ঢাকা ০৭:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
Logo আগামী মাসেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী Logo সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মতবিনিময় সভা Logo রাজধানী ঢাকায় মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত Logo আজ আবার ৫ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল ইন্দোনেশিয়া Logo ২০২৭ সালের পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য তারিখ Logo অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের টাইগারদের ঐতিহাসিক জয় Logo গ্যাস সংকট : আগামী ১৯ আগস্টের মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে Logo রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং অলি আহমদের মনোনয়নপত্র বাছাই আজ Logo সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে মিসরও যোগ দিতে পারে : হাকান ফিদান Logo সড়কপথে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

সরকারের ১৮০ দিন: তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ কোন পথে?

ডঃ এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
  • আপডেট সময় ০৬:২৭:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
  • / ২৫৪৪ বার পড়া হয়েছে

একটি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে কখনোই তার পূর্ণাঙ্গ সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত মাপকাঠি বলা যায় না। ছয় মাসে একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সংকটের সমাধান হয় না, অর্থনীতির সব চাপ দূর হয় না, প্রশাসনিক সংস্কারও রাতারাতি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে না। তবে প্রথম ১৮০ দিন গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে- এই সময়েই সরকারের অগ্রাধিকার, নীতির দিকনির্দেশনা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনের একটি প্রাথমিক চিত্র পাওয়া যায়।

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারের প্রথম ছয় মাস সেই অর্থে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনাপর্ব। এই সময়কে কেবল অর্জনের তালিকা দিয়ে বিচার না করে বরং দেখা প্রয়োজন- সরকার কোন সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং সেগুলোর স্থায়ী সমাধানের জন্য কী ধরনের কাঠামো তৈরি করতে চাইছে।

প্রথম ১৮০ দিনের কর্মসূচিগুলোর দিকে তাকালে যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তা হলো- সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও ডিজিটাল সেবাকে উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল পুনঃখনন, কৃষিঋণ মওকুফ, ই-হেলথ কার্ড, বৃক্ষরোপণ এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগগুলো সেই অগ্রাধিকারেরই প্রতিফলন।

এখানে আশাবাদের জায়গাটি হলো, এসব উদ্যোগকে শুধু তাৎক্ষণিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, আগামী পাঁচ বছরের বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

ছয় মাসে লক্ষ্য নির্ধারণ

একটি নতুন সরকারের জন্য প্রথম কাজ হলো রাষ্ট্রের সমস্যাগুলোর মধ্যে কোনগুলোকে আগে সমাধান করা হবে, তা নির্ধারণ করা। এই অগ্রাধিকার নির্ধারণের মধ্যেই সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের পরিচয় পাওয়া যায়।

তারেক রহমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিম্নআয়ের পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষকের সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটাল রূপান্তর, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ- এসব এমন ক্ষেত্র, যেখানে রাষ্ট্রের নীতির প্রভাব সরাসরি মানুষের জীবনে পড়ে।

সরকারের পক্ষ থেকে ১৮০ দিনের পাশাপাশি ২০২৬-২৭ অর্থবছর এবং পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য কর্মপরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি একটি ইতিবাচক দিক। কারণ উন্নয়ন কোনো এককালীন প্রকল্প নয়; এটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

একটি সরকারের আজকের সিদ্ধান্তের সুফল অনেক সময় কয়েক বছর পর দৃশ্যমান হয়। তাই প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন হতে পারে- সরকার ভবিষ্যতের জন্য কতটা শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছে।

ফ্যামিলি কার্ড: সহায়তা থেকে স্বাবলম্বিতার পথে

সরকারের আলোচিত কর্মসূচিগুলোর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রথম পর্যায়ে নারীপ্রধান নিম্নআয়ের ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাইলট পর্যায়ে হাজার হাজার পরিবারকে এর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই কর্মসূচির ইতিবাচক দিক হলো, সামাজিক নিরাপত্তার সহায়তাকে পরিবারের নারীপ্রধানের হাতে পৌঁছানোর চেষ্টা। একটি পরিবারের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা যত বাড়বে, পরিবারের সামগ্রিক সক্ষমতাও তত বাড়তে পারে।

খাদ্য, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা কিংবা জরুরি পারিবারিক ব্যয়- সব ক্ষেত্রেই এই সহায়তা নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য একটি নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতে পারে।

তবে এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন ও স্বচ্ছ বাস্তবায়নের ওপর। ফ্যামিলি কার্ড যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারের কাছে পৌঁছে, তাহলে এটি সামাজিক সুরক্ষার একটি কার্যকর মডেলে পরিণত হতে পারে।

কৃষক কার্ড: কৃষির সঙ্গে রাষ্ট্রের নতুন সম্পর্ক

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি কৃষি। কিন্তু উৎপাদন ব্যয়, ঋণের চাপ, বাজারব্যবস্থা ও ন্যায্যমূল্য নিয়ে কৃষকের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের।

এই বাস্তবতায় কৃষক কার্ডের উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার কথা বলে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কৃষি উপকরণ, ভর্তুকি, ঋণ, বীমা, প্রশিক্ষণ, সেচ, বাজার ও আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে কৃষকদের যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এটি সফল হলে কৃষক শুধু সরকারি সহায়তার গ্রহীতা থাকবেন না; বরং একটি সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার অংশীদারে পরিণত হবেন।

কৃষককে টেকসইভাবে শক্তিশালী করার সবচেয়ে ভালো পথ হলো তাঁর উৎপাদনক্ষমতা ও আয় বাড়ানো। তাই কৃষক কার্ডকে নগদ সহায়তার বাইরে নিয়ে গিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি সেবা প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা গেলে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

খাল পুনঃখনন: পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন সুযোগ

বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে খালের গুরুত্ব নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। বর্ষায় পানি নিষ্কাশন, শুষ্ক মৌসুমে সেচ, মাছের আবাসস্থল এবং কৃষির সঙ্গে খালের সম্পর্ক গভীর।

সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের লক্ষ্য নিয়েছে। এটি শুধু অবকাঠামোগত উদ্যোগ নয়; সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা, কৃষি ও পরিবেশ- তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে খাল খননের সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ ও দখলমুক্ত রাখার ব্যবস্থা জরুরি। আজ খনন করে কয়েক বছর পর আবার যদি খাল ভরাট হয়ে যায়, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।

তাই খাল পুনরুদ্ধারের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা যুক্ত করা গেলে এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সুফল আনতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনা

ই-হেলথ কার্ডের উদ্যোগও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

একজন নাগরিকের চিকিৎসার ইতিহাস, পরীক্ষার ফলাফল এবং পূর্ববর্তী চিকিৎসার তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকলে চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিকতা বাড়বে। এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে গেলে রোগীর পূর্ববর্তী তথ্য সহজেই পাওয়া গেলে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কমবে, চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত গ্রহণও সহজ হবে।

তবে ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকের স্বাস্থ্যতথ্য যাতে অননুমোদিতভাবে ব্যবহৃত না হয়, সে জন্য শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তরুণরাই আগামী বাংলাদেশের বড় শক্তি

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। এই তরুণদের দক্ষ করে তুলতে পারলে দেশের অর্থনীতি নতুন গতি পেতে পারে।

কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ফ্রিল্যান্সিং, শিল্পায়ন এবং বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর সুযোগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি নয়, চাকরি সৃষ্টিকারী তরুণ তৈরি করাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।

একজন দক্ষ তরুণ উদ্যোক্তা হলে তিনি নিজের পাশাপাশি আরও কয়েকজনের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন। ফলে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন আসলে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ।

শিক্ষা ও মানবসম্পদ: পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি

কোনো দেশের স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয় মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া। শিক্ষকদের মর্যাদা ও কল্যাণ, কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং শিক্ষার সঙ্গে কর্মবাজারের সমন্বয়- এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন।

সরকার শিক্ষকদের কল্যাণে বকেয়া সুবিধা পরিশোধসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ শিক্ষকদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে পারে।

তবে শিক্ষার বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না; বরং সমস্যা সমাধান করতে পারবে, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে, উদ্যোক্তা হতে পারবে এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।

পরিবেশ ও আগামী প্রজন্ম

আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ।

তবে বৃক্ষরোপণের প্রকৃত সাফল্য গাছ লাগানোর সংখ্যায় নয়, কতটি গাছ টিকে থাকল- তার ওপর নির্ভর করবে।

খাল পুনরুদ্ধার, বৃক্ষরোপণ, জলাধার সংরক্ষণ ও নগর সবুজায়নকে সমন্বিত পরিবেশ পরিকল্পনার অংশ করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।

সুশাসনই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে সুশাসন।

ফ্যামিলি কার্ড প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। কৃষক কার্ডে প্রকৃত কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। খাল খননে অর্থের অপচয় বন্ধ করতে হবে। স্বাস্থ্য প্রকল্পে তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে প্রশিক্ষণের মানের সঙ্গে বাজারের চাহিদার সমন্বয় করতে হবে।

অর্থাৎ প্রতিটি কর্মসূচির সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।

সরকার যদি এই দুই বিষয়কে উন্নয়ননীতির কেন্দ্রে রাখতে পারে, তাহলে প্রথম ১৮০ দিনের উদ্যোগগুলো আরও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করবে।

সামনে পাঁচ বছর: আসল পরীক্ষার সময়

১৮০ দিন কোনো সরকারের চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় নয়। বরং এটি একটি সূচনাপর্ব।

একজন কৃষকের আয় যদি বাড়ে, একটি নিম্নআয়ের পরিবার যদি নিরাপত্তা পায়, একজন তরুণ যদি দক্ষ হয়ে কর্মসংস্থান পায়, একজন রোগী যদি দ্রুত চিকিৎসা পান এবং একজন নাগরিক যদি সরকারি সেবা পেতে হয়রানির শিকার না হন- তাহলেই সরকারের নীতির প্রকৃত সাফল্য দৃশ্যমান হবে।

বাংলাদেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। তবে সেই পরিবর্তন শুধু নীতিপত্র বা বক্তৃতায় নয়- তারা পরিবর্তন দেখতে চায় নিজেদের জীবনযাত্রায়।

বাজারে স্বস্তি, কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, সহজ চিকিৎসা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, নিরাপদ বিনিয়োগ এবং কার্যকর প্রশাসন- এই বিষয়গুলোই শেষ পর্যন্ত একটি সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করবে।

শেষ কথা

তারেক রহমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের দিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে তাকালে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা হলো- মানুষকেন্দ্রিক উন্নয়নকে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সামনে আনার চেষ্টা।

ফ্যামিলি কার্ডে পরিবার, কৃষক কার্ডে কৃষক, খাল পুনঃখননে গ্রামীণ অর্থনীতি, ই-হেলথে নাগরিকের স্বাস্থ্য, বৃক্ষরোপণে পরিবেশ এবং দক্ষতা উন্নয়নে তরুণ প্রজন্ম- এই উদ্যোগগুলোকে যদি একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে আগামী পাঁচ বছরে এর ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে।

প্রথম ১৮০ দিন তাই শেষ কথা নয়। এটি বরং একটি সম্ভাবনাময় যাত্রার শুরু।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো- এই সূচনাকে ধারাবাহিকতায় রূপ দেওয়া। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ প্রশাসন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সরকারের প্রথম ছয় মাসের উদ্যোগগুলো আগামী দিনের বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কোনো সরকারকে শুধু তার ঘোষণায় বিচার করে না; বিচার করে তার কাজের স্থায়ী প্রভাব দিয়ে। সেই বিচারের সময় এখনো আসেনি। তবে প্রথম ১৮০ দিন একটি দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

এখন আগামী পাঁচ বছরের কাজই নির্ধারণ করবে- এই শুরু কতটা গভীর, কতটা টেকসই এবং কতটা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ একটি সুন্দর ভবিষ্যতের অপেক্ষায়। সেই ভবিষ্যৎকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব এখন রাষ্ট্রের। আর প্রথম ১৮০ দিনের ইতিবাচক উদ্যোগগুলো হতে পারে সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি আশাব্যঞ্জক সূচনা।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


প্রিন্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

সরকারের ১৮০ দিন: তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ কোন পথে?

আপডেট সময় ০৬:২৭:৩৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

একটি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে কখনোই তার পূর্ণাঙ্গ সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত মাপকাঠি বলা যায় না। ছয় মাসে একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সংকটের সমাধান হয় না, অর্থনীতির সব চাপ দূর হয় না, প্রশাসনিক সংস্কারও রাতারাতি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে না। তবে প্রথম ১৮০ দিন গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে- এই সময়েই সরকারের অগ্রাধিকার, নীতির দিকনির্দেশনা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনের একটি প্রাথমিক চিত্র পাওয়া যায়।

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারের প্রথম ছয় মাস সেই অর্থে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনাপর্ব। এই সময়কে কেবল অর্জনের তালিকা দিয়ে বিচার না করে বরং দেখা প্রয়োজন- সরকার কোন সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছে এবং সেগুলোর স্থায়ী সমাধানের জন্য কী ধরনের কাঠামো তৈরি করতে চাইছে।

প্রথম ১৮০ দিনের কর্মসূচিগুলোর দিকে তাকালে যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তা হলো- সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও ডিজিটাল সেবাকে উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল পুনঃখনন, কৃষিঋণ মওকুফ, ই-হেলথ কার্ড, বৃক্ষরোপণ এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগগুলো সেই অগ্রাধিকারেরই প্রতিফলন।

এখানে আশাবাদের জায়গাটি হলো, এসব উদ্যোগকে শুধু তাৎক্ষণিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, আগামী পাঁচ বছরের বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

ছয় মাসে লক্ষ্য নির্ধারণ

একটি নতুন সরকারের জন্য প্রথম কাজ হলো রাষ্ট্রের সমস্যাগুলোর মধ্যে কোনগুলোকে আগে সমাধান করা হবে, তা নির্ধারণ করা। এই অগ্রাধিকার নির্ধারণের মধ্যেই সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের পরিচয় পাওয়া যায়।

তারেক রহমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিম্নআয়ের পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষকের সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটাল রূপান্তর, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ- এসব এমন ক্ষেত্র, যেখানে রাষ্ট্রের নীতির প্রভাব সরাসরি মানুষের জীবনে পড়ে।

সরকারের পক্ষ থেকে ১৮০ দিনের পাশাপাশি ২০২৬-২৭ অর্থবছর এবং পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য কর্মপরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এটি একটি ইতিবাচক দিক। কারণ উন্নয়ন কোনো এককালীন প্রকল্প নয়; এটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

একটি সরকারের আজকের সিদ্ধান্তের সুফল অনেক সময় কয়েক বছর পর দৃশ্যমান হয়। তাই প্রথম ছয় মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন হতে পারে- সরকার ভবিষ্যতের জন্য কতটা শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পেরেছে।

ফ্যামিলি কার্ড: সহায়তা থেকে স্বাবলম্বিতার পথে

সরকারের আলোচিত কর্মসূচিগুলোর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রথম পর্যায়ে নারীপ্রধান নিম্নআয়ের ও প্রান্তিক পরিবারের জন্য মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাইলট পর্যায়ে হাজার হাজার পরিবারকে এর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই কর্মসূচির ইতিবাচক দিক হলো, সামাজিক নিরাপত্তার সহায়তাকে পরিবারের নারীপ্রধানের হাতে পৌঁছানোর চেষ্টা। একটি পরিবারের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা যত বাড়বে, পরিবারের সামগ্রিক সক্ষমতাও তত বাড়তে পারে।

খাদ্য, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা কিংবা জরুরি পারিবারিক ব্যয়- সব ক্ষেত্রেই এই সহায়তা নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য একটি নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতে পারে।

তবে এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন ও স্বচ্ছ বাস্তবায়নের ওপর। ফ্যামিলি কার্ড যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারের কাছে পৌঁছে, তাহলে এটি সামাজিক সুরক্ষার একটি কার্যকর মডেলে পরিণত হতে পারে।

কৃষক কার্ড: কৃষির সঙ্গে রাষ্ট্রের নতুন সম্পর্ক

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি কৃষি। কিন্তু উৎপাদন ব্যয়, ঋণের চাপ, বাজারব্যবস্থা ও ন্যায্যমূল্য নিয়ে কৃষকের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের।

এই বাস্তবতায় কৃষক কার্ডের উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার কথা বলে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কৃষি উপকরণ, ভর্তুকি, ঋণ, বীমা, প্রশিক্ষণ, সেচ, বাজার ও আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে কৃষকদের যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এটি সফল হলে কৃষক শুধু সরকারি সহায়তার গ্রহীতা থাকবেন না; বরং একটি সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার অংশীদারে পরিণত হবেন।

কৃষককে টেকসইভাবে শক্তিশালী করার সবচেয়ে ভালো পথ হলো তাঁর উৎপাদনক্ষমতা ও আয় বাড়ানো। তাই কৃষক কার্ডকে নগদ সহায়তার বাইরে নিয়ে গিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি সেবা প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা গেলে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

খাল পুনঃখনন: পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন সুযোগ

বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে খালের গুরুত্ব নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। বর্ষায় পানি নিষ্কাশন, শুষ্ক মৌসুমে সেচ, মাছের আবাসস্থল এবং কৃষির সঙ্গে খালের সম্পর্ক গভীর।

সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের লক্ষ্য নিয়েছে। এটি শুধু অবকাঠামোগত উদ্যোগ নয়; সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা, কৃষি ও পরিবেশ- তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে খাল খননের সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ ও দখলমুক্ত রাখার ব্যবস্থা জরুরি। আজ খনন করে কয়েক বছর পর আবার যদি খাল ভরাট হয়ে যায়, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।

তাই খাল পুনরুদ্ধারের সঙ্গে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা যুক্ত করা গেলে এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সুফল আনতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনা

ই-হেলথ কার্ডের উদ্যোগও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

একজন নাগরিকের চিকিৎসার ইতিহাস, পরীক্ষার ফলাফল এবং পূর্ববর্তী চিকিৎসার তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকলে চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিকতা বাড়বে। এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে গেলে রোগীর পূর্ববর্তী তথ্য সহজেই পাওয়া গেলে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কমবে, চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত গ্রহণও সহজ হবে।

তবে ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকের স্বাস্থ্যতথ্য যাতে অননুমোদিতভাবে ব্যবহৃত না হয়, সে জন্য শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তরুণরাই আগামী বাংলাদেশের বড় শক্তি

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। এই তরুণদের দক্ষ করে তুলতে পারলে দেশের অর্থনীতি নতুন গতি পেতে পারে।

কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ফ্রিল্যান্সিং, শিল্পায়ন এবং বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর সুযোগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরি নয়, চাকরি সৃষ্টিকারী তরুণ তৈরি করাই হওয়া উচিত লক্ষ্য।

একজন দক্ষ তরুণ উদ্যোক্তা হলে তিনি নিজের পাশাপাশি আরও কয়েকজনের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন। ফলে তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন আসলে দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ।

শিক্ষা ও মানবসম্পদ: পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি

কোনো দেশের স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয় মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া। শিক্ষকদের মর্যাদা ও কল্যাণ, কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং শিক্ষার সঙ্গে কর্মবাজারের সমন্বয়- এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন।

সরকার শিক্ষকদের কল্যাণে বকেয়া সুবিধা পরিশোধসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপ শিক্ষকদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে পারে।

তবে শিক্ষার বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না; বরং সমস্যা সমাধান করতে পারবে, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে, উদ্যোক্তা হতে পারবে এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।

পরিবেশ ও আগামী প্রজন্ম

আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ।

তবে বৃক্ষরোপণের প্রকৃত সাফল্য গাছ লাগানোর সংখ্যায় নয়, কতটি গাছ টিকে থাকল- তার ওপর নির্ভর করবে।

খাল পুনরুদ্ধার, বৃক্ষরোপণ, জলাধার সংরক্ষণ ও নগর সবুজায়নকে সমন্বিত পরিবেশ পরিকল্পনার অংশ করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারে।

সুশাসনই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে সুশাসন।

ফ্যামিলি কার্ড প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। কৃষক কার্ডে প্রকৃত কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। খাল খননে অর্থের অপচয় বন্ধ করতে হবে। স্বাস্থ্য প্রকল্পে তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে প্রশিক্ষণের মানের সঙ্গে বাজারের চাহিদার সমন্বয় করতে হবে।

অর্থাৎ প্রতিটি কর্মসূচির সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।

সরকার যদি এই দুই বিষয়কে উন্নয়ননীতির কেন্দ্রে রাখতে পারে, তাহলে প্রথম ১৮০ দিনের উদ্যোগগুলো আরও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করবে।

সামনে পাঁচ বছর: আসল পরীক্ষার সময়

১৮০ দিন কোনো সরকারের চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় নয়। বরং এটি একটি সূচনাপর্ব।

একজন কৃষকের আয় যদি বাড়ে, একটি নিম্নআয়ের পরিবার যদি নিরাপত্তা পায়, একজন তরুণ যদি দক্ষ হয়ে কর্মসংস্থান পায়, একজন রোগী যদি দ্রুত চিকিৎসা পান এবং একজন নাগরিক যদি সরকারি সেবা পেতে হয়রানির শিকার না হন- তাহলেই সরকারের নীতির প্রকৃত সাফল্য দৃশ্যমান হবে।

বাংলাদেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। তবে সেই পরিবর্তন শুধু নীতিপত্র বা বক্তৃতায় নয়- তারা পরিবর্তন দেখতে চায় নিজেদের জীবনযাত্রায়।

বাজারে স্বস্তি, কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, সহজ চিকিৎসা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, নিরাপদ বিনিয়োগ এবং কার্যকর প্রশাসন- এই বিষয়গুলোই শেষ পর্যন্ত একটি সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করবে।

শেষ কথা

তারেক রহমান সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের দিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে তাকালে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা হলো- মানুষকেন্দ্রিক উন্নয়নকে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সামনে আনার চেষ্টা।

ফ্যামিলি কার্ডে পরিবার, কৃষক কার্ডে কৃষক, খাল পুনঃখননে গ্রামীণ অর্থনীতি, ই-হেলথে নাগরিকের স্বাস্থ্য, বৃক্ষরোপণে পরিবেশ এবং দক্ষতা উন্নয়নে তরুণ প্রজন্ম- এই উদ্যোগগুলোকে যদি একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে আগামী পাঁচ বছরে এর ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে।

প্রথম ১৮০ দিন তাই শেষ কথা নয়। এটি বরং একটি সম্ভাবনাময় যাত্রার শুরু।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো- এই সূচনাকে ধারাবাহিকতায় রূপ দেওয়া। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ প্রশাসন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সরকারের প্রথম ছয় মাসের উদ্যোগগুলো আগামী দিনের বড় পরিবর্তনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কোনো সরকারকে শুধু তার ঘোষণায় বিচার করে না; বিচার করে তার কাজের স্থায়ী প্রভাব দিয়ে। সেই বিচারের সময় এখনো আসেনি। তবে প্রথম ১৮০ দিন একটি দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

এখন আগামী পাঁচ বছরের কাজই নির্ধারণ করবে- এই শুরু কতটা গভীর, কতটা টেকসই এবং কতটা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ একটি সুন্দর ভবিষ্যতের অপেক্ষায়। সেই ভবিষ্যৎকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব এখন রাষ্ট্রের। আর প্রথম ১৮০ দিনের ইতিবাচক উদ্যোগগুলো হতে পারে সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি আশাব্যঞ্জক সূচনা।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


প্রিন্ট