ঢাকা ০৭:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম:
Logo প্রশাসনে বড় পরিবর্তন, চার মন্ত্রণালয়-বিভাগে নতুন সচিব Logo নবম পে-স্কেলের শেষ ধাপে সরকার: বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপনের সম্ভাবনা Logo খাদ্যগুদামে নয়ছয়ের দিন শেষ, সিন্ডিকেটের মদদদাতারাও রেহাই পাবে না: খাদ্যমন্ত্রী Logo নেপালে ভয়াবহ বন্যা: ৩৬০-এর বেশি মৃত্যু, নিখোঁজ ১,৪০০ Logo মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) আদর্শ অনুসরণে শান্তিপূর্ণ দেশ গড়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর Logo আমি এখানে বসা তথ্যমন্ত্রী হিসেবে, কারো আত্মীয় হিসেবে নয়: পার্থ Logo মালয়েশিয়ায় অভিযানে ২৫২ জন আটক, ১৬৪ জনই বাংলাদেশি Logo রাষ্ট্রপতির শপথের পর মন্ত্রিসভায় শপথ নিলেন মঈন খান, পার্থ, সাচিং ও শামীম Logo মন্ত্রিসভায় যুক্ত হচ্ছেন আরও চারজন, আজই শপথের আভাস Logo রুহুল কবির রিজভী হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব

সরকারি কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ বলা কি বাধ্যতামূলক?

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
  • আপডেট সময় ০৬:১০:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২৫২৭ বার পড়া হয়েছে

‘স্যার বললেন না কেন?’- সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা অনেক নাগরিকেরই আছে। সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে ‘স্যার’ কিংবা ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করা আমাদের প্রশাসনিক ও সামাজিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি। কিন্তু কোনো রীতি দীর্ঘদিন প্রচলিত থাকলেই তা আইন হয়ে যায় না।

তাই প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট হলেও এর তাৎপর্য গভীর: সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে ‘স্যার’ কিংবা ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করা কি নাগরিকের জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক?

বর্তমান সংবিধান, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত Rules of Business, 1996 পর্যালোচনা করলে এমন কোনো সাধারণ বিধান পাওয়া যায় না, যেখানে সরকারি সেবা নিতে আসা নাগরিককে কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলতেই হবে- এমন বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থাৎ কেউ সৌজন্যবোধ থেকে ‘স্যার’ বলবেন, কেউ ‘ম্যাডাম’, ‘জনাব’ বা ‘মহোদয়’ বলবেন- এটি মূলত শিষ্টাচারের বিষয়। কিন্তু সৌজন্য আর আইনগত বাধ্যবাধকতা এক জিনিস নয়।

রাষ্ট্রের ক্ষমতার মালিক কে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই ফিরে যেতে হয় সংবিধানের কাছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কোনো সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। একজন কর্মকর্তা তাঁর পদ, দায়িত্ব ও আইন দ্বারা অর্পিত ক্ষমতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাজ করেন।

আর সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য হলো জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা।

এই দুটি সাংবিধানিক নীতি পাশাপাশি রাখলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের একটি মৌলিক চিত্র স্পষ্ট হয়। সরকারি কর্মকর্তা ক্ষমতার ব্যক্তিগত মালিক নন; তিনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত একজন জনকর্মচারী।

তাঁর পদমর্যাদা আছে, প্রশাসনিক ক্ষমতা আছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আছে; কিন্তু সেই ক্ষমতার উৎস তাঁর ব্যক্তিগত মর্যাদা নয়- সংবিধান ও আইন।

তাই একজন নাগরিক সরকারি দপ্তরে গেলে তিনি কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ চাইতে যান না। তিনি আইন ও বিধি অনুযায়ী তাঁর প্রাপ্য সেবা, সিদ্ধান্ত বা প্রশাসনিক প্রতিকার পাওয়ার জন্য যান।

শুধু ‘স্যার’ না বললে কি সেবা আটকে রাখা যায়?

এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ধরা যাক, একজন নাগরিক কোনো সরকারি দপ্তরে একটি সেবা নিতে গেলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বললেন, ‘আমাকে স্যার বলতে হবে।’ নাগরিক তা বললেন না। এরপর তাঁর আবেদন গ্রহণ করা হলো না, ফাইল আটকে রাখা হলো অথবা সেবা দিতে অযথা বিলম্ব করা হলো।

তখন বিষয়টি আর সম্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন দাঁড়ায়- একটি ব্যক্তিগত সম্বোধন কি সরকারি সেবা পাওয়ার পূর্বশর্ত হতে পারে?

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ২৫ ধারা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধারায় সরকারি কার্য বা সেবা পাওয়ার জন্য করা আবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এবং সময়সীমা নির্ধারিত না থাকলে যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে বা নির্ধারিত কিংবা যুক্তিসঙ্গত সময়ে নিষ্পত্তি করা না হলে তার কারণ জানানোর বিধানও রয়েছে।

আইনটি আরও বলছে, কোনো কর্মচারী ইচ্ছাকৃত ও অভ্যাসগতভাবে এ বিধান লঙ্ঘন করলে তা অসদাচরণ বা ক্ষেত্রমতে অদক্ষতা হিসেবে গণ্য হতে পারে।

অর্থাৎ সরকারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন আবেদন, সরকারি আদেশ, নির্ধারিত সময় ও যুক্তিসঙ্গত সময়ের কথা বলেছে। নাগরিককে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলার কথা বলেনি।

ফলে কোনো নির্দিষ্ট সেবার ক্ষেত্রে আলাদা কোনো আইন, বিধি বা বৈধ সরকারি নির্দেশনায় এমন শর্ত না থাকলে, শুধু ব্যক্তিগত সম্বোধনকে সরকারি সেবা প্রদানের পূর্বশর্ত বানানোর আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের গুরুত্ব

এখানে সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদও গুরুত্বপূর্ণ। এ অনুচ্ছেদ নাগরিককে আইনের সুরক্ষা এবং আইন অনুযায়ী ও কেবল আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেয়।

এর অর্থ এই নয় যে ‘স্যার’ না বলার প্রতিটি ঘটনাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার আইনগত ভিত্তি কী এবং সেই সিদ্ধান্তের ফলে নাগরিকের অধিকার বা স্বার্থ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে- এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

তবে মৌলিক নীতিটি পরিষ্কার: সরকারি ক্ষমতার প্রয়োগের আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে।

কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দকে সরকারি সেবা পাওয়ার শর্তে পরিণত করার প্রশ্নও তাই আইনগতভাবে বিচারযোগ্য।

Rules of Business-এ কি ‘স্যার’ বলার বিধান আছে?

‘স্যার-ম্যাডাম’ বিতর্কে Rules of Business, 1996-এর কথাও প্রায়ই বলা হয়। এটি সরকারের কাজের বণ্টন ও পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিধিমালা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত সংস্করণে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংশোধন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে এই বিধিমালায় নাগরিককে সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলতেই হবে- এমন কোনো সাধারণ বিধান পাওয়া যায় না।

তাই Rules of Business-কে নাগরিকের মৌখিক সম্বোধনের সাধারণ আইন হিসেবে উপস্থাপন করাও সঠিক নয়। অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট দপ্তর বা বিশেষ পরিস্থিতির জন্য পৃথক বৈধ প্রটোকল বা নির্দেশনা থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি আলাদাভাবে দেখতে হবে।

১৯৯০ সালের স্মারক: বিভ্রান্তির জায়গা

‘স্যার-ম্যাডাম’ বিতর্কে ১৯৯০ সালের ১১ ডিসেম্বরের একটি সরকারি স্মারকের কথা প্রায়ই সামনে আসে। বিভিন্ন প্রকাশিত সূত্রে ওই স্মারকের নম্বর এবং বিষয়বস্তু উদ্ধৃত হয়েছে। কিন্তু এর ভাষা নিয়েও প্রকাশিত সূত্রে একরকম তথ্য নেই। কোথাও দাপ্তরিক পত্রে ‘মহোদয়’ ও ‘মহোদয়া’ এবং মৌখিক সম্বোধনে ‘স্যার’ ও ‘ম্যাডাম’ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে; আবার কোথাও ‘জনাব’ ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এসেছে।

এখানে আইনগত সতর্কতা জরুরি। মূল সরকারি স্মারকের পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণিক কপি, এর বর্তমান কার্যকারিতা এবং পরবর্তী কোনো সংশোধন, প্রতিস্থাপন বা বাতিলের সরকারি নথি নিশ্চিতভাবে যাচাই না করে সেটিকে আজকের নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক আইন হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

বিশেষ করে ‘ব্যবহার করা যেতে পারে’ এবং ‘ব্যবহার করতেই হবে’- এই দুই ভাষার আইনগত তাৎপর্য এক নয়।

কোনো দাপ্তরিক শিষ্টাচারকে নাগরিকের ওপর আইনগত বাধ্যবাধকতা হিসেবে প্রয়োগ করতে হলে তার স্পষ্ট ও কার্যকর আইনগত ভিত্তি থাকা প্রয়োজন।

আদালতের বৃহত্তর নীতি

সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা আইনসম্মতভাবে প্রয়োগ এবং সরকারি কর্মচারীদের সাংবিধানিক দায়িত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে জনগণের সেবা করার যে দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে, আদালতের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে তার গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে।

একইভাবে ৩১ অনুচ্ছেদের আলোচনায় আইন অনুযায়ী আচরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে সতর্কতার সঙ্গে বলা দরকার, আদালতের এসব পর্যবেক্ষণকে ‘স্যার না বললে সরকারি সেবা দেওয়া যাবে না’- এই নির্দিষ্ট প্রশ্নের সরাসরি বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। এগুলো বৃহত্তর সাংবিধানিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আইন ও সংবিধানের সীমার মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে এবং সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব জনগণের সেবা করা।

‘স্যার’ সমস্যা নয়, সমস্যা ক্ষমতার সংস্কৃতি

‘স্যার’ শব্দটি নিজে কোনো সমস্যা নয়। একজন নাগরিক শ্রদ্ধা বা সৌজন্যবোধ থেকে একজন কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ বলতেই পারেন। ‘ম্যাডাম’, ‘জনাব’ কিংবা ‘মহোদয়’ও ব্যবহার করতে পারেন।

সমস্যা তখনই, যখন একটি সৌজন্যমূলক শব্দ আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়।

‘আগে আমাকে স্যার বলুন, তারপর আপনার কাজ হবে’- এই মানসিকতা শুধু একটি শব্দের দাবি নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক সম্পর্কে একটি পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ধারণার প্রকাশ।

ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে কর্মকর্তা ছিলেন ‘হাকিম’, আর সাধারণ মানুষ ছিলেন ‘প্রজা’। স্বাধীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে সেই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।

গণতান্ত্রিক প্রশাসনের দর্শন হওয়া উচিত- কর্তৃত্ব নয়, সেবা; ভয় নয়, আস্থা; দূরত্ব নয়, জবাবদিহি।

সম্মান আদায় নয়, অর্জন করতে হয়

একজন কর্মকর্তা দিনে কতবার ‘স্যার’ শুনলেন, তা দিয়ে তাঁর প্রশাসনিক সাফল্য মাপা যায় না।

সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত- তিনি কত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সেবা দিলেন, কতটা স্বচ্ছভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন, দুর্নীতি থেকে কতটা দূরে থাকলেন, সাধারণ মানুষের কথা কতটা মন দিয়ে শুনলেন এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করলেন।

একজন কর্মকর্তা সততা, দক্ষতা ও মানবিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে মানুষ তাঁকে এমনিতেই সম্মান করবে।

সম্মান শব্দ দিয়ে আদায় করা যায়; মর্যাদা অর্জন করতে হয় আচরণ দিয়ে।

সরকারের করণীয়

‘স্যার-ম্যাডাম’ বিতর্কের অবসান ঘটাতে সরকারের উচিত একটি স্পষ্ট ও সর্বসাধারণের জন্য সহজবোধ্য প্রশাসনিক নির্দেশনা দেওয়া।

সেখানে বলা যেতে পারে- সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে নাগরিককে কোনো নির্দিষ্ট সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারে বাধ্য করা যাবে না, যদি না কোনো নির্দিষ্ট আইন বা বৈধ বিধানে তা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকে।

একই সঙ্গে কর্মকর্তা ও নাগরিক- উভয় পক্ষকেই শালীন ও সম্মানজনক আচরণ করতে হবে। ব্যক্তিগত সম্বোধনকে সরকারি সেবা প্রদানের পূর্বশর্ত করা যাবে না। দাপ্তরিক পত্রালাপ ও মৌখিক সম্বোধনের ক্ষেত্রে সরকারি শিষ্টাচারও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে।

আর কোনো নাগরিক শুধু নির্দিষ্ট সম্বোধন ব্যবহার না করার কারণে হয়রানি বা সেবা-বঞ্চনার শিকার হলে তাঁর অভিযোগ ও প্রতিকারের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

শেষ কথা

সরকারি কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ বলা যাবে- অবশ্যই। ‘ম্যাডাম’ বলা যাবে- অবশ্যই। সম্মান দেখানোও উচিত।

কিন্তু ‘স্যার বলতেই হবে’- এমন সাধারণ আইনগত বাধ্যবাধকতা বর্তমান সংবিধান, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং Rules of Business, 1996-এ পাওয়া যায় না।

১৯৯০ সালের একটি পুরোনো সরকারি স্মারককে ঘিরে প্রশাসনিক সম্বোধনের ইতিহাস ও বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু মূল নথির ভাষা ও বর্তমান কার্যকারিতা নিশ্চিত না করে সেটিকে বর্তমান নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক আইন হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ বলছে- প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। আর ২১(২) অনুচ্ছেদ বলছে- প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তির জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা কর্তব্য।

তাই সরকারি কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘স্যার’ নয়- জনসেবক। আর নাগরিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘সেবাপ্রার্থী’ নয়- রাষ্ট্রের ক্ষমতার মালিক জনগণের একজন সদস্য।

প্রশাসনের দরজায় তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়- ‘আমাকে স্যার বলা হয়েছে কি না?’

প্রশ্ন হওয়া উচিত- আইন অনুযায়ী নাগরিকের কাজটি কি যথাসময়ে, স্বচ্ছভাবে, নিরপেক্ষভাবে এবং সম্মানের সঙ্গে করা হয়েছে?

কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন কর্মকর্তার মর্যাদা তিনি কতবার ‘স্যার’ শুনেছেন, তা দিয়ে নয়; বরং কতটা সততা, দক্ষতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার সঙ্গে জনগণের সেবা করেছেন- তা দিয়েই নির্ধারিত হওয়া উচিত।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


প্রিন্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

সরকারি কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ বলা কি বাধ্যতামূলক?

আপডেট সময় ০৬:১০:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘স্যার বললেন না কেন?’- সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা অনেক নাগরিকেরই আছে। সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে ‘স্যার’ কিংবা ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করা আমাদের প্রশাসনিক ও সামাজিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি। কিন্তু কোনো রীতি দীর্ঘদিন প্রচলিত থাকলেই তা আইন হয়ে যায় না।

তাই প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট হলেও এর তাৎপর্য গভীর: সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে ‘স্যার’ কিংবা ‘ম্যাডাম’ বলে সম্বোধন করা কি নাগরিকের জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক?

বর্তমান সংবিধান, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত Rules of Business, 1996 পর্যালোচনা করলে এমন কোনো সাধারণ বিধান পাওয়া যায় না, যেখানে সরকারি সেবা নিতে আসা নাগরিককে কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলতেই হবে- এমন বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থাৎ কেউ সৌজন্যবোধ থেকে ‘স্যার’ বলবেন, কেউ ‘ম্যাডাম’, ‘জনাব’ বা ‘মহোদয়’ বলবেন- এটি মূলত শিষ্টাচারের বিষয়। কিন্তু সৌজন্য আর আইনগত বাধ্যবাধকতা এক জিনিস নয়।

রাষ্ট্রের ক্ষমতার মালিক কে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই ফিরে যেতে হয় সংবিধানের কাছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কোনো সরকারি কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। একজন কর্মকর্তা তাঁর পদ, দায়িত্ব ও আইন দ্বারা অর্পিত ক্ষমতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাজ করেন।

আর সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য হলো জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা।

এই দুটি সাংবিধানিক নীতি পাশাপাশি রাখলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের একটি মৌলিক চিত্র স্পষ্ট হয়। সরকারি কর্মকর্তা ক্ষমতার ব্যক্তিগত মালিক নন; তিনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত একজন জনকর্মচারী।

তাঁর পদমর্যাদা আছে, প্রশাসনিক ক্ষমতা আছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আছে; কিন্তু সেই ক্ষমতার উৎস তাঁর ব্যক্তিগত মর্যাদা নয়- সংবিধান ও আইন।

তাই একজন নাগরিক সরকারি দপ্তরে গেলে তিনি কোনো ব্যক্তিগত অনুগ্রহ চাইতে যান না। তিনি আইন ও বিধি অনুযায়ী তাঁর প্রাপ্য সেবা, সিদ্ধান্ত বা প্রশাসনিক প্রতিকার পাওয়ার জন্য যান।

শুধু ‘স্যার’ না বললে কি সেবা আটকে রাখা যায়?

এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ধরা যাক, একজন নাগরিক কোনো সরকারি দপ্তরে একটি সেবা নিতে গেলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বললেন, ‘আমাকে স্যার বলতে হবে।’ নাগরিক তা বললেন না। এরপর তাঁর আবেদন গ্রহণ করা হলো না, ফাইল আটকে রাখা হলো অথবা সেবা দিতে অযথা বিলম্ব করা হলো।

তখন বিষয়টি আর সম্বোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন দাঁড়ায়- একটি ব্যক্তিগত সম্বোধন কি সরকারি সেবা পাওয়ার পূর্বশর্ত হতে পারে?

সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ২৫ ধারা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধারায় সরকারি কার্য বা সেবা পাওয়ার জন্য করা আবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এবং সময়সীমা নির্ধারিত না থাকলে যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে। আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে বা নির্ধারিত কিংবা যুক্তিসঙ্গত সময়ে নিষ্পত্তি করা না হলে তার কারণ জানানোর বিধানও রয়েছে।

আইনটি আরও বলছে, কোনো কর্মচারী ইচ্ছাকৃত ও অভ্যাসগতভাবে এ বিধান লঙ্ঘন করলে তা অসদাচরণ বা ক্ষেত্রমতে অদক্ষতা হিসেবে গণ্য হতে পারে।

অর্থাৎ সরকারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আইন আবেদন, সরকারি আদেশ, নির্ধারিত সময় ও যুক্তিসঙ্গত সময়ের কথা বলেছে। নাগরিককে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলার কথা বলেনি।

ফলে কোনো নির্দিষ্ট সেবার ক্ষেত্রে আলাদা কোনো আইন, বিধি বা বৈধ সরকারি নির্দেশনায় এমন শর্ত না থাকলে, শুধু ব্যক্তিগত সম্বোধনকে সরকারি সেবা প্রদানের পূর্বশর্ত বানানোর আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের গুরুত্ব

এখানে সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদও গুরুত্বপূর্ণ। এ অনুচ্ছেদ নাগরিককে আইনের সুরক্ষা এবং আইন অনুযায়ী ও কেবল আইন অনুযায়ী আচরণ পাওয়ার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা দেয়।

এর অর্থ এই নয় যে ‘স্যার’ না বলার প্রতিটি ঘটনাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার আইনগত ভিত্তি কী এবং সেই সিদ্ধান্তের ফলে নাগরিকের অধিকার বা স্বার্থ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে- এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

তবে মৌলিক নীতিটি পরিষ্কার: সরকারি ক্ষমতার প্রয়োগের আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে।

কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দকে সরকারি সেবা পাওয়ার শর্তে পরিণত করার প্রশ্নও তাই আইনগতভাবে বিচারযোগ্য।

Rules of Business-এ কি ‘স্যার’ বলার বিধান আছে?

‘স্যার-ম্যাডাম’ বিতর্কে Rules of Business, 1996-এর কথাও প্রায়ই বলা হয়। এটি সরকারের কাজের বণ্টন ও পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিধিমালা। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত সংস্করণে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংশোধন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তবে এই বিধিমালায় নাগরিককে সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ বলতেই হবে- এমন কোনো সাধারণ বিধান পাওয়া যায় না।

তাই Rules of Business-কে নাগরিকের মৌখিক সম্বোধনের সাধারণ আইন হিসেবে উপস্থাপন করাও সঠিক নয়। অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট দপ্তর বা বিশেষ পরিস্থিতির জন্য পৃথক বৈধ প্রটোকল বা নির্দেশনা থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি আলাদাভাবে দেখতে হবে।

১৯৯০ সালের স্মারক: বিভ্রান্তির জায়গা

‘স্যার-ম্যাডাম’ বিতর্কে ১৯৯০ সালের ১১ ডিসেম্বরের একটি সরকারি স্মারকের কথা প্রায়ই সামনে আসে। বিভিন্ন প্রকাশিত সূত্রে ওই স্মারকের নম্বর এবং বিষয়বস্তু উদ্ধৃত হয়েছে। কিন্তু এর ভাষা নিয়েও প্রকাশিত সূত্রে একরকম তথ্য নেই। কোথাও দাপ্তরিক পত্রে ‘মহোদয়’ ও ‘মহোদয়া’ এবং মৌখিক সম্বোধনে ‘স্যার’ ও ‘ম্যাডাম’ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে; আবার কোথাও ‘জনাব’ ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এসেছে।

এখানে আইনগত সতর্কতা জরুরি। মূল সরকারি স্মারকের পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণিক কপি, এর বর্তমান কার্যকারিতা এবং পরবর্তী কোনো সংশোধন, প্রতিস্থাপন বা বাতিলের সরকারি নথি নিশ্চিতভাবে যাচাই না করে সেটিকে আজকের নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক আইন হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

বিশেষ করে ‘ব্যবহার করা যেতে পারে’ এবং ‘ব্যবহার করতেই হবে’- এই দুই ভাষার আইনগত তাৎপর্য এক নয়।

কোনো দাপ্তরিক শিষ্টাচারকে নাগরিকের ওপর আইনগত বাধ্যবাধকতা হিসেবে প্রয়োগ করতে হলে তার স্পষ্ট ও কার্যকর আইনগত ভিত্তি থাকা প্রয়োজন।

আদালতের বৃহত্তর নীতি

সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা আইনসম্মতভাবে প্রয়োগ এবং সরকারি কর্মচারীদের সাংবিধানিক দায়িত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে জনগণের সেবা করার যে দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে, আদালতের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে তার গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে।

একইভাবে ৩১ অনুচ্ছেদের আলোচনায় আইন অনুযায়ী আচরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে সতর্কতার সঙ্গে বলা দরকার, আদালতের এসব পর্যবেক্ষণকে ‘স্যার না বললে সরকারি সেবা দেওয়া যাবে না’- এই নির্দিষ্ট প্রশ্নের সরাসরি বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। এগুলো বৃহত্তর সাংবিধানিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে- রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আইন ও সংবিধানের সীমার মধ্যে প্রয়োগ করতে হবে এবং সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব জনগণের সেবা করা।

‘স্যার’ সমস্যা নয়, সমস্যা ক্ষমতার সংস্কৃতি

‘স্যার’ শব্দটি নিজে কোনো সমস্যা নয়। একজন নাগরিক শ্রদ্ধা বা সৌজন্যবোধ থেকে একজন কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ বলতেই পারেন। ‘ম্যাডাম’, ‘জনাব’ কিংবা ‘মহোদয়’ও ব্যবহার করতে পারেন।

সমস্যা তখনই, যখন একটি সৌজন্যমূলক শব্দ আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়।

‘আগে আমাকে স্যার বলুন, তারপর আপনার কাজ হবে’- এই মানসিকতা শুধু একটি শব্দের দাবি নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক সম্পর্কে একটি পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ধারণার প্রকাশ।

ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে কর্মকর্তা ছিলেন ‘হাকিম’, আর সাধারণ মানুষ ছিলেন ‘প্রজা’। স্বাধীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে সেই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।

গণতান্ত্রিক প্রশাসনের দর্শন হওয়া উচিত- কর্তৃত্ব নয়, সেবা; ভয় নয়, আস্থা; দূরত্ব নয়, জবাবদিহি।

সম্মান আদায় নয়, অর্জন করতে হয়

একজন কর্মকর্তা দিনে কতবার ‘স্যার’ শুনলেন, তা দিয়ে তাঁর প্রশাসনিক সাফল্য মাপা যায় না।

সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত- তিনি কত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সেবা দিলেন, কতটা স্বচ্ছভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন, দুর্নীতি থেকে কতটা দূরে থাকলেন, সাধারণ মানুষের কথা কতটা মন দিয়ে শুনলেন এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করলেন।

একজন কর্মকর্তা সততা, দক্ষতা ও মানবিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে মানুষ তাঁকে এমনিতেই সম্মান করবে।

সম্মান শব্দ দিয়ে আদায় করা যায়; মর্যাদা অর্জন করতে হয় আচরণ দিয়ে।

সরকারের করণীয়

‘স্যার-ম্যাডাম’ বিতর্কের অবসান ঘটাতে সরকারের উচিত একটি স্পষ্ট ও সর্বসাধারণের জন্য সহজবোধ্য প্রশাসনিক নির্দেশনা দেওয়া।

সেখানে বলা যেতে পারে- সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে নাগরিককে কোনো নির্দিষ্ট সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারে বাধ্য করা যাবে না, যদি না কোনো নির্দিষ্ট আইন বা বৈধ বিধানে তা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকে।

একই সঙ্গে কর্মকর্তা ও নাগরিক- উভয় পক্ষকেই শালীন ও সম্মানজনক আচরণ করতে হবে। ব্যক্তিগত সম্বোধনকে সরকারি সেবা প্রদানের পূর্বশর্ত করা যাবে না। দাপ্তরিক পত্রালাপ ও মৌখিক সম্বোধনের ক্ষেত্রে সরকারি শিষ্টাচারও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে।

আর কোনো নাগরিক শুধু নির্দিষ্ট সম্বোধন ব্যবহার না করার কারণে হয়রানি বা সেবা-বঞ্চনার শিকার হলে তাঁর অভিযোগ ও প্রতিকারের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

শেষ কথা

সরকারি কর্মকর্তাকে ‘স্যার’ বলা যাবে- অবশ্যই। ‘ম্যাডাম’ বলা যাবে- অবশ্যই। সম্মান দেখানোও উচিত।

কিন্তু ‘স্যার বলতেই হবে’- এমন সাধারণ আইনগত বাধ্যবাধকতা বর্তমান সংবিধান, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এবং Rules of Business, 1996-এ পাওয়া যায় না।

১৯৯০ সালের একটি পুরোনো সরকারি স্মারককে ঘিরে প্রশাসনিক সম্বোধনের ইতিহাস ও বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু মূল নথির ভাষা ও বর্তমান কার্যকারিতা নিশ্চিত না করে সেটিকে বর্তমান নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক আইন হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ বলছে- প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। আর ২১(২) অনুচ্ছেদ বলছে- প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তির জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা কর্তব্য।

তাই সরকারি কর্মকর্তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘স্যার’ নয়- জনসেবক। আর নাগরিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘সেবাপ্রার্থী’ নয়- রাষ্ট্রের ক্ষমতার মালিক জনগণের একজন সদস্য।

প্রশাসনের দরজায় তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়- ‘আমাকে স্যার বলা হয়েছে কি না?’

প্রশ্ন হওয়া উচিত- আইন অনুযায়ী নাগরিকের কাজটি কি যথাসময়ে, স্বচ্ছভাবে, নিরপেক্ষভাবে এবং সম্মানের সঙ্গে করা হয়েছে?

কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন কর্মকর্তার মর্যাদা তিনি কতবার ‘স্যার’ শুনেছেন, তা দিয়ে নয়; বরং কতটা সততা, দক্ষতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার সঙ্গে জনগণের সেবা করেছেন- তা দিয়েই নির্ধারিত হওয়া উচিত।

ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ

লেখক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক


প্রিন্ট