রিজভীর সামনে মহাসচিবের চেয়ার, বিএনপিতে নতুন সমীকরণ
- আপডেট সময় ১১:১৭:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
- / ২৭৫৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সমীকরণও বদলে যায়। এখন সেই পরিবর্তনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বিএনপি। দলটির বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার আলোচনা সামনে আসার পর বিএনপির ভেতরে-বাইরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে- ফখরুলের জায়গায় কে আসছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি যে নামটি সামনে আসছে, সেটি রুহুল কবির রিজভী আহমেদের।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী দীর্ঘদিন ধরে দলের কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে দলের দুঃসময়ে তিনি যেমন মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, তেমনি দলীয় বক্তব্য গণমাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ফলে মহাসচিবের দায়িত্বের সম্ভাব্য তালিকায় তার নাম থাকা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক।
তবে রাজনীতিতে ‘আলোচনায় থাকা’ আর ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’- দুটি এক বিষয় নয়। রিজভী নিজেও জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী কিংবা ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার বিষয়ে তার সঙ্গে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট আলোচনা হয়নি।
তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়- কেন বারবার রিজভীর নামই সামনে আসছে?
ফখরুল বঙ্গভবনে গেলে শূন্য হবে মহাসচিবের চেয়ার
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা। ২০১৬ সাল থেকে তিনি দলের পূর্ণাঙ্গ মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ২০১১ সালে খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন।
বিএনপির সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটিতে তিনি দলের নেতৃত্বে ছিলেন। খালেদা জিয়ার কারাবাস, তারেক রহমানের দেশের বাইরে অবস্থান এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
এখন রাষ্ট্রপতি পদে তার প্রার্থিতার বিষয়টি যদি শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক রূপ পায়, তাহলে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় একটি স্বাভাবিক শূন্যতা তৈরি হবে।
রাষ্ট্রপতি পদে যাওয়ার আগে তাকে দলীয় পদ ছাড়তে হবে কি না- এ নিয়েও আইন ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যার প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতায় যদি মহাসচিবের পদটি শূন্য হয়, তাহলে কাউন্সিলের আগ পর্যন্ত দলের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগের প্রয়োজন হবে। আর সেই জায়গাতেই সবচেয়ে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে রিজভীর নাম।
কেন রিজভী?
রিজভীর সবচেয়ে বড় শক্তি তার দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা। দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ পরিচয় রয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগও দীর্ঘদিনের।
রাজনৈতিক সংকটের সময়ে দলীয় অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বিএনপির পরিচিত মুখ। সংবাদ সম্মেলন থেকে শুরু করে গণমাধ্যমে দলীয় বক্তব্য ব্যাখ্যা করা- বহু বছর ধরে এই ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।
একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাকে শুধু দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলেই হবে না; একই সঙ্গে তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ, সাংগঠনিক কার্যক্রম, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং গণমাধ্যমে দলের অবস্থান- সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। এই জায়গায় রিজভীর অভিজ্ঞতা তাকে অন্য অনেকের তুলনায় এগিয়ে রাখতে পারে।
তবে প্রতিযোগিতা একেবারে একতরফা নয়
বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বের আলোচনায় শুধু রিজভীর নাম নেই। দলের আরও কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার নামও রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল এবং শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির মতো নেতাদের নামও আলোচনায় রয়েছে। প্রত্যেকের রাজনৈতিক পরিচয় ও অভিজ্ঞতা আলাদা।
সালাহউদ্দিন আহমদ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অন্যতম পরিচিত নেতা।
অন্যদিকে হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির মতো নেতাদের রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা।
অতএব, রিজভী এগিয়ে থাকলেও শেষ সিদ্ধান্তের আগে অন্য সম্ভাবনাগুলোকে একেবারে বাতিল করে দেওয়া ঠিক হবে না।
রিজভীর নিজের বক্তব্যই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
রাজনৈতিক গুঞ্জনের মধ্যে রুহুল কবির রিজভীর নিজের বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বা ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়ার বিষয়ে তার কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই এবং কেউ এখনো এ বিষয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করেনি।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট- তিনি নিজে কোনো পদ দাবি করেননি। বরং সিদ্ধান্তটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
রাজনীতির ভাষায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। কারণ সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়ে প্রকাশ্যে আগ্রহ দেখানোর বদলে দলের সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য দেখানো অনেক সময় নেতৃত্বের কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে তার নামের আলোচনা ভিত্তিহীন। বরং রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার নাম যেভাবে সামনে এসেছে, সেটিই প্রমাণ করে যে দলীয় নেতৃত্বের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে তাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ছাত্ররাজনীতি থেকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব
রিজভীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও দীর্ঘ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে তার উত্থান। ১৯৮৯ সালে তিনি রাকসু ভিপি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও দায়িত্ব পালন করেন।
ছাত্ররাজনীতি থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর- এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে কেবল একজন বক্তা নয়, বরং একজন সংগঠক হিসেবেও পরিচিত করেছে।
আর মহাসচিবের পদে একজন সংগঠকের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। কারণ মহাসচিবের দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া নয়; দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে সচল রাখা, বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও তার অন্যতম দায়িত্ব।
সামনে কাউন্সিল, তাই ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব হতে পারে পরীক্ষার মঞ্চ
বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে নতুন কাউন্সিল হয়নি।
দলীয় সূত্রের বরাতে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছে। যদি সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এখন যিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেবেন, তার সামনে থাকবে মাত্র কয়েক মাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
এই সময়ের মধ্যে তাকে প্রমাণ করতে হবে- তিনি কি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, তৃণমূল এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় করতে পারেন?
সুতরাং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের পদটি হয়তো শুধু একটি অন্তর্বর্তী দায়িত্ব হবে না। এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্যও একটি রাজনৈতিক পরীক্ষার মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে।
ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাবনা ও বিএনপির নতুন অধ্যায়
মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার আলোচনা বিএনপির জন্য শুধু একটি পদ পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ এবং ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের প্রশ্ন।
দলীয় সূত্রের দাবি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে ফখরুলের প্রার্থিতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে ১২ আগস্ট।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ১৩ আগস্ট মনোনয়ন দাখিলের শেষ সময় এবং ২০ আগস্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
অন্যদিকে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিকভাবে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবহ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ফখরুল যদি রাষ্ট্রপতি হন, তাহলে বিএনপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বে তার জায়গায় কে আসছেন- সেটি হয়ে উঠবে পরবর্তী বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।
রিজভী কি স্থায়ী মহাসচিব হবেন?
এখানেই আসল প্রশ্ন। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হওয়া আর স্থায়ী মহাসচিব হওয়া এক বিষয় নয়।
রিজভী যদি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন, তাহলে তাকে দলের সাংগঠনিক নেতৃত্বে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করার সুযোগ পেতে পারেন। কিন্তু কাউন্সিলের পর স্থায়ী মহাসচিব কে হবেন, সেটি নির্ভর করবে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের রাজনৈতিক হিসাব, সাংগঠনিক বাস্তবতা এবং কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের ওপর।
তাই এখনই বলা যায় না যে রিজভীই পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব। কিন্তু এটুকু বলা যায়- ফখরুলের সম্ভাব্য বিদায়ের পর যে শূন্যতা তৈরি হবে, সেটি পূরণের দৌড়ে রিজভী এখন সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি।
শেষ কথা
বিএনপির রাজনীতিতে একটি অধ্যায়ের সম্ভাব্য সমাপ্তি এবং আরেকটি অধ্যায়ের সূচনা- দুটি ঘটনা যেন একই সঙ্গে সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
একদিকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য যাত্রা। অন্যদিকে তার দীর্ঘদিনের মহাসচিবের চেয়ার নিয়ে নতুন হিসাব।
আর সেই হিসাবের কেন্দ্রবিন্দুতে রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। তবে রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কোনো গুঞ্জন নয়, শেষ কথা বলে সিদ্ধান্ত।
রিজভী নিজেই বলেছেন, দল তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেই সিদ্ধান্ত দলের শীর্ষ নেতৃত্বই নেবে। সুতরাং এখন অপেক্ষা ঘোষণার।
ফখরুল যদি বঙ্গভবনে যান, তাহলে বিএনপির মহাসচিবের চেয়ারটি শুধু একজন নতুন ব্যক্তির অপেক্ষায় থাকবে না- অপেক্ষা করবে বিএনপির নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়েরও।
আর সেই নতুন অধ্যায়ের প্রথম সারির সম্ভাব্য মুখ হিসেবে রিজভীর নাম এখন যতটা জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে, আগামী কয়েক দিনেই হয়তো তার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে।
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
প্রিন্ট





















