৫ আগস্ট: রাজপথ যখন ইতিহাস লিখেছিল
- আপডেট সময় ০৬:৫৬:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
- / ৮৯২ বার পড়া হয়েছে
ইতিহাসের কিছু দিন কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকে না; তারা একটি জাতির চেতনা, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অংশ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জন্য ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তেমনই একটি দিন। সেদিন রাজপথ শুধু প্রতিবাদের সাক্ষী ছিল না; প্রত্যাশা, ক্ষোভ, ত্যাগ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা মিলিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনারও সাক্ষী ছিল। ইতিহাস সেই দিনকে কী নামে অভিহিত করবে, তার চূড়ান্ত উত্তর সময়ই দেবে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছে।
ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে কিছু দিন কেবল একটি তারিখ নয়; তারা হয়ে ওঠে জাতির আত্মপরিচয়ের অংশ। এমন দিনগুলোকে শুধু ঘটনাপঞ্জির ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না; বুঝতে হয় মানুষের স্মৃতি, বেদনা, আশা, প্রত্যাশা এবং সময়ের দীর্ঘ স্রোতের ভেতর দিয়ে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তেমনই এক দিন- যেদিন রাজপথ কেবল প্রতিবাদের ভাষা হয়ে থাকেনি, ইতিহাস রচনার এক অনিবার্য মঞ্চে পরিণত হয়েছিল। কেউ দিনটিকে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের দিন হিসেবে দেখেন, কেউ গণঅভ্যুত্থানের পরিণতি হিসেবে, আবার কেউ দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের একটি ঐতিহাসিক বাঁক বলে মনে করেন। মূল্যায়নে ভিন্নতা থাকতেই পারে। তবে একটি বিষয় অনস্বীকার্য- এই দিনটি বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
ইতিহাস কখনো এক দিনে তৈরি হয় না। একটি দিন আসে বহু দিনের জমে থাকা ক্ষোভ, প্রত্যাশা, বিতর্ক, ব্যর্থতা, সাহস এবং ত্যাগের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে। ৫ আগস্টও তার ব্যতিক্রম নয়। এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের রাজনীতি নির্বাচন, অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নানা প্রশ্নে উত্তপ্ত ছিল। সেই অস্থিরতার ভেতরেই শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে বৃহত্তর জনসমর্থন লাভ করে এবং একসময় তা জাতীয় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয়।
সেদিনের রাজপথ ছিল মানুষের। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের ঢল নেমেছিল। প্রত্যেকের হাতে হয়তো একই স্লোগান ছিল না, কিন্তু পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি সাধারণ সূত্র। ইতিহাসের প্রতিটি গণআন্দোলনের মতো এখানেও আশা ছিল, আবেগ ছিল, আবার ছিল গভীর অনিশ্চয়তাও।
কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি বিজয়ের পেছনে কিছু না কিছু মূল্য দিতে হয়। ২০২৪ সালের সেই আন্দোলনেও বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অনেকে আহত হয়েছেন, অসংখ্য পরিবার হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে। রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক না কেন, এই প্রাণহানি জাতির জন্য এক গভীর বেদনার অধ্যায়। রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই অধ্যায় কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; বরং সহিংসতা এড়িয়ে গণতান্ত্রিক সমাধান খোঁজারও শিক্ষা হয়ে থাকা উচিত।
ক্ষমতা মানুষের হাতে অর্পিত একটি দায়িত্ব। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যে ক্ষমতা জনগণের আস্থা হারায়, সেই ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। রাষ্ট্রের শক্তি অস্ত্র বা প্রশাসনিক কাঠামোতে নয়; রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে নাগরিকের বিশ্বাসে। সেই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে গেলে ক্ষমতার দৃশ্যমান কাঠামোও দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে।
তবে ক্ষমতার পরিবর্তনই গণতন্ত্রের শেষ কথা নয়। বরং সেখান থেকেই শুরু হয় আরও কঠিন পরীক্ষা। নতুন বাস্তবতায় রাষ্ট্র কতটা জবাবদিহিমূলক হবে, বিচারব্যবস্থা কতটা স্বাধীন থাকবে, নির্বাচন কতটা অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক হবে, সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে এবং সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদে মতপ্রকাশ করতে পারবেন- এসব প্রশ্নের উত্তরই একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণ করে।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য বিরোধী মতের অস্তিত্বে। যে সমাজে সবাই একই কথা বলবে, সেখানে গণতন্ত্র নয়, একরৈখিকতা জন্ম নেয়। তাই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিহিংসার রাজনীতি কখনো টেকসই শান্তি আনে না; বরং নতুন সংকটের বীজ বপন করে।
৫ আগস্ট আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়- রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা সরকারের সমার্থক নয়। রাষ্ট্র টিকে থাকে তার সংবিধান, প্রতিষ্ঠান, আইন এবং জনগণের সম্মিলিত আস্থার ওপর। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, নেতৃত্ব বদলাতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী না করা গেলে একই সংকট ভিন্ন সময়ে আবার ফিরে আসতে পারে।
ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার অর্থ হলো ঘটনাগুলোকে আবেগের পাশাপাশি তথ্যের আলোয় বিচার করা। যে কোনো বড় রাজনৈতিক ঘটনার মূল্যায়ন সময়ের সঙ্গে আরও পরিপূর্ণ হয়। নতুন দলিল, গবেষণা এবং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করে। তাই ৫ আগস্টকে বোঝার ক্ষেত্রেও গবেষণা, তথ্যসংগ্রহ এবং মুক্ত আলোচনার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
আমরা যদি সত্যিই এই দিন থেকে শিক্ষা নিতে চাই, তবে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো নাগরিক তার মতপ্রকাশের জন্য ভয় পাবেন না, কোনো নির্বাচন জনগণের আস্থা হারাবে না, কোনো প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হবে না এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।
একটি জাতির পরিপক্বতা কেবল ক্ষমতার পালাবদলে নয়; বরং ক্ষমতার ব্যবহার ও সীমাবদ্ধতা বোঝার মধ্যেই নিহিত। গণতন্ত্রের শক্তি প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মধ্যে নয়, বরং ভিন্নমতকে ধারণ করার সক্ষমতায়।
৫ আগস্ট তাই কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার স্মারক নয়; এটি একটি প্রশ্ন- আমরা কি সত্যিই এমন একটি রাষ্ট্র গড়তে পেরেছি, যেখানে জনগণের ইচ্ছাই সর্বোচ্চ? নাকি আমরা কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় শেষ করে আরেকটি অধ্যায়ের সূচনা করেছি?
এই প্রশ্নের উত্তর একদিনে পাওয়া যাবে না। উত্তর নির্ভর করবে আমাদের আগামী দিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনের শাসন, মানবাধিকার রক্ষা এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপর।
ইতিহাস কোনো সরকারের নয়, কোনো দলেরও নয়; ইতিহাস শেষ পর্যন্ত জনগণের। রাজপথে উচ্চারিত প্রত্যাশা যদি রাষ্ট্রের নীতিতে প্রতিফলিত হয়, তবেই একটি আন্দোলন পূর্ণতা পায়। আর যদি সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ থেকে যায়, ইতিহাস আবারও নতুন প্রশ্ন নিয়ে ফিরে আসে। ৫ আগস্ট আমাদের সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে- আমরা কি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন দেখেছি, নাকি সত্যিই একটি অধিকতর গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের পথে যাত্রা শুরু করেছি? সেই উত্তরই লিখবে আগামী দিনের বাংলাদেশ।
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক | সাংবাদিক | কলামিস্ট | বিশ্লেষক
প্রিন্ট



















