আলীকদম থেকে থানচির পথ প্রায় ৩৪ কিলোমিটার : জাহাঙ্গীর খান বাবু
- আপডেট সময় ০৪:৩৭:১৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৭ অগাস্ট ২০২৬
- / ২৫৭৯ বার পড়া হয়েছে
আলীকদমে পৌঁছেই জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে উঠলাম। আমার জন্য আগে থেকেই একটি কক্ষ বুক করে রেখেছিলেন দৈনিক জনতার আলীকদম প্রতিনিধি জিসান। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ফ্রেশ হয়ে তাঁর সঙ্গেই হোন্ডা মোটরসাইকেলে চড়ে রওনা দিলাম ডিম পাহাড়ের উদ্দেশে। যাওয়ার আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল, পথে একটি পাহাড়ি দোকানে কিছুক্ষণ থামব।
আলীকদম থেকে থানচির পথ প্রায় ৩৪ কিলোমিটার। ছয়-সাত কিলোমিটার পথ এগুতেই শুরু হলো পাহাড়ের প্রকৃত রূপ। খাড়া উঁচু-নিচু, আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে জিসানের হোন্ডাটি যেন কষ্ট করেই ওপরে উঠছিল। দুপাশে চোখ মেললেই শুধু পাহাড় আর পাহাড়—দূর-দূরান্ত পর্যন্ত জনমানবহীন সবুজের বিস্তার। ১২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে মিলল ছিলা সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট। এখান থেকে পর্যটকদের অনুমতি নিতে হয় আলীকদম থেকে ডিম পাহাড় হয়ে থানচির পথে যেতে হলে। জিসান আগেই অনুমতি নিয়ে রেখেছিল, তাই দায়িত্বরতদের তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আবার হোন্ডায় চড়ে বসলাম।
উঁচু পাহাড়ি পথ বেয়ে আমাদের মোটরসাইকেল ছুটে চলেছে। হঠাৎ আমাদের হোন্ডা থেমে গেল দেখলাম সামনে সেনা সদস্যরা দাঁড়িয়ে উপরে ভেকু দিয়ে রাস্তার মাটি পরিষ্কার করা হচ্ছে। তাই আমাদের সাথে আরো পর্যটক গাড়ি থেমে অপেক্ষা করছে কখন রাস্তা পরিষ্কার হবে। বেশি সময় লাগলো না
রাস্তা ছেড়ে দেয়া হলো আবার আমাদের গাড়ি পাহাড়ের উঁচুতে ওঠা শুরু করলো।
বেশ খানিকটা উঁচুতে ওঠার পর পাহাড়ি রাস্তার পাশে বাঁশবেড়া আর ছনের ছাউনি দেওয়া একটি ছোট্ট দোকান চোখে পড়ল। চারপাশ মেঘে ঢাকা, ঝরছে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। আমরা দোকানে ঢুকলাম।
দোকানজুড়ে ঝুলছে চিপস, বিস্কুট, চানাচুরসহ নানা ধরনের প্যাকেটজাত খাবার। একটু ভালো করে তাকাতেই বুঝলাম, দোকানটি শুধু ব্যবসার জায়গা নয়—একটি পরিবারের আশ্রয়ও বটে। ভেতরে এক ম্রো আদিবাসী নারী, তিন কিশোরী এবং তিনটি ছোট্ট শিশু গাদাগাদি করে বাস করছে। সেখানেই তাদের রান্নাবান্না, সেখানেই দিনযাপন। দোকানটি দেখাশোনা করছিলেন প্রায় ২৬ বছর বয়সী এক তরুণ; জানালেন, এখনও বিয়ে করেননি।
আমরা যখন দোকানে ঢুকি, তখন শিশু ও কিশোরীরা দুপুরের খাবার খাচ্ছিল। দেখলাম, কলাপাতায় মোড়ানো জুম চালের ভাত আর একটি কড়াইয়ে সেদ্ধ করা বাঁশ কোড়ল। ভাতের সঙ্গে বাঁশ কোড়ল মিশিয়ে দেখতে অনেকটা খিচুড়ির মতোই লাগছিল। আমি উৎসাহী হয়ে একটি বাঁশ কোড়ল খেতে চাইতেই এক কিশোরী একই হাতে বাড়িয়ে দিল। মুখে নিয়ে চিবিয়ে দেখলাম, একটু নোনতা স্বাদের; খুব একটা সুস্বাদু মনে হলো না। ওরা খাচ্ছিল আর মিটমিট করে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। কথায় কথায় এক কিশোরী তাদের নাম বলল। আলাপচারিতায় জানলাম—লেংটয়, লাংপাও, কাগদুই ও চাপং একই পরিবারের সদস্য।
চাপংয়ের বাবার বাড়ি চিম্বুক পাহাড়ের সুতরাং গ্রামে। প্রায় সাত-আট বছর আগে বিয়ের পর তিনি স্বামীর বাড়ি আলীকদম উপজেলার ২১ কিলো এলাকার আথাং গ্রামে চলে আসেন। বর্তমানে সেখানেই স্বামী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছেন।
ওদের খাওয়া তখনও শেষ হয়নি। আমি বললাম, “তোমাদের যা ইচ্ছে হয়, দোকান থেকে নিয়ে নাও।” কিশোরী ও শিশুরা খুব খুশি হয়ে পাঁচ টাকা দামের বিস্কুটের প্যাকেট দেখিয়ে বলল, এগুলো নেবে। যদিও দোকানটি তাদের পরিবারেরই, তবু আমি বসা তরুণটিকে বললাম, “ওরা যা খেতে চায়, দিয়ে দিন।” দেখলাম, প্রত্যেকে দুটি করে ছোট বিস্কুটের প্যাকেট নিল। এরপর যে নারীর সঙ্গে কথা বলছিলাম, তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কী খাবেন?” তিনি খুব সাবলীল ভঙ্গিতে দুটি চিপস দেখিয়ে দিলেন। আমি প্যাকেট দুটি ছিঁড়ে তাঁদের হাতে দিলাম। দোকানদার জানালেন, সব মিলিয়ে ১৬০ টাকা বিল হয়েছে।
বিস্কুট আর চিপস হাতে পাওয়ার পর শিশুদের মুখে যে নির্মল হাসি ফুটে উঠেছিল, তা দেখে মনে হচ্ছিল কতদিন পর হয়তো তারা এমন খাবার খেল! আলাপের একপর্যায়ে জানতে পারলাম, পোল্ট্রি কিংবা দেশি মুরগির মাংস শেষ কবে খেয়েছে, তা তারা নিজেরাও মনে করতে পারে না। গহীন পাহাড়ি অরণ্য থেকে কুড়িয়ে আনা বাঁশ কোড়ল আর জুমের ভাত—এতেই কেটে যায় তাদের দিন, যার জন্য কোনো অর্থের প্রয়োজন হয় না। বিস্কুট আর চিপস আঁকড়ে ধরা সেই ছোট্ট হাতগুলোর হাসিতে যেন পাহাড়ের নিরবচ্ছিন্ন নিস্তব্ধতাও মুহূর্তের জন্য প্রাণ ফিরে পেল।
আলাপের একপর্যায়ে চাপং জানাল, তাদের আদি বাড়ি চিম্বুক পাহাড়ের সুতরাং গ্রামে। কথাটি শুনেই চার বছর আগের একটি স্মৃতি হঠাৎ মনে ভেসে এলো। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কাপ্রুপাড়া থেকে চিম্বুক পাহাড় পর্যন্ত হোটেল ম্যারিয়ট নির্মাণের প্রতিবাদে ম্রো জনগোষ্ঠীর যে ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক রোড শো হয়েছিল, সেটির কথা কি মনে আছে?”
চাপং বিন্দুমাত্র দেরি না করে বলল, “হ্যাঁ, মনে আছে। আমরাও দল বেঁধে সেই রোড শোতে অংশ নিয়েছিলাম।”
আমি বললাম, “সেই কর্মসূচির সংবাদ আমিই করেছিলাম। শুধু তা-ই নয়, আপনাদের এলাকায় এসে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছিলাম। তখন আপনাদের দাবি ছিল—হোটেল ম্যারিয়ট নির্মিত হলে শুধু ম্রো জনগোষ্ঠীর বসবাসের পরিবেশই নয়, ধ্বংস হবে পাহাড়, বন আর প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্যও।”
কথা বলতে বলতে আরও একটি স্মৃতি মনে পড়ল। ম্রো বর্ণমালার উদ্ভাবক সেই তরুণের কথাও বললাম, যিনি একসময় নিখোঁজ হয়েছিলেন এবং আর ফিরে আসেননি। আমার কথা শুনে ম্রো নারীটি নীরবে মাথা নাড়লেন। মনে হলো, তিনি সবই বুঝতে পারছেন। তাঁর চোখেমুখে ছিল এক ধরনের অপার সরলতা, যা কৃত্রিমতার অনেক ঊর্ধ্বে।
জানতে চাইলাম, “সরকারি কোনো সহায়তা কি আপনাদের কাছে পৌঁছায়?”
তিনি খুব সহজভাবে উত্তর দিলেন, “না। আমরা লড়াই করেই টিকে আছি।”
কথাটি শুনে আর কিছু বলার ছিল না। পাহাড়ের নিস্তব্ধতার মতোই ভারী হয়ে উঠল চারপাশের মুহূর্তটি।
বিদায় নেওয়ার আগে বললাম, “আপনার একটি ছবি তুলতে চাই।” তিনি এক বাক্যেই সম্মতি দিলেন। ক্যামেরায় বন্দি করলাম তাঁর মায়াবী, নিরাভরণ মুখ। সেই মুখে ছিল পাহাড়ের মতোই গভীর এক নীরবতা, আর দীর্ঘ Struggles বা সংগ্রামের অমলিন ছাপ।
ফেরার সময় জিসান তাড়া দিচ্ছিল, সামনে আমাদের আরও অনেকটা পথ বাকি। হোন্ডায় উঠে বিদায় নিলেও মনটা বারবার পেছনেই পড়ে রইল। সেই ম্রো আদিবাসী পরিবারের সরলতা, শিশুদের নিষ্পাপ হাসি আর পাহাড়ি জীবনের অকৃত্রিম উষ্ণতা আমাকে এক অদ্ভুত মায়ার বন্ধনে বেঁধে ফেলেছিল।
আমাদের হোন্ডা আবার চলতে শুরু করল। চারপাশে শুধু বিস্ময়! পাহাড়, মেঘ, বৃষ্টি আর সবুজের অসীম মেলবন্ধনে প্রকৃতির এক অনন্য রূপ দেখছি। কখনও খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে মোটরসাইকেল ওপরে উঠছে, আবার মুহূর্তেই আঁকাবাঁকা পথ ধরে নেমে যাচ্ছে গভীর উপত্যকার দিকে। জিসানের দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হচ্ছিলাম; আলীকদম-থানচির এই দুর্গম পথে সে বহুবার যাতায়াত করেছে, তাই প্রতিটি বাঁক ও চড়াই-উতরাই তার চেনা।
পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে চাঁদের গাড়িভর্তি উৎসুক পর্যটকদের দল। পাহাড়ের চূড়ায় ভেসে বেড়ানো মেঘ মুহূর্তেই নিচে নেমে এসে ঢেকে দিচ্ছে পথঘাট। যেদিকে তাকাই, মনে হয় কুয়াশার সাদা চাদরে মোড়ানো এক রহস্যময় পৃথিবী। এখানকার প্রকৃতি সত্যিই ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়—এই মেঘ, এই বৃষ্টি, আবার হঠাৎ রোদের ঝলক।
পাহাড়ের চূড়া থেকে এবার হোন্ডা নিচের দিকে নামতে শুরু করল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দক্ষ প্রকৌশলীরা অত্যন্ত কঠিন ভূপ্রকৃতির মধ্য দিয়ে এই চমৎকার সড়ক নির্মাণ করেছেন। একসময় থানচি ছিল দেশের অন্যতম দুর্গম জনপদ; বান্দরবান থেকে থানচি পৌঁছাতেই পুরো একটি দিন লেগে যেত। মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদীপথই ছিল তখন প্রধান ভরসা। এখন সড়ক হয়েছে, কিন্তু থানচি থেকে বড় মদক পর্যন্ত পাহাড়ি পথ এখনও রোমাঞ্চ আর ভয়ের এক অদ্ভুত মিশেল। অনেক উঁচুতে উঠে আবার গভীর ঢালে নামার সময় বুকের ভেতর অজান্তেই কেঁপে ওঠে।
একসময় পৌঁছে গেলাম ছোট্ট পাহাড়ি উপজেলা থানচিতে। সাঙ্গু নদীর তীরে স্পিডবোটগুলো পর্যটকদের অপেক্ষায় ঘাটে বাঁধা, নদীর ওপরে সারি সারি রেস্টুরেন্ট। এখান থেকেই পর্যটকেরা নাফাখুম, রেমাক্রি, বড় পাথরসহ দুর্গম এলাকায় নৌকায় যাত্রা করেন। আমরাও একটি বাঙালি পরিচালিত রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার সেরে আবার মোটরসাইকেলে চড়ে রওনা হলাম বড় মদক সড়কের দিকে।
যত ওপরে উঠছিলাম, প্রকৃতি ততই নতুন বিস্ময় উপহার দিচ্ছিল। পৌঁছে গেলাম ‘তমাতুঙ্গী হিল ভিউ পয়েন্টে’। পাশে পাহাড়ের ঢালে গড়ে উঠেছে অত্যাধুনিক তমাতুঙ্গী রিসোর্ট। ছবি তুলতে তুলতে হঠাৎই চোখে পড়ল এক পরিচিত মুখ—চালে মারমা। পেশাগত সূত্রে তাঁর সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল। তিনি তাঁর রিসোর্ট ঘুরে দেখার আমন্ত্রণ জানালেন এবং কথাপ্রসঙ্গে পাহাড়ি জীবন ও পেশাগত নানা চ্যালেঞ্জের কথা অকপটে বললেন।
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো। পাহাড়, মেঘ আর মানুষের আন্তরিকতায় দিনটি হয়ে উঠল অবিস্মরণীয়। ফেরার পথে আবারও ডিম পাহাড়ে উঠতেই ঘন মেঘ এসে চারদিক ঢেকে দিল। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে চোখ ভিজে যাচ্ছিল, তবু জিসানের দক্ষ হাতে হোন্ডা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল আলীকদমের পথে।
আলীকদমে ফিরে সিদ্ধান্ত নিলাম আজই ঢাকায় ফিরব। জেলা পরিষদের ডাকবাংলো থেকে ব্যাগ গুছিয়ে সন্ধ্যা সাতটার বাস ধরলাম। পাহাড় পেছনে পড়ে রইল ঠিকই, কিন্তু মেঘ-বৃষ্টির পরশ আর সেই নারীর শান্ত কণ্ঠে বলা বাক্যটি—“আমরা লড়াই করেই টিকে আছি”—স্মৃতির ক্যানভাসে চিরকালের জন্য আঁকা হয়ে রইল।
প্রিন্ট


















