ঢাকা ১০:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
Logo নবম পে-স্কেলের শেষ ধাপে সরকার: বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপনের সম্ভাবনা Logo খাদ্যগুদামে নয়ছয়ের দিন শেষ, সিন্ডিকেটের মদদদাতারাও রেহাই পাবে না: খাদ্যমন্ত্রী Logo নেপালে ভয়াবহ বন্যা: ৩৬০-এর বেশি মৃত্যু, নিখোঁজ ১,৪০০ Logo মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আদর্শ অনুসরণে শান্তিপূর্ণ দেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর Logo আমি এখানে বসা তথ্যমন্ত্রী হিসেবে, কারো আত্মীয় হিসেবে নয়: পার্থ Logo মালয়েশিয়ায় অভিযানে ২৫২ জন আটক, ১৬৪ জনই বাংলাদেশি Logo রাষ্ট্রপতির শপথের পর মন্ত্রিসভায় শপথ নিলেন মঈন খান, পার্থ, সাচিং ও শামীম Logo মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন আরও চারজন, আজই শপথের আভাস Logo রুহুল কবির রিজভী হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব Logo ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

৯ম পে-স্কেল: জাতি কী এবার ঘুষের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে?

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
  • আপডেট সময় ০৭:৪৬:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২৫৪২ বার পড়া হয়েছে

একটি দেশের সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো কেবল মাস শেষে পাওয়া অর্থের হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতা, কর্মচারীদের জীবনমান, মেধাবীদের সরকারি চাকরিতে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা, পেশাগত মর্যাদা এবং সর্বোপরি নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর ৩১ আগস্ট ২০২৬ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬, যা নবম পে-স্কেল হিসেবে পরিচিত। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এটি নিঃসন্দেহে বড় একটি আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও যাতায়াতের ক্রমবর্ধমান খরচের বাস্তবতায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন ছিল। ন্যায্য বেতন কর্মীদের আর্থিক চাপ কমাতে, পেশাগত মর্যাদা বাড়াতে এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।

কিন্তু এই বেতন সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বেতন কত বাড়ল- তা নয়। প্রশ্ন হলো, বেতন বাড়ার পর কি সরকারি সেবায় ঘুষ কমবে?

আরও বড় প্রশ্ন- জাতি কি এবার সত্যিই ঘুষের অভিশাপ থেকে মুক্তির পথে এগোতে পারবে?

এটি আবেগের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতার প্রশ্ন।

ঘুষ কি এখনো নাগরিকের ‘অদৃশ্য কর’?

সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের একটি গভীর সমস্যা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ- টিআইবির ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ সেই বাস্তবতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।

টিআইবির হিসাবে, ২০২৫ সালে সরকারি ও অন্যান্য সেবা নিতে গিয়ে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি খাতে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়ার কথা জানিয়েছে। একই সময়ে জাতীয় পর্যায়ে আনুমানিক ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ দশমিক ২ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।

আরও উদ্বেগজনক হলো, ঘুষ দেওয়া পরিবারগুলোর ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ জানিয়েছে- ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না। মধ্যস্বত্বভোগী-নির্ভর সেবার ক্ষেত্রে ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে এবং ৯১ দশমিক ২ শতাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছে।

এখানেই দুর্নীতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি স্পষ্ট হয়। যখন একজন নাগরিক মনে করেন, ‘ঘুষ না দিলে কাজ হবে না’, তখন ঘুষ আর বিচ্ছিন্ন কোনো বেআইনি লেনদেন থাকে না; তা ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।

শুধু কম বেতন কি ঘুষের কারণ?

সরকারি কর্মচারীদের বেতন কম- তাই তাঁরা ঘুষ নেন; এই ব্যাখ্যা বহুদিন ধরে প্রচলিত। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়।

একই বেতন কাঠামোর মধ্যে হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। আবার তুলনামূলকভাবে উচ্চ বেতন পাওয়া ব্যক্তিও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন।

অতএব বেতন ও দুর্নীতির মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও বেতন একমাত্র কারণ নয়।

দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল জবাবদিহি, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া, দীর্ঘসূত্রতা, দালালচক্র, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ, অবৈধ অর্থনৈতিক লাভ এবং অপরাধের পর শাস্তি পাওয়ার অনিশ্চয়তা।

টিআইবির জরিপও দেখাচ্ছে, সেবার জটিলতা, মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা এবং অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া দুর্নীতির সুযোগ বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ ৯ম পে-স্কেলকে শুধু Salary Reform হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে বৃহত্তর Administrative Reform-এর সূচনা হিসেবেও দেখতে হবে।

বেতন বাড়লে দায়িত্বও বাড়বে

রাষ্ট্র যখন তার কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বেতন বাড়ায়, তখন এর সঙ্গে একটি নৈতিক প্রত্যাশাও তৈরি হয়।

রাষ্ট্র বলবে- “আমরা তোমাকে ন্যায্য বেতন দেব।”

সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব হবে- “আমি জনগণকে ন্যায্য সেবা দেব।”

রাষ্ট্র বলবে- “তোমার পেশাগত মর্যাদা রক্ষা করব।”

কর্মচারীর অঙ্গীকার হওয়া উচিত- “আমি ক্ষমতার অপব্যবহার করব না।”

এটাই হতে পারে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি।

অর্থাৎ বেতন বৃদ্ধি শুধু কর্মচারীর অধিকার নয়; এর সঙ্গে জনগণের প্রতি দায়িত্বও আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

সহজ সূত্রে বলা যায়- Salary ↑ → Accountability ↑ → Service Quality ↑ → Bribery ↓

অর্থাৎ বেতন বাড়বে, কিন্তু তার সঙ্গে জবাবদিহিও বাড়তে হবে। জবাবদিহি বাড়লে সেবার মান বাড়বে এবং ঘুষের সুযোগ কমবে।

প্রয়োজন কর্মদক্ষতাভিত্তিক প্রশাসন

বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা জরুরি।

একজন কর্মকর্তার মূল্যায়ন শুধু কতটি ফাইল নিষ্পত্তি করেছেন বা কতটি প্রতিবেদন দিয়েছেন- এ দিয়ে শেষ হওয়া উচিত নয়। মূল্যায়নে থাকতে পারে-

– নাগরিক কত দ্রুত সেবা পেয়েছেন;

– নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা দেওয়া হয়েছে কি না;

– অভিযোগ কত দ্রুত নিষ্পত্তি হয়েছে;

– সেবাগ্রহীতার সন্তুষ্টির মাত্রা;

– দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের প্রবণতা;

– দায়িত্ব পালনে কর্মকর্তা কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ছিলেন।

যে কর্মকর্তা দক্ষতা, সততা ও নাগরিকবান্ধব আচরণের জন্য পরিচিত হবেন, তাঁর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি থাকা দরকার। একইভাবে প্রমাণিত দুর্নীতির ক্ষেত্রে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ পুরস্কারহীন সততা যেমন দুর্বল প্রশাসন তৈরি করে, তেমনি শাস্তিহীন দুর্নীতি তৈরি করে আরও বড় দুর্নীতির সংস্কৃতি।

ডিজিটাল সেবা হতে পারে ঘুষবিরোধী বড় অস্ত্র

দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয় যেখানে প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ, সিদ্ধান্ত ব্যক্তিনির্ভর এবং নাগরিক জানেন না তাঁর আবেদন কোথায় আটকে আছে।

ডিজিটালাইজেশন এখানে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। প্রতিটি সরকারি আবেদনের জন্য একটি ইউনিক ট্র্যাকিং নম্বর চালু করা যেতে পারে। নাগরিক মোবাইল ফোন থেকেই জানতে পারবেন- আবেদন গ্রহণ হয়েছে কি না, ফাইল কোন পর্যায়ে আছে, কত দিন ধরে পড়ে আছে এবং নির্ধারিত সময়সীমা কত।

এতে ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রেখে ঘুষ আদায়ের সুযোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

তবে শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই হবে না। টিআইবির জরিপে দেখা গেছে, আংশিক ডিজিটালাইজেশন থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতির মাত্রা উচ্চ রয়ে গেছে।

অর্থাৎ প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রক্রিয়ার সংস্কার জরুরি। নীতিগত লক্ষ্য হতে পারে- No Cash. No Middleman. No Hidden Fee.

অপ্রয়োজনীয় নগদ লেনদেন নয়, দালালের ওপর নির্ভরতা নয়, গোপন ফিও নয়।

সম্পদের হিসাব হবে কার্যকর জবাবদিহির হাতিয়ার

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী দেওয়ার বিধান থাকলেও সেটিকে কেবল কাগজের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।

বৈধ আয়, ঘোষিত সম্পদ এবং জীবনযাত্রার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা গেলে ঝুঁকি-ভিত্তিক যাচাই করা যেতে পারে। তবে এখানে দুটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, নিরপরাধ কর্মকর্তা যেন হয়রানির শিকার না হন।

দ্বিতীয়ত, প্রভাবশালী কেউ যেন ক্ষমতা, পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আইনের বাইরে থাকতে না পারেন।

আইনের শাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো- আইন সবার জন্য সমান।

ঘুষ না দেওয়া নাগরিককে সুরক্ষা দিতে হবে

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নাগরিকই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু একজন নাগরিক ঘুষ দিতে অস্বীকার করে অভিযোগ করার পর যদি তাঁর নিজের কাজ আটকে যায়, তাহলে অন্য কেউ আর সাহস করে ঘুষ প্রত্যাখ্যান করবেন না।

তাই প্রয়োজন নিরাপদ ও গোপন অভিযোগ ব্যবস্থা, অভিযোগকারীর পরিচয় সুরক্ষা, দ্রুত তদন্ত, প্রতিশোধমূলক হয়রানির বিরুদ্ধে সুরক্ষা এবং অভিযোগের অগ্রগতি জানার ব্যবস্থা।

একজন নাগরিক তখনই ঘুষ প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন, যখন তিনি নিশ্চিত থাকবেন- “ঘুষ না দিয়েও আমার কাজ হবে।”

এই নিশ্চয়তা তৈরি করাই রাষ্ট্রের অন্যতম বড় দায়িত্ব।

আন্তর্জাতিক সূচকও সতর্ক করছে

বাংলাদেশের দুর্নীতির আন্তর্জাতিক চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। Transparency International-এর Corruption Perceptions Index (CPI) 2025-এ বাংলাদেশ ২৪ স্কোর নিয়ে ১৮২ দেশের মধ্যে ১৫০তম অবস্থানে রয়েছে। CPI-তে শূন্যকে সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ১০০-কে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। CPI সরাসরি কতটি ঘুষের ঘটনা ঘটেছে তা গণনা করে না; এটি মূলত সরকারি খাতের দুর্নীতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়িক মহলের ধারণা পরিমাপ করে। অন্যদিকে টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ নাগরিকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

দুটি সূচকের পদ্ধতি আলাদা হলেও উভয় ক্ষেত্রের তথ্য আমাদের একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়- কেন দুর্নীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমছে না?

এর উত্তর খুঁজতে হলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক না রেখে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক করতে হবে।

৯ম পে-স্কেলের সঙ্গে হতে পারে ১০ দফা ‘ঘুষমুক্ত প্রশাসন’ কর্মসূচি

৯ম পে-স্কেলের সঙ্গে একটি জাতীয় Bribery-Free Public Service Framework চালু করা যেতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে-

১. প্রতিটি সরকারি সেবার বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ।

২. সরকারি ফি যতটা সম্ভব সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা।

৩. প্রতিটি আবেদনের জন্য ইউনিক ট্র্যাকিং নম্বর চালু করা।

৪. ঘুষের অভিযোগের জন্য নিরাপদ ও গোপন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি।

৫. সম্পদ বিবরণীর ঝুঁকি-ভিত্তিক যাচাই।

৬. সরকারি অফিসে দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা।

৭. নাগরিক সন্তুষ্টিকে কর্মকর্তা মূল্যায়নের অংশ করা।

৮. প্রমাণিত দুর্নীতিতে দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।

৯. সততা ও দক্ষতার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার চালু করা।

১০. প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের বার্ষিক Public Service Integrity Report প্রকাশ করা।

এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে ৯ম পে-স্কেল শুধু সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ানোর কর্মসূচি থাকবে না; এটি প্রশাসনের চরিত্র পরিবর্তনেরও একটি সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

অর্থনৈতিক ভারসাম্যও জরুরি

বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় হলেও এর আর্থিক প্রভাব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে। তাই রাজস্ব আয় বাড়ানো, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয়ের অপচয় কমানো এবং ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি।

সরকারকে একই সঙ্গে দেখতে হবে- বেতন বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে।

অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন- Pay Reform + Revenue Reform + Administrative Reform + Anti-Corruption Reform

এই চারটি সংস্কারকে একই ধারায় এগিয়ে নেওয়া। কারণ শুধু বেতন বাড়িয়ে প্রশাসনিক সংস্কার না করলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না। আবার প্রশাসনিক সংস্কার করতে গিয়ে কর্মচারীদের ন্যায্য জীবনমান উপেক্ষা করলেও কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা ধরে রাখা কঠিন হবে।

শেষ কথা: বেতন সংস্কার, নাকি রাষ্ট্র সংস্কার?

৯ম পে-স্কেল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি বড় আর্থিক সংস্কার। এটি তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে, পেশাগত মর্যাদা বাড়াতে এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।

কিন্তু একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় নৈতিক পরীক্ষাও। কারণ রাষ্ট্র যখন তার কর্মচারীদের অধিক আর্থিক সুবিধা ও মর্যাদা দিচ্ছে, তখন নাগরিকেরও একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন থাকবে- “এর বিনিময়ে আমি কী পাব?”

উত্তরটি হওয়া উচিত-

– দ্রুত সেবা।

– স্বচ্ছ সেবা।

– দালালমুক্ত সেবা।

– ঘুষমুক্ত সেবা।

– জবাবদিহিমূলক সেবা।

বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়, যেখানে পাসপোর্ট করতে ঘুষ দিতে হবে না; ভূমির কাগজ পেতে দালাল খুঁজতে হবে না; বিআরটিএর সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে না; সরকারি হাসপাতালে সেবা পেতে পরিচয় বা সুপারিশের প্রয়োজন হবে না; একটি ফাইল এগিয়ে নিতে কাউকে ‘ম্যানেজ’ করতে হবে না।

একজন সরকারি কর্মকর্তা যেন তাঁর পদকে ক্ষমতার উৎস নয়, জনসেবার দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। আর একজন নাগরিক যেন সরকারি অফিসে গিয়ে মনে করেন- “আমি কারও অনুগ্রহ নিতে আসিনি; আমি আমার অধিকার নিতে এসেছি।”

৯ম পে-স্কেল সেই নতুন সম্পর্ক তৈরির একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।

রাষ্ট্রের সামনে এখন দুটি পথ। একটি হলো শুধু বেতন বাড়ানো। অন্যটি হলো বেতন বাড়ানোর সঙ্গে প্রশাসনের চরিত্রও বদলে দেওয়া।

বাংলাদেশের প্রয়োজন দ্বিতীয় পথটি। কারণ সরকারি কর্মচারীর ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; আর সেই বেতনের বিনিময়ে জনগণকে সৎ, দক্ষ, দ্রুত ও মানবিক সেবা দেওয়া সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব।

তাই এখন প্রয়োজন একটি নতুন জাতীয় অঙ্গীকার- “ন্যায্য বেতন, ন্যায্য সেবা, শূন্য ঘুষ।”

যেদিন একজন সাধারণ নাগরিক ঘুষ ছাড়াই তাঁর সরকারি সেবা পাবেন, সেদিনই ৯ম পে-স্কেলের প্রকৃত সাফল্য প্রমাণিত হবে।

তখন আমরা শুধু বলব না- সরকারি কর্মচারীদের বেতন বেড়েছে।বরং গর্ব করে বলতে পারব- রাষ্ট্রের সেবার মান বেড়েছে, নাগরিকের মর্যাদা বেড়েছে এবং ঘুষের জায়গা কমেছে।’

আর সেই দিনই ৯ম পে-স্কেল একটি বেতন সংস্কার থেকে রূপ নেবে রাষ্ট্র সংস্কারের মাইলফলকে।

সেদিন হয়তো বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই বলতে পারবে- ঘুষ সরকারি সেবার স্বাভাবিক মূল্য নয়; নাগরিকের অধিকারই সরকারি সেবার ভিত্তি।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


প্রিন্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

৯ম পে-স্কেল: জাতি কী এবার ঘুষের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে?

আপডেট সময় ০৭:৪৬:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একটি দেশের সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো কেবল মাস শেষে পাওয়া অর্থের হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতা, কর্মচারীদের জীবনমান, মেধাবীদের সরকারি চাকরিতে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা, পেশাগত মর্যাদা এবং সর্বোপরি নাগরিকের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর ৩১ আগস্ট ২০২৬ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পেয়েছে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬, যা নবম পে-স্কেল হিসেবে পরিচিত। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও মূল বেতন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এটি নিঃসন্দেহে বড় একটি আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও যাতায়াতের ক্রমবর্ধমান খরচের বাস্তবতায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন ছিল। ন্যায্য বেতন কর্মীদের আর্থিক চাপ কমাতে, পেশাগত মর্যাদা বাড়াতে এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।

কিন্তু এই বেতন সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বেতন কত বাড়ল- তা নয়। প্রশ্ন হলো, বেতন বাড়ার পর কি সরকারি সেবায় ঘুষ কমবে?

আরও বড় প্রশ্ন- জাতি কি এবার সত্যিই ঘুষের অভিশাপ থেকে মুক্তির পথে এগোতে পারবে?

এটি আবেগের প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতার প্রশ্ন।

ঘুষ কি এখনো নাগরিকের ‘অদৃশ্য কর’?

সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নাগরিক জীবনের একটি গভীর সমস্যা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ- টিআইবির ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ সেই বাস্তবতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে।

টিআইবির হিসাবে, ২০২৫ সালে সরকারি ও অন্যান্য সেবা নিতে গিয়ে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার অন্তত একটি খাতে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়ার কথা জানিয়েছে। একই সময়ে জাতীয় পর্যায়ে আনুমানিক ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ দশমিক ২ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।

আরও উদ্বেগজনক হলো, ঘুষ দেওয়া পরিবারগুলোর ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ জানিয়েছে- ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না। মধ্যস্বত্বভোগী-নির্ভর সেবার ক্ষেত্রে ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ পরিবার ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছে এবং ৯১ দশমিক ২ শতাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা উঠে এসেছে।

এখানেই দুর্নীতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি স্পষ্ট হয়। যখন একজন নাগরিক মনে করেন, ‘ঘুষ না দিলে কাজ হবে না’, তখন ঘুষ আর বিচ্ছিন্ন কোনো বেআইনি লেনদেন থাকে না; তা ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।

শুধু কম বেতন কি ঘুষের কারণ?

সরকারি কর্মচারীদের বেতন কম- তাই তাঁরা ঘুষ নেন; এই ব্যাখ্যা বহুদিন ধরে প্রচলিত। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়।

একই বেতন কাঠামোর মধ্যে হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। আবার তুলনামূলকভাবে উচ্চ বেতন পাওয়া ব্যক্তিও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন।

অতএব বেতন ও দুর্নীতির মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও বেতন একমাত্র কারণ নয়।

দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল জবাবদিহি, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া, দীর্ঘসূত্রতা, দালালচক্র, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ, অবৈধ অর্থনৈতিক লাভ এবং অপরাধের পর শাস্তি পাওয়ার অনিশ্চয়তা।

টিআইবির জরিপও দেখাচ্ছে, সেবার জটিলতা, মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা এবং অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া দুর্নীতির সুযোগ বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ ৯ম পে-স্কেলকে শুধু Salary Reform হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে বৃহত্তর Administrative Reform-এর সূচনা হিসেবেও দেখতে হবে।

বেতন বাড়লে দায়িত্বও বাড়বে

রাষ্ট্র যখন তার কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বেতন বাড়ায়, তখন এর সঙ্গে একটি নৈতিক প্রত্যাশাও তৈরি হয়।

রাষ্ট্র বলবে- “আমরা তোমাকে ন্যায্য বেতন দেব।”

সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব হবে- “আমি জনগণকে ন্যায্য সেবা দেব।”

রাষ্ট্র বলবে- “তোমার পেশাগত মর্যাদা রক্ষা করব।”

কর্মচারীর অঙ্গীকার হওয়া উচিত- “আমি ক্ষমতার অপব্যবহার করব না।”

এটাই হতে পারে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি।

অর্থাৎ বেতন বৃদ্ধি শুধু কর্মচারীর অধিকার নয়; এর সঙ্গে জনগণের প্রতি দায়িত্বও আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

সহজ সূত্রে বলা যায়- Salary ↑ → Accountability ↑ → Service Quality ↑ → Bribery ↓

অর্থাৎ বেতন বাড়বে, কিন্তু তার সঙ্গে জবাবদিহিও বাড়তে হবে। জবাবদিহি বাড়লে সেবার মান বাড়বে এবং ঘুষের সুযোগ কমবে।

প্রয়োজন কর্মদক্ষতাভিত্তিক প্রশাসন

বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা জরুরি।

একজন কর্মকর্তার মূল্যায়ন শুধু কতটি ফাইল নিষ্পত্তি করেছেন বা কতটি প্রতিবেদন দিয়েছেন- এ দিয়ে শেষ হওয়া উচিত নয়। মূল্যায়নে থাকতে পারে-

– নাগরিক কত দ্রুত সেবা পেয়েছেন;

– নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা দেওয়া হয়েছে কি না;

– অভিযোগ কত দ্রুত নিষ্পত্তি হয়েছে;

– সেবাগ্রহীতার সন্তুষ্টির মাত্রা;

– দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের প্রবণতা;

– দায়িত্ব পালনে কর্মকর্তা কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ছিলেন।

যে কর্মকর্তা দক্ষতা, সততা ও নাগরিকবান্ধব আচরণের জন্য পরিচিত হবেন, তাঁর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি থাকা দরকার। একইভাবে প্রমাণিত দুর্নীতির ক্ষেত্রে দ্রুত, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ পুরস্কারহীন সততা যেমন দুর্বল প্রশাসন তৈরি করে, তেমনি শাস্তিহীন দুর্নীতি তৈরি করে আরও বড় দুর্নীতির সংস্কৃতি।

ডিজিটাল সেবা হতে পারে ঘুষবিরোধী বড় অস্ত্র

দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয় যেখানে প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ, সিদ্ধান্ত ব্যক্তিনির্ভর এবং নাগরিক জানেন না তাঁর আবেদন কোথায় আটকে আছে।

ডিজিটালাইজেশন এখানে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। প্রতিটি সরকারি আবেদনের জন্য একটি ইউনিক ট্র্যাকিং নম্বর চালু করা যেতে পারে। নাগরিক মোবাইল ফোন থেকেই জানতে পারবেন- আবেদন গ্রহণ হয়েছে কি না, ফাইল কোন পর্যায়ে আছে, কত দিন ধরে পড়ে আছে এবং নির্ধারিত সময়সীমা কত।

এতে ফাইল ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রেখে ঘুষ আদায়ের সুযোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

তবে শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই হবে না। টিআইবির জরিপে দেখা গেছে, আংশিক ডিজিটালাইজেশন থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতির মাত্রা উচ্চ রয়ে গেছে।

অর্থাৎ প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রক্রিয়ার সংস্কার জরুরি। নীতিগত লক্ষ্য হতে পারে- No Cash. No Middleman. No Hidden Fee.

অপ্রয়োজনীয় নগদ লেনদেন নয়, দালালের ওপর নির্ভরতা নয়, গোপন ফিও নয়।

সম্পদের হিসাব হবে কার্যকর জবাবদিহির হাতিয়ার

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী দেওয়ার বিধান থাকলেও সেটিকে কেবল কাগজের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।

বৈধ আয়, ঘোষিত সম্পদ এবং জীবনযাত্রার মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা গেলে ঝুঁকি-ভিত্তিক যাচাই করা যেতে পারে। তবে এখানে দুটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, নিরপরাধ কর্মকর্তা যেন হয়রানির শিকার না হন।

দ্বিতীয়ত, প্রভাবশালী কেউ যেন ক্ষমতা, পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আইনের বাইরে থাকতে না পারেন।

আইনের শাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো- আইন সবার জন্য সমান।

ঘুষ না দেওয়া নাগরিককে সুরক্ষা দিতে হবে

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নাগরিকই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু একজন নাগরিক ঘুষ দিতে অস্বীকার করে অভিযোগ করার পর যদি তাঁর নিজের কাজ আটকে যায়, তাহলে অন্য কেউ আর সাহস করে ঘুষ প্রত্যাখ্যান করবেন না।

তাই প্রয়োজন নিরাপদ ও গোপন অভিযোগ ব্যবস্থা, অভিযোগকারীর পরিচয় সুরক্ষা, দ্রুত তদন্ত, প্রতিশোধমূলক হয়রানির বিরুদ্ধে সুরক্ষা এবং অভিযোগের অগ্রগতি জানার ব্যবস্থা।

একজন নাগরিক তখনই ঘুষ প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন, যখন তিনি নিশ্চিত থাকবেন- “ঘুষ না দিয়েও আমার কাজ হবে।”

এই নিশ্চয়তা তৈরি করাই রাষ্ট্রের অন্যতম বড় দায়িত্ব।

আন্তর্জাতিক সূচকও সতর্ক করছে

বাংলাদেশের দুর্নীতির আন্তর্জাতিক চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। Transparency International-এর Corruption Perceptions Index (CPI) 2025-এ বাংলাদেশ ২৪ স্কোর নিয়ে ১৮২ দেশের মধ্যে ১৫০তম অবস্থানে রয়েছে। CPI-তে শূন্যকে সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ১০০-কে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। CPI সরাসরি কতটি ঘুষের ঘটনা ঘটেছে তা গণনা করে না; এটি মূলত সরকারি খাতের দুর্নীতি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়িক মহলের ধারণা পরিমাপ করে। অন্যদিকে টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ নাগরিকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

দুটি সূচকের পদ্ধতি আলাদা হলেও উভয় ক্ষেত্রের তথ্য আমাদের একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়- কেন দুর্নীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কমছে না?

এর উত্তর খুঁজতে হলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক না রেখে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক করতে হবে।

৯ম পে-স্কেলের সঙ্গে হতে পারে ১০ দফা ‘ঘুষমুক্ত প্রশাসন’ কর্মসূচি

৯ম পে-স্কেলের সঙ্গে একটি জাতীয় Bribery-Free Public Service Framework চালু করা যেতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে-

১. প্রতিটি সরকারি সেবার বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ।

২. সরকারি ফি যতটা সম্ভব সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা।

৩. প্রতিটি আবেদনের জন্য ইউনিক ট্র্যাকিং নম্বর চালু করা।

৪. ঘুষের অভিযোগের জন্য নিরাপদ ও গোপন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি।

৫. সম্পদ বিবরণীর ঝুঁকি-ভিত্তিক যাচাই।

৬. সরকারি অফিসে দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা।

৭. নাগরিক সন্তুষ্টিকে কর্মকর্তা মূল্যায়নের অংশ করা।

৮. প্রমাণিত দুর্নীতিতে দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।

৯. সততা ও দক্ষতার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার চালু করা।

১০. প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের বার্ষিক Public Service Integrity Report প্রকাশ করা।

এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে ৯ম পে-স্কেল শুধু সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ানোর কর্মসূচি থাকবে না; এটি প্রশাসনের চরিত্র পরিবর্তনেরও একটি সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

অর্থনৈতিক ভারসাম্যও জরুরি

বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় হলেও এর আর্থিক প্রভাব উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে। তাই রাজস্ব আয় বাড়ানো, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয়ের অপচয় কমানো এবং ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি।

সরকারকে একই সঙ্গে দেখতে হবে- বেতন বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ে।

অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন- Pay Reform + Revenue Reform + Administrative Reform + Anti-Corruption Reform

এই চারটি সংস্কারকে একই ধারায় এগিয়ে নেওয়া। কারণ শুধু বেতন বাড়িয়ে প্রশাসনিক সংস্কার না করলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যাবে না। আবার প্রশাসনিক সংস্কার করতে গিয়ে কর্মচারীদের ন্যায্য জীবনমান উপেক্ষা করলেও কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা ধরে রাখা কঠিন হবে।

শেষ কথা: বেতন সংস্কার, নাকি রাষ্ট্র সংস্কার?

৯ম পে-স্কেল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি বড় আর্থিক সংস্কার। এটি তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে, পেশাগত মর্যাদা বাড়াতে এবং দক্ষ জনবল ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।

কিন্তু একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় নৈতিক পরীক্ষাও। কারণ রাষ্ট্র যখন তার কর্মচারীদের অধিক আর্থিক সুবিধা ও মর্যাদা দিচ্ছে, তখন নাগরিকেরও একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন থাকবে- “এর বিনিময়ে আমি কী পাব?”

উত্তরটি হওয়া উচিত-

– দ্রুত সেবা।

– স্বচ্ছ সেবা।

– দালালমুক্ত সেবা।

– ঘুষমুক্ত সেবা।

– জবাবদিহিমূলক সেবা।

বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়, যেখানে পাসপোর্ট করতে ঘুষ দিতে হবে না; ভূমির কাগজ পেতে দালাল খুঁজতে হবে না; বিআরটিএর সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে না; সরকারি হাসপাতালে সেবা পেতে পরিচয় বা সুপারিশের প্রয়োজন হবে না; একটি ফাইল এগিয়ে নিতে কাউকে ‘ম্যানেজ’ করতে হবে না।

একজন সরকারি কর্মকর্তা যেন তাঁর পদকে ক্ষমতার উৎস নয়, জনসেবার দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। আর একজন নাগরিক যেন সরকারি অফিসে গিয়ে মনে করেন- “আমি কারও অনুগ্রহ নিতে আসিনি; আমি আমার অধিকার নিতে এসেছি।”

৯ম পে-স্কেল সেই নতুন সম্পর্ক তৈরির একটি ঐতিহাসিক সুযোগ।

রাষ্ট্রের সামনে এখন দুটি পথ। একটি হলো শুধু বেতন বাড়ানো। অন্যটি হলো বেতন বাড়ানোর সঙ্গে প্রশাসনের চরিত্রও বদলে দেওয়া।

বাংলাদেশের প্রয়োজন দ্বিতীয় পথটি। কারণ সরকারি কর্মচারীর ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব; আর সেই বেতনের বিনিময়ে জনগণকে সৎ, দক্ষ, দ্রুত ও মানবিক সেবা দেওয়া সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব।

তাই এখন প্রয়োজন একটি নতুন জাতীয় অঙ্গীকার- “ন্যায্য বেতন, ন্যায্য সেবা, শূন্য ঘুষ।”

যেদিন একজন সাধারণ নাগরিক ঘুষ ছাড়াই তাঁর সরকারি সেবা পাবেন, সেদিনই ৯ম পে-স্কেলের প্রকৃত সাফল্য প্রমাণিত হবে।

তখন আমরা শুধু বলব না- সরকারি কর্মচারীদের বেতন বেড়েছে।বরং গর্ব করে বলতে পারব- রাষ্ট্রের সেবার মান বেড়েছে, নাগরিকের মর্যাদা বেড়েছে এবং ঘুষের জায়গা কমেছে।’

আর সেই দিনই ৯ম পে-স্কেল একটি বেতন সংস্কার থেকে রূপ নেবে রাষ্ট্র সংস্কারের মাইলফলকে।

সেদিন হয়তো বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই বলতে পারবে- ঘুষ সরকারি সেবার স্বাভাবিক মূল্য নয়; নাগরিকের অধিকারই সরকারি সেবার ভিত্তি।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


প্রিন্ট