ঢাকা ০৩:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
Logo অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের টাইগারদের ঐতিহাসিক জয় Logo গ্যাস সংকট : আগামী ১৯ আগস্টের মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে Logo রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং অলি আহমদের মনোনয়নপত্র বাছাই আজ Logo সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে মিসরও যোগ দিতে পারে : হাকান ফিদান Logo সড়কপথে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান Logo বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে রিজভী, আমান, ডোনার ও ইসমাইল Logo খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকীতে কড়াইলে দোয়া, উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান Logo স্বরাষ্ট্র ছাড়লেন সালাহউদ্দিন, এলজিআরডির দায়িত্ব পেলেন Logo নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি Logo পরাজয় জেনেও রাষ্ট্রপতি প্রার্থী অলি আহমদ

ফাহমিদা রিআ’র ছোট গল্প ”দায়”

ক্রাইম প্রতিদিন ডেস্ক:
  • আপডেট সময় ০৯:৩১:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
  • / ২৫৬৯ বার পড়া হয়েছে

দায়............ ফাহমিদা রিআ

//ফাহমিদা রিআ//

শারাফাত প্রতিবারের মত এবারও লাগেজগুলো ঘরের একপাশে রেখে মল্লিকাকে উদ্দেশ্য করে বললো, এগুলোতে যেন হাত লাগিও না। জার্নির ক্লান্তি কাটিয়ে কাল আমিই খুলবো। যার জন্য যা এনেছি দিবো।
মল্লিকা অন্যান্যবারের মত মাথা কাত করে সায় দিয়ে কিচেনে ঢুকলো না এবার। ঠোঁটের কোনে এক টুকরো বিদ্রুপাত্মক হাসি ছুঁড়ে দিতে দিতে বললো,
—– কেউ অপেক্ষাতে বসেও নেই আর,এসব ছুঁয়ে দেখবার জন্য।
শারাফাত বরাবরই স্বল্পভাষী মানুষ। প্রতি উত্তরে বিস্ময় নিয়ে একবার তাকালো শুধু।

পরদিন সকাল থেকেই মল্লিকাকে বাড়িতে পাওয়া গেলো না । শারাফাত প্রথমে ভেবেছিলো, আশে পাশেই কোথাও গেছে নিতান্তই প্রয়োজনে। যা অসচেতন মহিলা,হয়তো শারাফাতকে সকালের নাস্তা দেয়ার জন্য আটা চিনি বা চা পাতা কিছু একটা নেই দেখে মোড়ের দোকানটায় গেছে। দীর্ঘ সাতাশটা বছরে একটুও স্বভাব পাল্টালো না মল্লিকার। সেই যে ক্লাশ এইট পড়ুয়া চোদ্দ বছরের কিশোরি মেয়েটির সাথে গাঁটছড়া বেঁধে দিলো গুরুজনেরা, এতটা সময়েও পুরো বুদ্ধি হলো না বৌয়ের। ভাগ্যিস প্রবাসে চাকরীটা ছিল, নইলে এ মোটা বুদ্ধির সংগি নিয়ে সারাক্ষন নাজেহাল হতে হতো,মুখ খিস্তি করে ভাবে শারাফাত।
মেয়েটার বিয়ে দিয়ে গেছে গতবছর ছুটিতে এসে। পাত্র শিক্ষিত, সুদর্শন। এটা ওটা দিতেও কার্পন্য করে নি শারাফাত। গা ভরা গহনা, ট্রাক ভরা আসবাব কোনটারই ঘাটতি রাখে নি। মেয়ে সুখে না থেকে উপায় আছে?
আর ছেলেকে সেই ছোট্ট থেকেই দূরে দূরে, ভালো স্কুল খুঁজে অন্য শহরে বোর্ডিং এ রাখার ব্যবস্হা করেছিল শারাফাত। রেজাল্টও ভালো বরাবরই। ভার্সিটিতে ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করতে না করতে চাকরীটাও হয়ে গেছে। মাকে জানিয়ে দিয়েছে, স্কলারশীপটা হয়ে গেলেই নিজ পছন্দের সহপাঠিকে বিয়ে করে একসাথে উড়াল দিবে ইউরোপে।
মল্লিকা মেয়ের বিয়ের পর থেকে আবার সেই একা শুরুর মত।

মল্লিকা শুরুতে খুব অস্হির করতো শারাফাতকে। হয় ওকে নিয়ে যেতে হবে, নয় তো প্রবাসের চাকরী ছেড়ে আসতে হবে। তাই কি হয়? মধ্যপ্রাচ্যের প্রাইভেট কোম্পানির সাধারন এক চাকুরী শারাফাতের। তিন বছর পর পর নবায়ন করে আবারো কর্মস্হলে বহাল হয়। পরিবার নিয়ে থাকবার মত অবস্হান থাকতে হবে তো। অনুমতি নেই যে। আর যাওয়ার দরকারটাইবা কি। একগাদা খরচ। সেতো চুক্তি অনুযায়ী বছরে একমাসের ছুটি সহ আসা যাওয়ার টিকেট পায়। মাসে মাসে ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়বে। ঘর হবে, বাড়ি হবে শাড়ি গয়না সব হবে।
মল্লিকা অবুঝ তবু। দু’ বছর পর কোল ভরা কন্যা এলো যখন একটু স্হিরতা এলো মেয়ের লালন পালনে। তার দু’ বছর পর ছেলে। দিন গড়ায়, ছেলে মেয়েকে নিয়ে ছুটে মল্লিকা একা একা কখনও ডাক্তারের কাছে, কখনও খেলনার দোকানে, কখনওবা শিশু পার্কে।
স্কুলও শুরু হয় একদিন দুজনের। স্বল্প বিদ্যাধারী মা স্বপ্ন দেখায় মেয়েকে।আরো, আরো বড় হতে হবে খুকি। আমাকে দেখ্, এভাবে চার দেয়ালের একাকীত্ব নয়, এত সুন্দর পৃথিবীটাকে দেখার দৃষ্টি তৈরি করতে হবে তোকেই। জীবনটা সুন্দর, জানবি, বুঝবি। তবেই না সুন্দর।
এ জগতটা যে দেয়া নেয়ার।

নিয়ম মাফিক শারাফাত বছরের ছুটিতে এসেছে। কন্যা বিদায়ের পর থেকে মল্লিকা আগলে রেখেছে ঘরবাড়ি একা একা। অদূরেই তার পৈতৃক বাড়ি। ভাইদের ভাগাভাগির ঝঞ্ঝাট থেকে দূরেই থাকে মল্লিকা। বাবা মা বেঁচে থাকতে আশেপাশেই ভাড়া বাসতে থাকা কালীন তাঁদের ছায়াতেই একার সংগ্রামটা চালিয়েছে। অশিতীপর বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়ি বেঁচে থাকতেও গ্রাম ছাড়া হতে চান নি কোনদিনও। হাল ধরার মত মল্লিকা পাশে পায় নি শ্বশুরকুলের কাউকেই।

শারাফাত এক টুকরো জমি কিনলো এক ছুটিতে এসে। মল্লিকা দিনের পর দিন পরিশ্রান্ত হয়ে কামলা কামিনদের ঝক্কি সামলিয়ে বানালো বাস স্হান। সাজালো ঘর। আবার নতুন করে বায়না এলো মনে।শারাফাতকে লিখলো চিঠিতে,
” অনেকতো হলো চলে এসো এবার, মাথা গুঁজার ঠাঁইতো হয়েছে,দেশ এসে ছোট খাটো একটা ব্যবসা করবে, আমাদের ডালভাতের ব্যবস্হা হয়ে যাবে।”
নাহ্ শারাফাত টলে নি। হেসে উড়িয়ে দিয়েছে,মেয়ে মানুষের বুদ্ধি বলে কথা। এইতো বেশ আছি, বেশ রেখেছিও।

এরপর থেকে ছুটিতে দেশে এলেও মল্লিকা কিছু বলে নি আর। শারাফাতকে চিনতে কিছুই বাকি ছিলো না ততদিনে। মন বুঝার অক্ষমতা নিয়েই জীবনের বাকি দিনগুলি পার করবে সে। সংসার যেহেতু একজনের অর্থে পরিচালিত, শাসন শোষনটা তারই একতরফা, এটাই শারাফাতের একমাত্র জ্ঞান। কারো ইচ্ছা, অনিচ্ছা, সখ আহ্লাদ নির্ধারন করার দায় শুধু কর্তাব্যক্তিরই। এসবে পাত্তা দিতে গেলে এত উন্নতি কি সম্ভব হতো? আত্মতৃপ্তিতে মনে মনে হাসে শারাফাত।

কিন্তু একি, এখনও মল্লিকা ফিরছে না কেন? বেলাওতো কম হয় নি। গতরাতে জার্নির ধকল সয়ে খেয়েদেয়ে সেই যে ঘুম দিলো শারাফাত, চোখ মেলতেই একেবারে সকাল। ভেবেছিলো প্রতিবারের মত ডাইনিং এ সাজানো থাকবে গরম গরম পরোটা, ভুনা মাংস, পায়েশ পুডিং এর বাটি। তা না এই মহিলার বয়স বাড়ার সাথে সাথে কাজে ভারিক্কি ভাবতো এলোই না, উপরন্তু ছেলেমানুষি বাড়ছে। মোড়ের দোকানে গিয়ে ঠিক গল্প জুড়ে দিয়েছে কারো সাথে। বাচাল মেয়েমানুষ কোথাকার।
হঠাৎ চোখ গেলো টেবিলের উপর মোবাইল সেটটার উপর। ক’ বছর আগে নিজের নতুন সেট কিনে এটা মল্লিকাকে দিয়ে গিয়েছিলো। এটা সংগে নিয়ে গেলে অন্তত একচোট ঝাড়ি দেয়া যেতো তাড়াতাড়ি ফিরতে বলে।
ভাঁজ করা কাগজটা ছিলো মোবাইল চাপা দেয়া। শারাফাত হাতে তুলে নিলো, কৌতুহল বশতঃ মেলে ধরলো,
“আমায় খুঁজো না। প্রয়োজন যতদিন ছিলো আমি ছিলাম। সন্তানেরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, তুমি ফিরেছো, অপেক্ষা শেষ আমার। বুঝে নাও বাড়ি আর বাড়ির প্রতিটি কণা, যা সযত্নেই আগলে রেখেছি সাতাশটা বছর।”—– মল্লিকা।

শারাফাত স্বভাব সুলভ আচরনে রক্তচক্ষু নিয়ে স্বশরীরে হাজির হলো শ্বশুরবাড়িতে। শালাবউকে হাঁক ডাক দিয়ে বললো, তোমার আপাকে এখনই আমার সাথে বাড়িতে যেতে বলো, নাহলে জন্মের মত এখানেই থাকতে হবে। পায়ে ধরলেও নিবো না পরে।আমাকেতো চেনে না। নাটক শুরু করেছে।
কিন্তু জানা গেলো,মল্লিকা এখানে আসেই নি, বের হবে কোত্থেকে?
মেয়ের বাড়িতেও একই কান্ড। ছেলেকে ফোন করলেন পাশের শহরে। কোথাও যায় নি মল্লিকা।
একদিন দুদিন তিনদিন….. পেরিয়ে গেলো মাসও। অনেক কথার গুঞ্জন। এ বয়সে কেমন ভীমরতি মল্লিকার? কেউ বললো, নতুন করে সংসারি হলো কিনা নতুন কাউকে নিয়ে।বলে কয়েতো আর হারায় না কেউ, লুকোয়। আর লুকোবে তখনই যখন সামনে আসতে বাধা থাকবে। কলিকাল আর কাকে বলে।
শারাফাত বসে পড়লো ঘর বাড়ির প্রতিটা মুল্যবান জিনিসপত্র, কাগজ -দলিল আর ফাইলপত্র মিলাতে। পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব লিখেই রেখে গিয়েছে মল্লিকা। সাতাশ বছরের পাই পয়সার হিসেব।
বাকি হিসেবটাও এসে পৌঁছুলো দিন কতক পর উকিল নোটিশের মাধ্যমে।
ছেলেমেয়েরা বাবার কাছেই ছিলো সেদিন। বাবার অগ্নিমূর্তিটা হঠাৎই যেন চুপসে গেলো। শুধু বললো, উকিলের ঠিকানাটায় একবার যাওয়া উচিত।

অগত্যা মল্লিকার মুখোমুখি হবার বহুবিধ চেষ্টার পর রওনা হলো শারাফাত আর তার সন্তানেরা পাওয়া নির্দেশানুযায়ী। ঠিকানা মিলিয়ে একেবারে ঝকঝকে তকতকে দ্বিতল বাড়িটির সামনে। সদর দরজায় খবর জানাতেই ডাক এলো। নীচতলার অফিস রুমটায় ঢুকার মুখে নেমপ্লেটে লেখা নামটা ক’ জোড়া চোখ পড়ে ফেললো মুহুর্তেই, ” আহনাফ আহমেদ”।
ছিমছাম রুমে সুদর্শন এক ভদ্রলোক ফাইল ঘাটছেন মন দিয়ে। চোখ না তুলেই সাজানো চেয়ারগুলোতে বসতে আহ্বান জানালেন। কোন ভুমিকা ছাড়াই বললেন,
—— উকিল সাহেব আমাকে ফোনে জানিয়েছেন আপনাদের আসবার কথা। আমি সেভাবেই জানিয়েছিলাম মল্লিকাকে।
রিভলভিং চেয়ারটা ঘুরিয়ে মুখোমুখি হলেন এবার হাতের ফাইলটা বন্ধ করে।

—– যা বলার তাতো মল্লিকা আইনগতভাবেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জানিয়েছে। মুখোমুখি বসবার প্রয়োজন পড়লো কেনো? মল্লিকা আপাতত মুখে কিছু বলতে আগ্রহী নন।

এখানে আসার পর থেকে অসহনীয় একের পর এক দৃশ্য দেখতে দেখতে মেয়ের ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো এবার,
চোখের পানি মুছতে মুছতে বললো,
—– মা কিভাবে পারলো এমনটা করতে। শ্বশুরবাড়িতে লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। শাশুড়িতো মুখের উপর বলেই চলেছেন সেই প্রথম দিন থেকে, মা নাকি কার সাথে পালিয়ে ঘর বেঁধেছে।

পাশে থেকে ছেলে বোনকে একটা ধমক দিয়ে বললো, মা এমন কোন মহান কাজ করেনি যে, তার জন্য শোক করতে হবে কেঁদে কেঁদে। স্বামী সন্তানের কথা যে ভাবলো না একবারও, নিজের সুখটাই বড় হলো, তার জন্য আবার কান্না কিসের? ধিক্কার দিতে এসেছি ধিক্কার।

আহনাফ তাকলো এবার শারাফাতের দিকে,
—— ঠিক। শুনেছি আপনার কাছে জীবন মানেই অর্থ। তাইতো সারাটা জীবন অর্থের পিছু ছুটেছেন, সেই অর্থের জোরেই ছেলেমেয়েরা আজ আপনার হয়ে ধিক্কার জানাতে এসেছে সারা জীবন একা আগলে রাখা সেই মাকে। মায়ের দুঃখ, অপমান, নিগ্রহ, বঞ্চনা যাদের কাছে খুব মামুলি একটা ব্যাপার। এটা দেখেই তারা অভ্যস্ত জন্ম থেকে। মায়ের চাওয়া পাওয়া মানে যাদের ভাবনায় সুস্হ চিন্তা বহন করে না। মায়ের ইচ্ছা অনিচ্ছা যাদের চিন্তা চেতনায় শুধু স্বার্থপরতাই বহন করে। যারা আজও বুঝলো না, তাদের গর্ভধারীনি শেকল পরা মা মুক্তির স্বাদ নিতে চার দেয়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে। মুক্তি মানে পুনরায় শৃঙ্খলে জড়ানো নয়, নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্নও নয়।
বাকিটাও আপনাদের জানা উচিত।

এরপর ভেতর ঘরের দিকে গলা বাড়িয়ে ডাকলেন,
—- উনারা এসে পড়েছেন। এসো প্লিজ।

এগিয়ে এলেন ছাইরঙা জমিনে মেরুন পাড়ের তাঁতের শাড়ির আঁচলটা আলতো করে মাথায় তুলে।
ছয় জোড়া চোখ অগ্নি দৃষ্টি আছড়ে পড়লো সেদিকে। কে? কে উনি?
ষাটোর্ধ বয়স। সামনের কাঁচা পাকা চুলগুলোতে স্বল্পতার আভাস। রেইমলেস চশমার মাঝখান থেকে গভীর দৃষ্টি ছড়িয়ে দিতে দিতে আহনাফ আহমেদের পাশের চেয়ারটি টেনে বসলেন। মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বললেন,
—–মল্লিকা অনেক আগেই মুক্তির আলোর সন্ধানটা পেয়েছিলো। স্কুল বান্ধবীর সহায়তায় নিজের অসামান্য গুনের কিছু হাতের কাজ বাজার পেয়েছিলো খুব জোরালোভাবেই। দেশের বাইরেও ব্যাপক চাহিদা বাড়ছিলো। উদ্যোক্তারা অর্ডারের পর অর্ডার দিতে দিতে মল্লিকাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুললো। প্রয়োজন অনুভব করলো মল্লিকাকে সার্বক্ষনিকভাবে পাওয়ার। কিন্তু ছেলেমেয়েদের মাতৃদায় তখন পুরো মল্লিকার কাঁধে।

তারপর সন্তানেরা নিজ নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর একসময় দেখলো, তার আর প্রয়োজন নেই কারো গন্ডিতে।
আমাদের সাথে যোগাযোগ করলো। লুফে নিলাম তাকে, স্হায়ী চাকুরীর ব্যবস্হা করে। সময় নিলো আরো কিছুদিন, শারাফাতের ফিরবার অপেক্ষার, আমানত বুঝিয়ে দেবার অপেক্ষার।
এবার একটু আমার কথায় আসি।
খুব অল্প বয়সে ছোট্ট আহনাফকে নিয়ে আমি বিধবা হই। অনেক কষ্টের সাগর সাঁতরে ছেলেকে লেখাপড়া শিখাই। ছেলে লেখাপড়া শিখে অমানুষ হয় নি, সত্যিই মানুষ হয়েছে। বিদেশ থেকেই এ প্রতিষ্ঠানটিকে চালিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর
। দেশের শাখাগুলোর দেখভাল করি আমরা কজন অসহায়, স্বল্পশিক্ষিত অবহেলিতরা।
মল্লিকা নিজ আগ্রহেই উত্তরবঙ্গের শাখাটি বেছে নিয়েছে এ শহর থেকে, আপনজনদের কথার হুল থেকে নিজেকে বাঁচাতে।
কথার মাঝেই শারাফাত জিজ্ঞেস করে ওঠে
—–তার মানে মল্লিকা এখানে নেই?
—– ছিলো। দুপুর তিনটার ট্রেন ওর। সময় হওয়াতে খানিক আগেই বেরুলো।

সামনে দেয়ালে টাঙানো ঘড়িতে তখন প্রায় আড়াইটে।
শারাফাত কি এক ঘোরের মাঝে ওঠে দাঁড়িয়ে সোজা বেরিয়ে গেলেন। পিছে পিছে তড়িঘড়ি অনুসরন করলো ছেলেমেয়েও। কিন্তু বাবার কাছে পৌঁছুনোর আগেই একটা অটোতে ওঠে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেলেন স্টেশনের পথে।
দুইভাইবোনে যখন ষ্টেশনের প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেনটাকে লক্ষ্য করে এক কম্পার্টমেন্টে বসা মাকে আবিষ্কার করলো ঠিক তক্ষুনি জোর হুইসেল বাজিয়ে ট্রেনটা বিশাল দেহ নাড়িয়ে ধীর গতিতে এগোতে শুরু করলো, ঐ চলমান ট্রেনের আর এক কামরার মধ্যে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিয়ে এগোতে দেখা গেলো ওদের বাবা শারাফাতকেও।
বোনের আতংক ছাওয়া চোখের গড়িয়ে পড়া পানি মুছে দিতে দিতে ভাই বলতে থাকলো,
—– আরতো কান্নার কিছু নেইরে বুবু। নিশ্চয়ই বাবা এতক্ষনে চলন্ত বগিতে চলতে চলতে মাকে খুঁজে পেয়েছে। মা ফিরে আসবে দেখিস, ফিরিয়ে আনার দায় যে বাবা নিজেই নিয়েছে।


প্রিন্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

ফাহমিদা রিআ’র ছোট গল্প ”দায়”

আপডেট সময় ০৯:৩১:৫৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

//ফাহমিদা রিআ//

শারাফাত প্রতিবারের মত এবারও লাগেজগুলো ঘরের একপাশে রেখে মল্লিকাকে উদ্দেশ্য করে বললো, এগুলোতে যেন হাত লাগিও না। জার্নির ক্লান্তি কাটিয়ে কাল আমিই খুলবো। যার জন্য যা এনেছি দিবো।
মল্লিকা অন্যান্যবারের মত মাথা কাত করে সায় দিয়ে কিচেনে ঢুকলো না এবার। ঠোঁটের কোনে এক টুকরো বিদ্রুপাত্মক হাসি ছুঁড়ে দিতে দিতে বললো,
—– কেউ অপেক্ষাতে বসেও নেই আর,এসব ছুঁয়ে দেখবার জন্য।
শারাফাত বরাবরই স্বল্পভাষী মানুষ। প্রতি উত্তরে বিস্ময় নিয়ে একবার তাকালো শুধু।

পরদিন সকাল থেকেই মল্লিকাকে বাড়িতে পাওয়া গেলো না । শারাফাত প্রথমে ভেবেছিলো, আশে পাশেই কোথাও গেছে নিতান্তই প্রয়োজনে। যা অসচেতন মহিলা,হয়তো শারাফাতকে সকালের নাস্তা দেয়ার জন্য আটা চিনি বা চা পাতা কিছু একটা নেই দেখে মোড়ের দোকানটায় গেছে। দীর্ঘ সাতাশটা বছরে একটুও স্বভাব পাল্টালো না মল্লিকার। সেই যে ক্লাশ এইট পড়ুয়া চোদ্দ বছরের কিশোরি মেয়েটির সাথে গাঁটছড়া বেঁধে দিলো গুরুজনেরা, এতটা সময়েও পুরো বুদ্ধি হলো না বৌয়ের। ভাগ্যিস প্রবাসে চাকরীটা ছিল, নইলে এ মোটা বুদ্ধির সংগি নিয়ে সারাক্ষন নাজেহাল হতে হতো,মুখ খিস্তি করে ভাবে শারাফাত।
মেয়েটার বিয়ে দিয়ে গেছে গতবছর ছুটিতে এসে। পাত্র শিক্ষিত, সুদর্শন। এটা ওটা দিতেও কার্পন্য করে নি শারাফাত। গা ভরা গহনা, ট্রাক ভরা আসবাব কোনটারই ঘাটতি রাখে নি। মেয়ে সুখে না থেকে উপায় আছে?
আর ছেলেকে সেই ছোট্ট থেকেই দূরে দূরে, ভালো স্কুল খুঁজে অন্য শহরে বোর্ডিং এ রাখার ব্যবস্হা করেছিল শারাফাত। রেজাল্টও ভালো বরাবরই। ভার্সিটিতে ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করতে না করতে চাকরীটাও হয়ে গেছে। মাকে জানিয়ে দিয়েছে, স্কলারশীপটা হয়ে গেলেই নিজ পছন্দের সহপাঠিকে বিয়ে করে একসাথে উড়াল দিবে ইউরোপে।
মল্লিকা মেয়ের বিয়ের পর থেকে আবার সেই একা শুরুর মত।

মল্লিকা শুরুতে খুব অস্হির করতো শারাফাতকে। হয় ওকে নিয়ে যেতে হবে, নয় তো প্রবাসের চাকরী ছেড়ে আসতে হবে। তাই কি হয়? মধ্যপ্রাচ্যের প্রাইভেট কোম্পানির সাধারন এক চাকুরী শারাফাতের। তিন বছর পর পর নবায়ন করে আবারো কর্মস্হলে বহাল হয়। পরিবার নিয়ে থাকবার মত অবস্হান থাকতে হবে তো। অনুমতি নেই যে। আর যাওয়ার দরকারটাইবা কি। একগাদা খরচ। সেতো চুক্তি অনুযায়ী বছরে একমাসের ছুটি সহ আসা যাওয়ার টিকেট পায়। মাসে মাসে ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়বে। ঘর হবে, বাড়ি হবে শাড়ি গয়না সব হবে।
মল্লিকা অবুঝ তবু। দু’ বছর পর কোল ভরা কন্যা এলো যখন একটু স্হিরতা এলো মেয়ের লালন পালনে। তার দু’ বছর পর ছেলে। দিন গড়ায়, ছেলে মেয়েকে নিয়ে ছুটে মল্লিকা একা একা কখনও ডাক্তারের কাছে, কখনও খেলনার দোকানে, কখনওবা শিশু পার্কে।
স্কুলও শুরু হয় একদিন দুজনের। স্বল্প বিদ্যাধারী মা স্বপ্ন দেখায় মেয়েকে।আরো, আরো বড় হতে হবে খুকি। আমাকে দেখ্, এভাবে চার দেয়ালের একাকীত্ব নয়, এত সুন্দর পৃথিবীটাকে দেখার দৃষ্টি তৈরি করতে হবে তোকেই। জীবনটা সুন্দর, জানবি, বুঝবি। তবেই না সুন্দর।
এ জগতটা যে দেয়া নেয়ার।

নিয়ম মাফিক শারাফাত বছরের ছুটিতে এসেছে। কন্যা বিদায়ের পর থেকে মল্লিকা আগলে রেখেছে ঘরবাড়ি একা একা। অদূরেই তার পৈতৃক বাড়ি। ভাইদের ভাগাভাগির ঝঞ্ঝাট থেকে দূরেই থাকে মল্লিকা। বাবা মা বেঁচে থাকতে আশেপাশেই ভাড়া বাসতে থাকা কালীন তাঁদের ছায়াতেই একার সংগ্রামটা চালিয়েছে। অশিতীপর বৃদ্ধ শ্বশুর শাশুড়ি বেঁচে থাকতেও গ্রাম ছাড়া হতে চান নি কোনদিনও। হাল ধরার মত মল্লিকা পাশে পায় নি শ্বশুরকুলের কাউকেই।

শারাফাত এক টুকরো জমি কিনলো এক ছুটিতে এসে। মল্লিকা দিনের পর দিন পরিশ্রান্ত হয়ে কামলা কামিনদের ঝক্কি সামলিয়ে বানালো বাস স্হান। সাজালো ঘর। আবার নতুন করে বায়না এলো মনে।শারাফাতকে লিখলো চিঠিতে,
” অনেকতো হলো চলে এসো এবার, মাথা গুঁজার ঠাঁইতো হয়েছে,দেশ এসে ছোট খাটো একটা ব্যবসা করবে, আমাদের ডালভাতের ব্যবস্হা হয়ে যাবে।”
নাহ্ শারাফাত টলে নি। হেসে উড়িয়ে দিয়েছে,মেয়ে মানুষের বুদ্ধি বলে কথা। এইতো বেশ আছি, বেশ রেখেছিও।

এরপর থেকে ছুটিতে দেশে এলেও মল্লিকা কিছু বলে নি আর। শারাফাতকে চিনতে কিছুই বাকি ছিলো না ততদিনে। মন বুঝার অক্ষমতা নিয়েই জীবনের বাকি দিনগুলি পার করবে সে। সংসার যেহেতু একজনের অর্থে পরিচালিত, শাসন শোষনটা তারই একতরফা, এটাই শারাফাতের একমাত্র জ্ঞান। কারো ইচ্ছা, অনিচ্ছা, সখ আহ্লাদ নির্ধারন করার দায় শুধু কর্তাব্যক্তিরই। এসবে পাত্তা দিতে গেলে এত উন্নতি কি সম্ভব হতো? আত্মতৃপ্তিতে মনে মনে হাসে শারাফাত।

কিন্তু একি, এখনও মল্লিকা ফিরছে না কেন? বেলাওতো কম হয় নি। গতরাতে জার্নির ধকল সয়ে খেয়েদেয়ে সেই যে ঘুম দিলো শারাফাত, চোখ মেলতেই একেবারে সকাল। ভেবেছিলো প্রতিবারের মত ডাইনিং এ সাজানো থাকবে গরম গরম পরোটা, ভুনা মাংস, পায়েশ পুডিং এর বাটি। তা না এই মহিলার বয়স বাড়ার সাথে সাথে কাজে ভারিক্কি ভাবতো এলোই না, উপরন্তু ছেলেমানুষি বাড়ছে। মোড়ের দোকানে গিয়ে ঠিক গল্প জুড়ে দিয়েছে কারো সাথে। বাচাল মেয়েমানুষ কোথাকার।
হঠাৎ চোখ গেলো টেবিলের উপর মোবাইল সেটটার উপর। ক’ বছর আগে নিজের নতুন সেট কিনে এটা মল্লিকাকে দিয়ে গিয়েছিলো। এটা সংগে নিয়ে গেলে অন্তত একচোট ঝাড়ি দেয়া যেতো তাড়াতাড়ি ফিরতে বলে।
ভাঁজ করা কাগজটা ছিলো মোবাইল চাপা দেয়া। শারাফাত হাতে তুলে নিলো, কৌতুহল বশতঃ মেলে ধরলো,
“আমায় খুঁজো না। প্রয়োজন যতদিন ছিলো আমি ছিলাম। সন্তানেরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, তুমি ফিরেছো, অপেক্ষা শেষ আমার। বুঝে নাও বাড়ি আর বাড়ির প্রতিটি কণা, যা সযত্নেই আগলে রেখেছি সাতাশটা বছর।”—– মল্লিকা।

শারাফাত স্বভাব সুলভ আচরনে রক্তচক্ষু নিয়ে স্বশরীরে হাজির হলো শ্বশুরবাড়িতে। শালাবউকে হাঁক ডাক দিয়ে বললো, তোমার আপাকে এখনই আমার সাথে বাড়িতে যেতে বলো, নাহলে জন্মের মত এখানেই থাকতে হবে। পায়ে ধরলেও নিবো না পরে।আমাকেতো চেনে না। নাটক শুরু করেছে।
কিন্তু জানা গেলো,মল্লিকা এখানে আসেই নি, বের হবে কোত্থেকে?
মেয়ের বাড়িতেও একই কান্ড। ছেলেকে ফোন করলেন পাশের শহরে। কোথাও যায় নি মল্লিকা।
একদিন দুদিন তিনদিন….. পেরিয়ে গেলো মাসও। অনেক কথার গুঞ্জন। এ বয়সে কেমন ভীমরতি মল্লিকার? কেউ বললো, নতুন করে সংসারি হলো কিনা নতুন কাউকে নিয়ে।বলে কয়েতো আর হারায় না কেউ, লুকোয়। আর লুকোবে তখনই যখন সামনে আসতে বাধা থাকবে। কলিকাল আর কাকে বলে।
শারাফাত বসে পড়লো ঘর বাড়ির প্রতিটা মুল্যবান জিনিসপত্র, কাগজ -দলিল আর ফাইলপত্র মিলাতে। পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব লিখেই রেখে গিয়েছে মল্লিকা। সাতাশ বছরের পাই পয়সার হিসেব।
বাকি হিসেবটাও এসে পৌঁছুলো দিন কতক পর উকিল নোটিশের মাধ্যমে।
ছেলেমেয়েরা বাবার কাছেই ছিলো সেদিন। বাবার অগ্নিমূর্তিটা হঠাৎই যেন চুপসে গেলো। শুধু বললো, উকিলের ঠিকানাটায় একবার যাওয়া উচিত।

অগত্যা মল্লিকার মুখোমুখি হবার বহুবিধ চেষ্টার পর রওনা হলো শারাফাত আর তার সন্তানেরা পাওয়া নির্দেশানুযায়ী। ঠিকানা মিলিয়ে একেবারে ঝকঝকে তকতকে দ্বিতল বাড়িটির সামনে। সদর দরজায় খবর জানাতেই ডাক এলো। নীচতলার অফিস রুমটায় ঢুকার মুখে নেমপ্লেটে লেখা নামটা ক’ জোড়া চোখ পড়ে ফেললো মুহুর্তেই, ” আহনাফ আহমেদ”।
ছিমছাম রুমে সুদর্শন এক ভদ্রলোক ফাইল ঘাটছেন মন দিয়ে। চোখ না তুলেই সাজানো চেয়ারগুলোতে বসতে আহ্বান জানালেন। কোন ভুমিকা ছাড়াই বললেন,
—— উকিল সাহেব আমাকে ফোনে জানিয়েছেন আপনাদের আসবার কথা। আমি সেভাবেই জানিয়েছিলাম মল্লিকাকে।
রিভলভিং চেয়ারটা ঘুরিয়ে মুখোমুখি হলেন এবার হাতের ফাইলটা বন্ধ করে।

—– যা বলার তাতো মল্লিকা আইনগতভাবেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জানিয়েছে। মুখোমুখি বসবার প্রয়োজন পড়লো কেনো? মল্লিকা আপাতত মুখে কিছু বলতে আগ্রহী নন।

এখানে আসার পর থেকে অসহনীয় একের পর এক দৃশ্য দেখতে দেখতে মেয়ের ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো এবার,
চোখের পানি মুছতে মুছতে বললো,
—– মা কিভাবে পারলো এমনটা করতে। শ্বশুরবাড়িতে লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। শাশুড়িতো মুখের উপর বলেই চলেছেন সেই প্রথম দিন থেকে, মা নাকি কার সাথে পালিয়ে ঘর বেঁধেছে।

পাশে থেকে ছেলে বোনকে একটা ধমক দিয়ে বললো, মা এমন কোন মহান কাজ করেনি যে, তার জন্য শোক করতে হবে কেঁদে কেঁদে। স্বামী সন্তানের কথা যে ভাবলো না একবারও, নিজের সুখটাই বড় হলো, তার জন্য আবার কান্না কিসের? ধিক্কার দিতে এসেছি ধিক্কার।

আহনাফ তাকলো এবার শারাফাতের দিকে,
—— ঠিক। শুনেছি আপনার কাছে জীবন মানেই অর্থ। তাইতো সারাটা জীবন অর্থের পিছু ছুটেছেন, সেই অর্থের জোরেই ছেলেমেয়েরা আজ আপনার হয়ে ধিক্কার জানাতে এসেছে সারা জীবন একা আগলে রাখা সেই মাকে। মায়ের দুঃখ, অপমান, নিগ্রহ, বঞ্চনা যাদের কাছে খুব মামুলি একটা ব্যাপার। এটা দেখেই তারা অভ্যস্ত জন্ম থেকে। মায়ের চাওয়া পাওয়া মানে যাদের ভাবনায় সুস্হ চিন্তা বহন করে না। মায়ের ইচ্ছা অনিচ্ছা যাদের চিন্তা চেতনায় শুধু স্বার্থপরতাই বহন করে। যারা আজও বুঝলো না, তাদের গর্ভধারীনি শেকল পরা মা মুক্তির স্বাদ নিতে চার দেয়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে। মুক্তি মানে পুনরায় শৃঙ্খলে জড়ানো নয়, নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্নও নয়।
বাকিটাও আপনাদের জানা উচিত।

এরপর ভেতর ঘরের দিকে গলা বাড়িয়ে ডাকলেন,
—- উনারা এসে পড়েছেন। এসো প্লিজ।

এগিয়ে এলেন ছাইরঙা জমিনে মেরুন পাড়ের তাঁতের শাড়ির আঁচলটা আলতো করে মাথায় তুলে।
ছয় জোড়া চোখ অগ্নি দৃষ্টি আছড়ে পড়লো সেদিকে। কে? কে উনি?
ষাটোর্ধ বয়স। সামনের কাঁচা পাকা চুলগুলোতে স্বল্পতার আভাস। রেইমলেস চশমার মাঝখান থেকে গভীর দৃষ্টি ছড়িয়ে দিতে দিতে আহনাফ আহমেদের পাশের চেয়ারটি টেনে বসলেন। মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বললেন,
—–মল্লিকা অনেক আগেই মুক্তির আলোর সন্ধানটা পেয়েছিলো। স্কুল বান্ধবীর সহায়তায় নিজের অসামান্য গুনের কিছু হাতের কাজ বাজার পেয়েছিলো খুব জোরালোভাবেই। দেশের বাইরেও ব্যাপক চাহিদা বাড়ছিলো। উদ্যোক্তারা অর্ডারের পর অর্ডার দিতে দিতে মল্লিকাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুললো। প্রয়োজন অনুভব করলো মল্লিকাকে সার্বক্ষনিকভাবে পাওয়ার। কিন্তু ছেলেমেয়েদের মাতৃদায় তখন পুরো মল্লিকার কাঁধে।

তারপর সন্তানেরা নিজ নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার পর একসময় দেখলো, তার আর প্রয়োজন নেই কারো গন্ডিতে।
আমাদের সাথে যোগাযোগ করলো। লুফে নিলাম তাকে, স্হায়ী চাকুরীর ব্যবস্হা করে। সময় নিলো আরো কিছুদিন, শারাফাতের ফিরবার অপেক্ষার, আমানত বুঝিয়ে দেবার অপেক্ষার।
এবার একটু আমার কথায় আসি।
খুব অল্প বয়সে ছোট্ট আহনাফকে নিয়ে আমি বিধবা হই। অনেক কষ্টের সাগর সাঁতরে ছেলেকে লেখাপড়া শিখাই। ছেলে লেখাপড়া শিখে অমানুষ হয় নি, সত্যিই মানুষ হয়েছে। বিদেশ থেকেই এ প্রতিষ্ঠানটিকে চালিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর
। দেশের শাখাগুলোর দেখভাল করি আমরা কজন অসহায়, স্বল্পশিক্ষিত অবহেলিতরা।
মল্লিকা নিজ আগ্রহেই উত্তরবঙ্গের শাখাটি বেছে নিয়েছে এ শহর থেকে, আপনজনদের কথার হুল থেকে নিজেকে বাঁচাতে।
কথার মাঝেই শারাফাত জিজ্ঞেস করে ওঠে
—–তার মানে মল্লিকা এখানে নেই?
—– ছিলো। দুপুর তিনটার ট্রেন ওর। সময় হওয়াতে খানিক আগেই বেরুলো।

সামনে দেয়ালে টাঙানো ঘড়িতে তখন প্রায় আড়াইটে।
শারাফাত কি এক ঘোরের মাঝে ওঠে দাঁড়িয়ে সোজা বেরিয়ে গেলেন। পিছে পিছে তড়িঘড়ি অনুসরন করলো ছেলেমেয়েও। কিন্তু বাবার কাছে পৌঁছুনোর আগেই একটা অটোতে ওঠে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেলেন স্টেশনের পথে।
দুইভাইবোনে যখন ষ্টেশনের প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেনটাকে লক্ষ্য করে এক কম্পার্টমেন্টে বসা মাকে আবিষ্কার করলো ঠিক তক্ষুনি জোর হুইসেল বাজিয়ে ট্রেনটা বিশাল দেহ নাড়িয়ে ধীর গতিতে এগোতে শুরু করলো, ঐ চলমান ট্রেনের আর এক কামরার মধ্যে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিয়ে এগোতে দেখা গেলো ওদের বাবা শারাফাতকেও।
বোনের আতংক ছাওয়া চোখের গড়িয়ে পড়া পানি মুছে দিতে দিতে ভাই বলতে থাকলো,
—– আরতো কান্নার কিছু নেইরে বুবু। নিশ্চয়ই বাবা এতক্ষনে চলন্ত বগিতে চলতে চলতে মাকে খুঁজে পেয়েছে। মা ফিরে আসবে দেখিস, ফিরিয়ে আনার দায় যে বাবা নিজেই নিয়েছে।


প্রিন্ট