পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে বিশাল গ্রহাণু! : কিছুটা আঁচ লাগতে পারে পৃথিবীর মহাকাশবিজ্ঞান চর্চায়
- আপডেট সময় ০৯:৫৮:৪৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
- / ৮৮৮ বার পড়া হয়েছে
পৃথিবীর সবচেয়ে কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের গ্রহের সঙ্গে অ্যাপোফিসের দূরত্ব হবে মাত্র ৩২ হাজার কিলোমিটার
অ্যাপোফিস নামের গ্রহাণুটির কথা বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছিলেন সেই ২০০৪ সালে। হিসাব করে দেখা গিয়েছে, ২০২৯ সালের ১৩ এপ্রিল পৃথিবীর একেবারে সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাবে এই মহাজাগতিক পাথরখণ্ড।
বিজ্ঞানীরা আগেই জানতে পেরেছিলেন, বিশালাকায় এক গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে। তা পৃথিবীতে ধাক্কা খাবে না বটে, তবে আমাদের গ্রহের প্রায় গা ঘেঁষে বেরিয়ে যাবে। সংঘর্ষের সম্ভাবনা নেই বলে সকলেই এত দিন নিশ্চিন্ত ছিলেন। তবে সম্প্রতি একটি গবেষণা সব হিসাব উল্টে দিয়েছে। দাবি, সংঘর্ষ না হলেও একেবারে ‘ঝঞ্ঝাটমুক্ত’ হবে না গ্রহাণুর যাত্রা। তার কিছুটা আঁচ লাগতে পারে পৃথিবীর মহাকাশবিজ্ঞান চর্চায়। তা ছাড়া, গ্রহাণু আমাদের কোনও ক্ষতি না-করলেও পৃথিবীর প্রভাব পড়তে পারে সেই গ্রহাণুতে!
৯৯৯৪২ অ্যাপোফিস নামের গ্রহাণুটির কথা বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছিলেন সেই ২০০৪ সালে। হিসাব করে দেখা গিয়েছে, ২০২৯ সালের ১৩ এপ্রিল পৃথিবীর একেবারে সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাবে এই মহাজাগতিক পাথরখণ্ড। আকারে তা প্রায় ৩৭০ মিটার (প্রায় ১২১০ ফুট) লম্বা। পৃথিবীর সবচেয়ে কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের গ্রহের সঙ্গে অ্যাপোফিসের দূরত্ব হবে মাত্র ৩২ হাজার কিলোমিটার, মহাকাশের বিচারে যা বেশ কম।
গত কয়েক বছর ধরে অ্যাপোফিস নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। জটিল অঙ্ক কষে গ্রহাণুর যাত্রাপথের সব রকম সম্ভাবনা বিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখেছেন। নিশ্চিত করে বলা হয়েছে, অ্যাপোফিসের কারণে পৃথিবীতে চিন্তার কোনও কারণ নেই। এর ফলে আমাদের গ্রহের জন্য ছোট বা বড় কোনও ঝুঁকিই তৈরি হবে না। ২০২৯ সালেও নয়, আগামী ১০০ বছরেও নয়।
এমনিতে অ্যাপোফিসের গড় গতিবেগ সেকেন্ড প্রতি ৩০.৭৩ কিলোমিটার। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গতি কমছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পৃথিবীকে পেরোনোর সময় এই গ্রহাণুর সর্বোচ্চ গতি থাকবে সেকেন্ডে ৭.৪২ কিলোমিটার। পৃথিবীর উপর অ্যাপোফিসের প্রভাবের চেয়েও বিজ্ঞানীদের আলোচনায় এখন বেশি করে উঠে আসছে পৃথিবীর প্রভাবের দিকটি। অর্থাৎ, আমাদের গ্রহের কাছাকাছি আসার ফলে গ্রহাণুটির ভিতরে বা তার গতিপথে কিছু পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। তার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত বেশি। হলে তার পরিণাম কী হবে, বিজ্ঞানীরা এখনও সে সম্পর্কে নিশ্চিত নন। তাই কৌতূহল বেড়েছে।
এই সংক্রান্ত একটি গবেষণা সম্প্রতি ‘প্ল্যানেটারি সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ইটালিয়ান ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের (সিএনআর) ইনস্টিটিউট অফ অ্যাপ্লায়েড ফিজ়িক্সের পদার্থবিদ গিলিয়া শেটিনো এবং মহাকাশ-গতিবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ আলেসান্দ্রো রসি।
মহাকাশে আমাদের পৃথিবীর আশপাশের অংশে বহু ধ্বংসাবশেষ, অকেজো যন্ত্রপাতি ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মহাকাশ সংক্রান্ত গবেষণা, পরীক্ষানিরীক্ষা, নানা অভিযান, সাফল্য বা ব্যর্থতার দলিল এই সমস্ত ধ্বংসাবশেষকে এককথায় ‘মহাজাগতিক জঞ্জাল’ বলা যায়। গবেষণায় দাবি, পৃথিবীতে সরাসরি ধাক্কা না-খেলেও এই সমস্ত মানবসৃষ্ট জঞ্জালে বাধা পেতে পারে অ্যাপোফিস। তাতেই হতে পারে বিপদ! আলেসান্দ্রো বলেন, ‘‘আমি মহাকাশের এই সমস্ত জঞ্জাল এবং গ্রহাণুর গতিপ্রকৃতি— উভয় নিয়েই চর্চা করে থাকি। অ্যাপোফিস পৃথিবীর কাছাকাছি এলে তার গতিপ্রকৃতি কী হতে পারে, তা হিসাব করে দেখতে গিয়ে প্রথমেই এই প্রশ্নটা আমার মাথায় এসেছিল। মহাকাশে এত আবর্জনা ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে, তার সঙ্গে গ্রহাণুটা ধাক্কা খাবে না তো? সেই সম্ভাবনাটা প্রবল।’’
পৃথিবীতে সংঘর্ষের সম্ভাবনা না-থাকায় অ্যাপোফিসের গতিবিধিতে অনেক আগেই মনোনিবেশ করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। কাছাকাছি এলে তাকে নানা দিক থেকে নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। এমনকি, গ্রহাণু এবং তার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের এত দিনের প্রচলিত ধারণাও এর ফলে আমূল বদলে যেতে পারে। বিজ্ঞানীদের দাবি, পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির জোরালো প্রভাব পড়বে অ্যাপোফিসের উপর। তার ফলে গ্রহাণুটির মাটি কেঁপে (গ্রহাণুকম্পন) উঠতে পারে। ধসও নামতে পারে ভিতরে। অনেক না-জানা তথ্য প্রকাশ্যে চলে আসতে পারে। ইউরোপীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ইএসএ) ‘র্যামসেস মিশন’ এবং আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ‘ওসিরিস অ্যাপেক্স’ নামের দু’টি মহাকাশযান আগন্তুক ওই গ্রহাণুকে পর্যবেক্ষণ করবে। গবেষণায় দাবি, মহাজাগতিক জঞ্জালে ধাক্কা খেলে এই পর্যবেক্ষণ বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে গ্রহাণুকে কাছ থেকে দেখা এবং তার গতিবিধি বিশ্লেষণের সুযোগ হারাবেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, অধিকাংশ আবর্জনাই পৃথিবীর কাছাকাছি রয়েছে। অ্যাপোফিস বেরিয়ে যাবে আরও কিছুটা দূর দিয়ে। তবে কোনও জঞ্জালের সঙ্গে সংঘর্ষের কোনও সম্ভাবনাই নেই— এ কথা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। দীর্ঘ গাণিতিক বিশ্লেষণের পর অ্যাপোফিসের যে নিখুঁত যাত্রাপথ বিজ্ঞানীরা নির্ণয় করেছেন, তার সঙ্গে মহাকাশের ওই অংশে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষের একটি মডেল তৈরি করা হয়েছিল গবেষণাগারে। বিজ্ঞানীদের দাবি, আমাদের জানার বাইরেও অনেক বস্তু সেখানে রয়েছে। আকারে ছোট হওয়ায় হয়তো তার অধিকাংশই পৃথিবীতে দৃশ্যমান নয়। কিন্তু সেগুলির সঙ্গে গ্রহাণুর ধাক্কা লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ বাধা পাবে। কোনও নিকটবর্তী গ্রহাণুর উপর পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ কত গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, তা চাক্ষুষ করার সুযোগ হারাবেন বিশেষজ্ঞেরা।
সম্ভাব্য সংঘর্ষে গ্রহাণুতে গর্ত তৈরি হতে পারে। মহাজাগতিক সেই আবর্জনার ছোটখাটো স্তূপ তৈরি হতে পারে সেখানে। এই আবর্জনা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান যে অনেক কম, চোখের আড়ালে এমন অনেক বস্তু যে পৃথিবীর কাছাকাছি ছড়িয়েছিটিয়ে আছে, যার অস্তিত্বই আমরা জানি না, তা-ও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আলেসান্দ্রোদের গবেষণা। তবে তাঁদের আশা, ২০২৯ সালের মধ্যে এই ধরনের মহাজাগতিক জঞ্জাল চিহ্নিত করার জন্য পর্যাপ্ত পূর্ণাঙ্গ জরিপ এবং সমীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে। এই কাজে নতুন নতুন টেলিস্কোপ ব্যবহৃত হবে। ফলে চিত্রটা আরও খানিক স্পষ্ট হবে।
প্রিন্ট

















