জ্বালানি সংকট নাকি অব্যবস্থাপনা: কেন বারবার আঁধারে বাংলাদেশ?
- আপডেট সময় ০৪:৫৪:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
- / ২৫৪৪ বার পড়া হয়েছে
বিদ্যুৎ চলে গেলে একটি ঘর অন্ধকার হয়। কিন্তু একটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় যখন দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হয়, তখন সেই অন্ধকার ঘরের চার দেয়ালে আটকে থাকে না- তা ছড়িয়ে পড়ে কারখানায়, শিল্পে, পরিবহনে, বিনিয়োগে, কর্মসংস্থানে এবং শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তাই শুধু লোডশেডিং, কম গ্যাসের চাপ কিংবা সিএনজি স্টেশনের দীর্ঘ লাইনের গল্প নয়। এর গভীরে রয়েছে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভরতা, এলএনজি অবকাঠামোর ঝুঁকি, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার দুর্বলতা।
২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা ও কারিগরি সমস্যার পর জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। ৬ আগস্ট টার্মিনালটির একটি বয়লার মেরামতের পর আংশিকভাবে সরবরাহ শুরু হয়। কিন্তু ১৯ আগস্ট আবার এলএনজি মজুত শেষ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ২২ আগস্ট নতুন কার্গো আসার পর টার্মিনালটি পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করে।
একটি অবকাঠামোগত সমস্যার এমন ধারাবাহিক অভিঘাত একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে- সমস্যাটি কি শুধু জ্বালানি সংকট, নাকি সংকট মোকাবিলার সক্ষমতারও সংকট?
একটি টার্মিনালের সমস্যা, জাতীয় ব্যবস্থায় এত বড় ধাক্কা কেন?
বাংলাদেশে বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট বা FSRU রয়েছে। দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত পুনঃগ্যাসীকরণ সক্ষমতা প্রায় ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা একসময় প্রায় ২,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট থাকলেও তা কমে প্রায় ১,৬২৭ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে বলে সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করে BSS জানিয়েছে। জাতীয় গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি।
অর্থাৎ বাংলাদেশের গ্যাসব্যবস্থা এমনিতেই সরবরাহ ও চাহিদার বড় ব্যবধান নিয়ে চলছে। এর মধ্যে একটি FSRU অচল হলে আমদানিকৃত গ্যাসের একটি বড় অংশ একসঙ্গে ব্যবস্থা থেকে হারিয়ে যায়।
২১ জুলাইয়ের ঘটনার পর প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ কমে যাওয়ার তথ্যই তার প্রমাণ।
এখানে তাই প্রশ্নটি শুধু- টার্মিনালে কী ঘটেছিল?
তার চেয়ে বড় প্রশ্ন- একটি টার্মিনাল অচল হলে জাতীয় গ্যাসব্যবস্থার বিকল্প ব্যবস্থা কোথায়?
জ্বালানি নিরাপত্তার আধুনিক ধারণায় শুধু সক্ষমতা থাকলেই হয় না; প্রয়োজন রেজিলিয়েন্স বা সংকট-সহনশীলতা। একটি উৎস বা অবকাঠামো ব্যর্থ হলেও যাতে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে, সেই সক্ষমতাই জ্বালানি নিরাপত্তার আসল পরীক্ষা।
৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কোথায়?
সাম্প্রতিক সংকটের ভয়াবহতা বোঝার জন্য কয়েকটি সংখ্যা যথেষ্ট।
১৮ আগস্ট জাতীয় গ্যাসের মোট সরবরাহ ছিল প্রায় ২,৪২০ মিলিয়ন ঘনফুট, যেখানে চাহিদা ছিল প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ১,৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। একই সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রায় ৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছিল এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৫,৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠেছিল।
কিন্তু এক দিন পর, ১৯ আগস্ট, এক্সিলারেটের FSRU-তে এলএনজি মজুত শেষ হয়ে গেলে মোট গ্যাস সরবরাহ আবার ২,২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে যায়।
২২ আগস্ট নতুন কার্গো আসার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক হয়। এক্সিলারেটের টার্মিনাল প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট দিয়ে সরবরাহ শুরু করে এবং দুই টার্মিনাল মিলিয়ে এলএনজি-ভিত্তিক সরবরাহ প্রায় ৬৮৬ মিলিয়ন ঘনফুটে ওঠে; জাতীয় গ্যাস সরবরাহ পৌঁছায় প্রায় ২,৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে।
কিন্তু এটিও চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ সংকট সাময়িকভাবে কমেছে; কাঠামোগত ঘাটতি দূর হয়নি।
এলএনজি: সমাধান, নাকি নতুন ঝুঁকি?
বাংলাদেশের জন্য এলএনজি আমদানি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমেছে, অথচ অর্থনীতি ও নগরায়নের সঙ্গে জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে।
কিন্তু এলএনজি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের সামনে নতুন ঝুঁকিও তৈরি করেছে।
২০২৬ সালের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সেই ঝুঁকি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। জুলাইয়ে পেট্রোবাংলা জানায়, কাতারএনার্জি ২০২৬ সালে বাংলাদেশে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনতে পারে। কাতার থেকে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেটসহ বিকল্প উৎস থেকে কার্গো সংগ্রহ করতে হয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশকে এখন শুধু জ্বালানি কিনলেই হচ্ছে না; আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি কখন, কোথা থেকে এবং কত দামে পাওয়া যাবে, সেটিও জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২৪ আগস্টের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, চাহিদা মেটাতে সরকার দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্য থেকে দুটি এলএনজি কার্গো কিনছে, যার দাম প্রতি MMBtu ২৪ ডলারের বেশি।
এটি শুধু আমদানি ব্যয়ের প্রশ্ন নয়। উচ্চমূল্যের এলএনজি মানে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি। শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুৎ, শিল্পপণ্য, পরিবহন এবং ভোক্তার ওপর।
জ্বালানি নিরাপত্তা তাই শুধু জ্বালানি কেনার সামর্থ্য নয়; প্রয়োজনের সময়ে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি পাওয়ার নিশ্চয়তাও।
কাতারের ওপর নির্ভরতার শিক্ষা
বাংলাদেশ ২০২৫ সালে তার এলএনজি আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশ কাতার থেকে পেয়েছিল বলে S&P Global-এর তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কাতারি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ ঝুঁকি তৈরি করে।
এখানে প্রশ্ন কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা ভুল কি না- তা নয়। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি অনেক সময় মূল্য ও সরবরাহের পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ায়। কিন্তু একই সঙ্গে কোনো একটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে ভূরাজনৈতিক বা সরবরাহজনিত সংকটে ঝুঁকি বাড়ে।
তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৌশল হওয়া উচিত- দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি + বিভিন্ন সরবরাহকারী + প্রয়োজনমতো স্পট মার্কেট + পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সক্ষমতা।
সীমিত গ্যাস: বিদ্যুৎ আগে, নাকি শিল্প?
সংকটের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন এখানেই। গ্যাস কম থাকলে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়- এই সীমিত গ্যাস কোথায় যাবে?
বিদ্যুৎকেন্দ্রে দিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো যায়। কিন্তু শিল্পে গ্যাসের চাপ কমে যায়। আবার শিল্পে গ্যাস দিলে উৎপাদন সচল রাখা যায়; কিন্তু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ কমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও লোডশেডিংয়ের ওপর চাপ বাড়ে।
১৮ আগস্টের তথ্যটি বিষয়টি স্পষ্ট করে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে প্রায় ৯৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছিল, যা আগের সপ্তাহের প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এর ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৫,৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত উঠতে পারে। কিন্তু একই সময়ে শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে অনেক কারখানা স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারেনি।
এখানে বোঝা যায়, সংকট শুধু সরবরাহের নয়। এটি বণ্টন ও অগ্রাধিকার নির্ধারণের সংকটও।
শিল্পে গ্যাস কমলে অর্থনীতিতে তার অভিঘাত অনেক বড়
গ্যাসের চাপ কমে গেলে একটি কারখানা শুধু কয়েক ঘণ্টার উৎপাদন হারায় না। উৎপাদন ব্যাহত হলে কাঁচামাল, শ্রমঘণ্টা, সরবরাহ শৃঙ্খল, রপ্তানি সময়সূচি এবং আর্থিক দায়- সবকিছুর ওপর প্রভাব পড়ে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের টেক্সটাইল, নিটওয়্যার, ডাইং, সিরামিক, স্টিল, কাচ, সার ও অন্যান্য গ্যাসনির্ভর শিল্পে জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা সরাসরি উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত।
তাই গ্যাস সংকটকে শুধু ‘এনার্জি সেক্টরের সমস্যা’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর ধারাবাহিকতা হতে পারে- গ্যাস সংকট → উৎপাদন সংকট → রপ্তানি ও বিনিয়োগে চাপ → কর্মসংস্থানে ঝুঁকি → অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চাপ।
এই কারণেই জ্বালানি নীতি আসলে শিল্পনীতি ও অর্থনৈতিক নীতিরও অংশ।
বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেই বিদ্যুৎ নিরাপত্তা হয় না
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বড় বিনিয়োগ হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আবারও একটি মৌলিক সত্য সামনে এনেছে- বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা আর বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা এক জিনিস নয়।
কেন্দ্র আছে, কিন্তু গ্যাস নেই- উৎপাদন হবে না। গ্যাস আছে, কিন্তু পাইপলাইন সক্ষমতা নেই- উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে।
এলএনজি টার্মিনাল আছে, কিন্তু এলএনজি কার্গো নেই- গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র বসে থাকতে পারে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা ও তরল জ্বালানির ঘাটতিও বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলছে। ২৮ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো না কোনোভাবে উৎপাদন ব্যাঘাতের মুখে ছিল; এর মধ্যে ২০টি পুরোপুরি বন্ধ ছিল এবং বাকিগুলো সীমিত সক্ষমতায় চলছিল।
Power Grid Bangladesh-এর তথ্যেও দেখা যায়, ২৭ আগস্ট দিনের বিভিন্ন সময়ে গ্যাস, কয়লা, তরল জ্বালানি ও আমদানি করা বিদ্যুৎ- সবগুলো উৎস মিলিয়ে জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা চালাতে হয়েছে।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ নিরাপত্তা কোনো একক খাতের বিষয় নয়। এটি একটি সমন্বিত জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার ফল।
২১ জুলাইয়ের ঘটনা শুধু দুর্ঘটনা নয়, একটি ‘স্ট্রেস টেস্ট’
মহেশখালীর ঘটনা নিয়ে দোষারোপের আগে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। অগ্নিকাণ্ড বা কারিগরি ত্রুটি যে কোনো জ্বালানি অবকাঠামোয় ঘটতে পারে। কোনো ব্যবস্থা শতভাগ ঝুঁকিমুক্ত নয়।
কিন্তু একটি দুর্ঘটনার পর একটি দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা কত দ্রুত বিকল্প পথে ফিরে আসতে পারে- সেটিই ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার পরীক্ষা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটনাটি দেখিয়েছে যে আমদানিকৃত গ্যাস সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাত্র দুটি FSRU-র ওপর কেন্দ্রীভূত।
দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে একটি টার্মিনাল অচল হলে জাতীয় সরবরাহে বড় ধাক্কা আসা স্বাভাবিক।
তাই ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় শুধু আরও একটি টার্মিনাল নির্মাণ যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন হবে- টার্মিনাল, পাইপলাইন, স্টোরেজ, কার্গো, বিকল্প উৎস এবং জরুরি সরবরাহ- সব মিলিয়ে পুরো ব্যবস্থার কতটা রেজিলিয়েন্ট?
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ফিরতেই হবে
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি হওয়া উচিত দেশীয় সম্পদের অনুসন্ধান ও সঠিক ব্যবহার।
নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, সম্ভাবনাময় ব্লকে কূপ খনন, পুরোনো ক্ষেত্রের উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং আধুনিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ- এসব ক্ষেত্রে সময়বদ্ধ কর্মসূচি প্রয়োজন।
কারণ আমদানি করা এলএনজি যতই প্রয়োজনীয় হোক, তা আন্তর্জাতিক বাজার, বৈদেশিক মুদ্রা, পরিবহন ও ভূরাজনীতির ওপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ঝুঁকি আছে, ব্যর্থতার সম্ভাবনাও আছে। কিন্তু অনুসন্ধানই যদি পর্যাপ্ত না হয়, ভবিষ্যতের আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়বে।
সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে ১,৬২৭ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। এই প্রবণতা উল্টাতে না পারলে এলএনজি আমদানির ওপর চাপ আরও বাড়বে।
জ্বালানি ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য এখন আর বিলাসিতা নয়
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হওয়া উচিত- বৈচিত্র্য।
শুধু দেশীয় গ্যাস নয়। শুধু এলএনজি নয়। শুধু কয়লা নয়। শুধু তেল নয়। আবার শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানিও নয়।
প্রয়োজন একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি মিশ্রণ- দেশীয় গ্যাস, এলএনজি, কয়লা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং জ্বালানি দক্ষতার সমন্বয়।
বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা বাড়াতে হবে। তবে শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না। প্রয়োজন গ্রিড সক্ষমতা, সঞ্চালনব্যবস্থা, জমির পরিকল্পনা, স্টোরেজ প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং বাস্তবসম্মত অর্থায়ন।
শুধু নতুন জ্বালানি নয়, কম জ্বালানিতে বেশি উৎপাদন
বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিতে আরেকটি বিষয় তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত- energy efficiency।
একই পরিমাণ শিল্প উৎপাদনে যদি ১০ শতাংশ কম গ্যাস ব্যবহার করা যায়, সেটিও কার্যত নতুন জ্বালানি সরবরাহের সমান অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে পারে।
শিল্পে দক্ষ বয়লার, আধুনিক যন্ত্রপাতি, waste heat recovery, energy audit, ভবনে দক্ষতা এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে স্মার্ট ব্যবস্থাপনা- এসবকে জাতীয় জ্বালানি নীতির অংশ করতে হবে।
কারণ ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু ‘কত জ্বালানি কিনব’- এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
প্রশ্ন হতে হবে- যে জ্বালানি আছে, সেটি কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করছি?
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ
জ্বালানি খাতে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। এলএনজি ক্রয়, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পাইপলাইন, টার্মিনাল, সঞ্চালন অবকাঠামো- সব ক্ষেত্রেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে।
তাই প্রশ্ন উঠবে- কোন প্রকল্প কেন নেওয়া হলো? কত ব্যয়ে নেওয়া হলো? ব্যয় নির্ধারণের ভিত্তি কী? ক্রয়প্রক্রিয়া কতটা প্রতিযোগিতামূলক? চুক্তির শর্ত কী? প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে তার দায় কার?রাষ্ট্রের অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে কি?
এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্য হওয়া প্রয়োজন। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও মনে রাখা জরুরি। অভিযোগ আর প্রমাণিত দুর্নীতি এক বিষয় নয়।
তাই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রমাণ ছাড়া দায়ী না করে স্বাধীন নিরীক্ষা, তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
লক্ষ্য হওয়া উচিত কাউকে বলির পাঁঠা বানানো নয়; বরং এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ভুল, অপচয় বা অনিয়মের জন্য দায় নির্ধারণ করা যায়।
সামনে পাঁচটি জরুরি কাজ
১. দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে সময়বদ্ধ কর্মসূচি: নতুন কূপ, সম্ভাবনাময় ব্লক, পুরোনো ক্ষেত্রের উন্নয়ন এবং ভূতাত্ত্বিক জরিপ- সবকিছুকে সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে।
২. এলএনজি সরবরাহে উৎস ও চুক্তির বৈচিত্র্য: একক কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, স্পট মার্কেট এবং বিকল্প সরবরাহকারী- সবগুলোকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে হবে।
৩. FSRU ও পাইপলাইন ব্যবস্থায় রেজিলিয়েন্স: একটি টার্মিনাল বন্ধ হলে যাতে জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বিপর্যয় না ঘটে, সে জন্য বিকল্প সংযোগ, পর্যাপ্ত মজুত, জরুরি কার্গো এবং দ্রুত পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা থাকতে হবে।
৪. গ্যাস বণ্টনে স্বচ্ছ অগ্রাধিকারনীতি: বিদ্যুৎ, শিল্প, সার, আবাসিক ও পরিবহন- কোন পরিস্থিতিতে কোন খাত কতটা অগ্রাধিকার পাবে, তা আগে থেকেই নির্ধারিত ও স্বচ্ছ হতে হবে।
৫. নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও energy efficiency: নতুন জ্বালানি আমদানির পাশাপাশি বিদ্যমান জ্বালানি কম অপচয়ে ব্যবহার এবং দেশীয় নবায়নযোগ্য উৎসের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনা
বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিতে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা যদি কোনো একটি জায়গায় খুঁজতে হয়, তা হলো- দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতার প্রশ্ন।
একটি সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর হতে পারে। কিন্তু একটি গ্যাসক্ষেত্র, বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল কিংবা জাতীয় গ্রিডের পরিকল্পনা চলে কয়েক দশক ধরে। তাই সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মৌলিক জ্বালানি কৌশল যেন বারবার বদলে না যায়।
প্রয়োজন একটি পেশাদার, তথ্যভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনা কাঠামো- যেখানে অর্থনীতি, ভূতত্ত্ব, প্রকৌশল, পরিবেশ, আন্তর্জাতিক বাজার, জলবায়ু ঝুঁকি এবং জাতীয় নিরাপত্তা একসঙ্গে বিবেচিত হবে।
তাহলে দায় কার?
বর্তমান সংকটের দায় কোনো এক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা একটি দুর্ঘটনার ওপর চাপিয়ে দিলে বাস্তবতার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।
২১ জুলাইয়ের ঘটনা ছিল তাৎক্ষণিক ধাক্কা। কাতারি সরবরাহের বিঘ্ন ছিল বহিরাগত ভূরাজনৈতিক চাপ। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারের উচ্চমূল্য বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
কিন্তু এসব ঝুঁকি জানা থাকার পরও একটি দেশ কতটা প্রস্তুত ছিল- সেটিই ব্যবস্থাপনার আসল পরীক্ষা।
যদি একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর বড় ধরনের জাতীয় সংকট তৈরি হয়, তাহলে অবকাঠামোগত রেজিলিয়েন্সের প্রশ্ন উঠবে।
যদি আন্তর্জাতিক সরবরাহ কমার পর বিকল্প কার্গো জোগাড় করতে অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়, তাহলে আমদানি পরিকল্পনার প্রশ্ন উঠবে।
যদি বহু বছর ধরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমতে থাকে অথচ অনুসন্ধান যথেষ্ট গতিতে না বাড়ে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি নীতির প্রশ্ন উঠবে।
আর যদি বিপুল বিনিয়োগের পরও বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ বারবার অস্থিতিশীল হয়, তাহলে প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও জবাবদিহির প্রশ্ন উঠবেই।
শেষ কথা: সংকট সামাল দেওয়া নয়, সংকট-সহনশীল ব্যবস্থা গড়তে হবে
বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে। জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু উৎপাদন সক্ষমতার নাম নয়। এটি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, উৎসের বৈচিত্র্য, অবকাঠামোর স্থিতিস্থাপকতা, আর্থিক সক্ষমতা, জ্বালানি দক্ষতা এবং ব্যবস্থাপনার দক্ষতার সমন্বিত ফল।
একটি এলএনজি কার্গো এলে সংকট কমবে। টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরলে সরবরাহ বাড়বে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস বাড়ালে লোডশেডিং কমতে পারে।
কিন্তু এগুলো সংকটের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা- স্থায়ী সমাধান নয়। স্থায়ী সমাধান তখনই হবে, যখন একটি টার্মিনালের দুর্ঘটনা, একটি কার্গোর বিলম্ব, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি কিংবা একটি ভূরাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশের পুরো অর্থনীতিকে নড়বড়ে করে দিতে পারবে না।
বাংলাদেশের সামনে তাই এখন কয়েকটি স্পষ্ট অগ্রাধিকার- দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। এলএনজি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করতে হবে। FSRU ও পাইপলাইন অবকাঠামোকে আরও স্থিতিস্থাপক করতে হবে।
গ্যাস বণ্টনে স্বচ্ছ অগ্রাধিকারনীতি করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়াতে হবে। জ্বালানি অপচয় কমাতে হবে। এবং প্রতিটি বড় প্রকল্প ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য জ্বালানি শুধু আলো জ্বালানোর উপকরণ নয়। এটি শিল্পের চাকা ঘোরায়, শ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরি করে, রপ্তানিকে সচল রাখে, বিনিয়োগকে আকর্ষণ করে এবং অর্থনীতির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নির্ধারণ করে।
তাই প্রশ্নটি এখন আর শুধু- বিদ্যুৎ কেন গেল? গ্যাস কেন কম?
প্রশ্নটি আরও গভীর- বাংলাদেশ কি এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা সংকটের সময়ও দেশকে সচল রাখতে পারে?
যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে এখনই পরিকল্পনা বদলানোর সময়। কারণ সংকট এলেই সাময়িকভাবে সামাল দেওয়া কোনো টেকসই জ্বালানি নীতি নয়।
টেকসই নীতি হলো এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে সংকট এলেও দেশ অচল হবে না।
আজকের বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি খুব সরল- আমরা কি প্রতিবার সংকট দেখা দিলে জরুরি ব্যবস্থা নেব, নাকি এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করব যেখানে সংকট এলেও বাংলাদেশ থেমে যাবে না?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বাংলাদেশ কতটা আলোয় থাকবে- আর কতটা সময় আঁধারে।
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক
প্রিন্ট























