি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে গুরুতর অভিযোগ ও রায় রয়েছে।

ফলে তাঁর ভারতে অবস্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি প্রতীকী অর্থও বহন করছে। অনেকের কাছে এটি ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও পুরোনো ঢাকা-দিল্লি সমীকরণের একটি অবশিষ্ট প্রতীক।

এখানেই ভারতের জন্যও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

দিল্লি যদি বিষয়টিকে কেবল আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্ন হিসেবে দেখে, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় অংশ হয়তো উপেক্ষিত থাকবে। আবার বাংলাদেশ যদি ভারতের অবস্থানকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক আশ্রয় হিসেবে ব্যাখ্যা করে, তাহলে দ্বিপক্ষীয় আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।

অতএব, প্রয়োজন স্পষ্টতা, স্বচ্ছতা ও নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ।

শেখ হাসিনার ভারত-অবস্থান: শুধু আশ্রয়ের প্রশ্ন নয়

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ নতুন নয়। বিশেষ করে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে তাঁর বক্তব্যের সম্ভাবনা ঢাকার জন্য স্পর্শকাতর বিষয়।

২০২৬ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল মিডিয়া উপস্থিতি এই বিতর্ককে নতুন করে সামনে আনে। বাংলাদেশ ভারতের কাছে সহযোগিতা চেয়েছিল, যাতে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির মতো কর্মকাণ্ড না হয়।

ভারত অবশ্য স্পষ্ট করে বলেছে, ওই অনুষ্ঠান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আয়োজন করেছে এবং ভারত সরকার এতে কোনোভাবেই জড়িত ছিল না বা সেখানে প্রকাশিত কোনো বক্তব্যকে সমর্থন করে না।

কূটনৈতিকভাবে ভারতের এই ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্বেগকেও অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই।

কারণ একজন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান যদি প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ড থেকে নিয়মিতভাবে নিজ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন, তাহলে সেটি স্বাভাবিকভাবেই দুই দেশের সম্পর্কের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

এখানে সমাধান হলো- অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে একটি পরিষ্কার ও গ্রহণযোগ্য বোঝাপড়া।

তারেক রহমান কেন এখন গুরুত্বপূর্ণ?

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর একটি বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমানের সরকার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন ভারসাম্যের বার্তা দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করেও জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও সমমর্যাদার প্রশ্নকে সামনে আনা হচ্ছে।

ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। একই সঙ্গে BIMSTEC-এর বর্তমান চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশকে BRICS Outreach Session-এ অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে।

কিন্তু সফর শুধু আমন্ত্রণের বিষয় নয়। একটি প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান, কূটনৈতিক অগ্রাধিকার এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।

তাই তারেক রহমানের দিল্লি সফর হলে সেটি হবে শুধু সৌজন্য সফর নয়; বরং ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের নতুন সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

তারেক রহমানের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ

প্রথমত- শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং ২০২৪ সালের সহিংসতার জবাবদিহির প্রশ্নে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

দ্বিতীয়ত- সম্পর্কের ভারসাম্য। ভারত বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য প্রতিবেশী। কিন্তু বন্ধুত্বের অর্থ এক দেশের রাজনৈতিক বা কৌশলগত অগ্রাধিকারকে অন্য দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়।

তৃতীয়ত- জাতীয় স্বার্থ। পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি, ভিসা, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা- প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের স্বার্থকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।

তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে- ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা।

শেখ হাসিনার ছায়া থেকে বের হতে পারবে কি দিল্লি?

এখানেই ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা।

শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ- এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তাঁর সরকারের সময় ভারত নিরাপত্তা ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক যদি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও সংকটে পড়ে।

২০২৪ সালের পর বাংলাদেশে ঠিক সেটিই ঘটেছে বলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা।

ভারতের জন্য তাই এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো- কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা দলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না রেখে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা।

কারণ সরকার পরিবর্তন হতে পারে। রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসতে পারে, আবার ক্ষমতা হারাতেও পারে।

রাষ্ট্র থাকে। জনগণ থাকে। সুতরাং ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থও একটি স্থিতিশীল ও জনগণভিত্তিক বাংলাদেশ-নীতি দাবি করে।

চীনকে সামনে রেখে চাপের রাজনীতি নয়

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ার প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত নয়।

ঢাকা দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা করবে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং ইউরোপ, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গেও সহযোগিতা বাড়াবে- এটাই স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় কৌশল।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর নীতি হতে পারে- বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থে।

ভারত যদি বাংলাদেশের বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখে, তাহলে ভুল হবে। বরং একটি স্বাধীন, স্থিতিশীল ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী বাংলাদেশ ভারতের জন্যও লাভজনক প্রতিবেশী।

গঙ্গার পানি: বন্ধুত্বের বাস্তব পরীক্ষা

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি এখন গঙ্গার পানি।

১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি ৩০ বছরের জন্য স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। বাংলাদেশ সরকারের যৌথ নদী কমিশনের তথ্যেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

চুক্তিটির নবায়ন তাই আগামী মাসগুলোতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর প্রবাহের পরিবর্তন এবং দুই দেশের ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা নতুন চুক্তিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তাই নতুন চুক্তি শুধু ১৯৯৬ সালের কাঠামো পুনরাবৃত্তি করলেই হবে না। প্রয়োজন হতে পারে একটি আধুনিক, ন্যায়সংগত ও জলবায়ু-সহনশীল পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো।

এখানে ভারতের সদিচ্ছা যেমন প্রয়োজন, তেমনি বাংলাদেশেরও প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক ও শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রস্তুতি।

কারণ প্রতিবেশী সম্পর্কের সবচেয়ে কার্যকর পরীক্ষা হয় মানুষের জীবনে- কূটনৈতিক বিবৃতিতে নয়।

ভারতকে এখন একটি মৌলিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে

দিল্লির সামনে এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন- ভারত কি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক হিসেবে দেখবে, নাকি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক হিসেবে দেখবে?

দ্বিতীয় পথটিই ভারতের জন্য বেশি লাভজনক।

শেখ হাসিনা ভারতের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক অংশীদার ছিলেন- এটি ইতিহাসের অংশ। কিন্তু ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। ২০২৬ সালে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণও নতুন রূপ পেয়েছে।

এই বাস্তবতা অস্বীকার করে পুরোনো কাঠামো ধরে রাখার চেষ্টা করলে দিল্লি-ঢাকা দূরত্ব আরও বাড়তে পারে।

ভারতের উচিত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পছন্দকে সম্মান করা এবং কোনো একটি দল বা ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে অতিরিক্তভাবে যুক্ত না করা।

এতে শুধু বাংলাদেশের আস্থাই বাড়বে না, ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থও সুরক্ষিত হবে।

তাহলে ভারতের করণীয় কী?

প্রথমত, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে স্পষ্ট ও সময়োপযোগী কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রয়োজন। বিষয়টি দীর্ঘসূত্রতায় না রেখে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর আলোচনা হওয়া দরকার।

দ্বিতীয়ত, ভারতের ভূখণ্ড বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে- এমন অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে দৃশ্যমান নীতিগত অবস্থান প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, তারেক রহমানের ভারত সফর হলে সেটিকে কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সফরে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব ফলাফলভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগে পরিণত করা দরকার।

চতুর্থত, গঙ্গার পানি, সীমান্তে প্রাণহানি, বাণিজ্য ভারসাম্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও ভিসা- এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত ব্যাক-চ্যানেল ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও সক্রিয় করা দরকার।

বাংলাদেশেরও দায়িত্ব আছে

তবে আস্থার সংকট দূর করার দায়িত্ব শুধু ভারতের নয়। বাংলাদেশকেও বাস্তববাদী হতে হবে।

ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলানো সম্ভব নয়। নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদী, বাণিজ্য ও যোগাযোগের কারণে দুই দেশ পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

তাই ঢাকার কূটনীতি হওয়া উচিত দৃঢ়, কিন্তু উত্তেজনানির্ভর নয়; আত্মমর্যাদাপূর্ণ, কিন্তু সংঘাতমুখী নয়।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা এবং একই সঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা- এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই বাংলাদেশের জন্য বেশি কার্যকর।

বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বহুমুখী কূটনীতিই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

শেষ কথা

তারেক রহমানের দিল্লি সফরকে শুধু একটি বিদেশ সফর হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

এটি হতে পারে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভারতের পুরোনো কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মুখোমুখি হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

শেখ হাসিনার শাসনামল নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ, অভিযোগ ও বিচারপ্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে পুরোপুরি স্বাভাবিক করা কঠিন। একই সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত উদ্বেগকেও বাংলাদেশের উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

অতএব, প্রয়োজন আবেগ নয়- বাস্তববাদ। প্রয়োজন প্রতিশোধ নয়- জবাবদিহি। প্রয়োজন সংঘাত নয়- সমমর্যাদার সহযোগিতা।

একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার- বাংলাদেশ ভারতের বন্ধু হতে পারে, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী নয়।

ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিভাবক নয়।

আর শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র হতে পারেন, কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোনো এক ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করতে পারে না।

তারেক রহমানের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে- ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষা প্রতিষ্ঠা করা।

সেই ভাষা হবে- সংঘাত নয়, সহযোগিতা। আত্মসমর্পণ নয়, আত্মমর্যাদা। বিচ্ছিন্নতা নয়, ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি।

প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্র হবে বাংলাদেশ।

আর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এগোবে দুই দেশের রাষ্ট্র ও জনগণের পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে।

কারণ একটি দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব তখনই টেকসই হয়, যখন সেই বন্ধুত্বে সম্মান থাকে, সমতা থাকে এবং আস্থা থাকে।

ঢাকা এখন সেই আস্থাই চায়। আর দিল্লির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতাকে ভারত কতটা মেনে নিতে প্রস্তুত?

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


প্রিন্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

তারেক রহমানের দিল্লি সফর ঘিরে অনিশ্চয়তা, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও ভারতের ভূমিকা

ঢাকা-দিল্লির আস্থার সংকট: মাঝখানে শেখ হাসিনা

আপডেট সময় ০৫:৪১:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সীমান্ত, নদী, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, জ্বালানি, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি। ভৌগোলিক বাস্তবতাই দুই দেশকে পরস্পরের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করেছে।

কিন্তু প্রতিবেশী হলেই সম্পর্ক সব সময় স্বস্তিদায়ক হয় না। কখনো কখনো ঘনিষ্ঠতার মধ্যেও তৈরি হয় অবিশ্বাস, আর সেই অবিশ্বাস যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তা কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও ছায়া ফেলে।

ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক এখন এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, সেটিকে কেবল একটি বিদেশ সফরের তারিখ নির্ধারণের বিষয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এর পেছনে রয়েছে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাঁর প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশের দাবি, ভারতের অবস্থান, ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া আস্থার ঘাটতি।

২১ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শেখ হাসিনা ও ভারতে অবস্থানরত অন্যান্য পলাতক আসামির প্রত্যর্পণ বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ঢাকার বক্তব্য- একটি অনুকূল ও অর্থবহ কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরি না হলে উচ্চপর্যায়ের সফর নিয়ে তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই।

তাই প্রশ্নটি শুধু- তারেক রহমান দিল্লি যাবেন কি না?

মূল প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশ কি এমন একটি পরিবেশে দিল্লির সঙ্গে নতুন সম্পর্কের অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারবে, যেখানে তার সার্বভৌমত্ব, বিচারিক অধিকার, রাজনৈতিক মর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থ যথাযথ গুরুত্ব পাবে?

শেখ হাসিনা: একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি, নাকি নতুন সংকটের শুরু?

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছিল। দিল্লির কাছে তাঁর সরকার ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার।

কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর দমন-পীড়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিকীকরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন সেই রাজনৈতিক অসন্তোষকে বিস্ফোরণের পর্যায়ে নিয়ে যায়। আন্দোলন দমনে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়েন ও ভারতে চলে যান। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয় এবং ২০২৫ সালে অনুপস্থিতিতে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি অবশ্য এই বিচার ও রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও আইনগতভাবে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এখন বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট- শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করে বাংলাদেশের আইন ও আদালতের মাধ্যমে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।

ঢাকার দৃষ্টিতে এটি কেবল কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, বিচারিক কর্তৃত্ব এবং ২০২৪ সালের সহিংসতার জন্য দায় নির্ধারণের প্রশ্ন।

ভারত কেন শেখ হাসিনাকে ফেরত দিচ্ছে না?

এখানেই ঢাকা-দিল্লির আস্থার সংকট সবচেয়ে প্রকট।

বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে বিষয়টি আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ঢাকার প্রশ্ন- এই প্রক্রিয়ার শেষ কোথায় এবং কতদিনে?

শেখ হাসিনা ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থান করছেন- এটি বাংলাদেশের জন্য নিছক একটি আইনি বিষয় নয়। কারণ তিনি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে গুরুতর অভিযোগ ও রায় রয়েছে।

ফলে তাঁর ভারতে অবস্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি প্রতীকী অর্থও বহন করছে। অনেকের কাছে এটি ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও পুরোনো ঢাকা-দিল্লি সমীকরণের একটি অবশিষ্ট প্রতীক।

এখানেই ভারতের জন্যও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

দিল্লি যদি বিষয়টিকে কেবল আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্ন হিসেবে দেখে, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় অংশ হয়তো উপেক্ষিত থাকবে। আবার বাংলাদেশ যদি ভারতের অবস্থানকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক আশ্রয় হিসেবে ব্যাখ্যা করে, তাহলে দ্বিপক্ষীয় আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।

অতএব, প্রয়োজন স্পষ্টতা, স্বচ্ছতা ও নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ।

শেখ হাসিনার ভারত-অবস্থান: শুধু আশ্রয়ের প্রশ্ন নয়

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ নতুন নয়। বিশেষ করে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে তাঁর বক্তব্যের সম্ভাবনা ঢাকার জন্য স্পর্শকাতর বিষয়।

২০২৬ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার একটি ভার্চুয়াল মিডিয়া উপস্থিতি এই বিতর্ককে নতুন করে সামনে আনে। বাংলাদেশ ভারতের কাছে সহযোগিতা চেয়েছিল, যাতে ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির মতো কর্মকাণ্ড না হয়।

ভারত অবশ্য স্পষ্ট করে বলেছে, ওই অনুষ্ঠান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আয়োজন করেছে এবং ভারত সরকার এতে কোনোভাবেই জড়িত ছিল না বা সেখানে প্রকাশিত কোনো বক্তব্যকে সমর্থন করে না।

কূটনৈতিকভাবে ভারতের এই ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্বেগকেও অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই।

কারণ একজন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান যদি প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ড থেকে নিয়মিতভাবে নিজ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন, তাহলে সেটি স্বাভাবিকভাবেই দুই দেশের সম্পর্কের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

এখানে সমাধান হলো- অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে একটি পরিষ্কার ও গ্রহণযোগ্য বোঝাপড়া।

তারেক রহমান কেন এখন গুরুত্বপূর্ণ?

এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর একটি বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমানের সরকার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন ভারসাম্যের বার্তা দিয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার না করেও জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও সমমর্যাদার প্রশ্নকে সামনে আনা হচ্ছে।

ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। একই সঙ্গে BIMSTEC-এর বর্তমান চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশকে BRICS Outreach Session-এ অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে।

কিন্তু সফর শুধু আমন্ত্রণের বিষয় নয়। একটি প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান, কূটনৈতিক অগ্রাধিকার এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে।

তাই তারেক রহমানের দিল্লি সফর হলে সেটি হবে শুধু সৌজন্য সফর নয়; বরং ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের নতুন সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

তারেক রহমানের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ

প্রথমত- শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ। বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়া এবং ২০২৪ সালের সহিংসতার জবাবদিহির প্রশ্নে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

দ্বিতীয়ত- সম্পর্কের ভারসাম্য। ভারত বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য প্রতিবেশী। কিন্তু বন্ধুত্বের অর্থ এক দেশের রাজনৈতিক বা কৌশলগত অগ্রাধিকারকে অন্য দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়।

তৃতীয়ত- জাতীয় স্বার্থ। পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, জ্বালানি, ভিসা, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা- প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের স্বার্থকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।

তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে- ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করা।

শেখ হাসিনার ছায়া থেকে বের হতে পারবে কি দিল্লি?

এখানেই ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা।

শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ- এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তাঁর সরকারের সময় ভারত নিরাপত্তা ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক যদি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও সংকটে পড়ে।

২০২৪ সালের পর বাংলাদেশে ঠিক সেটিই ঘটেছে বলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা।

ভারতের জন্য তাই এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো- কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বা দলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না রেখে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা।

কারণ সরকার পরিবর্তন হতে পারে। রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসতে পারে, আবার ক্ষমতা হারাতেও পারে।

রাষ্ট্র থাকে। জনগণ থাকে। সুতরাং ভারতের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থও একটি স্থিতিশীল ও জনগণভিত্তিক বাংলাদেশ-নীতি দাবি করে।

চীনকে সামনে রেখে চাপের রাজনীতি নয়

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ার প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত নয়।

ঢাকা দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, বেইজিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা করবে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং ইউরোপ, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গেও সহযোগিতা বাড়াবে- এটাই স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় কৌশল।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর নীতি হতে পারে- বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, সিদ্ধান্ত জাতীয় স্বার্থে।

ভারত যদি বাংলাদেশের বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখে, তাহলে ভুল হবে। বরং একটি স্বাধীন, স্থিতিশীল ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী বাংলাদেশ ভারতের জন্যও লাভজনক প্রতিবেশী।

গঙ্গার পানি: বন্ধুত্বের বাস্তব পরীক্ষা

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি এখন গঙ্গার পানি।

১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি ৩০ বছরের জন্য স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। বাংলাদেশ সরকারের যৌথ নদী কমিশনের তথ্যেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

চুক্তিটির নবায়ন তাই আগামী মাসগুলোতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমের পানিপ্রবাহের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর প্রবাহের পরিবর্তন এবং দুই দেশের ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা নতুন চুক্তিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তাই নতুন চুক্তি শুধু ১৯৯৬ সালের কাঠামো পুনরাবৃত্তি করলেই হবে না। প্রয়োজন হতে পারে একটি আধুনিক, ন্যায়সংগত ও জলবায়ু-সহনশীল পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো।

এখানে ভারতের সদিচ্ছা যেমন প্রয়োজন, তেমনি বাংলাদেশেরও প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক ও শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রস্তুতি।

কারণ প্রতিবেশী সম্পর্কের সবচেয়ে কার্যকর পরীক্ষা হয় মানুষের জীবনে- কূটনৈতিক বিবৃতিতে নয়।

ভারতকে এখন একটি মৌলিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে

দিল্লির সামনে এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন- ভারত কি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক হিসেবে দেখবে, নাকি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক হিসেবে দেখবে?

দ্বিতীয় পথটিই ভারতের জন্য বেশি লাভজনক।

শেখ হাসিনা ভারতের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক অংশীদার ছিলেন- এটি ইতিহাসের অংশ। কিন্তু ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। ২০২৬ সালে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণও নতুন রূপ পেয়েছে।

এই বাস্তবতা অস্বীকার করে পুরোনো কাঠামো ধরে রাখার চেষ্টা করলে দিল্লি-ঢাকা দূরত্ব আরও বাড়তে পারে।

ভারতের উচিত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পছন্দকে সম্মান করা এবং কোনো একটি দল বা ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে অতিরিক্তভাবে যুক্ত না করা।

এতে শুধু বাংলাদেশের আস্থাই বাড়বে না, ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থও সুরক্ষিত হবে।

তাহলে ভারতের করণীয় কী?

প্রথমত, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে স্পষ্ট ও সময়োপযোগী কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রয়োজন। বিষয়টি দীর্ঘসূত্রতায় না রেখে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর আলোচনা হওয়া দরকার।

দ্বিতীয়ত, ভারতের ভূখণ্ড বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে- এমন অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে দৃশ্যমান নীতিগত অবস্থান প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, তারেক রহমানের ভারত সফর হলে সেটিকে কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সফরে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব ফলাফলভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগে পরিণত করা দরকার।

চতুর্থত, গঙ্গার পানি, সীমান্তে প্রাণহানি, বাণিজ্য ভারসাম্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও ভিসা- এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত ব্যাক-চ্যানেল ও উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও সক্রিয় করা দরকার।

বাংলাদেশেরও দায়িত্ব আছে

তবে আস্থার সংকট দূর করার দায়িত্ব শুধু ভারতের নয়। বাংলাদেশকেও বাস্তববাদী হতে হবে।

ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলানো সম্ভব নয়। নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদী, বাণিজ্য ও যোগাযোগের কারণে দুই দেশ পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

তাই ঢাকার কূটনীতি হওয়া উচিত দৃঢ়, কিন্তু উত্তেজনানির্ভর নয়; আত্মমর্যাদাপূর্ণ, কিন্তু সংঘাতমুখী নয়।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা এবং একই সঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা- এই ভারসাম্যপূর্ণ নীতিই বাংলাদেশের জন্য বেশি কার্যকর।

বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বহুমুখী কূটনীতিই হতে পারে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

শেষ কথা

তারেক রহমানের দিল্লি সফরকে শুধু একটি বিদেশ সফর হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

এটি হতে পারে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ভারতের পুরোনো কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মুখোমুখি হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

শেখ হাসিনার শাসনামল নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ, অভিযোগ ও বিচারপ্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে পুরোপুরি স্বাভাবিক করা কঠিন। একই সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত উদ্বেগকেও বাংলাদেশের উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

অতএব, প্রয়োজন আবেগ নয়- বাস্তববাদ। প্রয়োজন প্রতিশোধ নয়- জবাবদিহি। প্রয়োজন সংঘাত নয়- সমমর্যাদার সহযোগিতা।

একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার- বাংলাদেশ ভারতের বন্ধু হতে পারে, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী নয়।

ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিভাবক নয়।

আর শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র হতে পারেন, কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোনো এক ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করতে পারে না।

তারেক রহমানের সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে- ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষা প্রতিষ্ঠা করা।

সেই ভাষা হবে- সংঘাত নয়, সহযোগিতা। আত্মসমর্পণ নয়, আত্মমর্যাদা। বিচ্ছিন্নতা নয়, ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি।

প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্র হবে বাংলাদেশ।

আর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এগোবে দুই দেশের রাষ্ট্র ও জনগণের পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে।

কারণ একটি দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব তখনই টেকসই হয়, যখন সেই বন্ধুত্বে সম্মান থাকে, সমতা থাকে এবং আস্থা থাকে।

ঢাকা এখন সেই আস্থাই চায়। আর দিল্লির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতাকে ভারত কতটা মেনে নিতে প্রস্তুত?

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


প্রিন্ট