ঢাকা ১২:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
Logo খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকীতে কড়াইলে দোয়া, উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান Logo স্বরাষ্ট্র ছাড়লেন সালাহউদ্দিন, এলজিআরডির দায়িত্ব পেলেন Logo নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি Logo পরাজয় জেনেও রাষ্ট্রপতি প্রার্থী অলি আহমদ Logo এ্যানি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সালাহউদ্দিন এলজিআরডি মন্ত্রী! Logo রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন মির্জা ফখরুল Logo ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, আজই মিলবে উত্তর Logo জ্বালানি সংকটে দীর্ঘ লোডশেডিং, বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলার শঙ্কা Logo আজ ১২ আগস্ট আরাফাত রহমান কোকোর জন্মদিন Logo আগামীকাল ১২ আগস্ট আকাশে দেখা যাবে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ : রোমাঞ্চকর ক্ষণের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ব।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: পৌর ভবন থেকে বঙ্গভবনের পথে

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
  • আপডেট সময় ০৭:৩২:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
  • / ২৬৬৯ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার গল্প কম নয়। কিন্তু ছাত্ররাজনীতি দিয়ে যাত্রা শুরু করে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার, সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পেরিয়ে রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থী হওয়া- এমন রাজনৈতিক অভিযাত্রা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবন ও রাজনীতি সেই দীর্ঘ অভিযাত্রারই এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা মির্জা ফখরুল এখন দেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব। বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব হিসেবে দলকে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার পর এবার তিনি রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সামনে খুলে গেছে নতুন এক সম্ভাবনার দরজা- বঙ্গভবনের দরজা।

ছাত্ররাজনীতির উত্তাল দিনগুলো

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্ররাজনীতিতে। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। শিক্ষাজীবনেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্র আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। সেই সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলন তাঁর নেতৃত্বের ভিত্তি গড়ে দেয়।

ষাটের দশকের শেষভাগের রাজনীতি ছিল পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণআন্দোলন, স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে উত্তাল। তরুণ মির্জা ফখরুল সেই রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই সংগঠন, আন্দোলন এবং নেতৃত্বের প্রথম পাঠ নেন।

এই ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

রাজনীতির আগে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপপরিচালক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করার ফলে রাষ্ট্র পরিচালনা ও সরকারি কাঠামো সম্পর্কে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।

এখানেই মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়। তিনি শুধু রাজপথের রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না; শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক কাজের মধ্য দিয়েও রাষ্ট্র ও সমাজকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন।

পৌর ভবনে প্রথম বড় পরীক্ষা

১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল। এর দুই বছর পর, ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।

রাজনৈতিক জীবনের এই অধ্যায়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জাতীয় সংসদ কিংবা মন্ত্রিসভায় যাওয়ার আগে তিনি স্থানীয় সরকারের একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের কাছাকাছি থেকে কাজ করার সুযোগ পান।

পৌর চেয়ারম্যান হিসেবে নাগরিক সমস্যা, স্থানীয় অবকাঠামো, জনসেবা এবং মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন তিনি। স্থানীয় সরকার পরিচালনার এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পুঁজি হয়ে ওঠে।

একজন রাজনীতিকের জন্য জনগণের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার অভিজ্ঞতা অনেক সময় বড় রাজনৈতিক শিক্ষায় পরিণত হয়। মির্জা ফখরুলের ক্ষেত্রেও পৌর ভবন ছিল সেই রাজনৈতিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠশালা।

বিএনপিতে যোগদান ও জাতীয় রাজনীতিতে উত্থান

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন।

এরপর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত হতে থাকে। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তিনি জয়ী হতে পারেননি। কিন্তু নির্বাচনী পরাজয় তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়নি।

বরং সাংগঠনিক রাজনীতিতে তিনি নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন। এখানেই তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে- নির্বাচনে পরাজয় এলেও সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাঁর অগ্রযাত্রা থামেনি।

সংসদ সদস্য থেকে মন্ত্রিসভায়

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

একজন পৌর চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য, তারপর মন্ত্রিসভার সদস্য- এই ধারাবাহিক উত্থান তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁকে জাতীয় নীতিনির্ধারণের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সরকার- দুই স্তরের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁর নেতৃত্বের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করে।

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তবে জয়ী হতে পারেননি। কিন্তু এবারও নির্বাচনী ফল তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব কমাতে পারেনি।

বিএনপির মহাসচিব: কঠিন সময়ের নেতৃত্ব

২০০৯ সালের বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১১ সালের ২০ মার্চ তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। এরপর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হিসেবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বিএনপির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ হয়ে ওঠেন।

খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব, তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থান, রাজনৈতিক মামলা, আন্দোলন, নির্বাচন এবং সাংগঠনিক নানা সংকট- বিএনপির জন্য কঠিন সময়গুলোতে দলটির প্রকাশ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বে মির্জা ফখরুলকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়েছে।

বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল দলের রাজনৈতিক অবস্থান জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় রাখা।

প্রায় এক দশক মহাসচিবের দায়িত্ব পালন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি।

কেন বঙ্গভবনের জন্য মির্জা ফখরুল?

রাষ্ট্রপতি পদ বাংলাদেশের একটি সাংবিধানিক পদ। এই পদে একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সংবিধান এবং প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ।

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনে এই অভিজ্ঞতার কয়েকটি স্তর রয়েছে- ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার, সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং দীর্ঘদিনের দলীয় নেতৃত্ব।

অর্থাৎ তাঁর রাজনৈতিক জীবন কেবল দলীয় সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো ও জনপ্রতিনিধিত্বের বিভিন্ন পর্যায়েও তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে।

আরেকটি বিষয় হলো তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেও তিনি সাধারণত তুলনামূলকভাবে সংযত ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। জাতীয় রাজনীতিতে সংলাপ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বিভিন্ন সময়ে তাঁর বক্তব্যে এসেছে।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

পৌর ভবন থেকে বঙ্গভবন- কতটা বদলাবে রাজনৈতিক পরিচয়?

এখানেই মির্জা ফখরুলের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি ছিলেন একটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতা। দলের সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন ও সরকারের সমালোচনা- সবকিছুর সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল।

কিন্তু রাষ্ট্রপতি হলে তাঁকে দলীয় রাজনীতির সক্রিয় পরিচয়ের বাইরে এসে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা, সংবিধান এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। ফলে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে- দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করা।

একজন দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতিকের জন্য এটি সহজ কাজ নয়। আবার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে এটিই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তিতেও পরিণত হতে পারে।

ঠাকুরগাঁও থেকে বঙ্গভবনের পথে

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক যাত্রার দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট- তাঁর পথটি সরলরেখার মতো ছিল না।

ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা, শিক্ষকতা থেকে সরকারি চাকরি, সরকারি চাকরি থেকে পৌর রাজনীতি, পৌর রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি, সংসদ থেকে মন্ত্রিসভা, এরপর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব- প্রতিটি ধাপ তাঁকে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিয়েছে।

এই কারণেই তাঁর রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নকে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়ে না। এটি তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক যাত্রারও একটি বড় বাঁক।

একজন পৌর চেয়ারম্যান যখন রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হন, তখন সেটি রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের এক অসাধারণ উত্থানের গল্প হয়ে ওঠে।

সামনে নতুন অধ্যায়

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের সামনে এখন নতুন অধ্যায়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষ হলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নতুন রূপ পেতে পারে।

তিনি যদি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তাহলে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটবে। বিএনপির মহাসচিব থেকে তিনি হয়ে উঠবেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান।

তখন তাঁর সামনে থাকবে নতুন দায়িত্ব, নতুন প্রত্যাশা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা।

তাঁকে তখন দলীয় রাজনীতির ভাষার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ভাষায় কথা বলতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পরিবর্তে তাঁকে বিবেচনা করতে হবে পুরো রাষ্ট্রের নাগরিককে। দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

শেষ কথা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবন আসলে বাংলাদেশের রাজনীতির কয়েক দশকের একটি চলমান প্রতিচ্ছবি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষকতা; সরকারি চাকরি থেকে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান; পৌর ভবন থেকে জাতীয় সংসদ; সংসদ থেকে মন্ত্রিসভা; এরপর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং দীর্ঘদিনের মহাসচিব- প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করে তিনি আজ বঙ্গভবনের সম্ভাব্য বাসিন্দার তালিকায়।

একজন রাজনীতিকের জন্য এর চেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরণ খুব কমই দেখা যায়।

তবে ইতিহাসের শেষ বাক্য লেখার আগে নির্বাচনী ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে তার নিজস্ব গতিতে এগোতে দিতে হবে। কারণ রাজনীতিতে মনোনয়ন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়, কিন্তু রাষ্ট্রপতির শপথই সেই সম্ভাবনাকে ইতিহাসে পরিণত করে।

তবু আজকের বাস্তবতায় একটি কথা বলা যায়- ঠাকুরগাঁওয়ের পৌর ভবন থেকে বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের যে দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা, সেটি বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য উত্থানের গল্প। আর সেই গল্পের পরবর্তী অধ্যায় লিখবে সময়, নির্বাচন এবং ইতিহাস।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


প্রিন্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: পৌর ভবন থেকে বঙ্গভবনের পথে

আপডেট সময় ০৭:৩২:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার গল্প কম নয়। কিন্তু ছাত্ররাজনীতি দিয়ে যাত্রা শুরু করে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার, সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পেরিয়ে রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থী হওয়া- এমন রাজনৈতিক অভিযাত্রা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবন ও রাজনীতি সেই দীর্ঘ অভিযাত্রারই এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা মির্জা ফখরুল এখন দেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব। বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব হিসেবে দলকে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার পর এবার তিনি রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সামনে খুলে গেছে নতুন এক সম্ভাবনার দরজা- বঙ্গভবনের দরজা।

ছাত্ররাজনীতির উত্তাল দিনগুলো

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্ররাজনীতিতে। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ছিলেন। শিক্ষাজীবনেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্র আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। সেই সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলন তাঁর নেতৃত্বের ভিত্তি গড়ে দেয়।

ষাটের দশকের শেষভাগের রাজনীতি ছিল পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণআন্দোলন, স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে উত্তাল। তরুণ মির্জা ফখরুল সেই রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই সংগঠন, আন্দোলন এবং নেতৃত্বের প্রথম পাঠ নেন।

এই ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

রাজনীতির আগে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে উপপরিচালক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করার ফলে রাষ্ট্র পরিচালনা ও সরকারি কাঠামো সম্পর্কে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।

এখানেই মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়। তিনি শুধু রাজপথের রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না; শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক কাজের মধ্য দিয়েও রাষ্ট্র ও সমাজকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন।

পৌর ভবনে প্রথম বড় পরীক্ষা

১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল। এর দুই বছর পর, ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।

রাজনৈতিক জীবনের এই অধ্যায়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জাতীয় সংসদ কিংবা মন্ত্রিসভায় যাওয়ার আগে তিনি স্থানীয় সরকারের একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের কাছাকাছি থেকে কাজ করার সুযোগ পান।

পৌর চেয়ারম্যান হিসেবে নাগরিক সমস্যা, স্থানীয় অবকাঠামো, জনসেবা এবং মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হন তিনি। স্থানীয় সরকার পরিচালনার এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পুঁজি হয়ে ওঠে।

একজন রাজনীতিকের জন্য জনগণের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার অভিজ্ঞতা অনেক সময় বড় রাজনৈতিক শিক্ষায় পরিণত হয়। মির্জা ফখরুলের ক্ষেত্রেও পৌর ভবন ছিল সেই রাজনৈতিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠশালা।

বিএনপিতে যোগদান ও জাতীয় রাজনীতিতে উত্থান

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন।

এরপর তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত হতে থাকে। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও তিনি জয়ী হতে পারেননি। কিন্তু নির্বাচনী পরাজয় তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়নি।

বরং সাংগঠনিক রাজনীতিতে তিনি নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন। এখানেই তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে- নির্বাচনে পরাজয় এলেও সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাঁর অগ্রযাত্রা থামেনি।

সংসদ সদস্য থেকে মন্ত্রিসভায়

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

একজন পৌর চেয়ারম্যান থেকে সংসদ সদস্য, তারপর মন্ত্রিসভার সদস্য- এই ধারাবাহিক উত্থান তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁকে জাতীয় নীতিনির্ধারণের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে। স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সরকার- দুই স্তরের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁর নেতৃত্বের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করে।

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তবে জয়ী হতে পারেননি। কিন্তু এবারও নির্বাচনী ফল তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব কমাতে পারেনি।

বিএনপির মহাসচিব: কঠিন সময়ের নেতৃত্ব

২০০৯ সালের বিএনপির জাতীয় কাউন্সিলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১১ সালের ২০ মার্চ তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন। এরপর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হিসেবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বিএনপির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ হয়ে ওঠেন।

খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্ব, তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থান, রাজনৈতিক মামলা, আন্দোলন, নির্বাচন এবং সাংগঠনিক নানা সংকট- বিএনপির জন্য কঠিন সময়গুলোতে দলটির প্রকাশ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বে মির্জা ফখরুলকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়েছে।

বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল দলের রাজনৈতিক অবস্থান জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় রাখা।

প্রায় এক দশক মহাসচিবের দায়িত্ব পালন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি।

কেন বঙ্গভবনের জন্য মির্জা ফখরুল?

রাষ্ট্রপতি পদ বাংলাদেশের একটি সাংবিধানিক পদ। এই পদে একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সংবিধান এবং প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ।

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনে এই অভিজ্ঞতার কয়েকটি স্তর রয়েছে- ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার, সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং দীর্ঘদিনের দলীয় নেতৃত্ব।

অর্থাৎ তাঁর রাজনৈতিক জীবন কেবল দলীয় সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো ও জনপ্রতিনিধিত্বের বিভিন্ন পর্যায়েও তাঁর অভিজ্ঞতা রয়েছে।

আরেকটি বিষয় হলো তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যেও তিনি সাধারণত তুলনামূলকভাবে সংযত ভাষায় বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। জাতীয় রাজনীতিতে সংলাপ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বিভিন্ন সময়ে তাঁর বক্তব্যে এসেছে।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

পৌর ভবন থেকে বঙ্গভবন- কতটা বদলাবে রাজনৈতিক পরিচয়?

এখানেই মির্জা ফখরুলের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি ছিলেন একটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতা। দলের সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক কর্মসূচি, আন্দোলন ও সরকারের সমালোচনা- সবকিছুর সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল।

কিন্তু রাষ্ট্রপতি হলে তাঁকে দলীয় রাজনীতির সক্রিয় পরিচয়ের বাইরে এসে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা, সংবিধান এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। ফলে মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে- দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করা।

একজন দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতিকের জন্য এটি সহজ কাজ নয়। আবার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে এটিই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তিতেও পরিণত হতে পারে।

ঠাকুরগাঁও থেকে বঙ্গভবনের পথে

মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক যাত্রার দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট- তাঁর পথটি সরলরেখার মতো ছিল না।

ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা, শিক্ষকতা থেকে সরকারি চাকরি, সরকারি চাকরি থেকে পৌর রাজনীতি, পৌর রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতি, সংসদ থেকে মন্ত্রিসভা, এরপর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব- প্রতিটি ধাপ তাঁকে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিয়েছে।

এই কারণেই তাঁর রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নকে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়ে না। এটি তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক যাত্রারও একটি বড় বাঁক।

একজন পৌর চেয়ারম্যান যখন রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হন, তখন সেটি রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের এক অসাধারণ উত্থানের গল্প হয়ে ওঠে।

সামনে নতুন অধ্যায়

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের সামনে এখন নতুন অধ্যায়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষ হলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নতুন রূপ পেতে পারে।

তিনি যদি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তাহলে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটবে। বিএনপির মহাসচিব থেকে তিনি হয়ে উঠবেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান।

তখন তাঁর সামনে থাকবে নতুন দায়িত্ব, নতুন প্রত্যাশা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা।

তাঁকে তখন দলীয় রাজনীতির ভাষার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ভাষায় কথা বলতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পরিবর্তে তাঁকে বিবেচনা করতে হবে পুরো রাষ্ট্রের নাগরিককে। দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

শেষ কথা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবন আসলে বাংলাদেশের রাজনীতির কয়েক দশকের একটি চলমান প্রতিচ্ছবি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষকতা; সরকারি চাকরি থেকে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান; পৌর ভবন থেকে জাতীয় সংসদ; সংসদ থেকে মন্ত্রিসভা; এরপর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং দীর্ঘদিনের মহাসচিব- প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করে তিনি আজ বঙ্গভবনের সম্ভাব্য বাসিন্দার তালিকায়।

একজন রাজনীতিকের জন্য এর চেয়ে বড় রাজনৈতিক উত্তরণ খুব কমই দেখা যায়।

তবে ইতিহাসের শেষ বাক্য লেখার আগে নির্বাচনী ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে তার নিজস্ব গতিতে এগোতে দিতে হবে। কারণ রাজনীতিতে মনোনয়ন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়, কিন্তু রাষ্ট্রপতির শপথই সেই সম্ভাবনাকে ইতিহাসে পরিণত করে।

তবু আজকের বাস্তবতায় একটি কথা বলা যায়- ঠাকুরগাঁওয়ের পৌর ভবন থেকে বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের যে দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা, সেটি বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির অন্যতম উল্লেখযোগ্য উত্থানের গল্প। আর সেই গল্পের পরবর্তী অধ্যায় লিখবে সময়, নির্বাচন এবং ইতিহাস।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


প্রিন্ট