৭০ অনুচ্ছেদের সীমা, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এমপির ভোটাধিকার ও সংবিধানের ব্যাখ্যা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: দলবিরোধী ভোটে কি যাবে এমপি পদ?
- আপডেট সময় ০২:৪২:৪০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬
- / ২৫৩৫ বার পড়া হয়েছে
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে- কোনো সংসদ সদস্য যদি তাঁর দলের মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে কি তাঁর সংসদ সদস্য পদ চলে যাবে?
প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে একটি ভোটের। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র, দলীয় শৃঙ্খলা, সংসদ সদস্যের স্বাধীনতা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রকৃত পরিধির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও কার্যকর থাকবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে। রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে বক্তব্যটি স্পষ্ট। কিন্তু সাংবিধানিক প্রশ্নটি আরও গভীর।
কারণ রাজনৈতিক বা সংসদীয় নেতৃত্বের একটি ব্যাখ্যা এক বিষয়, আর সংবিধানের কোনো বিধানের আইনগত অর্থ নির্ধারণ আরেক বিষয়।
তাই বিষয়টি বুঝতে হলে দেখতে হবে- সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ ঠিক কী বলছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কীভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই নির্বাচনে সংসদ সদস্যের ভোটের সাংবিধানিক প্রকৃতি কী।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কীভাবে হয়?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না; জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট প্রদান করেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ এই নির্বাচনের জন্য পৃথক আইনগত প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে। মনোনয়ন, প্রার্থিতা, ভোটগ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণার জন্য সেখানে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। আইনটির ৯ ধারায় সংসদ সদস্যদের বৈঠকের শুরুতে প্রার্থীদের নাম ঘোষণার কথা বলা হয়েছে।
আর ১০(১) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে- “রাষ্ট্রপতি সংসদ-সদস্যগণের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হইবেন।” একই ধারার ১০(২) অনুযায়ী, প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি ভোট থাকবে।
অতএব, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদ সদস্যদের ভোটে অনুষ্ঠিত হলেও এর জন্য সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এ নির্দিষ্ট নির্বাচনপ্রক্রিয়া রয়েছে।
এখানেই ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে মূল প্রশ্নটি তৈরি হয়।
৭০ অনুচ্ছেদ আসলে কী বলে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিষয়বস্তু হলো- দলত্যাগ বা দলের বিরুদ্ধে ভোটদানের কারণে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়া।
বর্তমান সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর- দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে ওই দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে।
এখানে একটি শব্দ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- “সংসদে”। সংবিধানের ইংরেজি পাঠে ব্যবহৃত হয়েছে- “votes in Parliament against that party”। অর্থাৎ শুধু দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার কথা বলা হয়নি; বলা হয়েছে “সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট’ দেওয়ার কথা।
এখন প্রশ্ন হলো- রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্য যে ভোট দেন, সেটি কি ৭০ অনুচ্ছেদের অর্থে “সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট” হিসেবে গণ্য হবে?
এই প্রশ্নই পুরো বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
চিফ হুইপের বক্তব্য বনাম সাংবিধানিক ব্যাখ্যা
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির অবস্থান পরিষ্কার- ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধিত হয়নি; তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও এর বিধান কার্যকর থাকবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের পদ হারানোর বিষয়টি প্রযোজ্য হবে।
কিন্তু এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি- রাজনৈতিক ব্যাখ্যা আর সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এক জিনিস নয়।
চিফ হুইপের বক্তব্য বর্তমান সংসদীয় অবস্থান বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ৭০ অনুচ্ছেদের চূড়ান্ত আইনগত পরিধি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংবিধানের ভাষা, কাঠামো, উদ্দেশ্য এবং প্রাসঙ্গিক আইনগত ব্যাখ্যাও বিবেচ্য।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদ সদস্যদের ভোটে হয়- এটি সংবিধান ও আইনে স্পষ্ট। কিন্তু সেই ভোটের সাংবিধানিক প্রকৃতি কী?
এটি কি ৭০ অনুচ্ছেদের অর্থে “সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট”?
নাকি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর অধীনে অনুষ্ঠিত একটি বিশেষ নির্বাচন, যেখানে সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ভোটার হিসেবে অংশ নেন?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করতে পারে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগের প্রকৃত সীমা।
একটি ভোট, দুটি সাংবিধানিক প্রশ্ন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যের ভোটের ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পাশাপাশি দাঁড়ায়।
একদিকে রয়েছে দলীয় শৃঙ্খলা। অন্যদিকে রয়েছে প্রতিনিধির স্বাধীন বিবেচনা।
৭০ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যের দলত্যাগ বা দলের বিরুদ্ধে সংসদীয় ভোটের ক্ষেত্রে আসন শূন্য হওয়ার সাংবিধানিক পরিণতি নির্ধারণ করেছে।
কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একটি বিশেষ সাংবিধানিক নির্বাচন। এখানে সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করার দায়িত্ব পালন করেন।
তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে- এই ভোট কি কেবল দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে হবে, নাকি রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা, সততা, জাতীয় স্বার্থ ও সাংবিধানিক দায়িত্বও বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ থাকবে?
অন্যদিকে, দলীয় সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ বাইরে যাওয়ার সুযোগ দিলে রাজনৈতিক ম্যান্ডেট ও দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নও সামনে আসে।
সুতরাং বিষয়টি শুধু একটি সাংবিধানিক ধারার প্রয়োগের প্রশ্ন নয়; এটি সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রতিনিধির ভূমিকা নিয়েও একটি বড় প্রশ্ন।
প্রকাশ্য ভোটে বিতর্ক আরও গভীর
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভোটের প্রকাশ্যতা। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ১০(১) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হবেন। ভোটের পদ্ধতি সম্পর্কেও আইনে ভোটারকে ব্যালটের নির্দিষ্ট স্থানে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ভোট দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
ফলে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো সংসদ সদস্য অন্য প্রার্থীকে ভোট দিলে তাঁর ভোটের অবস্থান রাজনৈতিকভাবে গোপন থাকার সুযোগ সীমিত। এখানেই বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
একজন এমপি যদি দলীয় নির্দেশের বাইরে গিয়ে ভোট দেন, তাহলে একদিকে তাঁর সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে; অন্যদিকে দলীয় রাজনীতিতেও এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।
ফলে প্রশ্নটি শুধু “কাকে ভোট দিলেন?”এতটুকু নয়।
প্রশ্ন হলো- একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় কতটা স্বাধীনভাবে তাঁর ভোট প্রয়োগ করতে পারেন?
তাহলে কি এমপি পদ নিশ্চিতভাবেই যাবে?
এখানেই সবচেয়ে সতর্ক ও নিরপেক্ষ সাংবিধানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
একদিকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো সংসদ সদস্য ভোট দিলে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে।
অন্যদিকে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ভাষায় বলা হয়েছে- কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য “সংসদে” তাঁর দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে।
এখন মূল সাংবিধানিক প্রশ্ন হলো- রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যের দেওয়া ভোট কি ৭০ অনুচ্ছেদের অর্থে “সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট” হিসেবে গণ্য হবে?
এখানে কোনো বিষয়কে অতিরিক্ত সরল করে দেখা ঠিক হবে না। একদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদ সদস্যদের ভোটে অনুষ্ঠিত হয় এবং ভোটগ্রহণ জাতীয় সংসদ ভবনেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, এই নির্বাচনের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এ পৃথক প্রক্রিয়া নির্ধারিত আছে।
তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটকে ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় আনা হবে কি না, সেটি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে চূড়ান্তভাবে বলা যায় না। এখানে সংবিধানের ভাষা, কাঠামো, উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট আইন- সবকিছুর সমন্বিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
সুতরাং সবচেয়ে সতর্ক আইনগত বক্তব্য হবে- রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট দিলে ৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে- এমন অবস্থান জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। তবে ৭০ অনুচ্ছেদের “সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট” কথাটির সাংবিধানিক পরিধির মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, সেটি একটি পৃথক ব্যাখ্যাগত প্রশ্ন।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক অবস্থান একটি বিষয়, আর সাংবিধানিক বিধানের আইনগত ব্যাখ্যা আরেকটি বিষয়।
অতএব, এখনই এক কথায় “দলবিরোধী ভোট দিলেই নিশ্চিতভাবে এমপি পদ চলে যাবে”- এমন চূড়ান্ত আইনগত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেয়ে বলা অধিক সতর্ক যে, সংসদীয় নেতৃত্বের অবস্থান হলো ৭০ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও প্রযোজ্য; তবে এই প্রয়োগের সাংবিধানিক ভিত্তি ও পরিধি নিয়ে ব্যাখ্যাগত প্রশ্নটি পৃথকভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।
দলীয় শাস্তি আর এমপি পদ হারানো এক নয়
আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। কোনো সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে দল তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিতে পারে- এটি একটি রাজনৈতিক বিষয়।
অন্যদিকে সংবিধানের অধীনে তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হওয়া একটি সাংবিধানিক বিষয়। দুটিকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
দলীয় বহিষ্কার মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদীয় আসন শূন্য- এমন সরল সমীকরণ তৈরি করা আইনগতভাবে যথেষ্ট নয়।
কারণ সংবিধানের ৬৭(১)(e) অনুচ্ছেদও সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদের বিধানকে আলাদাভাবে উল্লেখ করেছে।
অর্থাৎ আসন শূন্য হওয়ার প্রশ্নে ৭০ অনুচ্ছেদের নির্দিষ্ট সাংবিধানিক শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন এই নির্বাচনকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যায়।
২০২৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে ইতোমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে; ফলে সংসদ সদস্যের ভোটের স্বাধীনতা এবং ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে বিতর্কও নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।
এখানে মূল প্রশ্ন শুধু কে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন- তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো- সংসদ সদস্যরা কীভাবে এবং কোন সাংবিধানিক সীমার মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁদের ভোট প্রয়োগ করবেন?
আসল প্রশ্ন: এমপি কার প্রতিনিধি?
একজন সংসদ সদস্য কি শুধু দলের প্রতিনিধি?
নাকি তিনি একই সঙ্গে তাঁর নির্বাচনী এলাকার জনগণের প্রতিনিধি এবং রাষ্ট্রের আইনসভার সদস্য?
সংসদীয় গণতন্ত্রে দলীয় ম্যান্ডেট অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক দল ছাড়া সংসদীয় ব্যবস্থা পরিচালনা করা কঠিন। কিন্তু একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি যখন সংসদে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর দায়িত্ব শুধু দলের কাছে সীমাবদ্ধ থাকে না। জনগণ, সংবিধান ও রাষ্ট্রের প্রতিও তাঁর দায়িত্ব রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই দ্বৈত দায়িত্ব আরও স্পষ্ট। কারণ এখানে কোনো সাধারণ রাজনৈতিক পদে কাউকে নির্বাচনের প্রশ্ন নয়; রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করার প্রশ্ন।
তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্যের ভোটকে কেবল দলীয় আনুগত্যের মাপকাঠিতে বিচার করা হবে, নাকি জাতীয় স্বার্থ ও সাংবিধানিক দায়িত্বের আলোতেও দেখা হবে- এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় কি এসেছে?
বাংলাদেশে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সমর্থকদের যুক্তি- দলীয় শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এই বিধান গুরুত্বপূর্ণ।
সমালোচকদের যুক্তি- এর কঠোর প্রয়োগ সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশ, বিবেকের স্বাধীনতা এবং সংসদীয় বিতর্কের পরিসর সীমিত করতে পারে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই পুরোনো বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
যদি একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর যোগ্যতা, সততা, জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিবেচনা করে ভোট দিতে না পারেন এবং দলীয় নির্দেশের বাইরে গেলেই সংসদীয় আসন হারানোর ঝুঁকি থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই- সংসদ সদস্যের ভোটাধিকার কতটা স্বাধীন?
আবার বিপরীত প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ- যদি দলীয় ম্যান্ডেটের কোনো কার্যকর মূল্য না থাকে, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা কোথায়?
সুতরাং প্রয়োজন এমন একটি সাংবিধানিক ভারসাম্য, যেখানে দলীয় শৃঙ্খলা থাকবে, কিন্তু প্রতিনিধির সাংবিধানিক দায়িত্ব ও বিবেকের জায়গাটিও পুরোপুরি অস্বীকার করা হবে না।
শেষ কথা: একটি ভোটের চেয়েও বড় যে প্রশ্ন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলবিরোধী ভোটে এমপি পদ যাবে কি না- এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে সীমাবদ্ধ নয়।
বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট। চিফ হুইপের ভাষ্য অনুযায়ী, ৭০ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও কার্যকর এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ হারানোর বিষয়টি প্রযোজ্য হবে।
কিন্তু সাংবিধানিক বিশ্লেষণের জায়গা থেকে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়- ৭০ অনুচ্ছেদের “সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট” কথাটির পরিধি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট পর্যন্ত কীভাবে বিস্তৃত হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বড়। এটি সংবিধানের ভাষা, কাঠামো, উদ্দেশ্য এবং আইনগত ব্যাখ্যার প্রশ্ন।
আর শেষ পর্যন্ত বিতর্কটি শুধু একজন এমপির পদ থাকবে কি থাকবে না- সেটি নয়।
প্রশ্ন হলো- একজন সংসদ সদস্য কি কেবল দলের নির্দেশের প্রতিনিধি, নাকি তিনি একই সঙ্গে রাষ্ট্র ও জনগণের বিবেকেরও প্রতিনিধি?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র। কারণ গণতন্ত্র শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার নাম নয়। গণতন্ত্র হলো- দলীয় শৃঙ্খলা ও ব্যক্তিগত বিবেক, রাজনৈতিক ম্যান্ডেট ও সাংবিধানিক দায়িত্ব, আনুগত্য ও জবাবদিহিতার মধ্যে ন্যায্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার নাম।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একটি ভোট হয়তো একজন রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচিত করবে; কিন্তু সেই ভোটের সাংবিধানিক স্বাধীনতা ভবিষ্যৎ সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি বড় প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারে।
ড. এ জেড এম মাইনুল ইসলাম পলাশ
লেখক | সাংবাদিক | কলামিস্ট | বিশ্লেষক
প্রিন্ট




















