৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার প্রকল্পে ২০ কোটি স্মার্ট কার্ড; এক পরিচয়ে মিলবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তাসহ সরকারি সেবা
জন্মের পরই ‘এক-আইডি’: নাগরিক সেবা সহজ হবে, নাকি বাড়বে তথ্যের ঝুঁকি?
- আপডেট সময় ০৯:৫০:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২৫৩২ বার পড়া হয়েছে
একটি শিশুর জন্ম হলো। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তার জন্য তৈরি হবে একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচয়। সেই পরিচয় থাকবে সারা জীবন। স্কুলে ভর্তি, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি ভাতা, কৃষিসেবা, কর, পাসপোর্ট কিংবা অন্যান্য সরকারি সেবা নিতে বারবার আলাদা পরিচয়পত্র বা একই তথ্য জমা দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। ভবিষ্যতে ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে পারে একই পরিচয়।
বাংলাদেশে এমন একটি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থার নাম ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’ বা ‘এক-আইডি’।
নামটি ছোট হলেও এর পরিধি বড়। এটি কেবল একটি নতুন পরিচয়পত্র তৈরির প্রকল্প নয়; বরং জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, সরকারি সেবা, বায়োমেট্রিক তথ্য, ডিজিটাল লেনদেন এবং বিভিন্ন সরকারি তথ্যভান্ডারকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ।
এ লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের প্রস্তাবিত ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ বা ‘ডি-স্টার’ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে রাখা হয়েছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলকে। প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
৩ সেপ্টেম্বর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞা।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের মোট ব্যয় ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে আসবে ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা।
এত বড় বিনিয়োগের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে- নাগরিক কী পাবেন, রাষ্ট্র কী পাবে এবং এই ব্যবস্থার ঝুঁকি কোথায়?
জন্মনিবন্ধন থেকে ‘এক-আইডি’: পরিবর্তনটা কোথায়?
বর্তমান ব্যবস্থায় জন্মের পর একটি শিশুর প্রথম সরকারি পরিচয় হলো জন্মনিবন্ধন। বয়স ১৮ বছর হলে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এরপর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত হয় পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, কর শনাক্তকরণ নম্বরসহ নানা পরিচয় ও নিবন্ধন। ফলে একই ব্যক্তির তথ্য একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের আলাদা তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত থাকে।
সমস্যা তৈরি হয় যখন এসব তথ্যের মধ্যে সামান্য অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। কোথাও নামের বানান এক রকম, কোথাও অন্য রকম। কোথাও জন্মতারিখে ভুল। আবার ঠিকানা কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিগত তথ্যেও পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে নাগরিককে একটি তথ্য প্রমাণ বা সংশোধনের জন্য একাধিক কাগজপত্র নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে যেতে হয়।
‘এক-আইডি’র মূল উদ্দেশ্য হলো এই বিচ্ছিন্নতা কমানো। জন্মের সময় একজন নাগরিককে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দেওয়া হবে এবং পরবর্তী জীবনের বিভিন্ন সরকারি সেবা ও তথ্য সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হবে।
এটি কার্যকর হলে নাগরিককে একই তথ্য বারবার দেওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করতে পারবে।
অর্থাৎ নাগরিককে তথ্যের বাহক না বানিয়ে রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল অবকাঠামোকেই তথ্য যাচাইয়ের প্রধান মাধ্যম করার চেষ্টা হবে।
১৮ কোটি নাগরিক, কার্ড তৈরি হবে ২০ কোটি
প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জনশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে প্রায় ১৮ কোটি নাগরিকের জন্য পরিচয় তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ২০ কোটি।
প্রতিটি পলিকার্বোনেট চিপ কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৪৬ টাকা। প্রতিটি কার্ড বিতরণ ও সরবরাহে আরও ১ মার্কিন ডলার বা প্রায় ১২৩ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে।
অর্থাৎ উৎপাদন, মুদ্রণ, বিতরণ ও সরবরাহ মিলিয়ে একটি কার্ডের আনুমানিক ব্যয় প্রায় ৩৬৯ টাকা।
তবে প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয় শুধু কার্ড তৈরিতে নয়। কার্ড উৎপাদন, মুদ্রণ, বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ ও বিতরণে প্রস্তাবিত ব্যয় প্রায় ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।
এখানেই প্রকল্পটির অর্থনৈতিক যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। রাষ্ট্র কি মূলত ২০ কোটি কার্ড তৈরিতে এত বড় অর্থ ব্যয় করবে, নাকি এই ব্যয়ের বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি একটি ডিজিটাল পরিচয় অবকাঠামো তৈরির বিনিয়োগ?
দ্বিতীয়টি হলে প্রকল্পের সাফল্য কার্ডের মান দিয়ে নয়, বরং কার্ডের পেছনে থাকা প্রযুক্তি, তথ্যভান্ডার, সফটওয়্যার, তথ্য বিনিময়ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তার সক্ষমতা দিয়ে বিচার করতে হবে।
কারণ নাগরিকের হাতে নতুন একটি চিপ কার্ড তুলে দিলেই সরকারি সেবা সহজ হয়ে যাবে- এমন নিশ্চয়তা নেই।
আসল চ্যালেঞ্জ কার্ড নয়, তথ্যের আন্তসংযোগ
বাংলাদেশে ইতিমধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, টিআইএনসহ বিভিন্ন পরিচয় ও তথ্যব্যবস্থা রয়েছে। তাই নতুন ‘এক-আইডি’ চালুর আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- বিদ্যমান এসব ব্যবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী হবে?
ধরা যাক, একটি শিশুর জন্মের সময় তার এক-আইডি তৈরি হলো। পরে সে স্কুলে ভর্তি হলো, স্বাস্থ্যসেবা নিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল, চাকরি পেল, কর দিল, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এল এবং পাসপোর্ট করল।
জীবনের এসব পর্যায়ের তথ্য যদি একই পরিচয়ের সঙ্গে নির্ভুলভাবে যুক্ত করা যায়, তাহলে একজন নাগরিকের পুরো জীবনচক্রের সেবা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমন্বয় তৈরি হতে পারে।
কিন্তু বিপরীত ঝুঁকিটিও কম নয়। মূল পরিচয়ভান্ডারে ভুল থাকলে কী হবে? জন্মতারিখ ভুল হলে? নামের বানান ভুল হলে? বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহে ভুল হলে? কিংবা কোনো কারণে পরিচয় চুরি হয়ে গেলে?
তখন একটি ভুল শুধু একটি কার্ডে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সেই ভুল একাধিক সরকারি সেবায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সুতরাং এক-আইডির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কার্ড তৈরি নয়- তথ্যের নির্ভুলতা, তথ্যের সামঞ্জস্য এবং আন্তঃকার্যক্ষমতা নিশ্চিত করা।
একজন নাগরিক, একটি পরিচয়, একটি ওয়ালেট
প্রস্তাবিত উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো- ‘একজন নাগরিক, একটি ডিজিটাল পরিচয়, একটি ওয়ালেট।’ এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ডিজিটাল পরিচয়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল লেনদেন ও সরকারি সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ, সরকারি ভাতা কিংবা অন্যান্য সুবিধা আরও সরাসরি নাগরিকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। মধ্যস্বত্বভোগী কমানো এবং প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর হতে পারে। তবে পরিচয়ব্যবস্থার সঙ্গে আর্থিক লেনদেন যুক্ত হলে ঝুঁকিও বাড়বে।
একজন নাগরিকের পরিচয় যদি একই সঙ্গে সরকারি সেবা এবং অর্থ লেনদেনের প্রবেশদ্বার হয়ে ওঠে, তাহলে পরিচয় চুরি বা তথ্য ফাঁস শুধু প্রশাসনিক সমস্যায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা আর্থিক ক্ষতির কারণও হতে পারে।
তাই ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর ক্ষেত্রে শক্তিশালী পরিচয় যাচাই, প্রতারণা প্রতিরোধ, লেনদেনের নিরাপত্তা এবং নাগরিকের সম্মতির বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: নাগরিকের তথ্যের মালিক কে?
‘এক-আইডি’ প্রকল্পের সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই। একজন নাগরিকের পরিচয়, বায়োমেট্রিক তথ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর, সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য সরকারি সেবার তথ্য যদি একটি ডিজিটাল পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের হাতে নাগরিক সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ তথ্য কেন্দ্রীভূত হবে।
প্রযুক্তিগতভাবে এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করতে পারে বড় ধরনের ঝুঁকিও।
তথ্য ফাঁস হলে কী হবে? কেউ অননুমোদিতভাবে তথ্য ব্যবহার করলে কী হবে? কোন কর্মকর্তা কোন তথ্য দেখতে পারবেন? একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের তথ্য কতটা ব্যবহার করতে পারবে? নাগরিক কি জানতে পারবেন তাঁর কোন তথ্য কখন এবং কেন ব্যবহার করা হয়েছে? ভুল তথ্য থাকলে তা সংশোধনের অধিকার কীভাবে প্রয়োগ করবেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট না হলে এক-আইডি নাগরিক সেবা সহজ করার পাশাপাশি নতুন ধরনের প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ডি-স্টার প্রকল্প-সংক্রান্ত নথিতেও ডেটা প্রোটেকশন, প্রাইভেসি, ডেটা শেয়ারিং, ডেটা এক্সচেঞ্জ এবং আন্তঃকার্যক্ষমতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
অতএব, প্রকল্পের আলোচনায় শুধু ‘স্মার্ট কার্ড’ থাকলে চলবে না; থাকতে হবে ডেটা গভর্ন্যান্স, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নাগরিকের তথ্য-অধিকার।
একবার ভুল, বহু জায়গায় ভুল- ঝুঁকি ঠেকাবে কে?
একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থায় তথ্যের নির্ভুলতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ধরা যাক, জন্মনিবন্ধনের সময় একটি শিশুর জন্মতারিখ ভুলভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো। পরে সেই তথ্য এক-আইডির মূল পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শিক্ষা, পাসপোর্ট, কর কিংবা অন্য সরকারি ব্যবস্থায় চলে গেল। তাহলে একটি ছোট ভুলই পরবর্তী জীবনে বড় প্রশাসনিক সমস্যায় পরিণত হতে পারে। এ কারণে তথ্য সংশোধনের ব্যবস্থা হতে হবে দ্রুত, সহজ ও নাগরিকবান্ধব।
নাগরিককে যদি ভুল সংশোধনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা, জেলা কিংবা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঘুরতে হয়, তাহলে ‘এক-আইডি’ পুরোনো ভোগান্তিরই নতুন ডিজিটাল সংস্করণে পরিণত হতে পারে।
ডিজিটাল ব্যবস্থা তখনই সফল হবে, যখন নাগরিকের জন্য শুধু তথ্য প্রদান নয়, তথ্য সংশোধন, আপিল এবং প্রতিকারের অধিকারও সহজ হবে।
ডিজিটাল বৈষম্যও বড় প্রশ্ন
দেশের সব নাগরিক প্রযুক্তির দিক থেকে সমান অবস্থানে নেই। শহর ও গ্রামের মধ্যে ইন্টারনেট সুবিধা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতায় পার্থক্য রয়েছে। প্রবীণ, দরিদ্র, প্রতিবন্ধী এবং প্রযুক্তিতে কম অভ্যস্ত মানুষের জন্য ডিজিটাল সেবা গ্রহণের ব্যবস্থা সহজ না হলে নতুন পরিচয়ব্যবস্থা নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করতে পারে।
তাই এক-আইডির পাশাপাশি নাগরিক সহায়তা কেন্দ্র, অফলাইন যাচাই, বিকল্প সেবা এবং সহজ অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
কারণ ডিজিটাল রাষ্ট্র মানে সব সেবা শুধু অনলাইনে নিয়ে যাওয়া নয়। বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে নাগরিকের কাছে সেবা আরও সহজ, দ্রুত ও ন্যায়সংগতভাবে পৌঁছে দেওয়া।
৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার বিনিয়োগ- সাফল্য মাপা হবে কী দিয়ে?
এত বড় অর্থ ব্যয়ের পর প্রকল্পের সাফল্য শুধু কতটি কার্ড তৈরি হয়েছে- তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। পাঁচ বছর পর মূল্যায়নের সময় অন্তত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার।
নাগরিককে সরকারি সেবা পেতে কত কম কাগজপত্র দিতে হচ্ছে? একই তথ্য কতবার দিতে হচ্ছে? সেবা পেতে সময় কতটা কমেছে? পরিচয় জালিয়াতি কতটা কমেছে? সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে কতটা নির্ভুলভাবে পৌঁছেছে? তথ্য সংশোধনের সময় কতটা কমেছে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা গেছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ইতিবাচক না হলে ২০ কোটি কার্ড তৈরি হলেও প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
প্রকল্পের আগে প্রয়োজন আস্থা
‘এক-আইডি’ বাংলাদেশের সরকারি সেবা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। জন্মের পর থেকে একজন নাগরিকের পরিচয় যদি একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, কর ও অন্যান্য সেবা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় বাড়তে পারে।
কিন্তু সম্ভাবনার সঙ্গে ঝুঁকিও কম নয়। কারণ পরিচয় এক করা মানে শুধু প্রশাসনিক তথ্য এক করা নয়; এর সঙ্গে নাগরিকের ব্যক্তিগত জীবনের বহু তথ্যও যুক্ত হতে পারে।
তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি- কী তথ্য সংগ্রহ করা হবে, কেন সংগ্রহ করা হবে, কোথায় সংরক্ষণ করা হবে, কে ব্যবহার করতে পারবে, কতদিন রাখা হবে, নাগরিক কীভাবে নিজের তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে জানতে পারবেন এবং অপব্যবহার হলে প্রতিকার কী হবে।
এখানে প্রযুক্তির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে আইন, নীতি, জবাবদিহি এবং নাগরিক আস্থা।
শেষ পর্যন্ত ‘এক-আইডি’কে শুধু একটি স্মার্ট কার্ড প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
তবে লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘একজন নাগরিক, একটি পরিচয়’ নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত- একজন নাগরিক, একটি নিরাপদ পরিচয়; সহজ ও দ্রুত সেবা; এবং নিজের তথ্যের ওপর কার্যকর অধিকার।
কার্ড তৈরি করা প্রযুক্তিগত কাজ। কিন্তু নাগরিকের তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনের মানই শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে- ‘এক-আইডি’ বাংলাদেশের নাগরিক জীবনে সত্যিই স্বস্তি আনবে, নাকি সুবিধার আড়ালে তৈরি করবে তথ্যের নতুন ঝুঁকি।
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক
প্রিন্ট












