বেগম খালেদা জিয়া: চলে গেছেন, রেখে গেছেন এক ইতিহাস
- আপডেট সময় ০২:০৫:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
- / ২৫৩৫ বার পড়া হয়েছে
আজ ১৫ আগস্ট। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির চেয়ারপারসন, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নারী নেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী। এই দিনে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি বাংলাদেশের রাজনীতির এই অনন্য ব্যক্তিত্বকে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মানুষ কেবল একটি দলের নেতা হয়ে থাকেন না; সময়ের সীমানা অতিক্রম করে তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি রাজনৈতিক যুগের প্রতীক। তাঁদের জীবন, সংগ্রাম, সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব একটি দেশের রাজনৈতিক গতিপথকে কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত করে। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম, সাহস, নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ ও প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াইয়ের দীর্ঘ উপাখ্যান। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠা, দীর্ঘদিন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেওয়া, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে থাকা এবং রাজনৈতিক জীবনের নানা সংকটে দৃঢ় অবস্থান ধরে রাখা- সব মিলিয়ে তাঁর জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু একজন মানুষের শারীরিক বিদায় তাঁর কর্ম, স্মৃতি, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কিংবা মানুষের হৃদয়ে তৈরি হওয়া জায়গাকে মুছে দিতে পারে না। বরং সময়ের দূরত্ব যত বাড়বে, তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে মূল্যায়নের পরিধিও তত বিস্তৃত হবে।
গৃহবধূ থেকে জাতীয় নেত্রী
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আগমন ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। তিনি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না। ছিলেন একজন সংসারী নারী, স্ত্রী ও মা।
স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁকে রাজনীতির কঠিন ময়দানে নিয়ে আসে। সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। একজন নারী হিসেবে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করা ছিল সহজ কোনো বিষয় নয়।
কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে তৈরি করেন একজন দৃঢ়চেতা রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে। সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন, আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন।
এখানেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় শিক্ষা- নেতৃত্ব সবসময় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না; অনেক সময় নেতৃত্বকে অর্জন করতে হয় সংগ্রাম, সাহস ও মানুষের আস্থার মধ্য দিয়ে।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন।
সেই সময় দেশের রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করছিল। খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্বে রাজপথের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এরশাদ সরকারের পতনের পথ তৈরি করে।
এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয় আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তিনি শুধু বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে নয়, গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলনরত একটি বড় রাজনৈতিক শক্তির নেত্রী হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা পান।
তাঁর সমর্থকদের কাছে এই সময়ের খালেদা জিয়া ছিলেন ‘আপসহীন নেত্রী’- যিনি রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সামনে পিছিয়ে যাননি।
রাজনৈতিক ইতিহাসের এই অধ্যায় নিয়ে বিভিন্ন মত ও মূল্যায়ন থাকতে পারে। কিন্তু এটুকু নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশে নব্বইয়ের আন্দোলন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক এবং সেই সময়ের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক চরিত্র ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এটি ছিল দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা।
একজন নারী দেশের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি শুধু নিজের রাজনৈতিক অবস্থানই প্রতিষ্ঠা করেননি; বাংলাদেশের নারীদের জন্যও জাতীয় নেতৃত্বের একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছিলেন।
তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্ব বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর সরকারের সময়ে শিক্ষা, নারী উন্নয়ন, অর্থনীতি, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব উদ্যোগের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে রাজনৈতিক ও একাডেমিক আলোচনা রয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর দীর্ঘ সময়ের প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
পরবর্তীতে তিনি আরও দুই দফা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘ একটি সময় তাঁর নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ক্ষমতার বাইরে থেকেও নেতৃত্ব
রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা অনেক সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়েই হয়। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনেও এই পরীক্ষা এসেছে।
তিনি যেমন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তেমনি দীর্ঘ সময় বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবেও রাজনীতি করেছেন। সরকারবিরোধী আন্দোলন, নির্বাচন, রাজনৈতিক সংকট এবং দলীয় নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বিএনপির নেতৃত্ব ধরে রেখেছেন।
একজন রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তাঁর প্রতি তৈরি হওয়া আস্থা ও আবেগ।
সময়ের সঙ্গে বিএনপিতে অনেক নেতা এসেছেন, অনেক নেতা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছেন; কিন্তু খালেদা জিয়া ছিলেন দলের সবচেয়ে বড় ঐক্যের প্রতীকগুলোর একটি।
তাঁর রাজনৈতিক উপস্থিতি দলটির নেতাকর্মীদের কাছে শুধু সাংগঠনিক নেতৃত্বের বিষয় ছিল না; এর সঙ্গে আবেগ ও বিশ্বাসও জড়িয়ে ছিল।
প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই
খালেদা জিয়ার জীবনকে শুধু ক্ষমতার ইতিহাস দিয়ে ব্যাখ্যা করলে তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যাবে। কারণ তাঁর জীবনের শেষ কয়েক বছর ছিল কঠিন প্রতিকূলতায় ভরা।
রাজনৈতিক সংকট, মামলা, কারাবাস এবং দীর্ঘ অসুস্থতা তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়।
বিশেষ করে অসুস্থতার সময় তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তাঁর চিকিৎসা, মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
এই কঠিন সময়েও তাঁর প্রতি নেতাকর্মীদের আবেগ ও সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ছিল দৃশ্যমান।
একজন নেতার রাজনৈতিক শক্তি শুধু মঞ্চে বক্তব্য দেওয়া কিংবা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কঠিন সময়েও মানুষের মনে তাঁর জন্য যে অনুভূতি থাকে, সেটিও নেতৃত্বের একটি বড় মাপকাঠি।
একজন মা ও সংগ্রামী নারী
রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে খালেদা জিয়া ছিলেন একজন মা।
স্বামীর অকাল মৃত্যু, সন্তানদের নিয়ে নানা দুশ্চিন্তা, রাজনৈতিক জীবনের চাপ এবং নিজের দীর্ঘ অসুস্থতা- সব মিলিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল নানা পরীক্ষায় পরিপূর্ণ।
রাজনীতির মঞ্চে তিনি ছিলেন দৃঢ় ও কঠোর। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন মা, যাঁর কাছে সন্তান ও পরিবার ছিল আবেগের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
একজন নারী কীভাবে একই সঙ্গে পরিবার, ব্যক্তিগত বেদনা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে ধারণ করতে পারেন- খালেদা জিয়ার জীবন তার একটি বাস্তব উদাহরণ।
এই মানবিক দিকটিও তাঁর জনপ্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে অনেক মানুষ তাঁকে একজন সংগ্রামী নারী ও মা হিসেবেও দেখেছেন।
‘আপসহীন নেত্রী’- একটি পরিচয়ের ইতিহাস
‘আপসহীন নেত্রী’- এই অভিধাটি দীর্ঘদিন ধরে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত।
তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন, রাজনৈতিক সংকট ও চাপের মধ্যেও তিনি তাঁর বিশ্বাস ও অবস্থান থেকে সরে যাননি। তাঁর দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থানই তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
অবশ্য রাজনীতিতে দৃঢ়তার পাশাপাশি সমঝোতা ও সংলাপের প্রয়োজনও রয়েছে। তাই একজন নেতার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন করতে হলে সময়, পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নিতে হয়।
তবে যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো- খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দৃঢ়তার একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল। এই দৃঢ়তাই তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকদের কাছে তাঁকে জনপ্রিয় করেছে এবং তাঁকে দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক রেখেছে।
মানুষের ভালোবাসাই বড় উত্তরাধিকার
ক্ষমতা ও পদ-পদবি কোনো রাজনৈতিক নেতার স্থায়ী সম্পদ নয়। সময়ের সঙ্গে এগুলো পরিবর্তিত হয়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া একজন নেতার সবচেয়ে বড় অর্জন।
খালেদা জিয়ার প্রতি তাঁর সমর্থকদের আবেগ ও ভালোবাসা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার।
তাঁর শেষ বিদায়ের সময় মানুষের আবেগ, শ্রদ্ধা ও অংশগ্রহণ সেই ভালোবাসারই প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায়।
রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, সমালোচনা থাকবে- এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু একজন রাজনৈতিক নেতার প্রতি মানুষের দীর্ঘস্থায়ী আবেগ তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
নারী নেতৃত্বের জন্য অনুপ্রেরণা
বাংলাদেশের নারী নেতৃত্বের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি এমন একটি সময়ে রাজনীতির শীর্ষে উঠে এসেছিলেন, যখন দেশের রাজনীতি ছিল মূলত পুরুষনির্ভর। সেই পরিবেশে তিনি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দেন এবং শেষ পর্যন্ত দেশের প্রধানমন্ত্রী হন।
তাঁর রাজনৈতিক উত্থান পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্য একটি বার্তা দিয়েছে- রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বেও নারীর সমান সক্ষমতা রয়েছে।
আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক পথচলা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে সামনে আসে।
নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন শুধু রাজনৈতিক ইতিহাসের বিষয় নয়; এটি নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষারও একটি উৎস।
প্রতিকূলতার কাছে আত্মসমর্পণ না করা, দায়িত্বের প্রতি অবিচল থাকা, দীর্ঘ সময় ধরে একটি রাজনৈতিক সংগঠনকে নেতৃত্ব দেওয়া এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার যে ক্ষমতা তিনি দেখিয়েছেন, তা নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
তাঁর জীবন আরও মনে করিয়ে দেয়- একটি বড় অর্জনের পেছনে দীর্ঘ সময়ের শ্রম, ধৈর্য ও সংগ্রাম থাকে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য তাঁর জীবন থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে- সাফল্য কখনো একদিনে আসে না; সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকতে হয়।
ইতিহাসে খালেদা জিয়া
ইতিহাস কোনো মানুষকে শুধু একটি পরিচয়ে সংজ্ঞায়িত করে না। একজন নেতার জীবনকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে সময় তাঁর অর্জন, সিদ্ধান্ত, নেতৃত্ব ও সীমাবদ্ধতা- সবকিছুকে সামনে নিয়ে আসে।
বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে এমনই হবে। কেউ তাঁকে স্মরণ করবেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। কেউ স্মরণ করবেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে। কেউ তাঁকে দেখবেন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রধান প্রতীক হিসেবে। আবার কেউ মনে রাখবেন একজন সংগ্রামী মা, সাহসী নারী ও দৃঢ়চেতা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে।
এই সব পরিচয়ের সমন্বয়েই তৈরি হয়েছে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। তাঁকে নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশের গত কয়েক দশকের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ও উপস্থিতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
চলে গেছেন, রেখে গেছেন এক ইতিহাস
বেগম খালেদা জিয়া চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক পথচলা থেমে যায়নি। কারণ তাঁর জীবন এখন ইতিহাসের অংশ।
তিনি রেখে গেছেন একটি রাজনৈতিক দলকে দীর্ঘদিন নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা, গণতন্ত্রের আন্দোলনের স্মৃতি, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঐতিহাসিক পরিচয় এবং সর্বোপরি মানুষের ভালোবাসায় নির্মিত এক দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।
সময়ের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় আরও গভীরভাবে মূল্যায়িত হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর অর্জন, নেতৃত্ব ও সংগ্রাম নিয়ে গবেষণা করবে। নতুন প্রজন্ম হয়তো তাঁকে দেখবে আরও বিস্তৃত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে।
কিন্তু তাঁর জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো একটাই- প্রতিকূলতা যত কঠিনই হোক, সাহস, ধৈর্য ও দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে গেলে ইতিহাসে নিজের জায়গা তৈরি করা সম্ভব।
বেগম খালেদা জিয়া সেই ইতিহাসেরই একজন নির্মাতা। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর স্মৃতি রয়ে গেছে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর সংগ্রামের গল্প রয়ে গেছে। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রয়ে গেছে।
আর মানুষের ভালোবাসায় যাঁরা বেঁচে থাকেন, তাঁদের বিদায় কখনো সম্পূর্ণ বিদায় হয় না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার নাম তাই শুধু একটি দলের ইতিহাসের সঙ্গে নয়, বরং একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে।
খালেদা জিয়া চলে গেছেন- রেখে গেছেন এক ইতিহাস।
জন্মবার্ষিকীতে মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক
প্রিন্ট




















